ভ্রমনে মজেছি ভ্রমে

লিখেছেন - সিনি মনি | লেখাটি 1293 বার দেখা হয়েছে

ঘুরতে যাবার মত মজার ব্যাপার পৃথিবীতে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না ।

ঢাকার বাইরে গাছে ঘেরা যেখানেই যাওয়া হোক না কেন মন ভাল হতে বাধ্য । তবে

আমার কাছে ঢাকা টাও ভীষণ ভাল লাগে, শুধু যদি জ্যামটা না থাকতো ! যা

বলছিলাম, বেড়াতে যাওয়া খুবই মজার আর সময়টা যদি হয় শীতকাল তবে তো বস কথাই

হবেনা । কিন্তু দুঃখের কথা হল, বাইরে ঘুরতে যাবার পেছনে কপালের একটু হাত

থাকতে হয় যা আমার নেই । এই কারনেই ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপক ইচ্ছা থাকলেও তা

কাজে লাগাবার সুযোগ আমার খুব বেশি হয়নি । তবে আমি স্পষ্ট বুঝেছি আব্বু

আম্মুর সাথে বেড়াতে যাওয়া মানে বেড়ানো মাটি করবার কাছাকাছি ।

 

একটা ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে ।  আমার বয়স তখন ৫ অথবা ৬ এর মাঝামাঝি ।আব্বু

আম্মুর সাথে গিয়েছি  রমনায়, বৈশাখী মেলাতে । রমনার এত রঙ দেখে আমার ছোট্ট

মনেও 'কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা' গানটা সমান তালে বাজছিল ।

কিন্তু হাতে যে আছে হাতকড়া , আর হাতকড়াটা হল আম্মুর হাত । আম্মুকে ভিলেন

বানিয়ে আমি মুখ হাড়ি করে ফুচকার দোকানে বসে ছিলাম । অকালপক্ক আমি আকাশ

পাতাল ভাবতে শুরু করলাম , মাথায় রাজ্যের চিন্তা কেমন করে শিশু জাতির

'বঙ্গবন্ধু' হওয়া যায় তাই বোধ হয় ভাবছিলাম । পাশ ফিরে দেখলাম আব্বু আম্মু

নাই । তারা মনে হয় দেখেনি আমার থালাতে তখনও তিনটা ফুচকা আমার দিকে দাত

কেলিয়ে তাকিয়ে ছিল , কিন্তু আমি তো দেখেছি তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আগে খাওয়া

শেষ করি । আস্তে আস্তে খেতে খেতে যখন তিনটা ফুচকাই কোল্ড স্টোরেজে চালান

করলাম তখন আমার মনে হল আমি কেমন করে বাসায় যাব । আশেপাশে কাউকে চিনিনা,

ভয়ে আমার ভিতরটা সাইবেরিয়া হয়ে গেছে । কি করব ভেবে না পেয়ে যখন কান্না

করবার আয়োজন করছিলাম তখন দেখি আব্বু আম্মু ছুটে আসছে ।আর আমি ? আমি থালা

হাতে বসে আছি , ভাবটা এমন যেন এত ছোট ব্যাপারে ভয়ের কিছুই নেই ! কিন্তু

আমি এখন ও ভাবি সেদিন আম্মু আব্বু যদি আর একটা মিনিট দেরি করত তাহলে

বিশাল রমনা এই 'শিশু বঙ্গবন্ধুর' কি গর্জনটাই না শুনত !!!!!

 

একই ঘটনার প্রতিফলন ঘটেছিল আহসান মঞ্জিলে । বিশাল মাঠে আব্বু কবির চাচ্চু

আর চঞ্চল চাচ্চুর সাথে গল্প করছিল আর আমি একটু দূরে সম্ভবত লাফাচ্ছিলাম ।

আমি চুপা রুস্তম ফড়িং এর পিছে দৌড়াতে গিয়ে হারিয়ে গেলাম । না রমনার মত

আহসান মঞ্জিলের কপাল অত খারাপ  না, সে আমার ভয়াবহ গর্জন শুনল বটে ! আমি

হাত পা ছুড়ে চিৎকার করতেই অনেক দয়াবান আঙ্কেল চলে আসলেন এবং আমি একটি

ছোটোখাটো ভিড়ের মধ্যমণি হলাম ! এই ভিড় দেখে আব্বু ও চলে আসলো এবং ৫ মিনিট

পর উৎকণ্ঠিত জনতা দেখল আমি আব্বুর কোলে করে চিপ্স খেতে খেতে বাসায় যাচ্ছি

!!

 

এহেন অভিজ্ঞতার পর আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়াটা বিপদের কাছাকাছি ই বটে !!

 

আমার ভয়াবহ  ভাবে হারাবার  অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০১০ সালে যখন এ+ পাবার জন্যে

প্রথম আলো নন্দনে নিয়ে গিয়েছিল । নন্দনে ব্যাপক মজা করবার পর বন্ধুদের

সাথে যখন বাসে উঠতে যাব তখন হঠাত করে আমি সবাইকে হারিয়ে ফেললাম । এক দিকে

কাউকে খুঁজে পাইনা তার উপর ১৬ নাম্বার (সম্ভবত ১৬ ই ছিল) বাসটাও যেন উধাও

। আন্দাজে আরেকটা বাসে উঠে পরলাম,৪৩ নাম্বার বাস । বাসে উঠেই মোবাইলটা

বের করে আমি আমার জীবনের বৃহত্তম বাঁশটা খেয়েছিলাম ।

 

আমি আবিষ্কার করেছিলাম আমার ফোন চার্জের অভাবে চোখ বুজেছেন । আমি

টিপাটিপি করে ব্যর্থ হলাম,আমি একদম প্রথম সিটে , আমার পাশে কেউ বসেনাই,

আমি এমনি কুভাগা । কিন্তু আমার একটা মোবাইল খুব দরকার কারন আমি বুঝতে

পারছিলাম আমাকে হারিয়ে আমার বান্ধবিরা ইতমদ্ধে পাগল হয়ে গেছে ।আমি

দাঁড়িয়ে পিছনে  তাকালাম , আমার পিছনের সিটের মেয়ে তিনটা হাই ভলিউমে গান

শুনছিল । আমি ওদের মোবাইলটা এক মিনিটের জন্যে চাইতেই ওরা এমন ভাবে তাকাল

যেন আমি একটা এলিয়েন,কেবল মঙ্গল গ্রহ থেকে ল্যান্ড করলাম । তিন পাউডার

সুন্দরির একজন আমাকে বলল, ''আমরা ত গান শুনতেছি ।'' আহারে কি গান...

তউসিফের ' দূরে কোথাও আছি বসে' ।ওই দিনের পর থেকে এই গান আমার কানের

টিমপেনিক পর্দাকে জালিয়ে দেয় ।

 

সে যাই হোক, আমাদের বাসে বন্ধুসভার এক ভাইয়া এই ঘটনা দেখলেন এবং আমাকে

বললেন আমি ফোন দিয়া কি করব । পুরো কাহিনি বলার পর আমাকে তার ফোনটা দিয়ে

বললেন ,'' শোন আমার ফোনে ২৩ টাকা ২৯ পয়সা আছে । একটু মাইপা কথা কইও ।''

ইচ্ছা করতেছিল ফোনটা আছাড় মারি, আরে বেটা আমার কি বয় ফ্রেন্ড আছে নাকি যে

তারে ফোন দিব ?? কিন্তু ফান্দে পড়িয়া যে বগারা আসলেই কান্দে সেটা আমি

হারে হারে টের পেয়েছিলাম  এই ১ আগস্ট ২০১০ । আমি মুন কে ফোন দিতেই সে

কাঁদো কাঁদো গলায় ফোন ধরল । আমি ওকে কোনোরকমে  ঠাণ্ডা করে ফোন রাখলাম

এবং সেই কঞ্জুশ ভাই কে ফোনটা ফিরিয়ে দিলাম । আমার ধারনা, এক টাকাও যায়নাই

। যাক, শেষমেশ বাস ছাড়ল, সারাটা রাস্তা আমার মন একদম সেই রকম খারাপ, আমি

সবাই কে শুধু হারিয়েই ফেলি । চিরন্তন সত্য ।

 

সারাটা রাস্তা আমি ঘুমালাম । এক সময় এই জালাময়ি অভিযান থামল । আমি চীন

মৈত্রী সম্মেলনে নামার ১০ মিনিট পর ১৬ নাম্বার বাসটা আসল যেখানে আমার

বান্ধবিরা ছিল । আমাকে দেখে আমার বন্ধুরা দৌড়াতে দৌড়াতে আসলো । মুনের

ঘুসি খেয়ে আর বাকিদের ঝারি  খেয়ে আমি বুঝলাম আমি জীবনে ফ্যান্টাস্টিক

কিছু বন্ধু পেয়েছি্‌ ,সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপারটা ছিল এটাই যে নন্দনে আসার

আগের দিন আমার বান্ধবি রাবেয়া আমাকে ম্যাসেজ দিয়েছিল এই লিখে '' যাব তো

সবাই দেখা যাবে ফেরার টাইমে তুই পালাবি ।'' ওর কথাটা পরোক্ষভাবে সত্য হয়ে

গিয়েছিল । গরমিল টা শুধু এটাই  যে আমি পালাই নি। হারিয়েছি ।

 

পরবর্তী আধা ঘণ্টা আমার জীবনের অসাধারন মুহূর্তগুলির অন্যতম । আমাদের

মাইক্রো বাসটা দেরি করছিল আর ততখন আমরা ফুটপাথে বসে বাউনডুলে হয়ে গেলাম ।

ঝালমুড়ির সাথে গান যা জমেছিল ! অতুলনীয় !!

 

বাসায় আসতে আসতে রাত ৯ টা। ঘরে ঢুকতেই আম্মুর ঝারি ''ফোন কি তোমার সাথে

নাকি নন্দনে সাজায়া রাইখা আসছ ?'' আমি ফোনের অবস্থা দেখিয়ে তেজ মেরে

বললাম,'' কিন্না ত দিসো নোকিয়া ২৭০০। পুরাই ফাউল ।'' আম্মু  মুখ বাকিয়ে

বলেছিল ,'' সারাদিন গেইম খেলো মোবাইল যে ফাটেনাই সেটাই অনেক '' ।

 

নন্দনের এই কাহিনি আমার আম্মাজান জানতেন না। আমি আমার আব্বু কে বলেছিলাম

কিন্তু আব্বু মীর জাফরগিরি করেছে এবং আমি এখনও আম্মুর কাছে এই ব্যাপারে

পচায়িত হই ...এইটা কিছু হইল ??

Share