পারমিতা

লিখেছেন - একজন কল্পচারী- | লেখাটি 2498 বার দেখা হয়েছে

এক

 

পারমিতা ক্লাস শেষে ঘরে ফিরছিল । প্রচন্ড গরম পড়ছে আজ । পোড়া রোদে গায়ের চামড়া যেন ঝলসে যাওয়ার উপক্রম । দুপুর গড়িয়ে যায় যায় । প্রতিদিন তাও একটু আগে আগে বাড়ি ফেরা যায় । কিন্তু আজ শনিবার । শনিবার আর রবিবার এ দু’টো দিন অনেকগুলো স্যারের ক্লাস থাকে । ক্লাস শেষ হতে হতে দুপুর গড়ায় । এমনিতে শরীরটা ভাল লাগছিল না দেখে সকালে তেমন কিছু মুখে দিয়ে আসে নি পারমিতা । এখন ক্ষিদের জ্বালায় পেটটা চোঁ চোঁ করছে । ক্যাম্পাস থেকে বেরুতে বেরুতে পার্সটা চেক করল । তেতাল্লিশ টাকা কাঁটায় কাঁটায় । ফার্মগেট যাওয়ার রিক্সা ভাড়া ত্রিশ , বাকীটা বাস ভাড়া । কিছু কিনে খাওয়ারও উপায় নেই । একসময় দরাদরি করে পঁচিশ টাকায় যাওয়া যেত । কিন্তু আজকাল সাত রাস্তার মোড় পার হতেই যা জ্যাম পড়ে রিক্সাওয়ালা মামারা ত্রিশ টাকার কমে যাবেই না । এতগুলো টাকা দিয়ে রিক্সায় চেপেও শান্তি নেই । কখনো কখনো জ্যামের মধ্যে বসে থাকতে হয় ঘণ্টাখানেক । আর এই কাঠফাটা রোদে তো কথাই নেই । রিক্সার হুড টেনে দিয়েও পোড়া রোদের ঝাঁঝ থেকে বাঁচার উপায় নেই । ভার্সিটি গেইটে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাল । যদি কোন পরিচিত মেয়েকে পাওয়া যায় তাহলে শেয়ারে যাওয়া যাবে । কিন্তু এ মুহূর্তে কাউকে দেখা যাচ্ছে না । ওর কপালটাই যেমন । ওদের সেকশনে ওসহ মাত্র চারটে মেয়ে । ওদের কারো সাথে খুব একটা থাতির নেই পারমিতার । ওরা সব উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান । মিডেল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে বলে ওরা ওকে খুব একটা ভাল নজরে দেখে না । যদিও আজকাল মিডেল ক্লাস ফ্যামিলির ভুড়ি ভুড়ি ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটিতে পড়ে তাও মিডেল ক্লাস ফ্যামিলির একটা মেয়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়া ওদের চোখে গরীবের ঘোড়া রোগ । তার উপরে চারজনের মধ্যে পারমিতাই দেখতে সুশ্রী । সুশ্রী বলতে শুধু সুন্দরী না , সুনয়নাও । ওর চোখের দিকে একবার তাকালেই যে কারো দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছে করবে । অতএব সর্বশেষ বিবেচনায় ওকে তো পাত্তা দেয়া সম্ভব না ঐ তিনজনের । পারমিতাও আর ওদের সাথে গায়ে পড়ে ভাব জমাতে যায় না ।

 

ক্ষিদের জ্বালায় আর রোদের তাপে আর একটুও অপেক্ষা করা সম্ভব নয় । রিক্সা একটা ডেকে ওঠে পড়ল । উঠতেই চোখ পড়ল প্রতিদিনের উটকো ব্যাপারটা । ওর রিক্সার আর একটু সামনের রিক্সাটায় চাপল প্রতিদিনের মত চশমা পড়া সাদাসিধে ধরণের ছেলেটা । ওর রিক্সাটা ছেলেটার রিক্সা টাকে অতিক্রম করে গেলেই ঐ রিক্সার মামা প্যাডেলে পা রাখেন । এটা হয়ত ছেলেটাই রিক্সাওয়ালাকে বলে রাখে । উহ্ , আরেক অসহ্য ব্যাপার ! পারমিতা প্রথম প্রথম ব্যাপারটা খেয়ালই করত না । কিন্তু তা যখন চিরায়িত সত্যের মত রোজ রোজ ঘটতে থাকল তখন তা পারমিতার নজরে আসল । আর সেটা এখানেই শেষ না । প্রতিদিনই ওর রিক্সার পেছন পেছন ফার্মগেট গিয়েই ছেলেটা ক্ষান্ত হয় না । ফার্মগেট থেকে পারমিতা যখন যে বাসে উঠে সেও পিছু পিছু ঠিক একই বাসে উঠে । পারমিতা বাসের সামনের দিকে মহিলা সিটের ওখানে দাঁড়াত (বেশির ভাগ সময় দুপুরের দিকে সিট খালি থাকে না) ।আর ছেলেটা উঠে ঠেলাঠেলি করে বাসের ভিতরের দিকে লোকারণ্যে মিশে যেত । পারমিতার ধারে কাছে ঘেষত না । অদ্ভুদ কাণ্ড ! আরও অদ্ভুদ কাণ্ডটা পারমিতার অনেক পড়ে চোখে পড়েছিল । সেটা হল পারমিতা দেখত ছেলেটা ওর সাথে সাথে পল্লবীতে নেমে পড়ত । ও প্রথম প্রথম ভাবত ছেলেটার বাসা হয়ত এদিকে কোথাও । পরে একদিন সে তড়িঘড়ি করে নেমে দোকানপাটের আড়ালে লুকিয়ে দেখতে লাগল ছেলেটা কি করে । পারমিতা অবাক হয়ে দেখল ছেলেটা অনেকক্ষণ ওকে খোঁজাখুঁজি করে না দেখে রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকে বাসে উঠে পড়ল । ওর বুঝতে বাকী থাকল না ছেলেটার বাসা আশেপাশে কোথাও না । সে যাই হোক , ছেলেটার এই অদ্ভুদ আচরণে পারমিতা কিছুটা বিরক্ত হলেও ছেলেটাকে খারাপ বলে মনে হয় না ওর । কারণ ছেলেটা রিক্সায় , বাসে কিংবা বাসস্টপে ওর দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকলেও ও যখন ছেলেটার দিকে তাকায় তখন সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলে কিংবা অপ্রস্তুতভাবে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে । এমন অদ্ভুদ উন্মাদ সে আগে কখনো দেখেনি ।

 

রিক্সা থেকে নেমে গাদা গাদা মানুষের ভীড়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দাঁড়াতে বাধ্য পারমিতা । কিছুই করার নেই , বাসায় তো ফিরতে হবে । প্রচণ্ড গরমে আর ক্ষিদের জ্বালায় ছেলেটার কথা ভুলে গেল পারমিতা । ছেলেটা ওর থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল । বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ওর চোখ গেল রাস্তার মোড়ে শরবতের ভ্যানে । লেবুর রস চেপে নিয়ে সাথে মধু আর বরফ কুচি দিয়ে একটা গ্লাসের উপর আর একটা চেপে ধরে নিপুণ ভঙ্গিতে ঝাঁকিয়ে গ্লাসের পর গ্লাস শরবত বানিয় যাচ্ছে বিক্রেতা মামাটা । ভীড় লেগেই আছে । পথচারী সবাই কিনে খাচ্ছে । এই কাঠফাটা রোদে পারমিতা আত্মসংবরণ করতে পারল না । জিভে পানি চলে এল । ইচ্ছে করল দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস কিনে খায় । কিন্তু বাস ভাড়াটাই আছে শুধু ।অবশ্য টাকা থাকলেও অত ধরণের মানুষের মধ্যে গিয়ে একটা মেয়ের শরবত কিনে খাওয়ার ব্যাপারটা কেমন জানি দেখায় । আঙ্গুর ফল টক- পারমিতা নিজেকে বুঝাল ।এমন সময় হঠাত্‍ ছেলেটার দিকে চোখ পড়ল ওর ।ছেলেটা ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল । রোদে পুড়ে মুখটা লালচে দেখাচ্ছিল । ও তাকাতেই ছেলেটা মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকাল । পারমিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে ।তারপর হঠাত্‍ কি মাথায় এলো ছেলেটাকে ডাক দিল , 'এই যে শুনুন' । ছেলেটা অপ্রস্তুত হয়ে পেছন দিকে তাকালো কেউ আছে কিনা দেখতে । কাউকে না দেখে আরো বেশি অপ্রস্তুত হয়ে গেল । আমতা আমতা করে বলল , 'জ্বি ? আমাকে বলেছেন ?' 'জ্বী আপনাকে' ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দিল পারমিতা । ‘একটু এদিকে আসুন ’। ছেলেটা ভীরু ভীরু পায়ে এগিয়ে এল । 'আচ্ছা আপনি কি আহসানউল্লাহ্‌ তে পড়েন ?' 'জ্বি' 'কোন্ সাবজেক্ট ?' 'জ্বী সিএসই' । 'কোন্ সেমিস্টারে ?' 'টু-টু' । 'টু-টু ? আপনি কি জানেন আমি কোন্ সেমিস্টারে ? আমি বিবিএ ফোর-ওয়ান । আমি তোমার সিনিয়র' । 'জ্বি জানি' । 'জানো ? তাহলে তোমার সমস্যাটা কি ?' 'জ্বী মানে-' 'তোমার কি চোখে সমস্যা ?' 'ইয়ে-মানে-' 'এত ইয়ে মানে করছো কেন ?' 'জ্বী আসলে-' 'শোন আমি ঐ যে ঐ পাশটাতে গিয়ে দাঁড়ালাম । আমার জন্য এক গ্লাস শবরত নিয়ে আসো' । 'জ্বী মানে ?' 'তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো না ? আমার বড্ড তেষ্টা পেয়েছে' । 'জ্বী আনছি' । 'শোন । দুই গ্লাস এনো । তোমার গলাটাও শুকিয়ে গেছে মনে হয়' । 'জ্বী আচ্ছা' ।

 

পারমিতা রাস্তার একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়াল । ছেলেটা বাধ্য বালকের মত দু গ্লাস শরবত নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে এল । আস্তে আস্তে কাঁপা কাঁপা হাতে একটা গ্লাস বাড়িয়ে দিল । ছেলেটার অবস্থা দেখে পারমিতার খুব মায়া হল । গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে ফেলল সে । ' কি ? তুমি খাবে না ? অমন করে কি দেখছো ? ' ' ইয়ে মানে- এইতো খাচ্ছি ' বলে সেও শরবত শেষ করল । শেষ করে পারমিতার দিকে এমনভাবে বাধ্য ছাত্রের মত তাকাল ভাবটা এমন যেন- এখন কি করতে হবে ম্যাডাম । ' কি হল ? অমন বুদ্ধুর মত তাকিয়ে আছো কেন , গ্লাস দুটো দিয়ে এসো ' । ' জ্বী ' বলে গ্লাস দুটো নিয়ে ছেলেটা চলে গেল । শরবতের দাম মিটিয়ে দিয়ে ফিরে এলো সে । ' তুমি তাহলে ভাল করেই জান আমি তোমার সিনিয়র ' । ' জ্বী ' ' তাহলে তুমি যা করছো এটাকে কি বলে ? আমার তো মনে হয় পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না ! ' ' জ্বী ' ' এত জ্বী জ্বী করছো কেন ? ' বিরক্তিতে ঠোঁট বাঁকালো পারমিতা । অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, ' শোন । কাল থেকে এভাবে আর আমার পিছু পিছু ঘুরবা না । ঠিক আছে ? ' ছেলেটার চোখ ছলছল করছিল । পারমিতা পুরোপুরি বিব্রত হয়ে গেল । কি বলবে কিছুই বুঝতে পারল না । এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল । ' কি হলো ? চুপ করে আছো কেন ? কি বলছি বুঝেছো ? ' ' জ্বী আচ্ছা '। একটা বাস এসে দাঁড়াতেই পারমিতা এগিয়ে গেল । ছেলেটি যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল । বাসে উঠে আজও সিট পেল না । মহিলা সিটের কাছাকাছি দাঁড়াল সে । বাস ছেড়ে গেল । এত মানুষের ভীড় উপেক্ষা করে জানালা দিয়ে উঁকি দিল পারমিতা । যতক্ষণ দেখা গেল ছেলেটা ঐখানেই দাঁড়িয়ে ছিল । পারমিতার কেন জানি অসম্ভব মায়া হচ্ছিল ছেলেটার জন্য । এমন পাগলামো কেউ করে । অদ্ভুদ ছেলেটা ! তবে সবচেয়ে বেশি অদ্ভুদ নিজেকেই ঠেকছিল পারমিতার । অচেনা অজানা একটা ছেলের জন্য ওর এত মায়া হচ্ছে কেন ? আর্শ্চয !

 

পরদিন আবার বাসায় ফেরার পথে ছেলেটাকে ডেকে পারমিতা জিজ্ঞেস করল , ' শরবতের দাম কত ছিল ? জ্বী কেন ? ' ' বলছি শরবতের দাম কত ছিল ? ' ' জ্বী পাঁচ টাকা ' । পারমিতাকে পার্সে হাত দিতে দেখে ছেলেটার চোখ গতকালের মত ছলছল করে উঠল । ' টাকাটা ফেরত দেওয়া খুব কি আবশ্যিক ? ' ' হুম । মন খারাপ করো না । আমি তোমার সিনিয়র । নাও দশ টাকা । মনে করো গতকাল আমি তোমাকে খাইয়েছি । ওকে ? আল্লাহ্ হাফেজ ' ।

 

দুই 

 

সচারাচর কোন কিছু নিয়মিত ঘটতে থাকলে যতই বিরক্তির বা অপছন্দের হোক না কেন , তা যদি হঠাত্‍ বন্ধ হয়ে যায় বা আর চোখে না পড়ে তখন মানুষ অচেতন মনেই তার অভাববোধ করে । আস্তে আস্তে দিন যেতে লাগল । প্রতিদিন বাসায় ফেরার পথে ভার্সিটি গেইটে , রিক্সা স্টপে , বাস স্টপে প্রায় সব জায়গায় পারমিতা এদিক ওদিক উঁকি দিয়ে সেই অদ্ভুদ ছেলেটিকে খোঁজে । কিন্তু তাকে আর আগের মত দেখতে পাওয়া যায় না । পারমিতা রোজ ছেলেটার কথা ভাবে । নিজেকে নিজের বিশ্বাস হয় না ওর । ও এমন পাগলামো করছে কেন ! ও কি তবে ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলেছে ? ছি ছি ! এ কি করে সম্ভব ? ছেলেটা যে বয়সে ওর ছোট । বয়সে ছোট একটা ছেলেকে ভালোবাসা যায় ? আচ্ছা , ভালোবাসা কি বয়স দেখে হয় ? ভালোবাসা কি বলে কয়ে আসে মানুষের জীবনে ? এমন অজস্র চিন্তা পারমিতার মাথায় ঘুরপাক খায় সবসময় । নিজেকে ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোন তত্ত্বে দাঁড় করাতে না পারলেও পারমিতা এটা বুঝতে পারে যে ও সর্বক্ষণ ছেলেটার অভাব অনুভব করে ।

 

দেখতে দেখতে পারমিতার অনার্স শেষ হয়ে গেলো । গতকাল ছিল ওদের শেষ পরীক্ষা । ডিপার্টমেন্টের কিছু অফিসিয়াল কাজ ছিল পারমিতার । দিনটা ছিল মেঘলা মেঘলা । পারমিতা একটু বেলা করেই বাসা থেকে বেরিয়েছিল । রিক্সা থেকে নেমে সোজা রেজিস্টার অফিসে চলে গেল ও। কাজগুলো শেষ হতেই তড়িগড়ি করে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল । বেরিয়ে সিএসই ডিপার্টমেন্টের দিকে দ্রুত হাঁটতে লাগল । পারমিতা গতকাল জেনে নিয়েছিল আজই সিএসই থ্রি-ওয়ানের শেষ পরীক্ষা । পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র কিছুক্ষণ আগে । পরীক্ষা দিয়ে সবাই এক এক জায়গায় যে যার মত জড়ো হয়ে কথা বলছিল । এত ছেলে মেয়ের ভীড়ে ছেলেটাকে খুঁজতে গিয়ে বড় সমস্যায় পড়ল । কাউকে জিজ্ঞেস করারও উপায় নেই । ছেলেটার নাম পর্যন্ত জানা হয়নি । নামটা জানলে অন্তত সবার কাছ থেকে খোঁজ নেয়া যেত । পারমিতা কি যে করবে বুঝতে পারছিল না । হঠাত্‍ এমন সময় চোখ পড়ল ছেলেটার উপর । বারান্দার এক পাশে রেলিং-এ হাত দিয়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা । পারমিতা এগিয়ে গেল , ' শোন ' । পেছন ফিরে তাকাতেই অবাক হল ছেলেটা । পারমিতা কাছে এসে দাঁড়াল । ওর বিষণ্ন চোখ দুটোর পানে বেশিক্ষণ থাকিয়ে থাকতে পারল না । চোখ সরিয়ে নিল । ছেলেটা স্মিতহাস্যে বলল , ' কেমন আছেন ? ' ছেলেটার বিষাদভরা মুখের শুকনো হাসিটা পারমিতার ভেতরটা ভেঙ্গে খান খান করে দিল । নিজেকে সামলে নিয়ে বলল , ' তোমার কয়েকটা মুর্হূত আমি পেতে পারি ? ' ' জ্বী বুঝলাম না ? ' কিছুটা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা । ' আমার সঙ্গে চল ' । ' কোথায় ? ' ' চলই না, বলছি...' ' আচ্ছা চলুন ' । দুজনে একসাথে হাঁটতে শুরু করল । পারমিতা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল ছেলেটা হঠাত্‍ কেমন জানি পরিণত হয়ে গেছে । ওর আগের সেই অপ্রস্তুত ভঙ্গি , কথাবার্তা কিছুই নেই । সবকিছু এখন বড়ই সাবলীল ।

 

ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে দুজনে রিক্সায় চাপল । রিক্সায় চুপচাপ বসে রইল দুজনে । কারো মুখে কোন কথা নেই । ফার্মগেট নেমে পারমিতা আরেকটা রিক্সা ডাকল , ' মামা ধানমন্ডি ৮ নম্বর যাবেন ? রবীন্দ্র সরোবর ? ' ছেলেটা কৌতুহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল , ' ঐখানে কেন ?' পারমিতা ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দিল , ' ঘুরতে '। দুজনে আবার রিক্সায় উঠে পড়ল । এবারও কারো মুখে কোন কথা নেই । রিক্সা থেকে নেমে ধীর পায়ে লেকের দিকে এগিয়ে গেল দুজনে । দীর্ঘক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে পারমিতা বলল , ' শোন আজকে যতক্ষণ তোমার সাথে আছি এভাবে মনমরা হয়ে থাকার ইচ্ছে নেই আমার ' । ' তো আপনার জন্য কি করতে পারি বলুন ?' ' কি করবা মানে ? একটু হাসতেও কি পারো না ? মনে হয় অনেকদিন তুমি হাস না ' । পারমিতার কথাটা শুনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল ছেলেটার মুখে । ' বাহ্ ! তোমার হাসি তো অনেক সুন্দর ' বলতেই দুজনে হো হো করে হেসে উঠল । ' ঐদিকে দেখো । ডিঙ্গি ! চল বোটে চড়ব । প্যাডাল বোট চালাতে পার ? ' 'পারব হয়ত ' । ' চল যে আগে পৌঁছাতে পারে '। 'মানে ? ' ' কোন মানে নেই ' বলেই পারমিতা স্যান্ডেল হাতে নিয়ে বাচ্চাদের মত দিল ছুট । কে কি ভাববে তোয়াক্কা করল না । ছেলেটা প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারল না । পরে পারমিতাকে অনুসরণ করে সেও ছুটতে লাগল । ডিঙ্গি'র কাছে পৌঁছে দুজনে হাঁপাতে হাঁপাতে হাসতে লাগল । হাসতে হাসতে দুজনের পেটে খিল ধরে গেল । ছেলেটা বলল , ' হঠাত্‍ এমন ছেলেমানুষী । বুড়ি হয়ে গেছেন । সবাই কি ভাববে বলুন তো ?' বলে আবারও হাসতে লাগল । ' বলুক গে । আমি কারো ধার ধারি না । চল বোটে উঠি । সকাল থেকে মেঘলা । ইশ ! বৃষ্টি নামলে ভালো হতো ! যাও টিকিট কেটে এসো । '

 

দুজনে বোটে উঠল । ছেলেটা অনেক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও বোট সামনে নিতে পারছিল না । প্যাডেল বোটে সে আগে কখনো চড়েনি । বোটটা এক জায়গাতেই ঘুরপাক খেতে লাগল । ওর চালানোর অপটুতা দেখে পারমিতা হেসে খুন । ওর হাসি যেন থামতেই চায় না । অনেক্ষণ চেষ্টার পর কোনরকমে বোটটা লেকের মাঝামাঝিতে নিয়ে আসল । ' অমন করে কি দেখছো ?' ' আপনার হাসি ' । ' কেন ? ' ' হাসি কি অমন করে দেখার মত জিনিস হলো ?' ' ঠিক তা না । আসলে আর কখনো দেখতে পাই না পাই তাই মন ভরে দেখে নিচ্ছি '। মুহূর্তেই পারমিতার মুখের হাসি উবে গেল । শূন্য দৃষ্টিতে লেকের জলে চেয়ে রইল । এভাবে চুপচাপ কেটে গেল অনেকক্ষণ । ' তুমি কি জানতে চাও না আমি কেন তোমায় সঙ্গে করে এখানে এসেছি ?' ' কেন ?' ‘কাল আমাদের অনার্স লাস্ট এক্সাম ছিল । আজকের পর হয়ত তোমার সাথে আর কখনও দেখা হবে না '। ' কেন ? এমবিএ করবেন না ?' 'না । বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন । সামনের মাসেই বিয়ে ' । ছেলেটা বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে রইল । ' কি মন খারাপ হয়ে গেল ?' 'ঠিক মন খারাপ না আসলে । নতুন করে মন খারাপ করারও কিছু নেই ' । 'দেখো বোঝার মত তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে । তুমি যা চাইছো তা কখখনো সম্ভব নয় '। 'হয়ত বুঝি দেখেই আজ পর্যন্ত আপনার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াই নি কখনো । আচ্ছা আপনি বললেন , তুমি যা চাইছো- একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে ' । ' কি ?' 'আপনি কি বিয়েটাতে রাজি ?' 'দেখো সবাই সবকিছু চাইলেও পায় না । আবার সবার সবকিছু চাইতেও নেই ' । 'কেন ?' ' কেনর উত্তর বলব বলেই তোমাকে এখানে এনেছি । আমরা তিন বোন , তিনজনের মধ্যে আমি মেঝ । আমি যখন সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হই তখন বড় আপুর বিয়ে ঠিক হয় । এমনসময় হঠাত্‍ একদিন বড় আপু ওর ইউনিভার্সিটির একটা ছেলের সাথে পালিয়ে যায় । মা-বাবা ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল । মা তো এ কষ্ট নিয়ে বেশিদিন থাকতেই পারল না ।আপু চলে যাওয়ার পরপরই মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন । এর মাসখানেকের ভেতর মারা যান । আর বাবা হয়ে যান শোকে পাথর । এরপর থেকে বাবা কারো সাথে ভাল করে কথা বলেন না । একদম চুপচাপ হয়ে গেলেন । এমন কি আমাদের সাথেও প্রয়োজনের বেশি দু'দন্ড কথাও বলেন না । আজ প্রায় ছয় বছর হতে চলল । আমি নিজের চোখে দেখেছি মা-বাবা কি কষ্টটাই না পেয়েছেন । এখনো মাঝে মাঝে মায়ের ছবি বের করে বাবাকে লুকিয়ে কাঁদতে দেখি । আপুর এ ঘটনার পর থেকে আমি মনে মনে শপথ করেছিলাম এ জীবনে কখনো কারো প্রেমে পড়ব না । কাউকে ভালোবাসব না । ভালোবাসা আমার জন্য আসেনি । আমি নিজে কাঁদতে রাজি আছি , তবুও বাবাকে আবার নতুন করে কাঁদাতে পারব না ' বলতে বলতে পারমিতার দুচোখ ভরে লোনা পানির ঢল নেমে এলো । হঠাত্‍ করেই বৃষ্টি আরম্ভ হল । স্থির লেকের জলে বোটে বসে দুজনে চুপচাপ ভিজতে লাগল । পারমিতার চোখের জল বৃষ্টির জলে মিশে একাকার হয়ে গেল । এভাবে তারা কতক্ষণ ছিল নিজেরাই জানে না । একপশলা বৃষ্টি হয়েই থেমে গেল । চারপাশের প্রকৃতিটা হঠাত্‍ করেই শান্ত হয়ে গেল । ঘোর কাটতেই পারমিতা আর্দ্র কণ্ঠে বলল , ' চল যাওয়া যাক । অনেকক্ষণ হল' । ছেলেটা বলল , 'যদি কিছু মনে না করেন আপনার হাতটা একটু ধরতে পারি ?' ' হাত ধরে আর কি হবে ? আজ আমি তোমার থেকে কিছু মুর্হূত চেয়ে নিয়েছিলাম আমার কিছু মুর্হূত তোমায় দেব বলে । এর চেয়ে বেশি কিছু দিয়ে আর কষ্ট বাড়াতে চাই না ' । ছেলেটি চুপ করে রইল , আর কিছু বলল না ।

 

বোট থেকে নেমে দুজনে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল । ' শোন । ভাল করে লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হও । তারপর লাল টুকটুকে দেখে একটা বউ আনবে ঘরে । কেমন ?' ' আচ্ছা ।' ছেলেটা হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করল । ' শোন জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না । সবাই সবকিছু পায় না । ভালো সবাই বাসে । কিন্তু সবার ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না । আর ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার যন্ত্রণা বলে যদি কিছুই না থাকতো তবে মানুষ ভালোবাসা পেয়ে সুখী হতো না কখনো । জানো , আমি আজ অনেক সুখী । জানি না অদূর ভবিষ্যতে আমার জীবনে যে আসছে তার কাছ থেকে কতটুকু ভালোবাসা পাব । তবে আমি এটা জানি , আমি একজন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি । তার দেয়া কিছু মুর্হূত পেয়েছি । এখন সেই মুর্হূতগুলোকে অবলম্বন করে আমি সামনে এগিয়ে যাবো । পারলে তুমিও তাই করো ' । ' হুম ।' 'একটা রিক্সা ডাকো তো '।

 

রিক্সায় উঠতে গিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকাল পারমিতা । ' ভাল কথা আজ পর্যন্ত তোমার নামটাই জানা হল না । কি নাম তোমার ?' একটা ম্লান হাসি খেলে গেল ছেলেটার মুখে , 'কি হবে আর নাম জেনে ?' 'তাও ঠিক । কি হবে আর নাম জেনে ! নাইবা জানলাম....' ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করার চেষ্টা করল পারমিতা । ' চলি তবে , ভালো থেকো ।' রিক্সায় উঠে হুড টেনে দিল । ধীরে ধীরে রিক্সা চলতে শুরু করল । পারমিতার দুচোখ বেয়ে আবারও ঢল নামতে শুরু করল , এ যেন ফুরাবার জন্য নয় । রিক্সা চলছে তো চলছে , পারমিতা কাঁদছে তো কাঁদছে ।

 

Share