ডেইলি প্যাসেঞ্জার - ২

লিখেছেন - সুষমা আপ্লুত | লেখাটি 757 বার দেখা হয়েছে

ইদানিং পাবলিক সবাই স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গেসে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সবাই চিরতার রস খাইয়া বের হয় কিনা কে জানে, তাদের কথাবার্তায় রস কসের বড়ই অভাব ! ভাবছিলাম আমার ডেইলি প্যাসেঞ্জার পর্ব ম্যালাদিন বীর বিক্রমে চালু থাকবে পাবলিকের অবদানে, কিন্তু সেই আশায় গুঁড়ে সুরকি মিশ্রিত বালি ! পাবলিক বাসে উঠলে এখন খালি কাইজ্জা করে, একটুও বিনোদন পাওয়া যায়না ! তারপর ও মাঝে মাঝে আখের মত ছেঁচা দিয়া কিঞ্চিৎ রস বের হয় বৈ কি !

 

পিচ্চি পাচ্চা আসলেই মারাত্মক। বছর তিনেকের এক বিচ্ছু পিচ্চি ( এইটা আমি হলফ কইরা কইতে পারি জন্মের সময় নিতম্বে দুইখান এক্সট্রা বান্দরের হাড্ডি নিয়া জন্মাইছে ) লাফাইতে লাফাইতে তার মা জননীর হাত ধইরা উঠসে বাসে । সামনের দিকে একটা সিটে বসছে তার মায়ের কোলে । আর পিছে বসা সব যাত্রীদেরকে একে একে সে ভেংচি কাটতে লাগল। নেহায়েত একদম পিচ্চি বলে কেউ আর গোসসা করেনা মনে হয়। আমি বসেছিলাম ঠিক তার পিছের সিটে। মায়ের সিট লাফায়ে পার হয়ে সে আমার ব্যাগ, ক্লিপ হাবিজাবি ধইরা টানাটানি করে এমন অবস্থা। আর কিছুক্ষন পর পর জিহ্বা বের করে বান্দরের সাথে সাদৃশ্য প্রমাণ তো আছেই। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে আমিও আমার জিহ্বা বের করে দেখানো ফরজ মনে করলাম। বেচারা পিচ্চি কতক্ষন ধরে ভাবতেসে আল্লাহর দুনিয়ায় সেই একমাত্র বান্দর যার লেজ পিছনে না থাইকা মুখের ভিতরে আছে ! আমি সহমর্মিতা দেখায়ে আমার জিহবাটাও তাকে বার কয়েক দেখায়ে দিলাম। কিন্তু বেক্কল পিচ্চি একটুও সান্ত্বনা পাইলনা। সে তার মাকে ডেকে আমাকে দেখায়ে দিল, আম্মু , আন্টি মারে !! বাস সুদ্ধা লোক পিচ্চির পিছনের সিটে আমার অবস্থান দেখে এই অভিযোগ সত্যি ভাইবা আমাকেও মনুষ্য সম্প্রদায়ের বহির্ভূত ঠাওরাল নিশ্চিত ! আর পিচ্চির মায়ের অগ্নিদৃষ্টিতে আমি বাসন মাজা ছাই তথা ভস্ম হব কিনা চিন্তা করতে লাগলাম ।

সাপ, ব্যাঙ, তেলাপোকা খাইলে মনে হয় মানুষ স্লিম হয় । এইটা আমার গবেষণা লব্ধ ফল। যে কয়েকটা চায়না বাস বাংলাদেশে আসছে,এইগুলার সিটের সাইজ দেখে আমি এই জ্ঞানার্জনে সক্ষম হইসি । একদিন বাসে উইঠা দেখি দেড়খানা সিট নিয়ে বসা এক মহিলার পাশে আধখানা সিট খালি আছে। আমার নিজেরি সোয়া খানা সিট লাগে। কেমতে আমি আধখানা সিটে বসব এইটা ভাবতেই ভাবতেই দেখি আরেকটা মেয়ে উঠসে বাসে। আমি সাথে সাথেই ওই আধখানা সিট বিশাল বপুর সিকিভাগ দিয়া দখলে নিলাম। তারপর বাকিটুকু খালি ইতিহাস ! এক একবার বাস মোড়া মারে আর না হয় রোলার কোস্টার টাইপ ফীলিংস আসে, আর আমার মনে হয় এই বোধ হয় আমি ভূপাত ধরণীতল থুক্কু বাসের মেঝে ! শেষমেশ আশপাশে চোখের কোণা দিয়ে তাকায়ে আমি পাশের দশাসই মহিলা কে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু তাকে ইঞ্চি খানেক ও নড়াতে না পেরে ক্ষান্ত দিয়ে মুখটা বাংলা পাঁচের মত করে আশপাশে কোন খালি সিটের সম্ভাবনা খুঁজতে থাকলাম। এই সময় ঠিক পিছনের কোণাকুনি একটা চ্যাংড়া পোলা সামনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল- ‘” মারো ঠেলা হেঁইয়ো ”

নিউ ভিশন বাসটার নাম নিয়া কয়েকদিন ব্যাপক গবেষণা করেও এই নামের সার্থকতা বের করতে পারিনাই। প্রথমে ভাবছিলাম, মনে হয় এই বাসে উঠলেই সবার ‘ভিশন’ নিউ হইয়া যায় ! কিন্তু এই বাসেই সব বাসের মত ক্যাচাল দেইখা এই তাৎপর্যের খেতা পুড়লাম। কিন্তু একদিন যথার্থই ছোটবেলায় বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষার সেই ইস্পিশাল উত্তরের শেষ লাইনের মত বুঝলাম যে, “নামকরণ সার্থক” ।  ঘটনা হইল, সামনের চারটা মহিলা সিটের একটাতে আমি উপবিষ্ট হয়ে দেশ ও জাতির কল্যানে আশেপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই মাঝামাঝি সিটে বসা এক পোলার দিকে চোখ গেল । হঠাত দেখি ডিপজলের মত ভিলেন হাসি মেরে ওমর সানীর মত এক চোখ টিপ মারল। বার তিনেক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে বুঝলাম,ছেলেটার এটা নতুন দৃষ্টি তথা নিউ ভিশন ! আমার পাশের সুন্দরী তরুণীর সেইদিকে বিরক্তি দৃষ্টি নিক্ষেপ দেখে বুঝলাম ঘটনার শিকার তাইলে এই সুন্দরী। আবেশ প্রক্রিয়ায় কি না বলতে পারিনা, এই নতুন দৃষ্টিতে সেই তরুণীও আবেশিত হইল । এডাম টিজিং নামক উঠতি ফ্যাশানে উদ্বুদ্ধ মাইয়া সেই পোলাকে বাস থেকে নামতে দেখেই জোরেশোরে হাক দিয়ে বলে উঠল, “ট্যারা ভাই ,ট্যারা ভাই, ভাল আছেন তো? ” ওই পোলা তার নিউ ভিশনের এহেন বিচ্ছিরি খেতাব পেয়ে একটু বেশি তাড়াহুড়া করেই নাইমা গেল ।

এই কাহিনী দেইখা চক্ষু সার্থক করার সৌভাগ্য আমার হয়নাই । আমার অতি আদরের অতি বাঁদর বোন ( সরি দিবামনি :P )এই কাহিনীর খলনায়িকা । ঢাকা থেকে মেহেরপুর একা একা বিশাল বাসযাত্রায় একবার তার পাশের সিটে অতি ডিস্টারবিং এক পোলা বসার পর পুরো জার্নিটা নাকি তার তামা তামা হয়ে গেসিল। সারা রাস্তা এইটা ওইটা জিজ্ঞেস করে, অং বং বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ লেকচার ছাড়ে আর খালি আজাইরা নিজের গুনগান গায়। ঘুমের ভান করেও নাকি দিবা পার পায়নি। অবশেষে দিবা ঠিক করে, এর বদলা সে নেবেই । পাটুরিয়া ঘাটের কাছাকাছি বাস পৌঁছালে দিবা ব্যাগ থেকে পানি বের করে খাওয়ার চেষ্টার নাম করে ঠিক পারফেক্ট এঙ্গেলে পোলাটার এক্কেরে জায়গা মত পানি ঢেলে প্যান্ট ভিজিয়ে দেয় যাতে কেউ দেখলেই মনে করে পোলাটা এক নম্বর করে ফেলসে ! দিবা নাকি একবার প্রস্তাব দেয়ার কথা চিন্তা করেও থাইমা গেসিল, ” আমি হিসু করিনাই” একটা কাগজে লিখে ওই পোলার গলায় ঝুলায়ে দেবে কিনা ! পোলাটা রাগে গজগজ করলেও বাকি রাস্তা নাকি দিবা শান্তিমত ঘুমাইতে পারসিল।

 

 

নিন্দুকেরা যাই বলুক, আবুল শব্দটার অবস্থান থাকা মানেই ঝামেলা, আমি এই কথা থোড়াই কেয়ার করে বীর বিক্রমে আমার কোম্পানির নুন খেয়ে মাঝে মাঝে গুণ গাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাইতাম ।কিন্তু সময় অসময়ের বাসযাত্রার ইতি টেনে যখন আমাকে দুম করে গরুর হাটে পাঠায়ে দিল, তখুনি বুঝসি আমার ডেইলি প্যাসেঞ্জার এর কুলখানির সময় হইসে !  ইয়ে মানে, গরুর হাটে পাঠাইসে মানে গাবতলী রেডিমিক্সের ফ্যাক্টরিতে বদলি কইরা দিসে !তারমানে প্রতিদিন মিরপুর টু মতিঝিল বাসযাত্রার আর সেই সাথে অদ্ভুতুড়ে অভিজ্ঞতার সলিল সমাধি ।  প্রথমদিন গাবতলী গিয়া আশপাশে যতদূর চোখ যায় ,কোথাও লাল রঙের মিক্সার প্ল্যান্টের সাইলোর নাম নিশান দেখতে না পেয়ে গরুর হাটের কাছে এক রিকশা নিলাম। অটো রোলার কোস্টার টাইপ ফীলিংস আসা সু (!) মসৃণ রাস্তায় শরীরের সব কলকব্জা ঢিলা করে নদীর ধারে যখন লাল রং এর সাইলো দেখতে পাইলাম, তখন বত্রিশ ওয়াটের এনার্জি সেভিং বাল্বের মত মুখ ঝলমল করে উঠল। সেই আলোতে চোখে ধাঁধা লেগেই মনে হয় ব্যাটা রিকশাওয়ালা হ্যাচকা টানে ঢালু তে নামার সময় রিকশা সুদ্ধা ভূপাত ধরনীতল। সিমেন্ট মাখা সাদা কাদা, পাথর সবকিছুর অব্যর্থ মিক্সিং কম্বিনেশনে আমার চেহারা যে যথেষ্ট খোলতাই হইছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা ! সেই সাথে এইটাও বুঝলাম, রাস্তার অভিজ্ঞতা আমার কখনই সুবিধার না বেশি !

 

তবে এই গরুর হাটে আসার আগ পর্যন্ত যা দুই একটা অভিজ্ঞতা হইসিল, সেইগুলাও ফেলনা না । একবার বাসে আমার সামনের সিটে এক পিচ্চি অনেক ক্ষণ ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করেই যাইতেছিল। রাস্তার পাশে কোন দোকানে lays চিপস দেখে বলা শুরু করল, " আম্মু, লেজ খাব " । পিচ্চির মা একেবারে থ। চোখ কপালে তুলে জিগাইল, কি খাবি? পিচ্চি আবার কয়, লেজ খাব । পিচ্চির মা আবার জিজ্ঞেস করে, ভাল করে বল, বুঝি নাই কি খাওয়ার কথা বললি । পিচ্চি তখন বাস সুদ্ধা কাপায়ে চিল্লায়ে বলল, বলসি না লেজ খাব লেজ খাব লেজ খাব  !!!

 

বনানীর সামনে থেকে এক স্টাইলিশ মেয়ে উঠসে বাসে। আমার পাশের সিটের যাত্রী নেমে যাওয়ায় মেয়েটা পাশেই বসছে। কিছুক্ষণ পর মোবাইলে কল আসছে। মেয়েটা রিসিভ করার পর, " বেইবি, বাসে একটা সিট পেয়েছি। উফ, এত রাশ ! ওয়েট, আম কলিং ব্যাক। পোলাটারে হোল্ড এ রেখে কল রিসিভ করে আরেকটা। বলতেসে, " হ্যাঁ আম্মু, দেরি হবে, অত চিন্তা কইর না তো। রাখতিসি । " তারপর আবার পোলার সাথে কথা শুরু। দেন বেইবি, বল , তুমি আজ আমাকে বাসায় ড্রপ করলে কি হত ! নটি বয় ! ব্লা ব্লা ব্লা..................... অনেক ক্ষণ কি ভ্যাজর ভ্যাজর করসে শুনিনাই কিন্তু ইংলিশ বাংলা জগাখিচুড়ি শুইনা কানের উপ্রে যেই অত্যাচার চলতেছিল তার বদলা হিসাবে ঠাটায়ে একটা চড় মারার জন্য হাত চুলকাইতেছিল। হঠাত শুনি, মেয়েটা কয় কি , বেইবি, নো , কুটুকুটু বেবি, লাগ কলে না, কান্না কলে না, জানুটা সলি ( সরি) ।এইদিকে সিটের পাশে দাঁড়িয়ে হেল্পার অনেকক্ষণ ধরে টিকিট দেখতে চাইতেছে। মেয়েটার সেইদিকে কোন খেয়াল ই নাই। ঠিক ওইসময় হেল্পার বলে উঠসে, আপা, বাচ্চার কান্দন থামানু হইলে টিকিট টা দিয়েন !

 

লেগুনায় উঠে এক পিচ্চি ম্যালাক্ষন মায়ের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতেসে যে সে সিটে বসবে, তার মা কিছুক্ষণ ভালমত বুঝাইছে পরে রেগে গিয়ে বলে, চুপ করে থাক্ক বান্দর ! আর আরেকটা কথা বললে থাবড়া মেরে বাট্টু বানায়ে দিব। পিচ্চি ধমক খেয়ে বাংলা পাঁচের মত মুখ বানায়ে মায়ের কোলে ঝুলন্ত অবস্থায় বসে আছে । এমন সময় এক লম্বা লোক লেগুনায় উঠতে গিয়ে মাথায় দড়াম করে বাড়ি খাইসে। সবাই ভিতরে বলাবলি করতেসে, আহারে ভাই, লম্বা মানুষ কি আর করা । পিচ্চি তখন দুম করে ওর মাক এবলে, আম্মা এই লোকটাকে পিটায়ে বাট্টু বানায়ে দিতা , তাইলেই আর মাথাত বাড়ি খাইত না  । পিচ্চির এই মহান সমাধানে অবশ্য লম্বা লোকটার মুখ শুকায়ে আমসি হয়ে গেছিল । এত সহজ সমাধান তার মনে ধরেনাই, বলাই বাহুল্য !

 অফিস টাইমে এমনিতেই সবার তাড়াহুড়া , এরকম সময়ে যদি বেরসিক ট্রাফিক পুলিশ বাস থামায়ে গাড়ির কাগজপত্র, ড্রাইভারের লাইসেন্স, মেইনটেন্যান্সের কাগজ দেখতে চায়, পাবলিকের মুখ ছোটাই স্বাভাবিক। কিছু পাবলিক আবার এক কাঠি উপ্রে। নিজের ভাড়া এক টাকা বেশি দিবেনা আইন দেখাবে কিন্তু হেল্পার কে তাগাদা দিতেসে পুলিশের পকেটে ৫০ টাকার নোট গুজে দেবার জন্য । হেল্পার ও বুঝসিল তার কাগজ পাতি সুবিধার না , তাই সেও পাবলিকের সমর্থন পাওয়া মাত্র ভাড়া থেকে ৫০ টাকার একটা নোট নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে পকেটে হাত ঢুকায়ে দিসে। পুলিশ ঘটনা বুঝে হাসি দিয়া নাইমা গেছে । এইবার হেল্পার গাড়ি ছাড়ার পর হাসতে হাসতে  গড়াগড়ি অবস্থা। কিছুক্ষণ পর পর গড়াগড়ি দিয়ে হাসে। ড্রাইভার জিগায়, কি হইসে বল দেখি ব্যাটা ?তখন থিকা মৃগী রোগীর মত হাসতে আছস।  হেল্পার পকেটে হাত দিয়ে একটা দুমড়ানো মুচড়ানো ১০০ টাকার নোট বের করে দেখায়ে ড্রাইভার কে কইতেসে, পুলিশের পকেট থেকে মারসি। ৫০ টাকা ঢুকাইতে গিয়া ১০০ টাকা বের কইরা আনসি । চোখের সামনে চোরের উপ্রে বাটপারির এতবড় উদাহরন বাস সুদ্ধা পাবলিক ইহজনমে আর দেখসে কিনা সন্দেহ !

 

Share