দেয়ালের ওপারে আছে আকাশ

লিখেছেন - সুষমা আপ্লুত | লেখাটি 1141 বার দেখা হয়েছে

প্রায় মাস ছয়েক ধরে রুনি ঘ্যানঘ্যান করে আলমের মাথার তার ঢিলা করে ফেলেছে একটা ল্যাপটপ আর না হয় নিদেনপক্ষে একটা নেটবুক কিনে দিতে। রুনির নেটবুক টাই বেশি পছন্দ , টানাটানি করতে ঝামেলা কম লাগে হালকা বলে, আর ঢাউশ ল্যাপটপের চেয়ে দেখতে অনেক ভাল, মোদ্দা কথা দাম কম। বাসায় ডেস্কটপ একটা আছে অবশ্য ,কিন্তু তাতে রাজ্যের গেম ঢুকানো আর মাহী টা প্রায় সারদিন তাতে গোলাগুলির গেম খেলে।ওই ঢুশ ঢুশ সাউন্ডে রুনির মাথা ধরে যায়। রুনির টাকা থাকলে নিজেই এদ্দিনে কিনে নিত কিন্তু মাঝে মাঝে সংসার খরচ বাঁচিয়ে যে কয়েকটা টাকা জমে রাহী আর মাহীর আবদার মেটাতেই টা শেষ হয়ে যায়। ছেলে মেয়ে দুইটাও হয়েছে তেমনি , যত আবদার রুনির কাছে। আরে বাপ, তোদের মায়ের কি টাকার গাছ আছে নাকি ! বাপের কাছে চাইতে কি হয় !

 

অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে মিষ্টি মিষ্টি প্রেম বাণী খরচ করে আলমকে পটিয়ে ল্যাপটপ মেলা থেকে অবশেষে একটা নেটবুক কিনে রুনি। নতুন নেটবুকের সাথে একটা মডেম ও ফ্রি পায়। কম্পিউটার বিষয়ে অ আ ক খ জ্ঞান থাকা রুনি নেটবুকের ছাতামাথা প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতে পারেনা। আর ইন্টারনেট সাইটের আগাগোড়া রঙ্গিন চেহারা দেখতেই শুধু ভাললাগে। সে ভেবেছিল নিজের নেটবুক থাকলে কত কত পছেন্দের গান যখন তখন ইচ্ছামত শুনতে পারবে ।প্রথম প্রথম কিছুই পারত না রুনি, আস্তে আস্তে মাহী রাহী সবকিছু দেখিয়ে দেয়। বিভিন্ন রেসিপি আর আর কিছু বাংলা গল্প কবিতার ই বুক ডাউনলোড করে হাতেখড়ি হয় তার । তবে মাহী রাহী দুই বিচ্ছু ছেলেমেয়ের উৎসাহে  আরও অনেক কিছু জেনে যায়। মাহী অনেকটা সখ করেই রুনির নামে ফেসবুকে একাউন্ট খুলে দেয় । পরিচিত আত্মীয়স্বজন যাদের একাউন্ট আছে, তাদের অ্যাড করে দেয়  রুনির একাউন্টে । কিছুদিন গেলে রুনি অবাক হয়ে দেখে তার প্রায় চল্লিশটার মত ফ্রেন্ড হয়ে গেছে , আরো বেশি অবাক হয় যখন স্কুল লাইফের দুই ফ্রেন্ড সাদিয়া আর মেহনাজকে ফেসবুকে খুঁজে পায়। মেসেজে মোবাইল নাম্বার আদানপ্রদান হতেই চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। সেই ছেলেবেলা, টিফিন পিরিয়ডে দারোয়ানের চোখ ফাকি দিয়ে দেয়াল টপকে স্কুল পালানো , সংসার, বাচ্চাকাচ্চা হতাশা কিচ্ছু বাদ যায়না।

 

এরপর সবকিছুই অভ্যস্ততা। আলম আর মাহী রাহী বেরিয়ে গেলে সংসারের টুকিটাকি কাজ সেরে অনেকখানি অবসর রুনির । আগে গান শুনত, টিভি দেখত ,তারপর ও মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে পড়া সময়কে জাগিয়ে দিতে ইচ্ছে হত। কিছুদিন হল রুনি বেশ খানিকটা সময় ফেসবুকের নীল সাদা দুনিয়ায় ঘুরে আসে। ভালই লাগে জীবন্ত মানুষের ডামিটাকে সুখ দুঃখের রূপে বন্দী হতে দেখতে ।

 

একদিন সাদিয়ার সাথে কথা শেষ হবার পর খুব বেশি মন খারাপ হয়ে যায় রুনির। তাদের স্কুলের আরেক বান্ধবী রেহানার সংসারটা নাকি কিছুদিন আগে ভেঙ্গে গেছে। আসলে দুজনের সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় একজন ঢুকে গেলেই সম্পর্কের বিশ্বস্ততার দাঁড়িপাল্লার নিক্তিটা সবসময় ই ভুল দিকে হেলে যায়। রেহানার কথা রুনি মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারেনা। কি মনে করে লিখে ফেলে একটা গল্প।নাম দেয় স্বপ্ন ঘুড়ি। একান্তই নিজের মনের কিছু আবেগ আর রেহানার জীবনের ধুসর হয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো মিলেমিশে শেষমেশ একটা ট্র্যাজিক গল্প হয়ে যায়। ফেসবুকে নোট হিসাবে লেখা গল্পটায় কিছুক্ষণ পর বেশ কয়েকজন বন্ধু মন্তব্য দেয় সুন্দর হয়েছে বলে। অনেক এবার রুনিকে লেখালেখির জন্য উৎসাহ ও দেয় । সবার বাহবা শুনে রুনি ঠিক খুশি হতে পারেনা, মনের কোথায় যেন ঠিক একটা কাঁটা বিঁধে থাকে। কারণ সে তো জানেই,এই গল্পটার গল্প হয়ে ওঠার পিছনের ভাঙন টুকু। 

 

সেই শুরু, তারপর কখন ও ছোটখাট কোন কবিতা, গল্প, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আর টুকরো টুকরো আবেগ মনের দরজায় উঁকি দিয়ে তুলে আনত রুনি নীল সাদার অধরা দুনিয়ায়। সেইখানে গল্পের চরিত্রের মত পাঠক দের ও কল্পনা করে নিতে হয় লেখকের। ইদানিং মাঝে মাঝে ব্লগেও লিখে রুনি। পনের বছরের সংসার জীবনটা প্রথমে সংসারটা নিজের করে নিতে, তারপর আলমের স্ত্রী হয়ে উঠতে আর তারপর মাহী রাহীর মা হয়ে উঠতে কিভাবে যেন ফুরিয়ে গিয়েছে। নিজের ভাল লাগা, মন্দ লাগা নিয়ে সবকিছু নিয়ে একান্তই রুনি হয়ে বেঁচে থাকাটা কখনো হয়ে ওঠেনি। এখন তার লেখার একেকটা চরিত্রের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করে প্রতিনয়ত।  নিজে যা করতে পারেনি, চেয়েও যা পায়নি , নিজের সৃষ্ট চরিত্রের মাঝে দিতে পেরে এক ধরনের বাঁধ ভাঙ্গার আনন্দ পায় রুনি। কয়েক মাসেই সেই কলেজ জীবন টা যেন কাছাকাছি চলে আসে। সেই নিছক ছেলেমানুষি, অজস্র স্বপ্নের আনাগোনা, আর নির্ভার নিজের একটা জীবন। লেখালেখির নেশা তাঁকে ভালমত পেয়ে বসলেআলমকে দুই একটা কবিতা শুনাতে গেলে আলম মজা করে বলত, " না বাবা। আমি খেটে খাওয়া মানুষ। এসব কবিতার কি ই বা বুঝি ।" তাই ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফির কাপে একলা বসে একটু একটু চুমুক দেয়ার মতই রুনি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে নিজের দ্বিতীয় সত্তাটাকে। 

 

একদিন একটা গল্পের মাঝখানে এসে আটকে যায় রুনি। কিছুতেই গিট্টু ছাড়াতে পারেনা। অনেকরকম ভাবে শেষটুকু চিন্তা করে কিন্তু কোনটাই পছন্দ হয়না, কেমন যেন হাস্যকর লাগে। এমন সময় অসময়ে বেল বাজে। দরজা খুলে দেখে আলম আগেভাগে চলে এসেছে অফিস থেকে। ঘরে ঢুকে আলম ফ্রেশ হয়ে খেয়াল করে রুনিকে চিন্তিত লাগছে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই রুনি বলে, " একটা গল্প অর্ধেক লিখে আটকে গেছি। আলম ভ্রু কপালে তুলে জিজ্ঞেস করে, " তুমি গল্প ও লেখ নাকি ? আমার ঘরে এতবড় একটা সাহিত্যিক লুকিয়ে আছে জানতাম না তো " আলমের তাচ্ছিল্য মাখা রসিকতায় রুনির মেজাজ খারাপ হয়। রুনি তখন ফেসবুক আর ব্লগের লেখাগুলো আলম কে দেখায়। আলম সেগুলো দেখার সময় কোন কথা বলেনা। তারপর রাগী গলায় বলে ওঠে, " ও! ল্যাপটপ কেনার তাড়া তাহলে এই কারণে !তুমি আধুনিক হচ্ছ! ইন্টারনেটে ব্লগিং আর ফালতু কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং লিখে রাতারাতি বেশ খানিকটা সস্তা জনপ্রিয়তাও পেয়ে গেছ দেখছি। এসব ছাড়। এই বয়সে এরকম ছেলেমানুষি মানায় না। সংসারে মন দাও। তাই তো বলি, দিন দিন রাহী মাহী এরকম বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে কেন । মায়ের মুক্ত মনের ছোয়া লেগেছে যে ! "

 

এই কথাগুলো শোনার সময় রুনি একটা ঘোরে চলে যায়। সে ঠিক শুনছে তো? আলম এই কথাগুলো তাঁকে বলতে পারল এইরকম কুৎসিত ভাবে? রুনি ভেবে পায়না, সে কি এমন করল যার কারণে এতদিনের পরিচিত আলমকে আজ অন্য রুপে দেখতে হল তাকে। ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে গিয়ে রুনি স্কুলের চাকরিটা যখন ছেড়ে দিল, তখন তো আলম একবার ও ভাবেনি এটা রুনির স্যাক্রিফাইস। ছেলেমেয়েরা স্কুলে চলে গেলে সময় কাটানোর জন্য রুনি যখন নিত্যনতুন রেসিপি,সেলাই, টিভি নিয়ে থেকেছে ঘরে ফিরে আলম তো কই একবার ও জিজ্ঞেস করেনি , " আজকের দিনটা খুব একলা লেগেছে, না?" এখন যখন রুনি নিজের মত করে লেখালেখি করতে চাইছে , তখন আলমের এরকম আচরনের কারণ কি ? ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে মিসেস আলম এখন "শায়লা আফরোজ রুনি" হয়ে উঠতে চাইছে, এটাই কি তবে আপত্তির মূল কারণ?

 

রুনি প্রথমে ভাবে আর লেখালেখি করবেনা। কিন্তু কয়দিন যেতেই তার কেমন যেন দমবন্ধ লাগে। মনে হয় তার কথা বলার অধিকারটুকু কেউ জোর করে কেড়ে নিয়েছে। সপ্তাহ খানেক পর রুনি এমনিতেই ফেসবুকে লগিন করে। দেখে ,মেসেজে তাকে জানানো হয়েছে তার একটা লেখা নামকরা একটা লিটল ম্যাগে ছাপানো হয়েছে। মাসখানেক আগে ওই লিটল ম্যাগের পক্ষ থেকে একটা গ্রুপ প্রতিযোগিতার জন্য লেখা আহ্বান করেছিল। রুনি একটা গল্প পাঠায় এবং গল্পটা প্রথম হয়েছে। পরের শুক্রবার রমনায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়া হবে আর সাথে থাকবেন ওই প্রতিযোগিতার আয়োজক, সঞ্চালক আর কয়েকজন নামী দামী লেখক কবি।

 

রুনি একবার ভাবে, লেখালেখি তো ছেড়েই দিবে, শুধু শুধু গিয়ে আর কি লাভ। আবার তার মনে হয়, 'আর কত মেনে নেয়া। সে লেখালেখি ছেড়ে দিলে এই সংসারের কিচ্ছু যাবে আসবে না। কিন্তু সারাজীবন ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়াতে হবে , যেটা আলমকে একসময় রুনির কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে।যে দেয়ালের মাঝে এতদিন সে স্বেচ্ছাবন্দী ছিল, সেই দেয়াল তাকেই ডিঙ্গাতে হবে। আর এই ভাঙ্গা দেয়ালের ধুলোবালিতে পথ কিছুটা নোংরা হয়ত হবে, কিন্তু তার পথটা রোধ হবেনা।  তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলে, শুক্রবার সে যাবে অনুষ্ঠানে আর লেখালেখি ও চালিয়ে যাবে।আবার বাচবে রুনি হয়ে।

 

এর মাঝে আলমকে এই কথা জানালে আলম কোন উৎসাহ দেখায়না, বরং বলে, " তুমি কি যাওয়ার কথা ভাবছ নাকি? এইসব পাগলামি বাদ দাও।"  মঙ্গলবারে রুনির ঠিকানায় ম্যাগাজিনের একটা কপি চলে আসে। গুপ্তধনের মত বারবার রুনি সেটা আলমারি থেকে বের করে আর ছুঁয়ে দেখে । আফসোস হয় তার এই অফুরন্ত আনন্দের অংশীদার যদি আলম ও হত !

 

শুক্রবার এলে বিকেলের দিকে রুনি রেডি হতে থাকে। আলম ঘুমাচ্ছিল। বের হবার আগে রুনি আলমকে ডেকে তুলে বলে, " বের হচ্ছি ।" আলমের চট করে মনে পড়ে যায়। কিছু জিজ্ঞেস না করেই রুনিকে বলে, " আমার নিষেধের চেয়ে তোমার কাছে তোমার ফালতু লেখালেখি বড় হল? কিচ্ছু বলার নেই, মনে রেখ, এর জন্য তোমাকে পস্তাতে হবে।"

 

 

রুনি একগাল হাসি দিয়ে বলে, " আসি, দেরি হয়ে যাচ্ছে।" বলে সে পা বাড়ায় সামনে। সামনে যে অনেক পথ......  

 

Share