হয়ত এমনটাই হওয়ার ছিল

লিখেছেন - তাসমিম দৃষ্টি | লেখাটি 1123 বার দেখা হয়েছে

     কিছু মানুষ আছে যারা তাদের অনুভুতি গুলো বলতে পারে না।সেগুলো তারা একান্ত নিজের হৃদয়ের এক অন্ধকার জায়গায় রেখে দেয়।আমিও হয়ত এমন একজন আমিও আমার অনুভূতি গুলো এভাবে লুকিয়ে রেখেছি।ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম রাজপুত্রের মত দেখতে এমন কাওকে ভালবাসব,তার হাত ধরে হৃদয়ের লুকানো অনুভূতিগুলো বলে দিব।আমি আমার বাবা-মার অত্যন্ত আদুরে একমাত্র মেয়ে।আমার বাবা মার অনেক স্বপ্ন আমায় নিয়ে।আমার মা হলেন সৌন্দর্যের পুজারী।তিনি প্রায় বলতেন তার রাজকন্যার মত দেখতে মেয়েটার জন্য একদম রাজপুত্রের মত জামাই আনবে। আর আমিও বলতাম আমি তার সেই খুঁজে আনা রাজপুত্রকেই ভালবাসব।আমাদের পছন্দ কি কখনো আলাদা হতে পারে।আমার মা তার কথা রেখেছেন আমার জন্য এমন এক ছেলে পছন্দ করে এনেছেন যাকে দেখে ডজনখানেক মেয়ে ক্রাশ খাবেই।কিন্তু আমিই কথা রাখতে পারি নি।সেই ছোট থকে আমার অনুভূতি ও ছোট্ট হৃদয়খানি মায়ের দেখানো রাজপুত্রের স্বপ্ন বুনতে ছিল,ভাবতাম তাকে দেখলে হৃদয়ে বিশেষ সুরটা বেজে উঠবে।কিন্তু আসল সময়েই আমার সাথে ধোকাবাজি করে গেল সবকিছু।আমার সামনে যখন মায়ের আনা রাজপুত্র টা এল,তাকে দেখে বেশ অভিভূত হয়েছিলাম কিন্তু তার জন্য আমার হৃদয়ে বিশেষ সুরটা বেজে ওঠেনি।

 

            কারন তখন আমার কিছু বোঝার আগেই আমার অনুভূতিগুলো,সেই বিশেষ সুর ও ছোট্ট হৃদয়খানিতে বাসছিল এমন একজনের যাকে কখনো কল্পনাতেও ভাবি নি ভালবাসব। আমার প্রিয় বান্ধবী অথৈ সবসময় বলত,ভালবাসা এমন একটা জিনিষ তুই নিজে বোঝার আগেই হয়ে যাবে।আজ কথাগুলো সত্যি লাগে।সত্যি আমি আমার মায়ের আনা রাজপুত্রকে ভালবাসতে পারি নি।কিন্তু যখন মা হাসি হাসি মুখে আমায় কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল,মা ছেলেটা আমার খুব পছন্দ আমি তোর জন্য এমন একজনকেই খুঁজছিলাম।মা তোর এই বিষয়ে মতামত কি?।সেদিন মায়ের হাসি মুখ আর পরিবারের সবার খুশির কাছে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল,কিন্তু তখনো আমার কাছে আমার অনুভূতি আর ভালবাসা গুলো আমার মা-বাবার ভালবাসার চেয়ে এত বড় ছিল না যে তাদের না বলে তাদের খুশি টা পানশে করে দিব।মায়ের বুকে মাথা রেখে নিজের অনুভূতিগুলোকে আবার সেই হৃদয়ের অন্ধকার জায়গায় রেখে দিয়ে বলেছিলাম মা আমি রাজি।তারপর যখন সবাই খুশিতে আত্মহারা ছিল তখন আমার বুকে হাহাকার শুরু হয়েছিল।

 

            কিন্তু আমি সেদিন কাঁদিনি।কি ভাবছেন আমি এতই কঠিন একটা মেয়ে যে এত ত্যাগের পরও কাঁদিনি ।আমি কঠিন হওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি এত কঠিন থেকেও নিজেকে একসময় সামলাতে পারিনি।মেয়ে হয়ে জন্মেছি আর চোখে পানি আসবে না তা কি হয়?।আমার বাসাই মানুষের জমা হওয়া শুরু হয়েছিল আর সেদিন আমার চোখের বাঁধও ভেঙ্গেছিল যখন স্পষ্ট বুঝেছিলাম আমার ভালবাসাটা অসম্পূর্ন থেকে গেল।আমি আমার হৃদয়ে থাকা মানুষ আয়ানকে কখনো আমার ভালবাসার কথাটা বলিনি,আমি জানতাম আয়ান আমার ভালবাসার জন্য অনেক অনেক বছর ধরে অপেক্ষা করছে।তবুও ওকে অনেক ভালবাসার পরেও ওর অপেক্ষাটা শেষ করতে পারি নি।কারন আমার কাছে বাবা-মার ভালবাসাটার কাছে আমার ভালবাসাটা বড়ছিল না।আয়ান হয়ত বিষয় টা বুঝেছিল যখন আয়ানকে বলেছিলাম,মা আমার জন্যে ছেলে ঠিক করেছে কিছুদিন পর বিয়ে।তখন আয়ান একটুখানি চুপ থেকে আমায় বলেছিল ভাল থেকো রাজকন্যা তারপর চুপটি করে চলে গিয়েছিল।সেদিন আমি আয়ানের চোখের কোণে পানি দেখেছিলাম।আর তারপর সারারাত অঝর ধারা বর্ষন করে কেঁদেছিলাম।সেদিন আমার সাথে মেঘেরাও কেঁদেছিল।

 

            আর আমি অসহায়ের মত কাঁদতে কাঁদতে বিধাতার কাছে অভিযোগ করেছিলাম,আয়ান তো আমার রাজপুত্রটার মত না যাকে ভালবাসবো বলে এত কল্পনা,তবু কেন ওকে ভালবাসলাম?আর যখন আমার জীবনের গল্পে আয়ান থাকবে না, তখন কেনই বা তাকে আনা হয়েছিল আমার জীবনে,আর কেনো কেনো আমায় এত ভালবেসেছিল আয়ান,যখন তা ধরে রাখার ক্ষমতাই আমার ছিল না?।কিন্তু তখন মেঘের গর্জন ছাড়া কোনো উত্তর পায় নি।তারপর ধীরে ধীরে ভালবাসাটা কে আড়াল করে নতুন ভাবে চলতে হবে ভেবে,বাবা-মায়ের খুশির জন্য নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে থাকি।

            

 

 

****

 

 

            আজ আমার বিয়ে।সকাল থেকে চারপাশে আনন্দের স্রোত চলছে।সবাই খুব খুশি আর আমিও খুশি থাকার অনেক চেষ্টা করছি।কিন্তু তবুও একটা শূন্যতা অনুভব হচ্ছে।আয়নায় নিজেকে দেখছি আর ভাবছি ,কত স্বপ্ন ছিল আমার বিয়ে নিয়ে কিন্তু সব যেন আজ ফাঁকা।আচ্ছা এমনটা কি না হলে হত না।

            বাইরে পটকা ফুটছে ছেলেপক্ষ এসেছে।আমার মা ঘরে আমায় নিতে এসেছে।আমায় দেখে মা বলছে তোকে আজ অচিনপুরের রাজকন্যা লাগছে মা,আমি তার দিকে তাকিয়ে তার হাসি টা দেখে নিজের শূন্যতা ভুলে গেলাম।

        

 

 

***

       

 

            আমাকে ছেলের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে করে বিয়ে স্টেজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্যে মা আর অথৈ নিয়ে যাচ্ছে।আমি মাটির দিকে তাকিয়ে নিজেকে তৈরি করছি অজানা অচেনা মানুষটা কে নিজের জীবনের অংশ বানাতে হবে ভেবে।আমায় গাড়িতে উঠিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে অথৈ বলল,"এই যে বর সাহেব আমার দোস্তটাকে কেমন লাগছে"।তখন আমার পাশে বসা ছেলেটি বলে উঠল,"অথৈ ঠিকই বলছিস আজ আমার রাজকন্যাকে একদম রাজকন্যা লাগছে"।কথাটা কানে আসা মাত্র হৃদয়ে মৃদু ধাক্কা লাগল।পাশে তাকিয়ে দেখলাম পাশে বসা ছেলেটি অজানা অচেনা কেও না।সে আমার, একমাত্র আমার হাইব্রিড জাতের আঁতেল আয়ান।আমি কিছুক্ষন ঘোরের মধ্যে ছিলাম,একবার আয়ান আর একবার অথৈ এর দিকে তাকাতে লাগলাম।আমার একবার মনে হল সেনসলেস হয়ে যাব,কিন্তু তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুব জোড়ে মা কে ডাকতে গিয়ে মুখ দিয়ে ধীরে করে বের হল,আম্মু এখানে আয়ান কি করছে?।''তোর বর তোর পাশে থাকবে না তো আমার সাথে থাকবে''।আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় এর মত তাকায় থাকলাম।তারপর অথৈ ব্যাখ্যা দিল পুরো ব্যাপারটার।

 

            বিষয়টা সিনেম্যাটিক লাগলেও সত্য।আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আমার মনের অনুভূতির কথা অথৈ নামের একজন বাঁদর জানত।সেদিন আমি কেঁদেছিলাম আর আড়াল থেকে তা দেখে অথৈ আম্মুকে নিয়ে এসেছিল।তারপর আম্মুকে অনেক কষ্টে ম্যানেজ করে আয়ানের সাথে দেখা করায়।আম্মু আগে আয়ানকে সহ্যই করতে পারতো না কিন্তু আয়ানের সাথে দেখা হওয়ার পর কথা বলার পর আম্মু পুরাপুরি নাকি অভিভূত হয়ে যায় আর সিদ্ধান্ত নেয় যে আয়ান কেই জামায় বানাবে।তারপর দুই পরিবারের মাঝে কথা হয়ে আর আগের ছেলেকে বুঝিয়ে আয়ানের সাথে বিয়ে ঠিক করা হয়।কিন্তু তার মাঝে এই আঁতেল আয়ান আর অথৈ ঠিক করে যে আমি যেন কিছু না জানি।

 

            এসব শুনে আমি কয়েক সেকেন্ড এর জন্যে ঘোরের মধ্যে থাকি।আম্মু আমার কাছে এসে বলে,"তোর খুশির চেয়ে আমাদের কাছে আর বড় কিছু নেই।এখন তো বিয়েতে আর খটকা নেই"।আমি তখন চুপ থেকে কিছুক্ষন পর বললাম,"নাহ আমি এখন বিয়ে করব না"।এই কথা শুনে একেকজন মনে হয় আকাশ থেকে পড়ল এমন অবস্থা।অথৈ আমার দিকে চোখ পাকিয়ে বলল ,"ওই কি বলিস তুই, তোর মাথা ঠিক আছে?"।আর পাশে থেকে আয়ান বলল,আরেহ এগুলা কি?।আমি তখন মুখ উল্টায়ে বললাম,ওই কি আমারে প্রোপোজ করছে যে আমি বিয়া করবো?একবার প্রেমের প্রোপোজ করছিল তাও মনে হচ্ছিল আমাক না মাটিকে?তো জীবনে একবারই বিয়ে করব।তার জন্যে প্রোপোজ করবে না?।

 

            আমার কথা শুনে অথৈ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,"তোর বিয়ার জন্যে আমি এত কাহিনি করলাম আর তুই শুরু করলি ভাক্কা?তোরে যে আমি কি মাইর দিব"।"যা দেওয়ার ইচ্ছে দিস বাট প্রোপোজা না করলে বিয়ে করছি না"।এই বলে গাড়ি থেকে নিচে নামলাম।আমার কান্ড দেখে আম্মু ছোটখাট শক খায়।আয়ান আম্মুকে বলে আমি দেখছি চিন্তা করবেন না।তাই বলে সবাই কে অবাক করে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আমার হাত ধরে।পুরো বিয়ে বাড়ি অবাক হয়ে আমাদের কান্ড দেখছে।আয়ান আমার হাত ধরে হাঁটু গেড়ে বলে,"এই যে মিস অভিমানি জানেন আমার না জানার সীমা অনেক,আমার জানিনার সীমা অসীম,আর ঠিক আমি জানি না তোমায় কত ভালবাসি,কিন্তু যদি কেও জিগ্গেস করে তোমায় কত ভালবাসি তবে বলবো,আমার এই 'জানি না' মত আর কিছু বলবো না,ওহ্ আর এক কথা আমায় কি একটু বিয়ে করবেন রাজকন্যা"।আমি আমার এই হাইব্রিড জাতের আতেল এর প্রোপোজ করা দেখে কি করবো না বুঝলাম না,শুধু মনে মনে বললাম সত্যি এমনটায় কি হওয়ার ছিল?হয়ত..

 

Share