পাখির বাসা ভালবাসা

লিখেছেন - সিনি মনি | লেখাটি 1795 বার দেখা হয়েছে

পায়রা :

 

ভার্সিটি থেকে বেড়িয়ে আমি কিছুক্ষন এদিক ওদিক অনর্থক ঘুরাঘুরি করলাম ।নাহ নীড় কে কোথাও পেলাম না , বেকুব টা কোথায় যে ডুব দেয় বোঝা মুশকিল ।নীড় আমার বন্ধু , না বন্ধু বলে মজা পাচ্ছি না , ও আমার দোস্ত । ওকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও চলে না । পড়াশুনা থেকে শুরু করে মুভি দেখা , সবকিছুতেই নীড়ের সরব উপস্থিতি না হলে আমার চলেই না ।আমার ক্লাস শেষে ওর আসার কথা ছিল । এখনও মনে হয় আসেনি । ঠিক আছে, ভালই হল,আজকে আমার হাত থেকে ওর চুল ছিঁড়া কেউ আটকাতে পারবেনা । আমি আরেকটু হাঁটাহাঁটি করতে লাগলাম ।

 

'' পেয়ারা বেগম কি করিস ?'' , নীড়ের গলা শুনে পিছনে তাকালাম । ''পেয়ারা বেগম'' নাম টা শুনলে আমার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত রাগে জলে উঠে, আমি মুহূর্তেই তেলে বেগুনে জ্বলে গেলাম ।

দাঁত খিঁচিয়ে বললাম , ''who is your পেয়ারা বেগম? ''

নীড় দাত কেলিয়ে হেসে বলল , '' নিজের নাম ভুইলা গেসস নাকি ? দুঃখজনক রে "

আমি নীড়ের চুল টানতে টানতে বললাম , '' আমার নাম পায়রা , পেয়ারা নাআআআ "

নীড় আমার হাত থেকে কোনরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ দুরত্তে সরে গিয়ে বলল ,

'' তোর মত ডাকাইত মাইয়ার নাম হওয়া লাগত ঘষেটি বেগম । আমি তোর বাপ হইলে.........''

নীড় কথা শেষ করতে পারল না । আশপাশের সাদা চামড়ার  মানুষ গুলি দেখল , নীড় দৌড়াচ্ছে এবং আমি ধাওয়া দিচ্ছি । এটা খুবি পরিচিত ঘটনা ।

 

আমরা নিউইয়র্ক থাকি । আমি , আমার বাবা মা আর বড় ভাইয়ের সাথে থাকি ।নীড় ওর বাবার সাথে থাকছে , broken family ওর ।আমার সাথে ওর পরিচয় হওয়ার কারন , আমরা একি এলাকায় থাকি ।

নীড় দৌড়ে কুলাতে না পেরে বলল , '' আর ফাল দিতে পারবনা , তুই পিটাইলে পিটা ।''

আমি ঘুসি দেখিয়ে বললাম , '' আর ডাকবি ওই নামে ?''

নীড় জোরে জোরে মাথা নাড়াল , '' যা আর বলবনা ।''

আমি ছেঁড়ে দিলাম , '' যা বাইচা গেলি ।''

 

নীড়ের সাথে আমি যখন কফিশপে এসে বসলাম তখন পড়ন্ত বিকেল । কফিশপটার নাম antora , নামটা প্রথমদিন বাঙ্গালি ঠেকছিল । কদিন বাদে সন্দেহ দূর হয় আমার, কফিশপটির মালিক অন্তরা নামের এক বাঙালি ভদ্রমহিলা । আমি আর নীড় আগে প্রচণ্ড কফি নিতাম , এখন অবশ্য চা প্রীতি বেড়েছে , এই কফিশপ টাতে খুব ভালচা ও পাওয়া যায় ।

 

নীড় :

 

আমি কফিতে একটু চুমুক দিয়ে পায়রার দিকে তাকালাম । পায়রাকে আজকে একদম গোলাপি পায়রার মত লাগছে । পায়রার সবকিছুই অবশ্য সুন্দর । ওর মন , ওর সারল্য , হাসি  , চোখ ,এলোমেলো চুল এমনকি ওর নামটাও । ওর নামটা আমার ভীষণ প্রিয় , সেটা অবশ্য কোনদিনই বুঝতে দেইনি ওকে । ''পায়রা বিলাস '' নামটা শুনলে প্রথমে মনে  হবে কোন বড়লোকের সৌখিন বাড়ির আদুরে নাম , কিন্তু না বস , ধারনাটি ভুল , এটা আমার পেয়ারা বেগমের নাম , আ আ আমার ? কি যে ভাবি !

 

 

আমি কফিতে দ্বিতীয় চুমুক দিতে দিতে দেখলাম পায়রা তার স্বভাব অনুযায়ী ডানে বামে আশেপাশে তাকাচ্ছে । এটা ও সবখানে গেলেই করে , আমি অন্তত তাই দেখেছি ।তাকানো ব্যাপারটিতে কোন সমস্যা নেই , কিন্তু ওর দৃষ্টিতে শুধুই তাকানো না ,আমার কেন জানি মনে হয় ও কাউকে খুঁজছে । ও আমাকে ''জানের দোস্ত '' মানলেও কখনও এই ব্যাপারে কিছু বলেনা ।

'''পায়রা ''

'' হু বল''

''তোর সমস্যাটা কি ?''

পায়রা চোখ কপালে তুলে বলল , ''আমার সমস্যা আবার কি ?''

আমি একটা ফিচলা হাসি দিয়ে বললাম ,'' সেটাই তো জানতে চাইছি ।''

পায়রা চেচিয়ে বলল , '' তুই আমার সাথে ত্যাঁদড়ামি করস ?আমার সমস্যা আছে ?''

আমি ঘোর কাটিয়ে বললাম ,'' তাইলে প্লিজ বল তুই কোথাও গেলে এমন ডাইনে বামে কি দেখস ?''

পায়রার চেহারা মুহূর্তেই চেঞ্জ হয়ে গেল । রাগ রাগ ভাব উবে গিয়ে তার মুখহাসি হাসি হয়ে গেল ।

''কিছু না... কই কিছু দেখিনাত ''

আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম , '' মিথ্যা বলিস না , না বলতে চাইলে বলিস ই না , তাও মিথ্যা না ,ok ?

পায়রা হেসে বলল , '' আসলে দেখি আরকি আশেপাশে বাঙালি আছে নাকি ''

''বাঙালি ?''

''হুম দেশের মানুষজন ''

আমি বুঝলাম ও বলতে চাইছেনা , লুকাচ্ছে । তাও বললাম , '' আমি হতাশ ।''

''ক্যান ?''

'' তোর সামনে মেডিকেলে পড়া এমন হ্যান্ডসাম বাঙালি যুবক বইসা আছে , তুই তারে দেখলি না উলটা আর ও বাঙালি খুজস ?''

পায়রা চোখ পাকিয়ে বলল , '' অই ফাইজলামি করবিনা একদম ! ধইরা নাইড়া কইরা দিব একেবারে !''

আমি হেসে মাথার চুলে হাত বুলালাম । গর্ব করবনা কিন্তু আমি জানি আমার চুলগুলা খুব সুন্দর এবং এজন্যে পায়রা অনেক জেলাস । তার মতামত হল ছেলেদের মাথায় এত সুন্দর চুলের কোনই দরকার নেই । আর তাই মাঝেমাঝেই সে আমার মাথা ন্যাড়া করার ইচ্ছা পোষণ করে । মাথা ন্যাড়া করে দিতে চাইলে সাধারনত আমি কিছু বলিনা , কিন্তু আজকে মুখ ফসকে গেল ।

'' তুই ন্যাড়া করে দিবি ? তুই নাপিতের বউ কবে হইলি ? দাওয়াত দিলি না ! দুঃখ পাইলাম । ''

'' ধইরা একটা আছাড় মারলেই দাওয়াত হবে !''

আমি হাসতে লাগলাম ।

 

পায়রাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় আসলাম । না, আব্বু এখন ও বাসায় আসেনি।এক মগ গরম চকলেট ড্রিঙ্ক খেতে খেতে আমি পায়রার কথা ভাবতে লাগলাম ।মেয়েটা নিজের ভিতর কি যেন একটা লুকিয়ে রাখছে । কি সেটা ? ওকে এতদিনেও বুঝতে পারিনি আমি , আজ ই বা কিভাবে বুঝব  ! 

 

দুদিন পর ---- পায়রাকে দাড় করিয়ে রেখে আইস্ক্রিম কিনতে এসেছি । এই মেয়েটা একদম বাচ্চাদের মতন , আইস্ক্রিমের কথা শুনলেই পাগলের মত খুশি হয় । রাস্তার এপাশ থেকে দেখছি ওকে । সেই একি অভ্যাস , কি যেন অথবা কাকে যেন খুঁজছে ও । মাঝেমাঝে রাগ হয় ওর উপর , কি হয় আমাকে বললে সবকিছু ? ওর ভিতরের অস্থিরতা দেখলে আমি ও যে অস্থির হয়ে যাই এই কথাটা ও কি কোনোদিন বুঝবেনা ?আমি রাস্তাটা পার হয়ে ওর পাশে গিয়ে  দাঁড়ালাম , ও টের ই পায়নি , খুব রাগ লাগছে । যে কারনে রাগ লাগছে সেই রাগ দেখানোর অধিকার টা তো আমার নেই , রাগটা তাই হজম করলাম। 

'' আইস্ক্রিম টা ধর । গলে যাইতেসে । ''

'' ওহ এসে গেসিস ''

'' সেটা কি আর ম্যাডাম টের পাবেন নাকি ''

পায়রা একটু লজ্জা পেয়ে গেল । আমি দেখেছি  , যখনি ও এই রকম খোঁজাখুঁজির কারনে ধরা খায় , ও খুব লজ্জা পেয়ে যায় ।

পায়রা অন্য দিকে তাকিয়ে বলল ,

'' আমার উপর তুই খুব বিরক্ত তাই না ?''

'' হাহ আজকে আমি শ্যাষ !''

'' কি ????''

'' মানে বছরে দুই একটা দিন আপনি মাত্রাতিরিক্ত উদাস থাকেন এবং পেইনফুল কথাবার্তা বলতে থাকেন !''

'' নীড় ''

'' বল''

'' তুই আমার কাছ থেকে যা জানতে চাস সেই কথাগুলি আমি আজকে তোকে বলব ।প্লিজ ফাইজলামি করিস না ।''

আমার হার্টে ড্রাম বাজছে । কোন রকমে বললাম , '' তুই বল দোস্ত ''

পায়রা শুরু করল ,'' আমি যখন ক্লাস  ৮ এ পড়ি তখন থেকে আমাদের স্কুলের একটা ছেলেকে খুব পছন্দ করি । ছেলেটা খুব ভাল  স্টুডেন্ট , ক্লাস টেনে পড়ত তখন, নাম সামিন । কখনও মুখে বলা তো দূরে থাক আমার অনুভুতিটা প্রকাশ করার সুযোগ টাও পাইনি । ভয়ে , লজ্জায় ... ''

'' তারপর ''

'' এইচ এস সি পাস করে ও দেশ ছাড়ে , আমি তখন টেনে , অনেক চেষ্টায় জানতে পারি ও আমেরিকাতে এসেছে । এস এস সি পাস করে আমি ও এখানে চলে আসি , তারপর জানতে পারি সামিন ও নিউইয়র্কে থাকে ... তখন থেকেই ওকে খুজি , জানি পাবোনা তাও ''

আমি অনেক কষ্টে নিজেকে আটকে রেখে বললাম , '' ফেইসবুকে ?''

'' পুরো নাম তো জানিনা রে ''

আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম , পায়রা কে আর কষ্ট পেতে দিবনা ।

'' আমি যেহেতু এখন থেকে জানি ,আমিও খুঁজব , তুই চিন্তা করিস না পায়রা ,ঠিক পেয়ে যাবি তোর সামিন কে , তুই দেখিস আমি বললাম তো ওকে খুঁজে এনে দেব''

''  কোথায় গিয়ে খুজবি ?''

'' যেখান থেকে পারি ''

পায়রা খুশি হয়ে বলল , '' সত্যি পারবি নীড় ?'''

'' তোর জন্যে সব পারব '' এটুক বলেই জিভ কাটলাম । কেন যে বললাম , ছি ছি ছি ।

পায়রার মুড মনে হয় ফিরে এসেছে , ও চোখ নাচিয়ে বলল , '' কি কি পারিস রে ?''

'' এইতো, যেমন ধর মশা মারতে , মাছি ধরতে , তেলাপোকা তোর গায়ে ছেড়ে দিতে ......''

'' অসভ্য , হারামি , চুপ কর । বজ্জাত !''

'' হাহাহা '' , হাসতে খুউব কষ্ট , এত কষ্ট কেন ?

 

পায়রা :

 

বাসায়  আমি একা , টিভিতে স্পাইডারম্যান মুভি দেখছি আর বসে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছি , সাথে খুব সুন্দর একটা কাঁচামরিচ । কাঁচামরিচ টা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছি , জানি একটু পর কি ঘটবে , আমার এসিডিটি উঠবে , আমি একা একা হাহুতাশ করব , ওষুধ খাব এবং কয়দিন পর সব ভুলে গিয়ে আবার দেখা যাবে আমি মুভি দেখতে দেখতে কাঁচামরিচে কামড় লাগাচ্ছি !

আমি কাঁচামরিচে শেষ কামড়টা দেয়ার পর কলিং বেল বাজল । আমি দরজা খুলে দেখলাম , নীড় । ওকে খেপিয়ে বললাম , '' ফোন ডেড ? ''

নীড় মুখ কাঁচুমাচু করে বলল , '' জরুরি দরকারে আসছি , ঢুকতে দে ''

 আমি ওকে ঢুকতে দিয়ে বললাম , '' টয়লেট ওইদিকে ''

নীড় চোখ গোল গোল করে বলল , '' টয়লেট মানে ?''

'' বললি না জরুরি দরকার ?''

'' ধুর খালি দুষ্টামি ''

'' ওকে বল কি কাজ ?''

'' আমি যে লাইব্রেরিতে কাজ করি , কালকে সেখানে ডিউটি আছে বাট আমি আব্বুর সাথে একটু ব্যাস্ত থাকব, তুই কালকে আমার জায়গায় প্রক্সি দিতে পারবি ?''

''ক্যান তোকে ছুটি দেয় না ?''

'' মালিক টা ক্যাচক্যাচ করে ছুটি নিলে ''

'' কি কাজ করস লাইব্রেরিতে ?''

'' তেমন কিছুনা , বই সবার কাছ থেকে নিয়ে জায়গামত রাখা , বই খুঁজে দেয়া , বইএর ধুলা ঝারা এইসব হাবিজাবি কাজ আর কি ।''

চিন্তা করলাম , ওর এই উপকারটা আমার করা উচিত , ও আমাকে সবসময় অনেকভাবে সাহায্য করে ।বই দেয়া , এসাইনমেন্টে হেল্প করা , নিউ মুভির ডিভিডি ম্যানেজ করে দেয়া , আরো কত কিছু । সিদ্ধান্ত নিলাম , ওকে হেল্প করব ।

'' ওককে নীড় তুই আড্ড্রেস রেখে যা আমি প্রক্সি দিয়ে দিব । তোর মালিককে বলে রাখিস ।''

নীড় সবগুলা দাঁত বের করে অ্যাড্রেস লিখে ফ্রিজ থেকে বিনা অনুমতিতে আপেল বের করে খেতে খেতে ওর বাসায় চলে গেল ।

 

আলফাবিট লাইব্রেরি , একটু আগে আব্বু নামিয়ে দিয়ে গেছে । লাইব্রেরির মালিকটা আসলেই বেশি ক্যাচক্যাচ করে । আমাকে  এমনভাবে কাজ বুঝাতে লাগল যেন  আমি কচি খুকি ।

আমি কিছু বই  নিয়ে গুছাচ্ছি , হঠাত পেছন থেকে excuse me  শুনে ফিরে তাকালাম ।তাকিয়ে আমি মোটামুটি একটা টাশকি খেলাম । আসলে আমি মনে হয় পাগল হয়ে গেছি নয়ত এখানে সামিন কে কেন দেখছি ?একবার  চোখ বন্ধ করে আবার তাকালাম , আচ্ছা এটা কি সত্যিই সামিন ? ছেলেটাহেসে বলল , '' পায়রা ? me right ? ''

আমি কিছুই বলতে পারলাম না । সে ই আবার বলল , '' আমরা একি স্কুলে পড়তাম ?

চিনেছ আমাকে ? একসাথে ড্রইং শিখতাম , আমি সামিন  ''

আমি তোতলাতে তোতলাতে খুব কষ্টে বলতে  পারলাম , '' চিনেছি ভাইয়া ''

'' কিন্তু তুমি এখানে ? জব কর ? আগে তো দেখিনাই "

'' আমার এক বন্ধুর জায়গাতে প্রক্সি দিতে এসেছি ।''

'' ও আচ্ছা , আমি রেগুলার ই আসি এখানে , সবাইকে মোটামুটি চিনি , তোমার বন্ধুর নাম কি ? ''

'' নীড় , নির্ঝর নীড়''

'' ow i see i know him . তার মানে তুমি ওর ফ্রেন্ড । কি করছ ইদানিং , পড়াশোনা ?''

'' এখানকার একটা ভারসিটিতে , পদার্থ নিয়ে , আপনি ''

'' আমি জবে আছি , টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছি  ।''

অনিচ্ছা সত্তেও বললাম , '' সামিন ভাইয়া , ম্যানেজার একটু হার্ড , আমরা পরে কথা  বলি ? ''

সামিন বুঝতে  পেরে বলল , '' তোমার কাজ কতখন ?''

''১২টা ''

'' ok i will come then , অনেক কথা হবে ''

সামিন চলে গেল । আমার নিজেকে বিশ্বাস হতে কষ্ট লাগল । কি যে খুশি লাগছে !নীড়কে না বলা পর্যন্ত শান্তি পাব না !

 

নীড় :

 

সোফাতে শুয়ে আছি । আমার প্ল্যান অনুযায়ী সামিনের আজ বই নিতে লাইব্রেরিতে যাওয়ার কথা । ওকে বলেছিলাম  ইন্ডিয়ান বইটা আজকে পাওয়া যাবে । পায়রার  ও ওখানেই থাকবার কথা । নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে ওদের । আমি জানি  সামিন আমাকে পছন্দ করে না , আমি ও করিনা অবশ্য । কারন ও আছে , ও কেমন যেন , মেয়ে পটানোর বাজে অভ্যাস ওর আছে । ওর নাম ইশরাক আহমেদ ই জানতাম , যেদিন জানলাম ওর নাম সামিন , খোঁজ নিয়ে দেখলাম ও ই পায়রার সেই সামিন ,আমি হয়ত পায়রাকে বলতে পারতাম যে আমি ই সামিন কে খুঁজে বের করেছি , কিন্তু আমি জানি ও নিজে যদি সামিন কে খুঁজে পায় তাহলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে । আর আমি তো ওকে খুশিই দেখতে চাই ।

ফোন বাজল । ধরলাম,

'' হ্যালো ''

'' দোস্ত মনিইইইই '', পায়রার গলা ,  শুনেই বুঝলাম আমি সার্থক । তারপর একে একে সব শুনলাম । পায়রা  আজ সামিনের সাথে খেতেও গেছে , ও এতটা আশা করেনি , আমিও না ! কিন্তু ও ভীষণ খুশি ।

আমি মনে প্রানে দোয়া করতে লাগলাম , সামিনের এই ব্যবহার যেন মেয়ে পটানোর

আরেকটি অপকৌশল না হয় !!!

 

ল্যাপ্টপে linkin park এর breaking the habit ফুল ভলিউমে বাজিয়ে শুনছি ।নিজেকে ভাঙছি , গড়ছি , আড়াল করছি । কখনও ভাবি ই নাই এরকম পলান্টিক্স খেলতে হবে আমাকে , নিজের সাথে  , পায়রার সাথে । খুবি খারাপ সময় যাচ্ছে ।পায়রার কাছ থেকে ইদানিং দূরে দূরে থাকছি ,ও এখন সামিনের সাথে ক্যাম্পাসে ঘুরাঘুরি করে ,আমি ইচ্ছা করেই দূরে দূরে থাকি , হাজার হোক আমি পায়রার

বন্ধু , আমি ওদের মাঝে বাগড়া বাধাতে চাইনা । কিন্তু আমি একটু একটু ভয় পাচ্ছি আর সেটা সামিনকে নিয়ে , ছেলেটার স্বভাব তো মোটেই ভাল না । আমি ওকে দেড় বছর ধরে দেখছি । ও যে আমাকে দেখতে পারেনা তার একটা কারন অবশ্য আছে ।

 

কয়েক মাস আগে ------ সামিন ওর মেয়েবন্ধুদের নিয়ে লাইব্রেরিতে আসতো , একেক দিন একেক জন কে নিয়ে । বই পড়ার উদ্দেশ্য না , গল্প করার ঠিক জানিনা , ওকে একদিন সতর্ক করলাম লাইব্রেরিতে আড্ডাবাজি না করতে । খুব খেপে গেল ।ম্যানেজারকে নালিশ করল আমার নামে । এতে অবশ্য লাভ হয়নি , ম্যানেজার লাইব্রেরিতে নিজের স্বভাব না দেখানোর অনুরোধটাই করেছে সামিন কে । তারপর থেকেই ছেলেটা আমাকে পছন্দ করেনা । থোরাই কেয়ার করতাম আমি ! কিন্তু ভাগ্য আমাকে হারিয়ে দিল । এই ছেলেটাই কিনা পায়রার ............

আমার মাথা ঘামানোর কিছুই থাকত না , কিন্তু আমি গত পরশুই সামিন কে আরেকটা মেয়ের সাথে হাত ধরে হাটতে দেখেছি । তখন থেকে শুধু এটাই ভাবছি যেচে গিয়ে পায়রার ক্ষতি করলাম না তো ? আমি না করলে তো সামিন কে পায়রা খুজেই পেত না,সেটাই কি ওর জন্যে ভাল ছিল ? কিছুই ভাবতে পারছি না! really ,life is painful !!!

কারও সাথে  কথা গুলি শেয়ার করতে না পারলে মরে যাব , আমার সামিনের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত । পায়রা আমাকে খুব ভাল বন্ধু ভাবে ,আমি জানি আমি ওর জানের দোস্ত ই , যেটা ও বলে ,এই সামিনের জন্যে ও যদি কষ্ট পায় আর এটা যদি বুঝতে পারে যে আমি আগে থেকেই সব জানতাম , কখনই আমাকে ক্ষমা করবেনা ও , আমি হলে কি করতাম ?? আর ক্ষমা  করা না করা ম্যাটার না ,আমি  ওকে কষ্ট পেতে দেখতে পারব না এইটাই ম্যাটার !

 

পায়রা :

 

পড়তে বসেছি , কয়দিন পর পরীক্ষা শুরু হবে । এখন পড়াশুনার সাথে একটু সম্পর্ক  রাখা উচিত ।ইদানিং নীড়কে খুব মিস করছি , কতদিন ওর সাথে আমার দেখা হয়না । ঠিকমত কথাই বলেনা আমার সাথে , আচ্ছা আমার উপর ও রাগ করেছে ?রাগ কেন করবে ? ও তো আমার সাথে কখনই রাগ করেনা । তাহলে কি আমি ওকে কষ্ট দিয়েছি কোনভাবে ? ও তো আমার সাথে দেখাই করেনা আমি আবার ওকে কষ্ট কেমন করে দিলাম ! ওই তো আমাকে কষ্ট দিয়েছে । আমাকে এভয়েড করছে । মনটা খারাপ লাগছে।

ফোনে রিং বাজতেই দৌড়ে গেলাম , নীড় ফোন দিয়েছে কি ?

'' হ্যালো ''

'' পায়রা কি কর বেইবি ?'' সামিনের গলা ।

'' পড়তে বসেছি বেবি , তুমি ?''

'' পড়তে? এত পড় কেন ? রেডি হও ,আমি গাড়ি নিয়ে আসছি , মুভি দেখব আজকে ।বাসায় খুব বোরিং লাগছে ।''

এইটুক বলেই সামিন ফোন কেটে দিল । পড়া জলে গেল আমার । রেডি হয়ে ওয়েট করতে লাগলাম সামিনের জন্যে । সামিনের উপর আমার মেজাজ খুব খারাপ । ২ দিনে ৩ দিনে খোজ নেয়না,আজকে আবার ............ আজাইরা ঢং যতসব ! 

 

 

সামিনের গাড়িতে উঠে আমি চুপচাপ বসলাম । সামিন কে বোঝাতে চাইলাম ওর উপর রেগে আছি আমি । সামিন আমার রাগের ধার না ধরে বলল ,

'' snow white  মুভিটা দেখব , তুমি নিশ্চয়ই দেখনি ?''

'' দেখেছি ''

সামিন আমার  দিকে ফিরল , '' কবে ''

'' যেদিন রিলিজ হয়েছে সেদিনি দেখেছি ''

সামিন হেসে বলল , '' নিশ্চয়ই নীড়ের সাথে ?''

আমি মাথা নেড়ে হ্যা বললাম ।এরপর সামিন কোন কথা বলল না । ও কি মন খারাপ করল ? আমি একটু পর নিরবতা ভাঙ্গলাম ,

'' একবার দেখেছি তো কি হইসে  আরেকবার দেখব । তোমার সাথে দেখব ।''

'' আমার মনে হয় দরকার নেই ''

আমার কান্না পেতে লাগল , কান্না চেপে বললাম , ''  তুমি রাগ করেছো ? আমিও করেছি , তুমি দুইদিন contact কর নাই ''

'' মানুষ ব্যাস্ত থাকতে পারে না ?''

আর কিছু বললাম না আমি , সামিন কে আমার খুব অচেনা লাগল ।

 

সামিন আমাকে আর মুভি দেখতে নিল না , একটা কফিশপে  বসলাম । সামিন বলল ,

'' আমি বুঝিনা ওই মাথা খারাপ ছেলেটার মধ্যে তুমি কি পাও ?''

আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল , '' নীড় মোটেই মাথা খারাপ না , না জেনে কাউকে নিয়ে কিছু বলা ঠিক না সামিন ''

'' ও তোমার খুব ভাল ফ্রেন্ড , তাই কি ?''

'' আমার জানের দোস্ত ও , আমি জানিনা কেন ওকে তুমি দেখতে পার না , কিন্তু ও খুব ভাল ছেলে ।''

''তোমাকে রিলিজ হওয়া নতুন মুভি দেখতে নিয়ে যায় বলে ?''

আমি হতবাক হয়ে সামিনের  দিকে তাকিয়ে থাকলাম ।সামিন হাসতে হাসতে বলল , '' বাদ দাও আমি নীড়কে নিয়ে আর কিছুই বলতে চাই না, ওর মত একজনের জন্যে আমাদের মধ্যে ঝামেলা হওয়া ঠিক না তাইনা ?''

খুব খারাপ লাগতে থাকল আমার । নীড় আমার খুব ভাল বন্ধু , সামিনের জন্যেই কি আমি ওকে হারাতে বসেছি ? সামিন ওকে এমন চোখে কেন দেখে ? আচ্ছা সামিন কি নীড়কে সন্দেহ করছে ? জানি না কেন , হঠাত করে আমার সামিন কেই সন্দেহ হতে থাকে ।।

 

নীড়  :

 

'' আমার এই আঁধার আমার কবিতা

সময়ের পাতায় যা লিখে চলি

ছিল সবই তোমারই

আছে আজো তোমার -----------------''

কলিং বেলের আওয়াজ শুনে গান থামাই । দরজা খুলে দেখি পায়রা থমথমে  মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ওকে দেখে ভয়ে আমার আত্তা শুকিয়ে গেল । ওর এরকম মলিন চেহারা আমি কোনদিন দেখিনি ।

'' ঢুকতে দিবিনা দোস্ত ?''

আমি ঢুকতে দিলাম ।পায়রা সোফাতে বসল । বাসার ড্রেস পরে চলে এসেছে । ওকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে এতখন কাদছিল ।আমি পরিবেশ হালকা করার জন্যে ফাইজলামি করার চেষ্টা করলাম ,  

 

'' চেহারা সুরত তো মাশাল্লাহ শাঁকচুন্নি ফেইল দিবে । এই অবস্থা হইল কেমনে ?''

'' লাত্থি দিয়া তোর সব কয়টা দাঁত ফেইলা দিব হারামি বদ মাইশ ''

'' আমি কি করলাম ?''

পায়রা চোখ বড় বড় করে বলল , '' আমি কোনদিন তোর ফ্রেন্ড ছিলাম না তাইনা ? ''

'' সামিনের সাথে ঝগড়া হইছে দোস্ত ? '', পায়রার হাত ধরে বললাম ।পায়রার নাক লাল হয়ে গেল , সে কাদতে শুরু করল । আমি ওর কান্না দেখতে লাগলাম , আমার পৈশাচিক আনন্দ হতে লাগল । আমি প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে দিলাম , '' নাক মুছ ''

পায়রা রুমাল টা দিয়ে নাক চোখ মুছতে লাগল । ওকে একটা স্ট্রবেরির মত লাগছে। আমি ওর মাথায় হাত দিলাম , আমার খুব ইচ্ছা হল ওকে বলি ,সামিনের কয়টা হাড্ডি ভাংগুম আমাকে বলে দে । কিন্তু আমি সেটা না বলে বললাম ,

'' একটু আধটু ঝগড়াতে কিছু হয়না দোস্ত , আর কাদিস না প্লিজ ''

পায়রা বাচ্চাদের মত ফোপাতে ফোপাতে বলল , '' ও তোকে কেন দেখতে পারে না আমাকে বলবি ? কি শত্রুতা তোর সাথে ?''

'' মানে ?সামিন তোকে কিছু বলেছে ? আমার সাথে তো ওর শত্রুতা নাই ''

'' ও তোকে সহ্য করতে পারেনা রে ... আমার কি মনে হয় জানিস ও তোকে  সন্দেহ করে ''

আমার রাগ উঠে গেল , '' তুই সন্দেহটাকে পাত্তা দিচ্ছিস কেন ? ওকে কেন সব বোঝাচ্ছিস না ?''

''ক্যান বুঝাব আমি ? ও আমাকে বিশ্বাস করেনা তার মানে  জানিস ও আসলে আমাকে লাভ ই করেনা ''

আমি আমার মত বলতে থাকলাম , '' আমি কেন তোদের রিলেশানে  সন্দেহ হব ? আমাকে নিয়ে কেন তুই সামিনের সাথে ঝগড়া করিশ ?কেন করিশ ?''

'' ও তোকে নিয়ে উলটা পালটা বলবে কেন ?''

'' বলুক । তুই গায়ে লাগাস কেন ?  তুই গায়ে লাগাচ্ছিস বলেই ও সন্দেহ করছে ''

'' রিলেশানে গেলে ফ্রেন্ডশিপ  কুরবানি দিতে হয় , এসব তো মানতে  পারব না ''

ভয়ংকর রেগে গেলাম , ''  আমাকে কেন বলছিস ? যখন সামিন কে ভালবেসেছিস আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি ? এখন সবকিছু নিয়ে শান্তিতে থাকবি তা না , আমাকে নিয়ে লেগেছিস ! আমি একটা আউটসাইডার ''

পায়রা উঠে দাঁড়াল , '' তোরা সব একরকম  , দুইদিন পরপর গুইসাপের মত কালার চেঞ্জ করিস । আমি আজকে সারাদিন কাদছি , তুই আমার সাথে দেখা করতে চাস না তাও আসছি , আমি জানতাম না তুই ও বদলাবি ''

'' বদলাইনাই আমি ''

'' ১০০ ভাগ বদলাইসিস ! আগের নীড় থাকলে আজকে আমাকে কাদতে দেখলে বলত,সামিনের কয়টা হাড্ডি ভাঙ্গুম আমাকে বলে দে ।হাহ  সরি রে আর ডিস্টার্ব করবনা ।''

পায়রা দুপদাপ করে পা বাড়িয়ে সোয়েটারের কলার দিয়ে কান ঢাকতে ঢাকতে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল ।

 

দরজা লাগাতে ভুলে গেলাম আমি । বাইরের অসম্ভব ঠান্ডা বাতাস আর স্নো ঘরের মাঝে ঢুকতে লাগল । ঠাণ্ডায় আমার হাত পা হয়ত  অবশ হয়ে আসছিল , কিন্তু সেদিকে আমার খেয়াল ছিল না । আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে , পায়রা আমি বদলাইনি । তুই বিশ্বাস কর !!!

 

 

প্রায় একমাস পর---- পায়রাদের ক্যাম্পাস থেকে কিছুটা দূরে  ক্যান্টিনের সিঁড়িতে বসে আছি ।আধাঘন্টা হয়ে যায় আমি বসেই থাকি , পায়রা আসেনা , ওর কি আসার কথা ? ওকে তো আমি আসতে বলিনি , কেন আসবে ও?দেড় ঘন্টা পর পায়রাকে চোখে পড়ল আমার , ব্লু ফুলহাতা টিশার্ট আর ব্ল্যাক জিন্স ওর পরনে । মাথায় এলোমেলো চুল সামলাতে সামলাতে আসছিল ও । কিভাবে যেন

আমাকে দেখে ফেলে , আমি মাথা নামিয়ে রাখি । ও এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবে , তারপর আমি অবাক হয়ে দেখলাম ও ছুটতে ছুটতে আমার দিকে আসছে ।সিঁড়ির উপর উঠে ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে । কি যেন ভাবে তারপর ধপ করে বসে পড়ে ।আমি ওর দিকে তাকিয়ে দুর্বল ভাবে হাসার চেষ্টা করে বললাম ,

''কেমন আছিস পাগলি ?''

পায়রা শুধু বলল , '' ভাল ''

আমি আর কোন কথা খুঁজে পেলাম । হঠাত করে আমার মনে হল , একটা সুন্দর বন্ধুত্তের সম্পর্ককে আমি নিজের হাতে খুন করেছি । গলা টিপে ।

পায়রা অস্থির চোখে তাকিয়ে বলল , '' তুই এত অসুস্থ কিভাবে হইছিস ?তুই মানুষ ? ছিহ !''

''না মানুষ না , আমার সাথে কথা বলিস না ''

আমি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম ,আমার চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে । আমি চশমার আড়ালে বৃথাই চোখ মুছার চেষ্টা করলাম । আমি আবার ওর দিকে তাকালাম ,ও আমার দিকে একি ভাবে তাকিয়ে আছে । ওর দৃষ্টিতে আমি আবার অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম , মুখ ঘুরিয়ে নিলাম । আমি যদি এখন পায়রাকে 'ভালবাসি' বলে দেই আমার কি মৃত্যুদণ্ড হবে ? একটাই জীবন আমার , আর কতবার হারানোর ভয় করব ?কিন্তু আমি বলার সুযোগ পেলাম না । পায়রা আমার হাত ধরে বলল , '' কথা বলবিনা আমার সাথে ?''

আমি একটু হাসলাম , '' আমি কখন বলেছি যে তোর সাথে কথা  বলবনা ?''

পায়রা আমার চুল ধরে টানতে টানতে বলল , '' অসভ্য ! বদমাইশ ! হারামি ! ''

আমি মাথায় হাত দিয়ে বললাম , '' আগে জানতিনা ?''

'' কই ছিলি এতদিন ?''

'' ছিলাম ছিলাম । তা তোর ঘর সংসার কেমন চলতেসে ? কেমন আছে সামিন ? ঝগড়া মিটছে ?''

পায়রার মুখটা বিষণ্ণ হয়ে গেল , '' ওর সাথে আমার কিছু হবেনারে । he doesn't care ''

'' আবার কি হইল রে ?''

পায়রা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল , '' নতুন করে কিছু হয়নাই । ও আগে থেকেই এরকম আর এখনও সেরকমি আছে ।''

তারপর হঠাত ই প্রসঙ্গ পালটে বলল , '' তুই এতদিন আমার সাথে কথা বলিস নাই কেন ? সামিনের  ভয়ে ?''

আমি চোখ পাকিয়ে বললাম , '' সামিন কি বাঘ টা আসছে যে আমি ভয় পাব ?''

পায়রা হিহিহি করে হাসতে লাগল । আমি জ্বলতে জ্বলতে বললাম , '' জামাই রে নিয়া এখনি এত দেমাগ দেখাস পরে যে কি করবি ! ''

আমি উঠে চলে যেতে পা বাড়ালাম ,কিন্তু পায়রা আমার সার্ট টেনে ধরে আমাকে আটকাল । আমি ঝাঝিয়ে বললাম ,

'' শার্ট ছাড় ''

'' নাআআআআ ''

'' বাঁদরামি করিস না । বড় হইছিস না ?

'' বড় হইনাই বুড়ি হইসি হিহি ''

'' ভালা এখন যাইতে দে ''

'' নাহ আমি এখন তোর সাথে খাইতে যাব । আমি নাস্তা কইরা আসিনাই , খুব খিদা লাগসে '' , পায়রাও উঠে দাড়াল ।

'' নাস্তা করিস নাই কেন আমারে জ্বালাইতে খুব মজা না ? পাইছস তো আমারে ,পাইকারি হারে জালাইতে থাক ''

পায়রা ফিকফিক করে হাসতে লাগল । আমি ওর মাথায় বাঢ়ি দিয়ে বললাম , '' চল হাতি ঘোড়া  তিন চারটা যদি না খাইছিস ''

'' তাইলে তুই কচু করবি '' , পায়রা ওর হাতের বুড়া আঙ্গুল দিয়ে  আমাকে কচু দেখাতে লাগল ।

 

আমি পায়রাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে আসলাম । ও এত্ত এত্ত খাবার অর্ডার দিয়েছে । আজকে আমাকে ফকির হতে হবে , আমার আফসোস লাগতে থাকল ইশ আমি যদি সারাজিবন এভাবে ফকির হওয়ার সুযোগ পেতাম ! পায়রা খেতে খেতে বকবক করতে লাগল । ও কখনও এরকম অনবরত বকবক করেনা , আমার খটকা লাগল , ওর দিকে ভ্রু কুচকে তাকালাম । ও বকবক করতে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল , বলল , '' কি ?''

'' তুই এমন বাচাল হইলি কবে থেইকা ?''

পায়রা মুখ দুখি দুখি করে বলল , '' অনেকদিন কথা বলি নাতো তাই আজকে খিড়কি ছুইট্টা গেসে ''

'' কেন সামিন কই ?''

'' জানিনা এক সপ্তাহ হইল আমাকে ফোন টোন দেয়না , কাজে নাকি বিজি ''

'' কি বলিস !''

আমার নিজেকে এত জঘন্য মনে  হল । সামিন কে কেন আগেই খুন করে ফেললাম না সেই দুঃখে নিজেরি মরে যেতে ইচ্ছা করল ।

 

খেতে খেতে মাথা তুলতেই রেস্টুরেন্টের দরজা দিয়ে কাউকে ঢুকতে দেখে আমি বরফের মত জমে গেলাম । সামিন একটা মেয়েকে নিয়ে ঢুকছিল। খাবারের বিল আগেই দিয়েছিলাম , আমি উঠে দাঁড়িয়ে পায়রা কে বললাম , '' চল আর খাওয়া লাগবেনা ''

পায়রার হাত ধরে টেনে আনতে লাগলাম , আমার উদ্দেশ্য পেছনের দরজা দিয়ে পায়রাকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়া যাতে ও সামিন আর মেয়েটাকে না দেখে । কিন্তু পায়রা আমাকে থামিয়ে পেছনে তাকাল এবং সামিন কে দেখতে পেল । সামিন ও আমাদের দেখে এগিয়ে আসল ।কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে পায়রা শীতল  গলায় সামিন কে বলল ,

'' তুমি খুব ব্যাস্ত না ? কে এই মেয়েটা ?''

সামিন হাসতে লাগল  ,'' পায়রা এটা বোরিং বাংলাদেশ না এইটা ড্যাশিং নিউইয়র্ক ! তুমি নিজেই কিন্তু এইটা জান । তুমি দুইটা বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতে পারলে আমি কেন ৫টা নিয়ে ঘুরতে পারবনা ? ''

আমার হাতে তখনও পায়রার হাত । আমি পায়রার হাত ছেড়ে দিয়ে বললাম ,

'' hold your tongue সামিন , বাজেকথা বলবানা খবরদার ''

সামিন পায়রার দিকে তাকিয়ে বলল , '' আমার ইচ্ছা কিন্তু দেশি কাউকেই বিয়ে করার ইচ্ছা '' তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল ,

'' তুমি খুব বোকা , আমি কিন্তু ততটা চালাক ''

'' মানে ? আমি ভেবেছিলাম তুমি নিজেকে বদলাবে , কিন্তু তুমি যে ...''

আমার কথা শেষ হবার আগেই সামিন পায়রাকে বলল , '' um leaving newyork tomorrow ,মেক্সিকো চলে যাব, সম্ভবত আর দেখা হচ্ছেনা তোমার সাথে । ''

পায়রা আর দাঁড়াল না , আমার হাত ধরে বেরিয়ে আসল ।

 

পায়রার মুখে কোনও কষ্ট নেই , ওকে দেখে মনে হচ্ছিল ও এতদিন যা ভেবে এসেছে আজ তার প্রমান পেয়েছে ।

'' তুই সব জানতি নীড় ? তুই আগে থেকেই সামিনের চেহারাটা জানতি ? ''

'' জানতাম । কিন্তু ও আমাকে কথা দিয়েছিল তোর জন্যে ও নিজেকে বদলাবে । but he didn't keep his words ''

'' আমাকে কেন বলিস নি এসব ?''

'' তুই সামিন কে ভালবাসিস আমি চাইনি এসব জেনে তুই কষ্ট পাস , তাই আমি সামিন কে অনুরোধ করেছিলাম , বিশ্বাস কর ''

'' তুই ওই কুত্তাটাকে কেন অনুরোধ করেছিস ''

আমি কথা বলতে পারলাম না । ও আবার বলল ,

'' আমি জানতাম আমি যে সামিন কে কল্পনা করেছিলাম সেই সামিন ও ছিলনা । তুই সব জেনেও আমাকে বলিস নি , আমাকে একা একা ওর সাথে মনের যুদ্ধে পাঠিয়েছিস ।

আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থেকেছিস , কেন করেছিস এসব ???''

 

পায়রা আমার চুল টানতে টানতে এসব বলল  । আমি ভাবতে পারিনি পায়রা আমাকে এইকথা গুলি আমাকে বলবে । আমি ওর হাত দুটি ধরে বললাম ,

'' i love you  আর এটাই আমার সবকাজের কৈফিয়ত ''

পায়রা আমার মাথা থেকে হাত নামিয়ে বলল ,

'' আমি একটা গাধি রে । যাকে নিজের অজান্তে  ভালবাসছি তাকে ফেলে আরেকজনের কাছে ছুটছি । আর তার কাছে গিয়ে প্রত্যেকটা মুহূর্তে তোকে মিস করছি । যে সময়টাতে আমার সামিনের ফোনের ওয়েট করার কথা তখন আমি তোর ফোন চাইছি । আর তুই ??? তুই হারামি তখন আমাকে ফেলে ভাগসিস । আমি তোকে ছাড়া লাড্ডু তুই জানিস না ?''

আমি কি বলব , আমার তো খুশিতে নাচতে মন চাচ্ছে । সেই সময় ই পায়রার আক্রমন। 

 

 

পায়রা আমার মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল,

'' i love u too  অসভ্য''

 

 

Share