নীলপদ্ম চোর

লিখেছেন - একজন কল্পচারী- | লেখাটি 1085 বার দেখা হয়েছে

কল্প একের পর এক ঢিল ছুঁড়েই যাচ্ছে লেকের জলে । থামবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না । আজ যেন পাথর দিয়ে লেকটা সে ভরাট করেই ছাড়বে । এক ফোঁটা জলও অবশিষ্ট রাখবে না । ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে এক সময় ক্লান্ত হয়ে মাটিতে বসে হাঁপাতে লাগল । দরদর করে ঘামছে ও । ঘামে ভিজে র্শাটটা গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে একদম ।

প্যান্টের পকেট থেকে ইনহিলারটা বের করে কয়েকবার নেড়ে চেড়ে মুখে পুরে দিল । কল্পের হাঁপানির সমস্যা আছে । উত্তেজিত অবস্থায় হাঁপানিটা আরো বেড়ে যায় । কয়েকবার ইনহিলার নেয়ার পরে একটু স্বস্তি বোধ করল সে । তারপর হতাশ দৃষ্টিতে শান্ত লেকের জলে আনমনে চেয়ে রইল । কিছুক্ষণ পর পর ফোঁস ফোঁস শব্দে কল্পের এক একটা দীর্ঘশ্বাস ওর আশপাশটা ভারী করে তুলছে । শুধু একটা কথাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে- 'অর্পিতা হারিয়ে গেছে , অর্পিতা হারিয়ে গেছে । অর্পিতা আমার নেই , অর্পিতা আমার নেই '। আকাশে ঘনকালো মেঘ জমলে বৃষ্টি তো নামবেই । নিজেকে আর সামলাতে পারল না কল্প । হাইমাউ করে বাচ্চাদের মত কাঁদতে লাগল । ছোট্ট একটা বাচ্চা যখন ভুল করে পথ হারিয়ে ফেলে তখন যেমন কান্না জুড়ে দেয় , কল্পের অবস্থাও যেন ঠিক তেমনি । অচীনসুখে উদ্দেশ্যহীনভাবে পথ চলতে চলতে কখন যে পথ হারিয়ে ফেলেছে সে নিজেও জানে না ।

 

 

 

অর্পিতা মেয়েটা কল্পের জীবনে এসে ওকে পুরোপুরি বদলেই দিয়েছিল । আজকের কল্প আর তখনকার কল্পের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক । একসময় কল্প ছিল অগোছালো,  খাপছাড়া আর ভবঘুরে টাইপের ছেলে । ওর থাকা- খাওয়া- পোষাক- পরিচ্ছদ- চলা- ফেরা কোন কিছুতেই ছিল না কোন সময়জ্ঞান,  না ছিল কোন মনযোগ । কল্প আর দশটা ছেলেদের মত ছিল না । ওর কখনোই কোন বন্ধু ছিল না । বন্ধুবিহীন ছন্নছাড়া জীবনটা কল্প ভালই উপভোগ করত । বেশির ভাগ সময়ই ও একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াত । যখন যেদিকে যেতে মন চায় চলে যেত । আর গাদা গাদা কবিতা লিখত । কল্পের এত এত কবিতা লেখার কারণে পরবর্তীতে অর্পিতা ওকে কবিতার ডিব্বা বলে ডাকত । সে যাই হোক- ভার্সিটিতে উঠেও ওর ভবঘুরে জীবনটা দিব্যি কাটছিল । কিন্তু হঠাত্‍ একদিন অর্পিতা এসে ওর জীবনের বাঁকটা-ই ঘুরিয়ে দিল । কল্পের ছেঁড়া পালে জোড়া লাগিয়ে আজ এতদূর নিয়ে এসেছিল অর্পিতা । কল্প তো ভালই ছিল । সাগরের তীর ঘেঁষেই নাও বাইছিল ও । ওর তো কোন ভয়ই ছিল না । অথচ আজ অর্পিতা ওকে মাঝ-সমুদ্রে একা ছেড়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল ।

 

 

আজ অর্পিতার এনগেইজমেন্ট । হঠাত্‍ করে কি থেকে কি হয়ে গেল ওরা নিজেরাই জানে না । অর্পিতার সাথে কল্পের শেষ দেখা হয়েছিল পরশু । কল্প সেদিন লেকের পাড়ে বসে গভীর মনোযোগ সহকারে কবিতা লিখছিল । অর্পিতা কখন যে ওর পাশে এসে বসল ও খেয়ালই করে নি ।

‘-কি তোর কবিতা লেখা শেষ হল ?

-আরে অর্পি ! কখন এলি ?

-এইতো বিশ মিনিট হবে ।

-বিশ মিনিট ? তো আমায় ডাকবি না পাগলী ?

-তুই কবিতা লিখছিলি দেখে ডির্স্টাব করিনি । সবসময় তো বলিস আমি তোর বাড়া ভাতে ছাই দেই !

-হুম । তা তো দিলি-ই ।

-কি ! এখনো তোর কবিতা শেষ হয় নি ? এতক্ষণ ধরে বসে আছি !

-প্রায় শেষ করছিলাম । কিন্তু তুই ডাক দিয়ে শেষ করতে দিলি না । হা-হা- আচ্ছা , আজীবন কি তুই এভাবে আমার বাড়া ভাতে ছাই দিবি ? হুম ? কিরে কি হল ? অমন দেখাচ্ছে কেন তোকে ? কি হয়েছে ? আজীব তো ! কথা বলিস না কেন্ ?

-আর হয়ত দিব না ।’

বিষণ্ন দৃষ্টিতে লেকের স্থির জলে চেয়ে রইল অর্পিতা । কল্প হঠাত্‍ করে ভাষা হারিয়ে ফেলল । অর্পিতার চোখের দিকে চেয়ে কল্প বুঝতে পারল খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে । কিন্তু কি তা সে অন্দাজ করতে পারছে না । অর্পিতাকে জিজ্ঞেস করতেও কেন জানি ভয় করছে । কেন জানি শুনতে ইচ্ছে করছে না । আসন্ন র্দুযোগের ভাবী সম্ভাবনায় কল্পের ভেতরটা শুকিয় গেল । উদাস দৃষ্টিতে সেও লেকের জলে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল । এভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল । তারপর হঠাত্‍ করেই নীরবতা ভেঙ্গে অর্পিতা বলল , 'আগামী পরশু আমার এনগেইজমেন্ট । এর এক সপ্তাহ পরেই বিয়ে । তার এক সপ্তাহ পর আমায় নিইয়ে ইউ.কে. চলে যাবে লোকটা ।' ফোঁস করে একটা র্দীঘশ্বাস ছাড়ল অর্পিতা । অর্পিতার সে র্দীঘশ্বাসটা যেন লেকের জলে ঘুরপাক খেয়ে কল্পের বুকের ভেতরটায় ঢুকে কঠিন একটা ঘা মারল । চিনচিন একটা ব্যথা অনুভব করল কল্প ।

‘-কি হল কথা বলছিস্ না যে ?

-তুই কি এই বিয়েতে রাজি ?

-জানি না ঠিক । সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল আমাদের ফ্যামিলিতে বাবা যা বলেন তাই শুনতে হয় সবাইকে ।

-হুম ।

-তাই আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের দাম নেই এখানে ।

-তুই কি কাউকে ভালোবাসিস ?

-ভেবে দেখার সময় পাই নি !

-ভালোবাসা কি ভেবে চিন্তে হয় ?

-ঠিক তা না । আমি আসলে বুঝতে পারছি না ।

-হুম ।

-তোর কবিতা শুনাবি না ? আর কখনো শুনতে পাব কি না জানি না...

-শুনবি ?

-হুম । শোনা ।

-কখনও বা আমায় ভেবে উপছে যদি ঐ নয়ন ,

রুদ্ধশ্বাসে দুঃখগ্রাসে শূন্য আবেগ আলাপন...

আমার খাতার পাতায় পাতায় মোর আবেগের সবটুকু ,

আমায় যদি নাই খুঁজে পাও উল্টে দেখো একটুকু ।

কখনও বা একলা করে হারাও যদি তেপান্তর ,

একলা মনে দুঃখ বুনে নাইবা শুন কন্ঠস্বর...

দিলাম তোমায় আমার যত কল্প কথার আলপনা ,

আমার হয়ে কইবে তারা যখন আমি থাকব না ।

-এটা কি তখন লিখেছিলি ?

-না ।

-এখন ?

-হুম । নে ধর-

-কি ?

-তোকে দিয়ে দিলাম-

-ডায়েরীটা তো তোর প্রাণ । এটা ছাড়া বাঁচবি পাগল ?

-ছিল এক সময় । এখন নেই ।

-কেন ?

-সব কেন-র উত্তর থাকে না পাগলী ।

-কল্প !

-হুম ?

-তোর কি মন খারাপ ?

-না তো পাগলী ! হা-হা- হুম অবশ্য একটু তো খারাপ বটেই । তুই আমার একটা মাত্র বন্ধু । আমায় ছেড়ে চলে যাবি একটু খারাপ তো লাগবেই । নাকি ?

-আচ্ছা কল্প , আমি চলে যাওয়ার পর তুই খুব একা হয়ে যাবি । তাই না ? একা একা কি করবি রে তখন ?

-আগে যা করতাম । তোর সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার আগে আমি তো একাই ছিলাম । জানিস-ই তো এ পৃথিবীতে আমার কেউ ছিল না । মাঝখানে তুই এসেছিলি । সামনে আবার আগের মত কেউ থাকবে না । এ আর এমন কি ? কি রে পাগলী তোর চোখে জল কেন ? পাগলীটার কান্ড দেখ্ ! হা-হা-হা-

-আমি জানি তোর খুব কষ্ট হবে ।

-ধুরু পাগলী । শোন । তুই কি জানিস মানুষের পাঁচটা নীলপদ্ম থাকে ?

-শুনেছি ।

-আমার একটা নীলপদ্ম তোর কাছে । তোর একটা নীলপদ্ম আমার কাছে । কেন জানিস্ ?

-কেন ?

-কারণ আমরা খুব ভাল বন্ধু তাই । আর তোর একটা নীলপদ্ম আমার কাছে রইল-ই তো । তাহলে খারাপ থাকি কি করে বল্ পাগলী ?

-তুই আসলেই একটা পাগল ।

-হুম । ও তো ম্যায় হুঁ । হা-হা-হা-

-পাগল !

-হুম । পাগলীর পাগল ।’

অর্পিতা আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না । ঝরঝর করে ওর গাল বেয়ে লোনা পানির স্রোত নেমে এল । কল্প চুপ করে ওর পাশে বসে রইল । ওর মুখে আর একটা কথাও বেরুল না । আস্তে আস্তে ওর হাতটা অর্পিতার হাতের উপর রাখল । অর্পিতার চোখের পানি ক্রমশ বাড়তেই থাকল ।

 

 

ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে বেলা পড়ে এল । এতক্ষণে হয়ত অর্পিতার এনগেইজমেন্ট শেষ হয়ে গেছে । কল্প শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে আছে । কোথাও মেঘ নেই । বিশাল আকাশের বুকে বিশাল শূন্যতা । আজকে ওর এ পরিণতির জন্য কে দায়ী ? ও নিজেই ? ও তো চাইলে বলতে পারত- ‘অর্পিতা আমি তোকে ভালবাসি । আমায় এভাবে একা ফেলে যাসনে । তোকে ছাড়া আমার চলবে না । একা একা আমার খুব কষ্ট হবে ।’ অর্পিতা কি ওর কথা শুনত ? অর্পিতা কি ওকে ভালবাসে ? হয়ত বাসে না , বাসলে তো বলতই । আর বাসলেই বা কি ! ও তো ওর বাবার কথার বাইরে যেতে পারত না । ভালই হয়েছে । কথাটা ওকে বলা হয়নি । না হলে পাগলীটা ওর কথা ভেবে ভেবে আজীবন কষ্ট পেত । ভাবতে ভাবতে কল্পের মনে কিছুটা প্রশান্তি এল । এমন সময় কে যেন পরম মমতায় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ।

‘-কি রে ! অর্পি ! তুই ? এখানে ?’

বিস্ময় ভরা কন্ঠে কল্প বলল ।

‘-হুম আমি ।’

মিষ্টি একটা হাসি অর্পিতার মুখে লেগে আছে ।

‘-কখন এলি ?

-এই তো বিশ মিনিট হবে ।

-বিশ মিনিট ? তো আমায় ডাকবি না পাগলী ?

-দেখলাম আনমনে আকাশের দিকে চেয়ে আছিস । ভাবলাম কবিতা লিখছিস । তাই ডাকি নি । কি আজও কি তোর বাড়া ভাতে ছাই দিলাম না কি ? হুম ?

-আরে নাহ্ । কবিতা লিখছিলাম না । একটা অংক কষছিলাম ।

-অংক ?

-ও কিছু না । তা তোর এনগেইজমেন্টের খবর কি ? শেষ ?

-হুম শেষ । কত্ত আগে !

-বিয়ে তাহলে আগামী রবিবার । তাই না ?

-না । আজকে ।

-আজকে ? মানে কি ?

-কোন মানে নেই । আমার বিয়ে আজকেই ।

-কি বলছিস বুঝতে পারছি না অর্পি । ক্লিয়ার করে বল্ ।

-ক্লিয়ার করার কিছু নেই । আজকেই আমার বিয়ে ।

-কখন ?

-একটু পর ।

-তাহলে এখানে কি করছিস্ তুই ?

-বিয়ে করতে এসেছি ।

-মানে কি?

-কল্প তোর মনে আছে তুই পরশু দিন আমায় বলেছিলি তোর একটা নীলপদ্ম আমার কাছে , আমার একটা নীলপদ্ম তোর কাছে ?

-হুম ।

-আচ্ছা কল্প , আমি যদি আমার সবগুলো নীলপদ্ম তোকে দেই, তুই নিবি ?’

অর্পিতা কল্পের চোখে চোখ রাখল । কিছুক্ষণের জন্য কল্প র্নিবাক হয়ে ওর চোখের পানে চেয়ে রইল ।

‘-কি ? নিবি না ?

-হুম নেব ।’

দুজনের চোখে মুখে অর্পূব একটা হাসি দীপ্তি ছড়াল ।

‘-আর তোর নীলপদ্মগুলো আমায় দিবি না ?

-না । সেটা আর সম্ভব নয় ।

-কেন ?’

অবাক হল অর্পিতা ।

‘-দেব কি রে ? সেই কবেই তুই আমার সবকটা নীলপদ্ম চুরি করে বসে আছিস । কোত্থেকে দেব বল্ তো ? হা-হা-হা-

-কল্প তুই কি জানিস , তুই পুরাই পাগল একটা ?

-হুম জানি ।

-পাগল !

-হুম । পাগলীর পাগল ।’

 

 

Share