সাজাই আপন মায়ায়

লিখেছেন - শুকনোপাতা | লেখাটি 977 বার দেখা হয়েছে

ঠাশ!করে ডাইনিং টেবিলে মগটা রাখলো তুবা...আরেকটু জোরে রাখলে শব্দটা মনে  হয় ঠাশ না হয়ে কাঁচে ভেঙ্গে খান খান হওয়ার শব্দ হতে  পারতো!

 

একটু দূরে ফ্রিজে অনেকদিন ধরে জমে থাকা মাছ বের করার চেষ্টায়  ব্যাস্ত তহুরা বেগম,শব্দ শুনে একবার মেয়ের দিকে তাকালেন,মেয়ে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে,কিন্তু মেয়ে তার কাছ থেকে কেনো রেসপন্স আশা করছে?এ বাসায় কি তিনি ছাড়া আর কেউ নেই নাকি?!সবার সব রাগ তার সামনেই কেন প্রকাশ করতে হবে?!মা হয়েছেন বলে কি তার সব রাগ সহ্য করতে হবে?!বাপের সামনে সব গুলো ভাইবোন কি হাসি-খুশী থাকে,যতো রাগ-ক্ষোভ সব তার সামনেই...!

নাহ...আজ বুঝি আর এই মাছ  বের হবে না!ধুর...!এবার তিনিও  ধাম করে ফ্রিজের দরজাটা লাগিয়ে কিচেনের দিকে চলে  গেলেন...

তুবা ঘাড় ঘুড়িয়ে চোখ সেদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল...তারপর সোজা নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে আয়নার সামনে  দাঁড়িয়ে শুরু করলো,

''বুঝলি তুবা?তুই হলি এই বাসার সব থেকে অপ্রয়োজনিয় প্রানী...এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই!সো,তুই কেন আশা করিস যে কেউ তোর রাগের দাম দিবে?এই বাসার কাজের বুয়া যদি একটু মুখ কালো করে থাকে,তাহলে কম করে হলেও তিন জন তাকে জিজ্ঞেস করবে,'ও খালা কি হইছে?মুখ কালো ক্যান?'কিন্তু তোকে?তোকে কেউই জিজ্ঞেস করবে না...এই যে তোর বিয়ে ঠিক হইছে,বিয়েতে কি হবে না হবে তা নিয়ে তোকে কেউ জিজ্ঞেস করছে কিছু?নাহ...কেউ করে নাই করবে ক্যান?বিয়ে কি তোর?নাহ,বিয়ে তো তোর পন্ডিত কাজিনদের! তোর কাজিনরা তোর গায়ে হলুদে কি ড্যান্স না ফ্যান্স কি করবে সে জন্য বাড়ি কাঁপিয়ে হিন্দি মিউজিক অন করে প্র্যাকটিস করতেছে!ইচ্ছে করতেছে যেয়ে,একেকটার গালে কষে থাপ্পর মেরে যার যার বাসায় পাঠায় দিতে! কিন্তু কারো কি সে নিয়ে ভাবনা আছে?!নাই......''

লেকচার মনে হয় আরো  বড় ছিল,কিন্তু মোবাইলের রিং এর আওয়াজে এখানেই ব্রেক চাপল তুবা।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল,বান্ধবী শাম্মার ফোন।

এই মুহুর্তে কারো সাথে কথা বলার ইচ্ছে নাই,তাই মিউট করে ওয়াশ রুমে গেল তুবা,মুখে কিছুক্ষন পানি ছিটিয়ে বের হয়ে দেখলো খালাতো বোন ইরা ওর ল্যাপটপ ওন করে কি যেন করছে,

--কিরে?কি করিস আমার ল্যাপটপে?

--আরে নেট কানেকশন পাচ্ছিনা,তাই তোমার রুমে আসলাম,একটা হিন্দি গানের রিমিক্স ভার্সন ডাউনলোড করবো।

--তোরা এসব কি শুরু করেছিসরে ইরা?

ইরা একটু মুচকি হাসল

--দেখতেই পাচ্ছো কি করছি!ক্যান? তোমার বেশি রাগ লাগতেছে?রাগ লাগলেও কিছু করার নাই,আমরা আজকালকার ছেলে মেয়েরা এভাবেই আনন্দ করি,তোমাদের মতো ম্যারা-ম্যারা আমরা না...ওকে?

তুবা যথা সম্ভব  নরম কন্ঠে বলল,

--এটা আমার বিয়ের অনুষ্ঠান,তোরা বোধহয় সেটা ভুলে গেছিস,এটা কোন মিউজিক্যাল শো না,কিংবা কোন ড্যান্স কম্পিটিশন না...

--হুম,তো কি হইছে?আমরা কি দুনিয়ার মানুষকে দেখিয়ে নাচবো?স্রেফ ফ্যামিলি মেম্বাররাই তো...নিজেরা নিজেরাও কি মনের মতো করে আনন্দ করতে পারবো না?আজব!!

--কে বলল সব ফ্যামিলি মেম্বার?!!আমার ফ্রেন্ডস আসবে,এলাকার মানুষ জন আসবে,আব্বু-ভাইয়াদের কলিগদের ফ্যামিলি আসবে...তারা কি দেখবে না?কি বলবে তারা দেখলে?এ বাসার লোকজন সারা বছর সবাই ভাল ভাবে চলছিস,নিজস্ব কালচার,শালীনতা মেনে চলছিস,অন্যদের অনুষ্ঠানের বাড়াবাড়ি কাজের সমালোচনা করছিস আর নিজেদের অনুষ্ঠানের বেলায়?সব শেষ?!! অন্তত আমাদের বাবা-মায়েদের মান সম্মান কোথায় থাকবে ভেবেছিস?

ইরা কপাল কুঁচকে তুবার  দিকে তাকালো...!

--শোন ইরা,তোরা কেউ ছোট বাচ্চা নাই,বড় হয়েছিস,সো প্লিজ এসব দেখানো কাজ কর্ম বন্ধ কর। আর যাই কর,সবাই মিলে হিন্দি গানের সাথে রাত জেগে নাচানাচি করার আইডিয়া বাদ দে...এটা একটা পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠান,এটা মাথায় রাখিস। সব কিছুরই একটা সীমা আছে,আনন্দ করা ভালো,কিন্তু অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না। আল্লাহ অতিরিক্ত কোন কিছুই পছন্দ করেন না...''

ইরা কিছুক্ষন চুপ  থেকে কিছু না বলে উঠে চলে  গেল...তুবা বুঝতে পারল ইরা  ক্ষেপেছে!কিন্তু কিছু করার নেই! আর কিভাবে বুঝাবে?অবুঝ হলে তাকে বোঝানো যায়,যে বুঝেও বুঝে না তাকে কি বুঝাবে...?!

তুবা ঘড়ির দিকে তাকালো,দুপুর হয়ে গেছে...দ্রুত গোসল,নামাজ শেষ করতে হবে...ডাইনিং এ এসে দেখলো কেউই নেই!ব্যাপার কি?,আম্মুর রুমে যেয়ে দেখলো,আম্মু নামাজ শেষ করে দোয়া পড়ছেন। তাশফি কই গেল?আর ইরারাই বা কোথায়?ওরা কি নামাজ পড়েছে দুপুরে?ভাবতে ভাবতে ছোট বোন তাশফির রুমে গেল,হায় হায়!!কি অবস্থা ঘরের?!!!

ইরা আর তাশফি মিলে ও বাসার জন্য কেনা গিফট গুলো র‍্যাপিং করছে,ফারিহা,পিচ্চি ভাই আফিফ ওদেরকে হেল্প করছে...

--কিরে?ঘড়িতে কয়টা বাজে?গোসল,নামাজ,খাওয়া কই সবার?

--কাজ শেষ করে নেই

--কাজটা পরেও করা যাবে,আগে মূল কাজ শেষ করে নে...তাড়াতাড়ি উঠ সব...'

বলে রুম থেকে বের  হতে হতে শুনতে পেল,ফারিহা তাশফিকে বলছে,

--তুবা'পু না হইছে একদম আমাদের আম্মুদের মতো!খালি লেকচার আর নির্দেশ!উফফ!!

--আর বলিস না,দেখলি না,গায়ে হলুদটা কিভাবে মাটি করে দিল!দেখবি বিয়ের দিন আমরা যেভাবে সাজবো সেটা তার পছন্দ হবে না,আম্মু-আন্টিদের মতো বলা শুরু করবে,'এই এতো পাতলা শাড়ি পড়বে না,এই এতো টাইট ড্রেস পড়বে না!...ব্লা,ব্লা,ব্লা''

--হুম,আমি না বুঝি না,একটা দুইটা দিন একটু সবার মত আনন্দ করলে কি হয়?সবাই বিয়ে-গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে কি না করে,আর সে? এই যুগের মেয়ে হয়েও সে খালি,এটা করা ঠিক না,ওটা করা ঠিক না ভাবতে থাকে!আজব!!আসলে কোন লাভ হয়নাই আপুর এতো দামী প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে,হইছে একদম,আম্মু-ফুপ্পিদের ডুপ্লিকেট!''

 

তুবা কিছু বলতে যেয়েও  না বলে চলে আসে...এভাবে  বলে আসলে লাভ নেই,এরা অবুঝ না,যথেষ্ট আপডেট ছেলে-মেয়ে!তবে তুবা জানে,এরা আর যাই হোক,উচ্ছৃংখল কিংবা মুখের উপর বেয়াদবি করবে এমন ধরনের না,

ছোট থেকেই এরা যথেষ্ট পারিবারিক বাধা-নিষেধ এর মধ্যে বড় হয়েছে,প্রয়োজনিয় জ্ঞান ও এরা পেয়েছে,কিন্তু আজকাল কার ফ্রেন্ড সার্কেল,আর মিডিয়ার অপপ্রভাবের কারনে ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝে চলাটা যে কতো গুরুত্বপূর্ণ তা এরা বুঝতে পারছে না...এরা ভাবছে সারা বছর তো ভালো ভাবে চলছিই,একদিন একটু অন্যদের মতো করলে কি হয়?!কিন্তু এরা বুঝতে পারছে না,এই একদিনের অতিরিক্ত কাজগুলোর ফলাফল কতোটা ভয়াবহ হতে পারে!

বিকেলে ফোন পেয়ে সব ছুটলো এক সাথে মামার  বাসায়,মামীর মা অনেকদিন ধরেই অসূস্থ,ছেলেরা সবাই বাইরে থাকে,তাই তিনি মামীর কাছেই থাকেন...হঠাৎ করেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেল,তাই সবাই আসল।

তুবা দেখলো,মামী তার পাশে বসে কোরআন পড়ছেন,আরেক পাশে বড় খালামণি মৃদু স্বরে দোয়া পড়ছেন,আর নানু চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন,খুব ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন তিনি...মাগরিবের কিছু সময় পর নানু চলে গেলেন আল্লাহর কাছে।

তুবা,ফারিহা,ইরা,তাশফি সবাই দেখতে পেল একটা জীবনের সমাপ্তি। বেঁচে থাকা মানুষ গুলোর ভেতর আরো একবার নতুন করে মনে হলো,জীবন কতোটা ছোট!আর এই ছোট্ট জীবনে বাহ্যিক যা কিছু অর্জন তার সব কিছু রেখে চলে যেতে হয় মানুষকে,সম্পদ,সন্তান,টাকা সব কিছুই রয়ে যায় যে গুলোর পেছনে সে ব্যয় করেছে তার সারা জীবন.. এই ছোট্ট জীবনে ভালো ভাবে চলাটা যতো কঠিনই হোক অনেক গুরুত্বপূর্ণ..

 

বিয়ের স্টেজে বসে  তুবা হাফ ছেড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর চারপাশে তাকাচ্ছে,অনেক মানুষ চারপাশে,সবাই ওকে দেখছে!একটু পর শোনা গেল বর যাত্রী এসেছে,সবাই নিচে গেল,তুবার হবু শ্বশুড় বাড়ির লোকজন এসে বসল।বিয়ে পড়ানোর পর ওবাড়ির ভাবি এসে ওর পাশে বসে বলল,

--তুবা,তোমার ভাই-বোন গুলোকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে,মাশায়াল্লাহ,অনেক ভালো ওরা। কি সুন্দর শালীন ড্রেস পরেছে সবাই,ছেলে-মেয়ে একসাথে আদিখ্যেতা নেই,কোন বিশৃংখলা নেই,এমনকি একটূ আগে দেখলাম,মাগরিবের আযান হয়েছে দেখে,তোমার সাথে সাথে ওরা সবাই দল বেঁধে নামাজ পড়তে গেল!এরকম তো আজকাল দেখাই যায় না!''

পাশে থেকে ওর ফুপু শ্বাশুড়ি বলে উঠল,

--আসলে,বাবা-মায়েরা যদি সন্তানদের ভালো শিক্ষা দেয়,নিজেরা এবং পরিবারের বড়রা যদি সেভাবে চলে তাহলে ছোটরাও সেভাবেই চলতে শিখবে!একটু আকটু ভুল তো করবেই কিন্তু আবার ধরিয়ে দিলে নিজেরাই ভুল বুঝে সংশোধনও হবে..''

আসে-পাশের বাকী সবাই ও একই সুরে সুর মেলালো।  তুবা মাথা ঘুড়িয়ে দেখল ওর বোন  গুলো দূরে বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে,ওকে দেখে মিষ্টি করে হাসি দিল,বিনিময়ে তুবাও মমতা ভরা একটা হাসি দিল :) আর একটু পর আপনাতেই চোখে পানি টলমল করতে লাগল.. 

 

(পরিবার হলো শেখার প্রথম জায়গা। যদি দক্ষ টিচার সেখানে থাকে,তাহলে ছাত্র-ছাত্রী যেমন ই হোক,যতোই ভুল করুক ধৈর্য ধরে তাদেরকে সঠিক ভাবে হাতে-কলমে শিখাতে পারেন..)

 

Share