অতঃপর তারা

লিখেছেন - সিনি মনি | লেখাটি 1662 বার দেখা হয়েছে

একটা ছোট্ট গল্প । একটা দুষ্টু মেয়ে আর একটা লক্ষ্মী ছেলের গল্প ।

 

মেয়েটি দুষ্টু ছিল । ছেলেটি দুষ্টু নয় । মেয়েটি ভালবাসত রঙ্গিন স্বপ্ন ইচ্ছের খোলা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে । ছেলেটির চশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকত বাস্তবতার বাঁধা ।

 

মেয়েটি ভালবাসত হইচইয়ে সবাইকে ভুলিয়ে রাখতে । ছেলেটি নিজের জন্যে চাইত অফুরন্ত সময় । মেয়েটি পৃথিবীকে দেখত প্রজাপতির ডানার মত রঙিন । আর ছেলেটির কাছে পৃথিবী ছিল রেল লাইনের নির্বাক পাথর গুলির মতই কঠিন , জীবন্মৃত ।

 

মেয়েটির কাছে তার বাবা ছিল বন্ধুর মত , আর ছেলেটি তার বাবাকে দেখত শাসনের বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে । মেয়েটি মনে করত , শুধুমাত্র পড়াশোনাই একমাত্র কাজ হতে পারেনা । ছেলেটি বিশ্বাস করত, '' যতই পড়িবে, ততই শিখিবে '' ।

 

মেয়েটি খেলার ছলে জীবনকে দেখত , আর ছেলেটির কাছে জীবন খেলার উপকরন নয় । মেয়েটি অকারণে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালবাসত । আর ছেলেটি ? সে ও ভিজত , তবে তা শুধু ক্লাস না মিস করবার জন্য । মেয়েটি ক্লাসের সবখানেই ছুটাছুটি করত , আর ছেলেটি চাইত দৃষ্টির অগোচরে থাকতে ।

 

কিন্তু হঠাত কি যেন হয়ে গেল !!

 

মেয়েটি তার দুষ্টুমির ফাঁকে মুখ গম্ভীর এই চশমা পরা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবত । ছেলেটি সব বুঝেও বুঝতে চাইত না । কিন্তু দিনে দিনে সে বুঝতে পারল সে তার মনটাকে হারিয়ে ফেলছে । সে তার ছকে বাধা জীবনে মেয়েটির বসবাস কামনা করতে শুরু করল । মেয়েটি তার ভেতর অনুভব করল এক অসাধারন অনুভুতি । ছেলেটি বুঝতে পারল , তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রন নেই ।

 

তারপর?

 

মেয়েটি ভালবাসত ক্লাসের এক কোনে বসে থাকা শান্ত এই ছেলেটার কথা অকারনে ভাবতে ,আর ছেলেটি চাইত ওই দুষ্টু মেয়েটার সাথে তার শান্ত জীবনের দ্বিঘাত সমীকরণ মিলাতে । মেয়েটি প্রেমে পড়ল গাম্ভীর্যের আর ছেলেটি হারাল চাঞ্চল্লে । মেয়েটি ধূসর রাতগুলির অপেক্ষায় থাকত আর ছেলেটি সারা রাত ধরে অপেক্ষাতে থাকত সকালের জন্য । মেয়েটি কখনও কখনও ভাবত , '' আমি বুঝি তার কাছে অসহ্য ! '' ছেলেটি নিজেকে বলত , ''আর কারোটা জানিনা , তার সবকিছু এত টানে কেন ??'' মেয়েটি কখনও ভাবতে পারেনি সে বদলে যাবে । ছেলেটি জানতোনা তার অস্থিরতার সমাপ্তি কোথায় , কতটা দূরে । মেয়েটির দুরন্ত দৃষ্টির প্রতিটি কোনে নেবে আসল লজ্জা । ছেলেটি নিজেকে আবিস্কার করতে লাগল অন্য এক রুপে ।

 

ছেলেটি তার গাম্ভীর্যে টেনে দিল নীলাকাশ , মেয়েটি যে গুটিয়ে গেল সেই আকাশ দেখে ! মেয়েটি হৃদয়ের একপাশে তৈরি করল আরেকটি জগত , সেই জগতে শুধু সে আর তার স্বপ্ন বালক । আর ছেলেটির খাতার শেষ পাতায় মেয়েটির নামের আদ্যাক্ষর ভরা ।

 

তারপর ............।

 

সেদিন ছিল শ্রাবণের চতুর্থ দিন । আকাশে মেঘের ঘনঘটা সেই সকাল থেকেই । মেয়েটির প্রানে বাজতে লাগল হারিয়ে যাবার সুর । ছেলেটি বুঝল আজ ই সেই দিন যার প্রতিক্ষায় সে আছে । মেয়েটি অকারন অস্থিরতায় ভুলে গেল ছাতার কথা । আর ছেলেটি তার  বাবার চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে আসল বাসা থেকে । সেই ঝুম বৃষ্টিতে মেয়েটি একা দাঁড়িয়ে ছিল । আর ছেলেটি বারবার নিজেকে হারাতে হারাতে খুজে

পেল বৃষ্টিস্নাত মেয়েটির পাশে । কাঁপা কাঁপা হাতে সে বাড়িয়ে দিল হাতে ধরে রাখা ছাতা টা ।মেয়েটি ছাতাটা নিয়ে ছুড়ে দেয় অসীম বৃষ্টিকনায় । ছেলেটির বাড়িয়ে দেয়া হাতে নিজের হাত রেখে বলে , ''শুধু এই হাত টা চাই , সারাজীবন ''

ছেলেটি অতল মায়ায় ডুবে যায় যেন , বলে ,'' সব ই তো দিতে চাই, সারাজীবন''

 

অতঃপর তারা এগিয়ে গেল বৃষ্টিতে ভিজবার উদ্দেশে । মাথার উপর বিশাল আকাশ আর অসীম বৃষ্টিকনা ..................

Share