শেষের কবিতার বাকী অংশ

লিখেছেন - শুকনোপাতা | লেখাটি 953 বার দেখা হয়েছে

নির্ঝরের পথ চলা শুরু হয়েছিল অনেকটা একাই,তবে সাথে ছিল অনেক গুলো স্বপ্ন আর বিশ্বাস।মানুষ আসলে স্বপ্ন দেখতে অনেক বেশী ভালোবাসে...  

আর নির্ঝর এমন একটা মেয়ে যে কি না সব সময় নিজের ভেতর তার স্বপ্নের একটা আলাদা পৃথিবী সাজিয়ে রাখতো,সেখানে সে কখনো অনেক আদরের মেয়ে,কখনো বা একটা স্বাধীন মানুষ,কখনো ভাবতো তার একটা বড় ভাই আছে যে তাকে অনেক আদর করে,কখনো ভাবতো তার একটা বড় আপু আছে যা তাকে খুব ভালোবাসে...যখনই মন খারাপ হতো নির্ঝর নিজের সেই স্বপ্নের ভূবনে হারিয়ে যেতো...স্বপ্ন গুলো কেন পূরন হলো না বা হয় না এ নিয়ে তার খুব একটা মাথা ব্যাথা নেই...

নির্ঝর মধ্যবিত্ত  বাবার মেয়ে,ওদের দুই বোনকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন।নির্ঝরের বাবা-মা দুই জনই খুব উদার মনের মানুষ,সমাজ সেবক।এটা ঠিক বাবা-মা ওদের দুই বোনের অনেক স্বপ্ন,অনেক আবদারই পূরন করতে পারেননি,তবে স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্ট খুব কমই দিয়েছেন।বিশ্বাস আর স্বাধীনচেতা মানুসিকতা সম্পন্ন মেয়ে নির্ঝর।উপরে যতটা শক্ত আর সাহসী মেয়ে মনে হয়,সে আসলে ভেতরে ভেতরে খুবই নরম আর আবেগী।

 

বই পড়তে  বিশেষ করে সাহিত্য চর্চা  নির্ঝরের প্রান বলা যায়...  

‘শেষের কবিতা’উপন্যাসটা পড়ে নির্ঝরের সে কি মন খারাপ,এমন একটা ভাব যেন সে নিজেই লাবন্য!কাউকে যদিও বুঝতে দেয়না,কিন্তু গল্প-উপন্যাস পড়তে পড়তে নির্ঝরের ভেতরে একটা মানুষ গড়ে উঠেছে,যার সাথে বাস্তবের নির্ঝরের কোন মিল নেই। বাস্তবের নির্ঝর কখনো ছেলেদের সাথে প্রয়োজনের বাইরে কথাই বলেনা,অনেক অনেক দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন মেয়ে,অনেক বাস্তববাদী।কিন্তু নির্ঝরের ভেতরের সেই নির্ঝর একদমই অন্যরকম,এই নির্ঝর স্বপ্ন দেখে কোন এক অচীন দেশের রাজপুত্রের হাত ধরে সে ঘুরে বেরাচ্ছে,পরম প্রশান্তি নিয়ে তার সাথে মেঘলা বিকেল কাটাচ্ছে...

 

আস্তে আস্তে  সময় চলে যায়,নির্ঝর এখন ভার্সিটি স্টুডেন্ট,টিচার ক্লাসমেটদের প্রিয় মুখ।স্বপ্ন দেখছে নির্ঝর পড়াশুনা শেষ করে একটা ভালো চাকরী করবে,একটা গাড়ী কিনবে... 

নির্ঝরের অনেক শখ ওর বাবা বাসে না গাড়িতে করে অফিসে যাবে,ছুটির দিনে সবাই মিলে বেড়াতে যাবে।কিন্তু জীবন সব সময় পরিকল্পনা মাফিক চলে না।কখনো কখনো অনেক বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আসে,কখনো তা ভালো কখনো খারাপ... 

 

নির্ঝর কিছুদিন যাবত ভেতরে ভেতরে নিজেকে খুব একা ফিল করে...মনে হয় ওর কি যেন নেই!কাউকে খুব মিস করে সে মনে মনে...কিন্তু কাকে তা জানেনা!মাঝে মাঝে মনে হয় ওর বুঝি দম বন্ধ হয়ে আসছে!খুব ইচ্ছে হয় মুক্ত পাখীর মতো উড়তে...  

একদিন লাইব্রেরীতে বসে এক মনে নোট করছিল,হঠাত একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসল,একবার দুইবার...নির্ঝর চুপ করে নাম্বারটা দেখল চিনতে পারল না।কাজ শেষ করে ল্যাব থেকে বের হওয়ার সময় আবারও ফোন আসল,এবার ধরল, 

;হ্যালো,মিমি কই তোমরা? আমি তো মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি! 

নির্ঝর খুবই অবাক হলো!একেতো ছেলেটাকে সে চেনে না,তার উপর ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ছেলেটা গড়গড় করে বলে যাচ্ছে! 

;দেখুন আমি মিমি না,আপনি রং নাম্বারে ফোন করেছেন। 

;ওপস!সরি... 

নির্ঝর ফোন রেখে বান্ধবী ইভা কে নিয়ে ভার্সিটির পাশেই একটা শপিংসেন্টারে গেল কিছু টুকটাক কেনা-কাটার জন্য,মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে আবারো মোবাইল বেজে উঠল,সেই একই নাম্বার।বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করল, 

;হ্যালো 

;আচ্ছা,এটাতো মিমিরই নাম্বার হওয়ার কথা! 

;কথা থাকলেও এটা মিমির নাম্বার না। 

;সরি আপনার কথা শুনতে পাচ্ছি না! 

কি মুশকিল!নির্ঝর দোকান থেকে বের হয়ে সিড়ির কাছে গেল 

;হ্যালো এবার শুনতে পাচ্ছেন? 

;জ্বী বলুন... 

কথাটা বলেই দু’জন একসাথে ঘুরে দাড়ালো,ব্যাপার কি!নির্ঝর তাকিয়ে দেখল ওর সামনে একটা ছেলে মোবাইল কানে রেখে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে,কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে আবারো 'হ্যালো'বলল,ওপাসে কোন উত্তর নেই,ছেলেটা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়েই আছে! 

নির্ঝর বুঝতে পারল ফোনে যেই ছেলেটার সাথে কথা বলছে,সেই ছেলেটাই ওর সামনে,হাসি চেপে রাখতে চেয়েও পারল না... 

;কি অদ্ভুদ ব্যাপার!হাই,আমি অমিত,আপনি? 

;আমি নির্ঝর,হুম,ব্যাপারটা আসলে অদ্ভুদই। 

অমিত হেসে বলল, 

;আসলে আজকে আমার এক ফ্রেন্ড ওর গার্ল ফ্রেন্ড কে নিয়ে এখানে আসার কথা,কিন্তু আমি আসলে ওদের খুঁজে পাচ্ছিনা,বন্ধুর নাম্বারে ট্রাই করছি ধরছে না,তাই মিমির নাম্বারে ট্রাই করলাম বাট তা চলে গেল আপনার কাছে! 

;হুম,বুঝতে পেরেছি,এনিওয়ে,এখন তো সব ক্লিয়ার,সো,আমি আসি তাহলে? 

;ওকে,ভালো থাকবেন। 

নির্ঝর শপিং শেষ করে বাসায় চলে আসল।রাতে একমনে ডায়েরী লিখছিল,আজকের সেই মজার ঘটনাটাও লিখল,অমিত নামটা নির্ঝরের খুব পছন্দ,শেষের কবিতার অমিত এর মত...হঠাত মোবাইলে ম্যাসেজ আসল। 

‘[si]হাই,নির্ঝর,কেমন আছেন?আপনার নামটা অনেক সুন্দর...অমিত[/si]’ 

নির্ঝরের মনে হলো হঠাত করেই ওর মনটা অনেক ভালো হয়েগেছে... হাসি মুখে ম্যাসেজ এর রিপ্লাই দিল, 

‘[si]ভালো আছি,আপনি কি জানেন?অমিত নামটাও অনেক সুন্দর,শেষের কবিতার নায়ক...নির্ঝর’[/si] 

কিছুক্ষন পর রিপ্লাই আসল, 

[si]‘শেষের কবিতা!!এটা কি কোন মুভির নাম?!!’[/si] 

নির্ঝরের মুখটা চুপসে গেল ম্যাসেজটা পড়ে!বলে কি এই লোক!!শেষের কবিতা কি সেটাই জানে না! 

[si]‘এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বিখ্যাত উপন্যাসের নাম,আপনি উপন্যাস পড়েন না?!![/si]’ 

রিপ্লাই আসল, 

[si]‘নাহ,ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া মানুষদের অত কিছু পড়ার সময় কই বলেন?’[/si] 

নির্ঝর ভ্রু কুঁচকালো!ইশ...ভাব কি!মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং আর কেউ পড়েনা!হুহ  

এভাবেই অনেকক্ষন চলল ম্যাসেজ আদান প্রদান।একজন আরেক জনের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হলো, অমিত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে,নির্ঝরের একবছরের সিনিয়র।অনেক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট অমিত,বাবা-মায়ের এক ছেলে।এবং অনেকটা না পুরোপুরি আঁতেল টাইপ, পড়াশুনা ছাড়া খুব একটা অন্যদিকে খবর রাখেনা! ব্যাস,হয়ে গেল বন্ধুত্ব।

 

আজকাল নির্ঝরের মনে হয়,চারপাশের সব কিছু অনেক সুন্দর,আগের মতো আর নিজের ভেতর একা ফিল করেনা। পড়াশুনা,বাসা,আর অমিত এই নিয়েই সাজানো দুনিয়া।আস্তে আস্তে অমিত আর নির্ঝরের সম্পর্ক গভীর হয়,দু’জনেই দু’জনের প্রতি অনেক নির্ভরশীল হয়ে পরে,এবং একসময় বুঝতে পারে দুজনেরই দু’জনকে সারা জীবনের জন্য অনেক দরকার। 

শুরু হলো অন্য এক গল্প। 

ভালোবাসি এ কথাটি খুব একটা ঘটা করে অমিত নির্ঝরকে বলেনি,আর নির্ঝরও তা নিয়ে কিছু ভাবেনি।আসলে অমিত আর দশটা ছেলের মতো না,কেয়ারিং,কনভেন্সিং,একজন আরেকজন কে বোঝা এই ব্যাপার গুলো নিয়ে তেমন কোন মাথা ব্যাথা ছিল না,ভালোবেসেছি,ব্যাস,এতেই চলবে। 

নির্ঝর বুঝতে পারলেও ব্যাপার গুলো নিয়ে অতো করে ভাবেনি।আর ভাবারই কি আছে,ওর বিশ্বাস একদিন ওর ভালোবাসা দিয়ে অমিতকে বদলাতে পারবে,অমিত ওকে মন থেকে ভালোবাসে এটাই তো অনেক কিছু।আর কি চাই...

 

প্রায় একবছর  হয়ে এলো অমিত-নির্ঝরের সম্পর্কের।এই একবছরে অমিত যতটা না বদলেছে তার থেকে অনেক বেশী বদলেছে নির্ঝর।হাসি-খুশী প্রানবন্ত  সেই নির্ঝর এখন আর নেই,নির্ঝর এখন আর স্বপ্ন দেখতে পায় না।প্রচন্ড হতাশা আর গ্লানির মাঝে দিন পাড় করে,নিজেকে অনেক অযোগ্য মনে হয়।নিজের জীবনের এই অবস্থানের জন্য নির্ঝর কাকে দায়ী করবে বুঝতে পারে না। 

অমিত কে দোষ দিবে?কিন্তু কি লাভ...?অমিত তো ভালো আছে,দিব্বি একের পর এক সফলতার সিঁড়ি পাড় করে যাচ্ছে,কিন্তু পিছিয়ে আছে নির্ঝর।

 

নির্ঝর এখন  আর বৃষ্টি দেখলে পাগলের মতো  ছুটে যায় না।শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে আর নীরবে অশ্রু ফেলে..  

এমনি এক বৃষ্টি ঝরা দিনে ফোন করেছিল অমিতকে... 

;হ্যালো,মিতা কি করছো? 

;উফফ!তোমাকে না বলেছি আমাকে মিতা বলে ডাকবা না?কেমন লাগে শুনতে!আমি তোমার উপন্যাসের নায়ক হতে পারব না বুঝলা?যাই হোক,কি বলতে ফোন দিস বল...? 

নির্ঝর চুপ হয়েও আবার আগের মতোই চঞ্চল কন্ঠে বলে, 

;দেখো বাইরে কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে...প্লিজ চলনা দুই জন ভিজি বৃষ্টিতে... 

;কি?আমার চারদিন পর প্রেজেন্টেশন,আর আজকে যাবো বৃষ্টিতে ভিজতে?!মাথা খারাপ হইছে আমার! 

;ধুর...!তোমাকে বলাই ভুল হইছে।ওকে তুমি থাকো আমি যাচ্ছি... 

;এই দাড়াও কোথাও যাবা না,এখন তুমি বৃষ্টিতে ভিজতে যাচ্ছ কোন সেন্সে?!তুমি ছাদে বৃষ্টিতে ভিজবে আর আশে পাশের মানুষজন তাকায় দেখবে,এই টুকু বোঝ না?... 

;প্লিজ,আমার খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে... 

;যেটা করতে বলেছি সেটা কর,জানালা দিয়ে দেখ...ছাদে যেয়ে ভিজতে হবে না। 

সেদিন নির্ঝর অনেক কেঁদেছিল।অনেক কষ্ট হচ্ছিল ওর,কিন্তু তারপরেও যায়নি ছাদে...অমিতের কথা না শুনলে অমিত অনেক রাগ হয়।বলে,তুমিও দেখি আজকাল কার মেয়েদের মতো হয়ে যাচ্ছ!কথা শুন না...ইত্যাদি। 

থাক,নিজে কষ্ট হয় হোক,তবু অমিতকে কষ্ট দিতে চায় না।আর তাই তো অমিতের এমন হাজারো স্বেচ্ছাচারিতা নির্ঝর চুপ করে মেনে নেয়।ও অন্য মেয়েদের মতো হতে চায় না।অমিত ও অন্য ছেলেদের মতো না,ওর তেমন মেয়ে বন্ধু ও নাই,আজকাল কার ছেলেদের মতো সিগারেট ও খায় না,সারাক্ষন বন্ধুদের সাথে আড্ডাও দেয় না,অনেক রেসপন্সিবল একটা ছেলে।থাকলো না হয় কিছু দোষ একটু মানিয়ে নিলে দোষ কি?...

 

কিন্তু সব কিছুরইতো একটা সীমা থাকে।একটা মুক্ত  পাখী যেমন দিনের পর দিন  একা একা খাঁচায় বন্দী  থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে যায়,নির্ঝরও তেমনি হাঁপিয়ে উঠেছে অমিতের শাসন আর অবহেলায়... 

একদমই ওকে বুঝতে চায় না অমিত।শুধু নিজের মতো করে দেখতে চায়, দেখাতে চায়...কি করবে নির্ঝর বুঝে না।সরে দাঁড়াবে অমিতের জীবন থেকে?নাহ,এটা করতে পারবে না ও।অমিত কে যে প্রচন্ড ভালোবাসে,এবং অমিতও ওকে ভালোবাসে।জেনে শুনে অমিতকে কষ্ট দিতে পারবে না নির্ঝর।নাই বা হলো নিজের মনের মতো...

 

ইদানীং নির্ঝর খেয়াল করছে,অমিত কেমন জানি অন্যরকম বিহেভ করছে!অফিসে জয়েন করার পর থেকে অমিতের ভেতর কেমন যেন একটা চেঞ্জ এসেছে।আগের থেকে অনেক রোম্যান্টিক হয়ে গেছে।আজকাল প্রচুর রোম্যান্টিক মুভি দেখে,গান শুনে।প্রায়ই নির্ঝরকে লং ড্রাইভে যাওয়ার জন্য বলে...!কিন্তু সময়ের কারনে যাওয়ার সুযোগ হয়না।অমিতের এই পরিবর্তনে নির্ঝর খুশী হয়েও খুশী হতে পারে না।কেমন জানি খটকা লাগে...! 

সেদিন হঠাত করেই রাত ১টার দিকে ফোন করে অমিত।খুব অবাক হয় নির্ঝর।এত রাতে তো অমিত ফোন করার কথা না...! ঘুম জড়ানো কন্ঠে ফোন ধরে নির্ঝর... 

;হ্যালো... 

;হ্যালো সুইটহার্ট...কি কর? 

অমিতের এমন আদুরে গলার কথা শুনে ঘুম ছুটে যায় নির্ঝরের...!এই ভাবে কথা বলছে আমিত!!  

;ঘুমাচ্ছিলাম,তুমি এত রাতে? 

;ইয়াহ...এখন থেকে আমরা রাতেই কথা বলবো জান।সারা রাত আমরা ভালোবাসবো...ওকে? 

;কি বল এই সব!আর তুমি এভাবে কথা বলছ কেন?! 

;ও জানু,তুমি দেখি কিছুই বোঝ না...!আমি ভালোবাসা নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে পারিনা? 

নির্ঝর কিছু না বলে চুপ করে থাকে,বুঝতে চেষ্টা করে অমিতকে... 

;জানু,আজ কে আমার এক কলিগ আমাকে কি দেখিয়েছে জানো?হাহাহাহা...তুমি চিন্তাও করতে পারবা না... 

;কি দেখিয়েছে? 

;ওর আর ওর জিএফ এর সেই রকম ভিডিও...ওপসস...যা হট ছিল!আমি তো দেখে অবাক!...আমিতো... 

আরও কি কি যেন বলছিল অমিত,কিন্তু নির্ঝরের কানে আর সেসব কথা ঢুকলো না।প্রচন্ড ঝড় শুরু হয়ে যায় নির্ঝরের ভেতরে...!অমিতের ডাকে স্বন্মতি পায়, 

;কি হলো ময়না পাখী কথা বলো না কেন? 

;অমিত,তুমি এসব বাজে জিনিস কেন দেখ?কবে থেকে দেখা শুরু করেছ? 

;হাহাহা...কি যে বলো না তুমি,আমি কি তোমার মতো বেরসিক নাকি? 

;অমিত,তুমি একটা শিক্ষিত,ভদ্র পরিবারের জ্ঞান সম্পন্ন ছেলে হয়ে এসব কুরুচি সম্পন্ন ভিডিও কিভাবে দেখ?কেউ দেখালেই তুমি কেন দেখবা?! 

;দেখ,নির্ঝর আমাকে জ্ঞান দিতে আসবা না।আমি বুঝি কোনটা ভালো কোনটা মন্দ।আরেকটা কথা,তোমার ওসব আবেগী মুল্যবোধ নিজের কাছেই রাখো,যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শিখ।ওকে? 

নির্ঝর প্রচন্ড শক খাওয়া মানুষের মতো বসে থাকে,ওপাসে অমিত হ্যালো হ্যালো করতে করতে ফোন কেটে দেয়। 

সেদিন সারা রাত আর নির্ঝর ঘুমাতে পারেনি।ছোট বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে আর নিজেক স্বান্তনা দিয়েছে,যে শুনেছে সব ভুল,অমিত হয়তো মজা করছে...ওএমন হতেই পারেনা।এত দিনের চেনা মানুষ এভাবে বদলে যেতে পারে না।

 

নির্ঝরের আকাশের মেঘ দিনে দিনে আরো গভীর আর কালো হতে থাকে...বদলে যেতে থাকে ভালোবাসার বসন্ত। 

এখন ফোন করলে অমিত আর নির্ঝরের কথা হয়না,হয় ঝগড়া।অমিতের মতে নির্ঝর আগের যুগের ধ্যান ধারনার মানুষ,এমন একটা মানুষের সাথে ও কিভাবে আছে এতদিন সেটাই সে ভেবে পায় না।অন্যদিকে নির্ঝরের মতে অমিত একেবারেই খারাপ ভাবে বদলে যাওয়া মানুষ,এই অমিতকে সে ভালোবাসেনি।এই মানুষটার জন্য সে এতদিন ধরে সব কষ্ট সহ্য করে ভালোবেসেছিল কিভাবে তাই সে ভাবতে পারছে না।

দিনে দিনে আরও  বদলে যায় অমিত।অমিত এর এই বদলে যাওয়া নির্ঝরের জীবনকে আরও অন্ধকার করে দেয়।পাগলের  মতো একটু আলোর সন্ধানে  ছুটতে থাকে নির্ঝর।অঝোর  ধারায় ঝরতে থাকে চোখের জল।কিন্তু  অমিত তা মুছে দেয় না,তবু নির্ঝর আশায় বুক বেঁধে রাখে,সে বিশ্বাস করে অমিত তাকে মন থেকে প্রচন্ড ভালোবাসে।ওর জীবনে যেমন অমিত প্রথম তেমনি অমিতের জীবনেও সে ই প্রথম,আর কেউ এখানে আসতে পারবে না।কিন্তু সময়...?সময় তো আর ফিরে আসে না।আর তাই নির্ঝরের প্রতিক্ষার অবসান ঘটে একদিন।

 

তিন বছর পর… 

নির্ঝর একটা বেসরকারী ব্যাঙ্কে সিনিয়র অফিসার হিসেবে জব করছে।বাবা এখনো রিট্যায়ার্ড করেননি আর তাই তিনি এখন নির্ঝরের আবদার পূরনের জন্য নির্ঝরের কেনা গাড়িরে করেই নির্ঝরের সাথে অফিসে যাতায়াত করেন।দিন শেষে বাবা-মেয়ে একসাথে বাড়ী ফেরেন গল্প করতে করতে। 

সামনেই নির্ঝরের বিয়ে।মা আর ছোট বোন তা নিয়েই অনেক ব্যাস্ত।ব্যাস্ত ফাহিমদের পরিবার ও।নির্ঝরের হবু বর।একটা বিদেশী ফার্মে আর্কিট্যাকট হিসেবে আছেন।নির্ঝর ওর বর্তমান নিয়েই অনেক হ্যাপি,ফাহিমের মতো কেউ একজন ওর জীবন সঙ্গী হচ্ছে,যে হয়তো ওকে অনেক ভালোবাসতে পারবে না কিন্তু এটা বলতে পারে যে,ফাহিমের সাথে ও সারা জীবন সুখে থাকতে পারবে,একা না সবাইকে নিয়ে।এটা ভেবেই নির্ঝর স্বান্তনা খুঁজে নিচ্ছে.... ফাহিমের হয়তো ওকে সেভাবে বুঝতে,ওর ছোট ছোট সুখ খুঁজে নিতে অনেক সময় লাগবে কিন্তু সারা জীবন ভালো বন্ধু হয়ে,উপযুক্ত সম্মান আর ভালোবাসা নিয়ে নির্ঝরের পাশে থাকবে ছায়া সাথী হয়ে এটুকুই নির্ঝরের জন্য অনেক... আর কি চাই?নির্ঝর আর পেছনে চাপা দেয়া ভালোবাসা নামক সেই অতীতের দিকে তাকাতে চায় না।একদমই ভুলে যেতে চায় অমিতকে।নির্ঝর এর কাছে শোভনলাল হিসেবে ফাহিম আছে,লাবন্যের ভাষায় যে হলো সবচেয়ে বড় বন্ধু। নির্ঝর এই ভেবে খুশী যে ও শেষ পর্যন্ত শোভনলাল কে খুঁজে পেয়েছে...এবার পূর্ণ হবে ওর ভালোবাসার উপন্যাস। নতুন করে গড়ে তুলবে ওর নিজের শেষের কবিতা।

শেষ করার আগে,অমিতের বর্তমানটা একটু দেখে আসি,

 

একবছর আগে বাবা-মায়ের পছন্দে অমিত বিয়ে করেছে  নবনীকে। 

সুন্দরী,শিক্ষিতা,বড়লোক ফ্যামিলির মেয়ে! 

নির্ঝর চলে যাওয়ার পর অমিতের আরো গার্লফ্রেন্ড হয়েছিল,কিন্তু তারা বিয়ে করে ওর পরিবারের বউ হওয়ার উপযুক্ত ছিল না! 

কিন্তু বিয়ের পর থেকে অদ্ভুদ হলেও সত্য অমিত নবনীর মাঝে শুধু নির্ঝরকেই খুঁজে বেরিয়েছে...নির্ঝরের মতো আবেগ,নির্ঝরের মতো অল্পতেই অনেক খুশী হওয়া,নির্ঝরের মতো চুপ করে সব মেনে নেয়া,সেই ভালোবাসা ভরা আবদার...এই সব কিছুরই অনেক অভাব নবনীর মাঝে, স্বার্থপর মানুসিকতার মেয়ে নবনীর কাছে অমিতের প্রাণ খোলা হাসি অনেক কিছু না,বরং লেটেস্ট ডিজাইনের গয়না আর শাড়ি অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ।পরিবার,শ্বশুড়-শ্

বাশুড়ির দোয়া এই সব একদমই সময় নষ্ট করা চিন্তা নবনীর জন্য!তার থেকে বান্ধবীদের সময় দেয়া,নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করাই ওর জন্য সুন্দর জীবনের সংগা! 

আর তাইতো অমিত এখন দিন পাড় করে সেই পেছনের স্মৃতি নিয়ে।যেখানে ছিল,নির্ঝরের মন মুগ্ধকরা হাসি...হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন,ভালোবাসার দিন রাত্রী...নির্ঝরের শেষের কবিতা...বৃষ্টির শব্দ... 

নিজের বোকামী আর হীন মানুষিকতার কারনে যা সে হারিয়ে ফেলেছে ...

 

 

[নির্ঝর,অমিত,নবনী,ফাহিম এই সব গুলো চরিত্রের মানুষকেই আমরা আমাদের বর্তমানে দেখতে পাই।তাদের গল্প গুলো দেখতে পাই।তথাকথিত সস্তা মূল্যবোধ আর প্রযুক্তির অপব্যাবহার যাদের মানুষিকতা কে নষ্ট করে দিচ্ছে! মাঝে মাঝে ভাবি যেভাবে বদলে যাওয়া অমিতদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কি হবে তখন নির্ঝরদের?...সব নির্ঝরতো আর ফাহিম খুঁজে পাবে না...]

 

 

Share