হারিয়ে খুঁজেছি তোমায়

লিখেছেন - সিনি মনি | লেখাটি 1818 বার দেখা হয়েছে

১.

আমি খুব সুকৌশলে আমার খাতার পেছনের একটি পাতার উপর এক ফোটা চোখের পানি পড়তে দিলাম । কিন্তু আমার চোখে এক ফোটা পানি নয় , লক্ষ লক্ষ ফোটা পানি অপেক্ষা করছে মুক্ত হবার আশায় ।কিন্তু আমি এখন কাঁদতে পারবনা , কারন যেকোন মুহূর্তে আম্মু ঘরে এসে ঢুকতে পারে । আমিতো পড়তে বসেছি , এখন কান্না না পেলেই কি হত না ? খাতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ইতোমধ্যে পাঁচ ছয় ফোটা পানি কাগজ ভিজিয়ে দিয়েছে । আমি চোখ ভালভাবে মুছে জোরে একটা শ্বাস নিলাম , কান্না থামানোর জন্যে এই আইডিয়াটা ভালো কাজে দেয় । আমার মনের ভিতরে যখন বিশাল একটা শুন্যস্থান তৈরি হয় তখন আমার কান্না পেতে থাকে, বড় একটা শ্বাস নিলে অনেক খানি বাতাস ভিতরে ঢুকে শুন্যস্থান কিছুটা পুরন করে , এতে কান্না আটকানো যায় । আমি খাতাটা বন্ধ করতে গিয়ে থেমে যাই , তাকিয়ে থাকি আমার কান্নাভেজা কাগজটির দিকে । কান্না শুকিয়ে গেলেও কাগজটা দেখলে ঠিকই বুঝা যাবে , কি যেন ভেবে আমি কাগজটা শুকাবার অপেক্ষা করলাম । যার জন্যে কাদলাম , এটা তাকে একদিন দেখাব । সেই সুযোগটা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেবেন তো ?

 

 

খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি আমার আজকে পড়াশুনা হবেনা । কিন্তু তাও আমি একটা বই সামনে নিয়ে বসে থাকলাম । কলেজ জীবনে কেবল আসলাম , পড়াশুনাটা তাই এখনো চেপে ধরেনি , তার উপর আজ মনের যা অবস্থা তাতে এমনিতেও পড়া হবেনা । আমি টেবিল থেকে উঠে জানালায় দাড়ালাম ।বিকেলের নরম আলোতে আমাদের বাসার সামনে রাস্তায় অনেকগুলি বাচ্চা খেলছে , ঠিক যেভাবে আমি আগে খেলতাম । কেউ কি আমাকে সেই স্কুলে পড়া পরিধি বানিয়ে আগের জীবনে ফিরিয়ে নিতে পারবে ? আর একটা বার ?

 

পারলাম না থাকতে, ঘর থেকে বেরিয়ে বহুদিনের পুরনো রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম । আমার এতটুকু জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলি এই রাস্তার আনাচে কানাচে মিশে আছে । এত পরিচিত পথটিতে সেই পরিচিত মুখটি আমি আর খুজে পাইনা । রিহান কে কতদিন দেখিনা ভুলে গেছি । হয়ত রিহানেরও আমার কথা মনে নেই , মনে থাকলে সে একবারও কি আসত না ? আমার মত সে ও কি চোখ বুজলেই আগের দিনগুলি দেখতে পায় ? ক্লাস সেভেনের দুষ্টুমি ভরা দিনগুলিতে আমি যখন এই পথে হাটতাম তখন দূর থেকে দেখতাম লম্বা গড়নের ঝলমলে চেহারার রিহান কে তার বন্ধুদের সাথে খেলতে। আড়চোখে চোখাচোখি চলত। সময়ের সাথে বাড়তে লাগল চোখাচোখি, সাথে চলতে থাকত আমার মনের সাথে লুকোচুরি । আমার পাশ দিয়ে যাবার সময় আমাকে ' চারচক্ষু ' বলে খেপাত ও , আমি চশমা পড়তাম বলে । আমি ছেড়ে দিতাম তা কিন্তু নয় , আমি তাকে ''একচক্ষু'' বলে ডাকতাম । রিহান আমার চেয়ে দুই ক্লাস উপরে পড়ত । বন্ধুদের সামনে তাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করলেও মনের গভীরে ভাল লাগার একটা বীজ সে যে কোন অবকাশে বুনে গিয়েছিল আমি বুঝতেই পারিনি । সেই ভাল লাগার বীজ থেকে একদিন ভালবাসা ডালপালা ছড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল । কি যে আনন্দ লেগেছিল যেদিন আবিষ্কার করলাম ওদের বাসা ঠিক আমাদের সামনের বিল্ডিঙে । শুধু তাই নয় আমি যখনি বারান্দায় দাড়াতাম দেখতে পেতাম রিহান তার বেডরুমের জানালায় দাঁড়ানো । কোন এক অজানা আকর্ষণে আমি বারান্দার দিকে ছুটে যেতাম শুধুমাত্র তাকে দেখবার আশায় । শুধু যে দেখা হত তা কিন্তু নয় , চলত দুষ্টুমিও । আমার আম্মু হয়ত খানিকটা টের পেয়েছিল আমার অস্থিরতা , তাই চেষ্টা করতাম নিজেকে গুটিয়ে রাখতে । কিন্তু মানুষ নাকি দুইটা জিনিস গোপন রাখতে পারেনা , মাতাল হয়ে যাওয়া আর প্রেমে পড়া । আমার স্বপ্নেও যেদিন ওর আনাগোনা দেখলাম, বুঝলাম রিহান খুব গোপনে আমাকে অধিকার করে নিয়েছে ।ওর প্রতি আমার এই দুর্বলতা আমার বন্ধুদের কাছে ধরা পড়ে গেল । এক মুহূর্ত দ্বিধান্বিত না হয়েই মেনে নিয়েছিলাম , ভালবাসি তাকে । স্কুলে আমার ক্লাসের পিছনের জানালা দিয়ে দেখতাম কোচিং শেষ করে ও ওর বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকত, কখনও হাঁটাহাঁটিও করত । ওর এমন করা দেখে মনে হত সে যেন বুঝতে পারছে তাকে আমি আড়াল থেকে দেখছি ।এক অদৃশ্য ভালবাসার সুতো দিয়ে আমার মন তার মনের সাথে বাধা পড়েছিল । তাই তাকে দেখতে পাবো এরকম কোন সুযোগ আমি মিস করিনি । পথে বের হলেই আমার চোখ শুধু তাকে খুজত । স্কুলে গিয়েও অপেক্ষায় থাকতাম কখন ৯.৩০টা বাজবে আর সে স্কুলের পিছনের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করবে । প্রতিদিন সেই সময়টাতে আমার চোখ ক্লাসের পিছনের জানালা দিয়ে চেয়ে থাকত ।

 

খুব সাধারন একটা দিন আমার কাছে 'ঈদের দিন' হয়ে গেল যেদিন আমি জানলাম আমার বন্ধু মিরা দেখেছে, রিহানের বন্ধু রিহান কে বলছে , '' ভাল যে বাসিস সেটা পরিধিকে কেন বলছিস না ?'' আমার মত সাধারন একটা মেয়ের জন্যে রিহানের হৃদয়ে এত বড় জায়গা আছে সেটা ভাবতেই আমার আনন্দে চিৎকার করতে ইচ্ছে করল । দুজনই দুজনের অনুভুতি বুঝতে পারতাম ,একমাত্র অপরিনত মনের একরাশ ভয় আমাদের দুজনকে আলাদা করে রেখেছিল । তবে শুধুমাত্র চোখের দেখায় মনের দিক দিয়ে আমরা এতটা কাছে ছিলাম যে পার্থিব দূরত্ব কোন ব্যাপার ছিল না ।

 

এত এত স্মৃতি ! চোখ বন্ধ করলেই আমার চোখের সামনে সব কিছু ভেসে আসে । আমি হাটতে হাঁটতে রিহানদের আগের বাসার সামনে আসলাম । রিহানরা কলোনি ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন , তাও আমি ব্যাকুল হয়ে সেই বাসার দিকে তাকিয়ে থাকি । আগের মত কেউ আর জানালা ধরে দাঁড়িয়ে নেই। সময়ের সাথে আমার চারপাশের সব বদলে গিয়েছে , শুধু আমিই অতীত নিয়ে পড়ে আছি । আমি আমাদের বাসার সামনের সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে দাঁড়াই, আমি বারান্দায় দাড়ালে কতবার রিহান এই গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত , লুকিয়ে আমাকে দেখছে সেটা বোঝাতেই যেন একরাশ পাতার ফাঁকে খনিকের জন্যে ও দেখা দিত । গাছটা এখনও আগের মতই আছে অথচ এই গাছের নিচে যে একদিন আমার অপেক্ষায় থাকত সে বদলে গেছে ।আমি কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে আকড়ে দাঁড়িয়ে থাকি । আমি যদি এখন চিৎকার করে কাঁদি সেটা কি খুব অপরাধ হবে এই পৃথিবীর চোখে ??

 

ক্লাস নাইনে উঠবার পর থেকে রিহান কে আমি অনেক কম দেখতে লাগলাম , তাকে দেখার সেই কয়েকটা দিন যে আমার কাছে কতটা প্রতীক্ষিত ছিল আমি যদি সেটা ওকে বুঝাতে পারতাম । আমার এস এস সি'র পর হঠাত করেই রিহান যেন 'নাই ' হয়ে গেল । আমি জানি সে আমার আশেপাশে কোথাও আছে ,আমার কেন যেন মনে হয় সে আমার সামনে না আসার প্রতিজ্ঞা নিয়েছে । পড়াশুনা নিয়ে সে কি অনেক ব্যস্ত? সে সব ভুলে যেতে পারলে আমি কেন ভুলতে পারবনা, নিজেকে হাজারবার করে বুঝিয়েছি , কোন লাভ হয়নি । আমি তো নিজেকে চিনি , আমি তার জন্যে অপেক্ষায় থাকব । আমার চাওয়া শুধু এতটুকুই তাকে যেন চোখের দেখা দেখতে পারি । তাকে না দেখলে শ্বাস নিতেও যে আমার ভীষণ কষ্ট হয় ।

 

আমি বিশ্বাস করতাম সে আমাকে ভালবাসে ।অন্ধবিশ্বাস নয় , বিশ্বাস । আমি বিশ্বাস করতাম একদিন না একদিন সে আমার কাছে ফিরে আসবে । এই বিশ্বাস টুকু আমায় বাচিয়ে রাখত । কিন্তু কেন এই বিশ্বাস টা বিশ্বাস হয়েই থাকবে ? আমার এতখানি ভালবাসার গায়ে আমি ''childhood love '' এর সিল মেরে স্মৃতির আস্তাকুড়ে ফেলে রাখতে চাইনা , আমি পারবনা ।

 

মাগরিবের আজান কানে আসতেই গাছ থেকে সরে আসলাম । আজকের বিকালটাও আমার ব্যর্থ হল । তুমি কেন আসলেনা রিহান ?

 

২.

রিন্টির ডাকে ধ্যান ভাংল আমার , কলেজ বাসে করে বাসায় যাচ্ছি , কানে ইয়ারফোনে গান বাজছে , আর মোবাইল দিয়ে ফেসবুকে চ্যাট করছি । ইদানিং ফেসবুকে আমার একজন বন্ধু হয়েছে ।নাম সাব্বির, প্রথম দিন তার অদ্ভুত আইডি নেম এবং প্রোফাইল পিক দেখে ঘড়ি ধরে আধা ঘণ্টায়ও হাসি থামাতে পারিনি , তাও কি ভেবে যেন অ্যাড করেছিলাম । পড়ে জানতে পারি সে ঢাকা ইউনিতে আই আরে পড়ছে , সাথে পার্ট টাইম জব করছে কোন এক পত্রিকায় । ছেলেটা একটু অদ্ভুত ধরনের , সময়ে সময়ে তাকে খুবি জলি মনে হয় আবার কখনও খুবি উদাস থাকে , আমি অবশ্য তাকে খুব বেশি ঘাটাতে যাই না । ব্রেকিং নিউজ গুলি অনেক আগেই আমি আমার এই বন্ধুর বদৌলতে ইনবক্সে পেয়ে যাই , এ আর খারাপ কি ?

 

রিন্টির দিকে তাকিয়ে কান থেকে ইয়ার ফোন খুলি , '' হুম বল ''

'' আইসা পড়ছি তো ,এই তার তুর সব ব্যাগে ঢুকা ''

'' অহ খেয়াল করিনাই রে ''

'' কার সাথে চ্যাট করেন ? সাব্বু নাকি ?''

'' হ সাব্বু গাব্বু হাহাহা ''

সাব্বিরের সাথে রিন্টির ও ভাল দোস্তি হয়ে গেছে , রিন্টি সাব্বিরকে সাব্বির ডাকে না , ডাকে সাব্বু , সাব্বির নামটা নাকি খুবি বড় লাগে , এই মেয়েটাকে আমি আর বড় করতে পারলাম না । রিন্টি নেমে যাওয়ার একটু পর আমিও নেমে যাই , সাব্বির এখন ওর পত্রিকা অফিসে, এই মাত্র পাওয়া একটা নিউজ আমাকে দিল , মিরপুরের কোথায় নাকি ছেলেরা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দুই টিম ব্যাপক মারামারি আর রক্তারক্তি ঘটিয়েছে । কি যে হয়েছে পোলাপাইন গুলি ! বাসায় আসতে আসতে সেই জায়গাগুলির দিকে আমার চোখ পড়ল যেখানে রিহান তার দলবল নিয়ে ক্রিকেট খেলত । জুনিয়র কয়েকটা পিচ্চি পোলাপাইন আবার ইন্ডায়রেক্টলি আমাকে ভাবি ও ডাকত । কত মজার সময় গুলি আমি ফেলে এসেছি , এসব মনে হতেই আমার ভিতরটা জ্বলতে লাগল । মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সাব্বিরকে ''bye'' বলে আমি ঘরে ঢুকলাম ।

 

যেদিন থেকে ফেসবুকে আইডি খুলেছি সেদিন থেকেই পাগলের মত রিহানকে খুঁজেছি । রিহানের পুরো নাম আমি জানতাম না ।তাও আমি বসে ছিলাম না , রিহান নামটাই বিভিন্ন বানানে লিখে একের পর এক সার্চ দিয়ে গিয়েছি । প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি , শত হাজার রিহানের মাঝে আমার রিহান কে আমি খুঁজে পাই নি । যেহেতু আমি রিহানের পুরো নাম জানতাম না তাই তাকে খুজবার আশাটা অসমাপ্ত থেকে গেল । আমি অপেক্ষায় থাকতাম , রিহানই আমাকে খুঁজে নেবে ।কিন্তু আমার অপেক্ষার মেয়াদ আর শেষ হতে চাইলনা ।

 

কয়েকদিন পর ---আমি ফোন হাতে বসে আছি , একটু আগে রিন্টির সাথে কথা বললাম । ও ভীষণ রেগে আছে , সাব্বির নাকি অনেক মিথ্যা বলে , মিথ্যা বলতে গিয়ে ওর কাছে ধরা পড়ে গেছে । ওর আসল নাম নাকি সাব্বির না , ওর নাম আহাদ , সেটা রিন্টি ওর বিভিন্ন মেইল আইডি দেখে বুঝতে পেরেছে ,সেটা সাব্বিরকে জিজ্ঞেস করার পর সাব্বির নাকি কিছু বলতে পারেনি । রিন্টি আমাকে এটাই বলছিল , যে ছেলে নিজের নাম ভুল বলে সে কোনদিনি আমাদের বন্ধু হতে পারেনা । আমি রিন্টিকে কি বলব আমি জানিনা , ও যেটা বলছে সেটা ঠিক কিন্তু............... সাব্বিরের আসল নাম যে আহাদ সেটা সাব্বির আমাকে আগেই বলেছে । তবুও সাব্বিরকে নিয়ে আমার আসলেই খুব কনফিউশান হতে লাগল ।

 

সাব্বির যে আসলেই খুব কনফিউজিং সেটা আমি মাঝেমাঝেই টের পাই ,কিন্তু যেহেতু ওর সাথে আমার সম্পর্কটা ভার্চুয়াল তাই আমি এত মাথা ঘামাই না । রিন্টির সাথে সাব্বিরের আর কথা হয়না , রিন্টি ঠিকই করেছে, বন্ধুত্ব মিথ্যে দিয়ে চলেনা । কিন্তু সাব্বিরের কাছে রিন্টি নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে , ওর কথায় সে নাকি কিছু মনে করে নাই । তবে ঘটনা হল এত কিছুর পরেও সাব্বির যেন কিভাবে কিভাবে আমার খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেল । সাব্বিরকে আমি রিহানের কথা বলেছিলাম , সাব্বির ও তার ফার্স্ট লাভের কথা আমাকে বলে , ও আমাকে বুঝায় কারো জন্যে জীবন থেমে থাকেনা । আমি কেন জানি মানতে পারিনা । কিন্তু আগে আমার একলা সময় গুলি যেমন রিহানের কষ্টে জর্জরিত ছিল সাব্বিরের কারনে আমার এখন আর তত কষ্ট হয়না । মাঝেমাঝে আমি দ্বিধান্বিত হয়ে যাই আমি কি সাব্বিরের মাধ্যমে রিহানের কথা ভুলে থাকতে চাইছি ? আমি কি রিহান কে ঠকাচ্ছি ? অস্থিরতায় আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনা ।

 

৩.

রিন্টি আসলেই ঠিক ছিল । সাব্বিরকে বিশ্বাস করাটা আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল । তার চেয়েও যে জঘন্য ভুলটা আমি করেছি তা হল সাব্বিরের মাঝে রিহান কে খুজতে গিয়েছিলাম । সাব্বিরের মত কিছু মানুষ ই আসলে ফেসবুক টাকে ফেকবুক বানিয়েছে । তাদের কাছে বন্ধুত্ব আর বিশ্বাসের এতটুকু দাম নেই ।

 

সাব্বির আমার সাথে অনেক অনেক কিছু মিথ্যা বলেছে । সে কখনই বলেনি সে আমার চেয়ে অনেক বড় একজন মানুষ , সে যে ঢাকা ইউনিতে পড়ার কথা বলত সেটা একটা মিথ্যা ছিল । সবচেয়ে বড় কথা সে যে আইডি দিয়ে আমার সাথে বন্ধুত্ব করেছিল সেটি একটা ফেক আইডি ছিল । এত ভাল বন্ধু ভাবতাম আমি ওকে আর ও এরকম করল ? আমাকে ও কোনদিন বন্ধু তো ভাবেই নি , বরং আমার সাথে মেসেজিং করে ও কিনা টাইম পাস করত । আমি এতটা সস্তা একজন মানুষ ছিলাম সেটা ভাবতেই আমার দুনিয়া ভেঙ্গে কান্না আসতে লাগল । আমি ওকে ব্লক করে দিলাম । আর কাউকে বিশ্বাস করার ইচ্ছে নেই আমার ।

 

আজ আমাদের স্কুলের ২৫ বছরের রজত জয়ন্তী উৎসব । কাল সারারাত আমি দুই চোখের পাতা এক করতে পারিনি । সাব্বিরকে বিশ্বাস করে আমি কত বড় অন্যায় করেছি । রিহানের উপর খুব অভিমান হচ্ছে । সে কেন আমাকে এভাবে একা রেখে হারিয়ে গেল ? অবিশ্বাসের এই পৃথিবীতে আমি বড় অসহায় , অনেক বেশি একা ।

 

স্কুলে গিয়ে খুব হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করলাম । সবার সাথে অনেক ছবি তুললাম ।

 

যে আসনে আমি বসেছিলাম তার পাশের সারিতে একটি পরিচিত মুখ দেখে আমি চমকে উঠলাম । রিহান ? হ্যা সেটা রিহানই ছিল , সে যখন আমার দিকে তাকাল তখনই সেটা বুঝতে পারলাম । এতদিন পর রিহান কে দেখে আমি আর আগের মত উচ্ছাসিত হতে পারলাম না । আমার মাথা কাজ করছিল না । আমার কয়েক পা সামনেই রিহান ,আমার খুব ইচ্ছে করল ওর কলার চেপে জিজ্ঞেস করি এতদিন ও কেন আমাকে একা রেখে গিয়েছিল । কিন্তু আমার মধ্যে থেকে সেই পরিধি হারিয়ে গিয়েছে , হারিয়ে গিয়েছে সেই রিহান ও । অনেকদিন পর সারাদিনের জন্যে রিহানকে চোখের সামনে এভাবে পাবো কখনও ভাবিনি । ওর মাঝে আগের রিহানকে আমি তন্নতন্ন করে খুজতে লাগলাম । ওর মুখ থেকে ' চারচক্ষু ' নামটা শুনবার জন্যে আমি উদগ্রীব হয়ে থাকলাম । আমি শুধু একটা বারের জন্যে বুঝতে চাই , রিহান আমাকে ভুলে যায়নি ।

 

রাতে বন্ধুদের সাথে স্টেজ পারফরমেন্স দেখছিলাম আর ফাঁকে ফাঁকে রি ইউনিয়নের ম্যাগাজিনটায় চোখ বুলাচ্ছিলাম । স্কুলের সবচেয়ে প্রথম ব্যাচ থেকে সবার শেষ ব্যাচ পর্যন্ত যারা যারা রেজিস্ট্রেশান করে আজকে উপস্থিত হয়েছে সবার নাম আর ছবি ম্যাগাজিনে এসেছে । আমি আর রিন্টি ম্যাগাজিন ঘেটে পরিচিতদের বের করছিলাম এবং তাদের স্ট্যাম্প সাইজ পিক দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম । রিহানের পিকটা ও দেখতে পেলাম । পিকের নিচে রিহানের পুরো নাম টি লিখা , আমি ওর ছবিটার উপর হাত বুলাতে বুলাতে পিছনে তাকালাম , রিহান কয়েক ধাপ পিছনের সারিতে তার বন্ধুদের সাথে বসে ছিল , রিন্টি ওর হাত নাড়াতে নাড়াতে বলল ,

'' দোস্ত দোস্ত জলদি এই নামে এফবি তে সার্চ দে , এই নে ফোন '' , রিন্টি ওর ফোন টা এগিয়ে দিল ।

 

আমি একবার রিন্টির দিকে দিকে তাকিয়ে কাপা কাপা হাতে ফোন টা ধরলাম । নাম লিখে সার্চ দিতেই পেয়ে গেলাম রিহান কে । রিন্টি কে দেখালাম , ও বলল ,

'' দোস্ত তুমি এক্ষনি তোমার আইডি থেকে ভাইয়ারে অ্যাড মারো ''

হঠাত করেই একরাশ অভিমান চেপে ধরল আমাকে , পিছনে তাকিয়ে রিহানকে আরেকবার দেখে দম আটকে বললাম,

'' পারবো না আমি । ও আমারে খুজতে পারল না ? ''

'' কিচ্ছু হইবনা তোমারে দিয়া । থাক তুই তোর পার্ট লইয়া । ভাইয়ারে আমিই অ্যাড পাঠাইতেছি ''

রিন্টি রিহান কে অ্যাড পাঠাল , আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম ।

 

সময়ের দাবিতে কেটে যাচ্ছিল বেশ কয়েকটি দিন । রিহান রিন্টিকে অ্যাড করেনি , সে সম্ভবত এফবিতে কম আসে । রিহান কে পাবার শেষ আশাটুকুও মুছে গেল আমার মন থেকে ।

 

 

৪.

ফেসবুকের একটা পেজে স্টোরি পড়ছিলাম , তখন রাত সাড়ে ১১ টা । হঠাত রিন্টির মেসেজ আসল ইনবক্সে । রিহান ওর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে । আমি ওকে একটা রিপ্লাই দিয়ে এফবি থেকে বের হয়ে আসলাম । আমার ঘুম পাচ্ছে । ভীষণ ।

 

সকালে ঘুম থেকে উঠে কলেজের জন্যে তৈরি হয়ে নিলাম । বাসে উঠে খুব একা লাগল ,রিন্টি দুইদিন হল কলেজে আসেনা , মেয়েটার জ্বর । আমি কাজ না পেয়ে ফেসবুকে লগ ইন করলাম । হোম পেজের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আমি বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম । মনে মনে বলতে লাগলাম , '' তুমি সত্যিই আমার বন্ধু হতে চাও রিহান ? আমার যে বিশ্বাস হচ্ছেনা !''

 

অ্যাড পাঠানোর কিছুক্ষন বাদেই রিহানের টেক্সট । আমি তাকে বেশ কিছু সময় ঝুলিয়ে রাখলাম । রাগ ঝাড়বার এমন সুবর্ণ সুযোগ আমি আর পাবোনা । আমাকে অবাক করে দিয়ে সে জিজ্ঞেস করতে থাকল আগের দিন গুলির কথা আমি ভুলে গিয়েছি কিনা । আমি তাকে খেপানোর জন্যে উলটাপালটা বলতে লাগলাম , সে এসব দেখে যতটা আপসেট হচ্ছিল , আমি ঠিক ততটা পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিলাম ।

 

''i love u '' ফরমালিটিস দিয়ে রিলেশানের কোন দরকার আমাদের ছিল না । কিন্তু তাও বন্ধু হয়েই আমি আর রিহান অনেক দূর এগিয়ে গেলাম । মাঝেমাঝে সে আমাকে ' i love u ' লিখত আর তার পরে 'as a friend ' লিখে আমার রিঅ্যাক্ট বুঝবার চেষ্টা করত । ক্লাস সেভেন থেকে ওয়েট করছি রিহান । কি করে ভাবলে এত সহজে পরিধি ভেঙ্গে পড়বে ?

 

অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি , আমার মানুষটিকে ঠিকই আমি আমার করেই পেয়েছি , যেমন করে চেয়েছিলাম ।

 

৫.

ঢাবি থেকে বাসায় আসছি বাসে করে । পাশে রিহান মুখ ভার করে বসে আছে । আমি নিজে থেকে তার হাত ধরছি না বলে সে রাগ করেছে । আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম , আলতো করে ধরলাম ওর হাতটা । খানিক বাদে আমার হাতের উপর ওর হাতের ছোঁয়া পেয়েই ওর দিকে তাকালাম , সে তখনও আরেক দিকে তাকিয়ে আছে । ছেলেটা এত রাগ করতে পারে রে বাবা ! আমি আনমনে হাসলাম।

 

'' হাসো কেন ?''

'' তোমার রাগ দেখে ?''

'' রাগ হাসির জিনিস ?''

''ছোট্ট বাবু রাগ করেনা , হাত ধরেছিতো ''

'' এত দেরি হল কেন ?''

'' আর দেরি হবেনা ঠিক আছে ?'' আমি ওর কাধে মাথা রাখলাম , বাস ভরা এত মানুষ , তাও আমার মনে হতে লাগল, রিহান আর আমি ছাড়া চারপাশে বুঝি আর কেউ নেই । রিহান হাসছে , আমি মুগ্ধ হয়ে ওর হাসির দিকে তাকিয়ে আছি ।

 

এত সুন্দর করে হাসে কেন ছেলেটা ?

 

[ উৎসর্গ - সত্যিকারের পরিধি ও তার রিহান কে , যাদের কাছে আসার গল্পটি লিখবার চেষ্টা করেছি ]

 

Share