এখানে পৃথিবী নেই (২)

লিখেছেন - একজন কল্পচারী- | লেখাটি 902 বার দেখা হয়েছে

দাদাভাই,

কেমন আছিস্‌ তুই ? অনেকদিন দেখিনা তোকে । যতদিন চোখের সামনে ছিলি, দু’চোখের বালি ছিলি তুই । অথচ আজ তুই নেই । কেমন জানি শূন্য শূন্য লাগে । তোর কথা খুব মনে পড়ে । একা একা আর ভালো লাগে না রে । সেই যে গেলি, আজ ছ’মাস হতে চলেছে । মায়ের বালিশের নিচে চিঠিটা রেখে চলে গেলি, কাউকে একটু টের পেতে দিলি না । আমাকে পর্যন্ত একটু বলার প্রয়োজন মনে করলি না । দাদা তুই আমাকে বল্‌লি না কেন ? জানিস আমি ঠিক করেছি তুই ফিরে এলে তোর সাথে টানা এক সপ্তাহ কথা বলব না । সত্যি বলছি দাদা, আমার খুব অভিমান তোর ওপর ।

 

দাদা, ছ’মাস তো হয়ে গেল । যুদ্ধ শেষ হবে কবে ? এই যুদ্ধ কি কোনদিনও শেষ হবে না ? আমার খুব ভয় করে রে । কোন্‌দিন কি হয়ে যায় ! চালার নিচে মাচায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে থাকতে আমার খুব কষ্ট হয় দাদা । এখানে দিন নেই রে । ঝাপসা আলোয় থাকতে থাকতে মনে হয় আর বেশি দিন এখানে থাকলে আমি অন্ধ হয়ে যাব । জানিস্‌ তো কিছুই করার নেই । শকূনীগুলোর চোখ তো আমাদের বয়সী মেয়েদের খুঁজে বেড়ায় । চোখে পড়লেই ছোবল মারে । আচ্ছা দাদা, ওদের কি মা-বোন নেই ? ওরা কি মায়ের কোলে জন্ম নেয় নি ? ওরা এত নীচ কেন দাদা ? স্বপ্নেও কোনদিন ভাবিনি আমাদের মাটির পৃথিবীটা আর পৃথিবী রবে না ।

 

দাদাভাই, তুই ঠিক আছিস্‌ তো ? তোর অনেক কষ্ট হচ্ছে, না দাদা ? এত বড় ছেলে হয়েছিস- তবু মা তোকে নিজ হাতে খাইয়ে দিত সবসময় । নিজে তো ভালো করে দু’মুঠো ভাত খেতে পারতি না- সেই তুই কি করে যুদ্ধে গেলি রে ? জানিস, মা শুধু কাঁদে- আমার সাথে কথা বলে না খুব একটা । মাচার নিচে নামতেই দেয় না । সবসময় চুপ করে থাকে- আর কাঁদে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে । যখন ক্লান্তি আসে তখন দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে, তবুও চোখের পানিগুলো থেমে থাকে না । নীরবে ঝরতে থাকে । দাদাভাই, আমি তো কাঁদতে পারি না মায়ের মতন । আচ্ছা দাদা, আমার চোখে জল আসে না কেন ? আমারও যে কাঁদতে ইচ্ছা করে খুব ।

 

শুনেছি কাল রাতে পাশের বাড়ির সুনীলদা এসেছে লুকিয়ে । বেচারা ! বউটাকে দেখতে পেল না । সাতমাসের বাচ্চা ছিল পেটে । তবুও ওকে ধরে নিয়ে যেতে একটুও বাঁধল না বেজন্মাগুলোর । আজ রাতের মধ্যেই নাকি সুনীলদা চলে যাবে । তাই তো চিঠিটা লিখছি তোকে । তার হাতে ধরিয়ে দিব, যদি তোর সাথে কখনও দেখা হয়ে যায় যুদ্ধের ময়দানে । দাদা, জীবনে কখনও চিঠি লিখতে হয়নি তোকে। জানি না কিভাবে চিঠি লিখতে হয় । দাদা, তুই কি আমার কষ্টগুলো বুঝতে পারছিস্‌ ? ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি আমরা, কখনও চোখের আড়াল হস্‌নি । তোকে তো শুধু জ্বালিয়ে মেরেছি সবসময় । তোর সাথে একদিন ঝগড়া না করলে আমার যে পেটের ভাত হজম হতো না দাদা । আবার তোর মন যখন খুব খারাপ হয়ে যেত, একা একা পুকুর পাড়ে বসে থাকতি, তখন তো ঠিকই চুপিচুপি গিয়ে তোর হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিতাম । তুই তখন অদ্ভুতভাবে হাসতি । তোর ভেজা ভেজা চোখে হাসিটা দেখলে খুব ভালো লাগত কেন জানি ।

 

দাদাভাই, আমার কত আশা ছিল রে, কত স্বপ্ন ছিল ! কোনটাই বুঝি আর পূরণ হলো না । কত সাধ ছিল- মেট্রিক পরীক্ষায় পাশ করে তুই আমার জন্য একটা লাল টুকটুকে বউ নিয়ে আসবি । আর আমি সারাদিন ওর সাথে ঝগড়া করতাম শুধু । কারণ তোর সাথে ঝগড়া করে আমার সাধ মিটবে না কোনদিন । তারপর একদিন তুই রাগ করে আমাকে কারো গলায় ঝুলিয়ে দিবি । আমি স্বামীর সংসার শুরু করব । আমার এক গাদা বাচ্চা-কাচ্চা হবে । তুই এলে ওরা তোকে মামা মামা বলে ডাকবে, সবাই মিলে তোকে ছিঁড়ে খাবে । আমি দেখে খুব মজা পেতাম আর হাসিতে গড়াগড়ি দিতাম । তুই আসতে না চাইলেও জোর করে তোকে অন্তত মাসে একবার হলেও আমার শ্বশুড়বাড়ি আনাতাম । তোকে আমি নিজ হাতে পায়েস রেঁধে খাওয়াতাম । আরও কত কী ! কিন্তু- কি থেকে কি হয়ে গেল ! কোত্থেকে কোন্‌ ঝড় এসে আমার সাজানো পৃথিবীটা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল । দাদা আমার খুব ভয় হয় ! এভাবে আর কতদিন লুকিয়ে থাকতে পারব জানি না- খুব ভয় করে রে !

 

জানিস্‌ দাদা, হাতের কাছে একটা ছুরি লুকিয়ে রাখি সবসময়, মা জানে না । দাদাভাই, আমার গায়ে যদি কেউ হাত দেয় আমি সইতে পারব না রে । তাই তো ছুরিটা রেখেছি । দাদা, তুই ফিরে এসে যদি দেখিস্‌ আমি নেই, তখন তোর খুব কষ্ট হবে, না রে ? দাদা, আমার একটুও ইচ্ছে করে না মরতে । বিশ্বাস কর আমার বাঁচতে ইচ্ছে করে খুব । আচ্ছা দাদা, তুই পারবি না তোর ছোট্ট বোনটিকে বাঁচাতে ? পারবি না ? পারবি না আমার সাজানো মাটির পৃথিবীটা আমায় ফিরিয়ে দিতে ? বল্‌ দাদা, পারবি না ?

 

বেঁচে থাকলে হয়ত দেখা হবে । জানি না ওরা আমায় বাঁচতে দিবে কি না । ভালো থাকিস্‌ দাদা ।

 

ইতি-

তোর আদরের ছোট্ট পারুল ।

 

 

 

( বিঃ দ্রঃ

লেখাটি আমার বন্ধু শিহাবের ‘ এখানে পৃথিবী নেই ’ গল্পটি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছি । যতটুকু ভিতরে ইমোশন ছিল, সবটুকু দিতে পারি নি । সবাই সব পারে না । যাই হোক, শিহাব কে অসংখ্য ধন্যবাদ । ওর লেখাগুলো টেনে নিয়ে লিখতে আমাকে কখনও বারণ করে না সে । এর আগেও ওর লেখা ‘ শেষ চিঠি ’ হতে আমি ‘ এবং শেষ চিঠি ’ লিখেছি । তবে ‘ এবং শেষ চিঠি ’ সিকুয়্যাল ছিল, এটা সিকুয়্যাল না । শুধুমাত্র থিম্‌ থেকে লেখা । তাই নামটাও চেইন্‌জ করতে পারি নি । )

Share