মেঘলা রোদের হাসি

লিখেছেন - সিনি মনি | লেখাটি 1923 বার দেখা হয়েছে

স্বর্ণের মত ঝলমলে রোদেলা আকাশটা হঠাত করেই কাল মেঘে ঢেকে গেল । হঠাত করে কাল হয়ে আসা আকাশ দেখতে আমার ভীষণ ভাল লাগে । কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে বাতাসের মাঝে বৃষ্টির আগমনের সুস্পষ্ট কানাকানি শুরু হয়ে গেল, সেই গুঞ্জন শুনবার জন্যে আমি কান পেতে থাকি । মেঘলা আকাশ আমার মাঝে কি যে ভীষণ ভাল লাগার একটা অনুভূতি নিয়ে আসে , আসলে  আমি নিজেও তা বর্ণনা করতে পারিনা ।

আমি একা একা হাঁটছি । না একদম একা একা বলাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছেনা , পথে আরও মানুষ আছে , কিন্তু আমার পাশে আমার পায়ে পা মিলিয়ে হাটছেনা কেউ , সেই অর্থে আমি এখন একা । আকাশের এক ফোঁটা স্নিগ্ধ জলের অপেক্ষায় আছি অনেকক্ষণ ধরে । ক্যাম্পাস থেকে আমার বাসা বেশি দূরে নয় , তাই ঠিক করলাম আজ হেটেই চলে যাব । আসন্ন বৃষ্টির আগমনী বার্তা পেয়ে আমার বেশ খুশি খুশি লাগছে । মাথা তুলে তাকিয়েই দেখতে পাচ্ছি আগুন লাল কৃষ্ণচূড়ার অসহ্য সৌন্দর্য । একটু পরেই তারা ভিজবে অবিরাম বারিধারায় । তাদের স্নাত উজ্জ্বল রঙ দেখে আমি প্রতিদিনই হাজারবার পাগল হয়ে যাই । একটা ফুলের মাঝে এত বেশি সৌন্দর্য থাকলে মাথা আউলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক । কৃষ্ণচূড়া , কি দরকার ছিল তোমার এত সুন্দর হবার ?

 

 

আমি খুব করে লক্ষ্য করেছি , প্রতিটা ঋতুরই একটা নিজস্ব আবেদন থাকে যা কোন না কোনভাবে মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য । রুদ্রমূর্তি এই বৈশাখের কথাই বলিনা কেন , সবসময় নিজের মাঝে কি একটা রহস্য লুকিয়ে রাখে , এই বুঝি ঈশানকোণে জমে আসল মেঘের ঘনঘটা , এই বুঝি বাতাসের বাঁশিতে ঝড়ের সুর তুলে প্রকৃতির কন্ঠে বাজিয়ে তুলল কালবৈশাখীর গান । তাই ভীষন রোদের মাঝেও যখন নিজের মাঝে ক্লান্তি ভর করে তখনও শ্রান্ত চোখদুটো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে । নামবে কি দুফোটা জল ? ভেজাবে কি তপ্ত ধরা ? কিন্তু বৈশাখ তুমি বড্ড ছলনা জানো , কখনও দ্বিগুণ রোদে উজ্জ্বল হও আর কখনও বা শ্রান্ত চোখের দৃষ্টি ছাপিয়ে ঝরাও অবিরাম বর্ষণ । তবে বৃষ্টির সাথে রোদের সারাদিন ধরে এই লুকোচুরি আমার ভীষণ রোমাঞ্চকর লাগে হে বৈশাখ !

 

বাসায় আসতে আসতেই বৃষ্টি নুপুর বাজিয়ে চলে এল মর্ত্যের মঞ্চে । তার সাথে কিছুক্ষণ পা মিলিয়ে বাসায় ঢুকে পড়লাম । ছোটবেলা থেকে মায়ের মুখ থেকে নিযুত কোটি বারের মত শোনা '' এমন বৃষ্টি পাগলা ছেলে আমি জন্মে দেখিনাই '' কথাটা আবার শুনলাম । মেনে নেই আনন্দের সাথে, আমি আসলেই বৃষ্টি পাগলা , বৃষ্টি দেখলে আমার মাথা হ্যাং হয়ে যায় আনন্দে । মা বলে , ''খোদা তোকে ময়ুর বানাতে গিয়ে মানুষ বানিয়ে ফেলেছে রে রঙ্গন '' এই কথাটা আমার ভীষণ পছন্দের । যাই হোক আমি  প্যান্ট আর টিশার্ট বদলে বারান্দায়  এসে দাঁড়ালাম । বৃষ্টি ততখনে নুপুর বদলে পায়ে ঝুমুর লাগিয়েছে । ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম গ্রিলের ভেতর থেকে আকাশটাকে কেমন যেন ছকে বাঁধা দেখতে লাগে, ঠিক আমাদের জীবনের মত । নাকে মাটির ঘ্রান আসতেই যেন জেগে উঠলাম । 

 

হঠাত দেখলাম একটি মেয়ে আনমনে পথে হাঁটতে হাঁটতে বৃষ্টি স্নান করছে , মেয়েটি হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির জল ছুঁয়ে দিচ্ছে , মুখে লাগাচ্ছে , একা একা হাসছে ,চোখের সামনে চলে আসা চুলের গোছা সরিয়ে দিচ্ছে । খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য , বৃষ্টি নামলে অনেক মেয়েই নেমে আসে রাস্তায় বর্ষা দর্শনে । দৃশ্যটি পরিচিত , কিন্তু মেয়েটি আমার পরিচিত ছিলনা । মেয়েটিকে দেখে আমি যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম এবং আমি ভীষন ব্যর্থতার সাথে আবিষ্কার করলাম হঠাত করেই আমার হার্টের দুই তিনটা বীট মিস হয়ে গেছে ।

 

মেয়েটি আরো কতক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজল আমি তা খেয়াল করিনি তবে পুরোটা সময় সে এক অদ্ভুত জাদু করেছিল আমাকে , এমনই অদ্ভুত সেই জাদু যে আমি আমার অবস্থান থেকে একচুল নড়তে পারছিলাম না । মেয়েটি কে , কোথায় থাকে , আমি কিছুই জানিনা , তার কাছে কেমন করে এমন বেসামাল হয়ে গেলাম আমি সেটাও জানিনা , আমি শুধু অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম ।  আমার এই ধ্যান ভাংল যখন সামনের বিল্ডিঙ্গের দোতলা থেকে একজন মহিলা মেয়েটিকে ডাকল , '' জলধি , আর না , অনেক ভিজেছ , চলে আস এখনি '' 

 

মেয়েটি চলে গেল । সাথে আমাকেও নিয়ে গেল । না আমাকে না , আমার কি যেন একটা সে নিয়ে গেল । 

 

জলধিকে আমি প্রায়ই দেখতে শুরু করলাম , ভার্সিটিতে যাবার সময় , বাসায় ফেরার সময় । আমি অবাক হয়ে গেলাম , যে মেয়েটাকে আমি এতদিন দেখি ই নি , সেদিনের পর থেকে তাকে কেন যেন এতবার চোখে পড়ে যাচ্ছে । একদিন তাকে দেখলাম আমার ক্যাম্পাসেও , একা একা হাঁটছিল , আসলে আমি তাকে যতদিন দেখেছি ততদিন তাকে একা হাটতেই দেখেছি । আমি অসহায় হয়ে তাকিয়ে দেখতাম কি ভীষণ মায়ায় আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে সে একাকী হেটে যাচ্ছে ।     

 

একদিন খুব ভোরে মেঘের ডাক শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার । বৃষ্টি বৃষ্টি গন্ধটা নাকে আসছিল তাই কয়েকবার এপাশ ওপাশ করবার পর যখন বুঝলাম ঘুম আসবেনা চোখে চশমা টা লাগিয়েই বারান্দায় চলে গেলাম । জলধি , তুমিও যে এসময় বারান্দায় থাকবে আমি ভাবতেও পারিনি । আমার মত তোমাকেও বুঝি মেঘলা আকাশ হাতছানি দেয় । তাই ভোরের এই বৃষ্টি তোমাকেও থাকতে দেয়নি বিছানায় । খোলা বারান্দায় বাতাস যেভাবে তোমার চুল ওড়াচ্ছিল তাতে বাতাসের উপরেও আমার ভীষণ হিংসে হচ্ছিল । মনে হতে লাগল, আমি বাতাস হলাম না কেন ? আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আজকের এই বৃষ্টি শুধুমাত্র তোমার আর আমার জন্যে , তাই এভাবে তোমার দেখা পেয়ে গেলাম । বারান্দার গ্রিলের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম আমার মেঘকাব্যের নায়িকাকে । আচ্ছা জলধি তুমি কি একবারও দেখেছিলে আমাকে ? তোমার চোখের আলোয় আমি কি কোনদিনই ধরা পড়ব না ?        

 

ফেসবুকে একদিন তার আইডি দেখলাম , এত সহজে হয়ত তাকে পেতাম না নীল সাদার এই দুনিয়াতে , আমি আর সে একই ভার্সিটিতে পড়তাম বলেই সম্ভব হয়েছে । সে ছিল প্রথম বর্ষের ছাত্রী আর আমি শেষ বর্ষের ছাত্র । আমি  তাকে বন্ধু হবার অনুরোধ পাঠানোর পর একসপ্তাহ কোন সাড়া পেলাম না । আমি রোজ কল্পনা করতাম এই বুঝি ফেসবুকে লগইন করে দেখতে পাব সে আমার বন্ধুত্বের অনুরোধ মেনে নিয়েছে , আমার এই কল্পনা টা অতিকল্পনা হয়ে যেত যখন আমি তার একটি টেক্সট কামনা করতাম , '' কেমন আছেন রঙ্গন ?'' 

 

একসপ্তাহ পর আমার বংশের কারো কোন পুন্যের জোরে আমি তার বন্ধু হলাম । জলধি অনলাইনে থাকত খুব কম সময়ের জন্যে , সেই সময় টা প্রতিদিনই একটি নির্দিষ্ট সময় আর আমি তা কখনই মিস করতাম না । খুব সাহসের জোরে তার সাথে চ্যাট করবার চেষ্টা করলাম । জলধি খুব মিতভাষী আর বেশিরভাগ সময় ই তার কথা গুলি হত খুব মন মরা । তার বিষাদ মাখা মুখটি ভেবে আমি কত রাত যে ঘুমাতে পারিনি  সকালে ক্যাম্পাসে আমার ঘুমঘুম চোখ আর এলোমেলো চুল দেখে সে কি কখনও বুঝতে পেরেছিল ?

 

আমি জলধিকে অনেকভাবে আমার মনের লাগামছাড়া অনুভূতি বুঝানোর চেষ্টা করতাম  , কিন্তু তখনি আমার মন ভেঙ্গে যেত তার কোন উত্তর না পেয়ে । আমি হয়ত তাকে বিরক্ত করছি, হয়ত সে ভালবাসে অন্য কাউকে । কিন্তু আমি যে সেটা মানতেই পারিনা । 

 

ভোরের আলোতে প্রায়ই জলধিকে বারান্দায় দেখা যেত । আমি সেই আশাতে প্রতি ভোরে দাঁড়াতাম আমার বারান্দায় । জলধি তার রেলিং এ ভর দিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত আর কি যেন ভাবত । বাতাসে তার চুল এলোমেলো হয়ে যেত , কিন্তু তার সেদিকে কোন খেয়াল থাকত না । একদিন আমি তার এরকম বিষন্ন একটি ছবি তুলে রাখি মুগ্ধতার আতিশয্যে । কিন্তু সে বারান্দা থেকে চলে যাবার পরই আমার মনে হল আমি কাজটা ঠিক করিনি , না বলে এভাবে তার ছবি তুলে রাখাটা খুব ভুল হয়েছে । 

 

রাতে ফেসবুকে অনলাইনে পেয়ে আমি যখন জলধিকে কথাটা বললাম , সে লিখল ,

'' কি ছবি তুলেছেন আমার ??"

আমি ছবিটা সুন্দরমত তাকে ইনবক্স  করলাম । অনেকবার ক্ষমা ও চাইলাম । প্রতিউত্তরে সে লিখল ,

 '' রঙ্গন ভাইয়া , আমি কি ছবিটা আমার প্রোফাইল পিক করতে পারি ?''

 

আমি সেই রাতেও ঘুমাতে পারিনি । এত আনন্দ আমি আবার কবে পাবো তার কি ঠিক আছে ?

 

জলধির সাথে যদিও পথে বা ক্যাম্পাসে আমার অনেক দেখা হত , সে কখনও আমার সাথে কথা বলার আগ্রহ দেখাত না । কথা বলবার আশায় তার দিকে তাকালেও সে একটু কথা বলতনা । একদিন দেখলাম তাকে ক্যাম্পাসে ,একা একা হাফওয়ালে বসে আছে । আমি তার থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখে বসলাম , সে ফিরে তাকাতেই '' হ্যালো '' বললাম । তার কন্ঠ শুনবার অদম্য ইচ্ছায় আমি তখন শিহরিত , কিন্তু আমার ভাগ্যে তা ছিলনা । সে একটু হেসে একবার আমার দিকে আর একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে চলে গেল । আমি সত্যিই খুব অযোগ্য তোমার কাছে , তাইনা জলধি ? 

 

মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় আমার । সাথে ভীষণ অভিমান , জানি তোমার উপর অভিমান করার অধিকার তুমি দাওনি আমাকে , তবুও এই অভিমান আমার মনে । কি করব বল , অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছি যে তোমায় ! দুদিন পর এক রাতে সে আমাকে টেক্সট দিল , 

'' আমি দুঃখিত সেদিনের জন্যে । আমার ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছিল ।কিছু মনে রাখবেন না প্লিজ '' 

 

আমি উত্তর দিলাম ,'' কষ্ট পাইনি তা বলবনা । তোমাকে তো আমার ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম , একবার ফোন দিয়ে এই কথাটা বলতে পারতে । আমাকে কতটা বাজে ছেলে ভাবো , জল ?''

 

তার উত্তর এল , '' আমার কোন মোবাইল নেই , দরকার হয়না । আমি ভিন্ন জগতের বাসিন্দা । মাফ করে দেবেন । শুভরাত্রি ।'' 

 

সেদিন সারারাত ও ঘুমালাম না । খুব রাগ হচ্ছিল , জানিনা কেন । ভাবলাম , কাল সামনাসামনিই বলে দেব সব । লুকোচুরি খেলার ছেলেমানুষি আর নেই । 

পরদিন লাইব্রেরিতে তার সাথে দেখা । আমি বললাম , '' জলধি তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই ''

সে থমকে তাকাল । '' জলধি আমি জানি আমার সাথে কথা বলতেও তোমার ইচ্ছে হয়না । তবু এই কথাটা আজ আমার জানাতেই হবে তোমাকে '' 

জলধি মুখ ঘুরিয়ে নিল ।

 

'' তোমায় ভীষন ভালবাসি জল '' 

 

আমি দেখলাম সে প্রানপনে কান্না চাপছে । তার কাজল চোখের সীমানা পেরিয়ে উথলে উঠছে জল । আমি অস্থির হয়ে বললাম , '' প্লিজ কিছু বল '' 

সে ঠোঁট চেপে কান্না আটকাল , তারপর তার ব্যাগ থেকে খাতা আর কলম বের করে কি যেন লিখল । কাগজটা আমার হাতে দিয়েই সে যেন দৌড়ে পালালো  । 

 

কাগজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম , তিনটা লাইন ,

 

'' ভাষাহীন নির্বাক আমি ঠিক পাথরের মত ওই মেঘে জমিয়ো তোমার ভালবাসা আছে যত বৃষ্টি মেখে জুড়াবো তোমায় না পাওয়ার এই ক্ষত '' 

 

আমি বুঝে গেলাম , আমার জলধি কথা বলতে পারেনা । আমি আরও বুঝে গেলাম , সে আমায় ইচ্ছে করে কষ্ট দেয়নি । আমি বুঝে গেলাম , সেও আমায় ভালবাসে । সবশেষে আমি এটা বুঝলাম , জলধিকে ছাড়া আমি থাকতে পারবোনা । 

 

 

পরিশিষ্ট ঃ  কয়েক বছর পর  এক পড়ন্ত বিকেলে কাগজে কলমে জলধির সাথে চলছে আমার খুনসুটি । খুনসুটির এক পর্যায়ে সে মুখ বাকিয়ে লিখল , 

'' তুমি ভীষণ পচা , ভীষণ খারাপ , একদম পচা ডিমের মতন '' 

আমি কিছু না লিখে দাঁত কেলিয়ে হাসছিলাম । সে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখল , তারপর লিখল ,  '' দাঁত কেলালে বাদরের মত লাগে "

'' তাই ?''

'' হ্যা ''

'' তোমাকে তো সুন্দর লাগে । আমি আমার মিষ্টি বউটার দাঁত কেলানো দেখতে চাই , দেখাবা না ?''

জলধি সব দাঁত বের করে হেসে ফেলল । আমি আরও দেখলাম, তার মেঘ কালো চোখের কোনায় এক বিন্দু জল , তাতে এসে পড়েছে শেষ বিকেলের এক টুকরো রোদ । 

 

এই মেঘলা রোদের হাসি দেখে আমি নিযুত বারের মত পাগল হয়ে গেলাম ।

 

Share