শেষের দিকে...

লিখেছেন - তাসমিম দৃষ্টি | লেখাটি 1118 বার দেখা হয়েছে

১.

 

দিত্রা আপু সবসময় বলতো,"আমাদের দেশের বৃষ্টির মাঝে আর মেঘলা আকাশে যে পরিমান সৌন্দর্যটা আছে তা পৃথিবীর কোথাও যেন পাওয়া যায় না।আমাদের দেশে যখন মেঘ করতো তখন মনে হত পেজা তুলার মত মেঘরা এক আনন্দ খেলায় মাতোয়ারা আর এই দেশে দেখ বৃষ্টি আর মেঘ আসলে যে কি এদেশের মানুষেরা মনে হয় জানেই না।নাহ আসলে দেশের যে জিনিসটা আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি তা হল বর্ষাকাল"।আমি এই কথা শুনে নাক সিটকে বলতাম,হু ঐ কাদা আর জলাবদ্ধতায় তো তুমি মিস করবা।আপু বলতো "আরেহ পাগলী ঐ কাদা আর জলাবদ্ধতা থেকে মাথা তুলে ওপরের আকাশ নামক জিনিসটার দিকে তাকিয়ে দেখিস পেজা তুলার মত মেঘে ঢাকা এক আকাশ দেখতে পারবি আর যখন বৃষ্টির স্বর্গীয় ফোঁটা গুলো মন থেকে অনুভব করবি তখন ঐ কাদা মাখা ইটকাঠের শহরগুলোও স্বর্গ মনে হবে"।আজ যখন এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম দেখলাম আকাশে অসংখ্য মেঘ আর অঝর ধারায বৃষ্টি বর্ষন।কি যেন মনে করে আমি বৃষ্টির মাঝে নেমে গেলাম।দিত্রা আপু সবসময় বলতো বৃষ্টি অনুভব করে দেখিস তুই'ও ভালবেসে ফেলবি।আজ আমি সেইটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম কতটা পারলাম জানি না কিন্তু খুব ভাল লাগলো। 

 

গাড়িতে উঠে মনে মনে ভাবলাম দেশের মাটিতে পা রাখতেই দিত্রা আপুর প্রিয় বৃষ্টি আমায় ভিজিয়ে দিল ইশ যদি আজ সাথে দিত্রা আপু থাকতো সে কত না খুশি হত।হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ১০টা বাজে ।এসময় ঐখানে দিত্রা আপু কি করছে নিশ্চয় কোনো গল্পের বই এর মাঝে ডুবে আছে।মেয়েটা বই পড়তে যে এতই ভালবাসে।আপুর নিশ্চয় একবার আমার কথা মনে পড়ছে।দিত্রা আপুকে মিথ্যা বলে দেশে আসতে একটু খারাপ লাগছিল।কিন্তু যদি সত্যিটা বলতাম আপু আসতে দিত না।আমি যখন প্রথম তাকে দেখি তখন ভাবি নি এই অজানা অচেনা মেয়ে টা আমার কাছে এত আপন হয়ে যাবে।আসলে সৃষ্টিকর্তা দিত্রা আপুকে কিছু অদ্ভুত গুণ দিয়েছিল তা ছিল কাউকে খুব সহজে আপন করে নেওয়া ।সে আমাকে কত কিছু না শিখিয়েছে।দিত্রা আপু খুব ভাল করে জানতো কিভাবে কোনো সম্পর্কের দাম দিতে হয়।আমার মনে হয় সে তার জীবনে যে কাজ টি খুব ভাল করে পারতো তা হল কাউকে খুব ভালবাসতে পরিমানের উর্ধ্বে সে ভালবাসতো তার প্রিয়জনকে।দিত্রা আপু খুব গোছানো কিন্তু আমাকে সব সময় আক্ষেপ করে বলতো যে আমার এই গোছানো আমাকে ভাল লাগে না,অগোছালো আমাকে ভাল লাগতো কারন তখন এই অগোছালো আমাকে সামলানোর কেউ ছিল।এখনকার আমি যেন আসলে দিত্রা না অন্য কেউ।দিত্রা যেন খুব অভিমান করে হারিয়ে গেছে। 

 

আমি দিত্রা আপুর এই কথাগুলো কখনো বুঝতাম না এসব কি বলে মাথায় ঢুকতো না।কিন্তু আপুর এই কথা গুলো সহজ হয়ে মাথায় ঢুকলো যখন আমার হাতে আপুর ডাইরি টা আসলো। 

 

আমি আমার ব্যাগ থেকে আপুর ডাইরি বের করে পাতাগুলো পাল্টাতে লাগলাম।আর মনে মনে ভাবলাম আপু যখন ডাইরি খুঁজে পাবে না তখন কি হবে?।আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল ফোনের শব্দে।ফোনের ওপাশ থেকে রুদ্র বলল,মায়া তুই যে ঠিকানা গুলো খুঁজতে বলছিল খুঁজে পাইছি ।কথা টা শুনে যেন আমি প্রান ফিরে পেলাম একটুও দেরি না করে রুদ্রকে হোটেলে আসতে বললাম। 

 

২.

 

হোটেলে ফিরেই রুদ্রকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম সেই ঠিকানা গুলোতে কারন আমার হাতে বেশি সময় ছিল না মাত্র পাঁচদিন।যা করার তা তার মাঝেই করতে হবে।দিত্রা আপুর পরিবার বলতে কিছু ছিল না।আপুর কাছে আপনজন বলতে ছিল মাত্র কয়েকটা মানুষ কিন্তু সে মানুষদের থেকে প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে অভিমান করে সাতসাগর পার করে ভীনদেশে চলে আসে।কিন্তু তবুও সেই মানুষদের আপু খুব ভালবাসতো। 

 

আমি যখন ডোর বেল বাজিয়ে দাড়িয়ে ছিলাম বুকের মাঝে ধুক ধুক করছিল।আমার খুব ইচ্ছে ছিল নিধিতা আর আবির নামের মানুষটিকে দেখার।বিশেষ করে নিধিতা এই মেয়েটির মাঝে এমন কি আছে যে দিত্রা আপুর খুব প্রিয় ছিল।যখন দরজা খোলার পর সামনে যে মেয়েটি দাড়িয়ে ছিল সে যে নিধিতা তা বুঝতে আমার দেরি হল না।দিত্রা আপু ঠিক যা যা বলেছিল সে তেমনি ছিল।আমি ভেবেছিলাম তারা দিত্রা আপুর ব্যাপারে শুনতে আগ্রহী হবে না।কিন্তু যখন বললাম আমি দিত্রা আপুর খবর নিয়ে এসেছি তখন আমায় ভিতরে বসিয়ে আবির আর নিধিতা নামের মানুষ দিত্রা আপু কই,কেন তাদের ছেড়ে গেছে এসব হাজারো প্রশ্ন করতে লাগলো।আমি শুধু তাদের দিকে ডাইরি দুটা আগায় দিলাম। 

 

তারা যখন ডাইরি দুটা পড়ছিল তখন তাদের চোখের কোনে পানি চিকচিক করছিল।মনে মনে ভাবলাম যে এখন কাদছো কেন যখন আপুকে কষ্ট দিয়েছিল তখন মনে ছিল না।আমি তাদের উদ্দেশ্য বললাম,"আমি আপনাদের লাকি বলবো না আনলাকি বুঝছি না।লাকি এই জন্য যে আপনারা জীবনে দিত্রা আপুর মত মানুষকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন আর তার মত মানুষ আজো আপনাদের পাগলের মত ভালবাসে কিন্তু আনলাকি কারন পেয়েও আপনারা তাকে হারালেন।আপনারা আপুর জীবন ছিলেন কিন্তু আপুকে কখনো আপুকে আপনাদের জীবনের অংশ'ও ভাবেন নি।বিশেষ করে আপনি নিধিতা আপু ,দিত্রা আপুর কাছে যে আপনি কি ছিলেন তা জানা আপনার পক্ষে সম্ভব না"।তখন নিধিতা আপু তার অশ্রু লুকাতে বলল,তুমি ঠিক ই বলেছো যখন দিত্রা ছিল তখন ওর মূল্যটা বুঝিনি।আসলে সবসময় পেয়েছি তো হারানোর ভয় টা কি জানতাম না।কিন্তু আজো পাই আগের চেয়ে বেশি তবুও ওকে হারানোর পর মনে কি যেন নেই এই পাওয়ার মাঝে"।পাশ থেকে আবির ভায়া বলে ওঠে আমাদের দিত্রার কাছে নিয়ে যাও প্লিজ ওকে আমাদের বলতে হবে যে আমাদের জন্যে ও কি"।আমি তাদের দিত্রা আপু অসুস্থ এই খবর দিব তখনি দরজায় একজন কে দেখে নিধিতা আপু বলে উঠল আর্দ্র ভাইয়া আমাদের দিত্রার খোঁজ পাওয়া গেছে।এই মেয়ে আমাদের তার কাছে নিয়ে যাবে।আমি ছেলেটার দিকে তাকিয় দেখলাম খুব সাধারন এক যুবক।মনে মনে ভাবলাম এই সে যাকে দিত্রা আপু ভালবাসে।আমি তাদের দিকে তাকিয়ে বললাম দিত্রা আপুর অসুস্থতার কথা।তখন তারা আমায় বলল,দিত্রার কিছু হবে শুধু একবার নিয়ে চলো ওকে ওর ভালবাসার প্রতিদান দিতে দাও আমাদের। 

 

*** 

 

আবির আর্দ্র আর মায়া নিধিতাদের নিয়ে কিছুক্ষনের মাঝেই প্লেনটা আমেরিকার উদ্দেশ্যে উড়বে।মায়া চুপ হয়ে বসে তার হাতের ফোনে দিত্রার মেসেজ, ডক বলে গেল অপারেশন এর পর যে কোন কিছু হতে পারে।যাওয়ার আগে তোকে একটা কথা বলে যাই কিছু মানুষ কখনো কারো জীবনের অংশ হতে পারে না যেমন আমি।তুই ভাল থাকিস আর ভেবে নিস আমি কারো গল্পে কখনো ছিলাম না। মায়া ভাবছে দিত্রা আপু কি জানতে পারবে এই তার প্রতি মানুষগুলোর ভালবাসা

Share