দিনযাপনের গল্প

লিখেছেন - সুষমা আপ্লুত | লেখাটি 823 বার দেখা হয়েছে

নানাই,নানাই আমাকে আরেত্তু মিত্তি দাও। আধো আধো বোলে পায়েসের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দেয় আমার তিন বছরের নাতনী মীম। এইটা আমার একেবারে কলিজার টুকরা। এখনো ঠিকমত সব কথা বলতে পারেনা, আমাকে নানাই বলে ,পানিকে মানি আর ওর চেয়ে দশ  বছরের বড় ভাইয়া কে তাইয়া । কোলের মধ্যে এই সাদাপরী কে নিয়ে শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়েই সারাটা দিন পার করে দিতে পারি। এবার মীম আর মাহিন টা আমার কাছে আসল অনেকদিন পর। এই যুগের সবকিছুই কেমন যেন। স্কুলে যাওয়ার সময় পিঠের মধ্যে বিশাল একখান বইয়ের বস্তার ভারে যেমন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে গুলোর ঘাড় বাঁকা হওয়ার অবস্থা , পড়ালেখার চাপ ও তেমনি। তাই বছরে একবার ঈদের ছুটি ছাড়া ওরা বাড়িতে আসার তেমন সুযোগ পায়না। ওরা আমার বড় মেয়ের ছেলে মেয়ে। আমার আপন বলতে এই মেয়ে,জামাই নাতি নাতনী আর ছোট ছেলে,ছেলে বউ। ছোট ছেলেটা বছর খানেক হল বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। দেশে ফেরার বোধ হয় আর সম্ভাবনা নেই। এখনো সোজা সাপটা কিছু বলেনা,কিন্তু আমি জানি ,ফেলে যাওয়া পথ ধরে ফিরে আসার মানুষ বড্ড কমে গেছে।

 

আমি মানুষটা একটু বেশি বকবক করি।আগেও করতাম কিনা জানিনা।কিন্তু বয়স বাড়লেই নাকি মানুষ বেশি কথা বলে,তাই এই রোগ টা মনে  হয় ভালোমতই আমাকে ধরেছে। মাহিন আর মীমের নানা টার  উপর মাঝে মাঝে খুব রাগ লাগে।বছর তিনেক আগে তার কি এত তাড়াহুড়া লাগছিল ওইপারে যাওয়ার জন্য কে জানে ! স্বার্থপর একটা লোক ! সারাটা জীবন মুখে না বলে দিলে নিজে থেকে কিছু বুঝে নিলনা।আর এই জন্যই বোধ হয় আমাকে একা করে চলে যাবার আগে একবার ও ভাবেনি আমার কি হবে ।

 

হঠাৎ সম্বিত ফিরল মীমের চিল চিৎকারে । মেয়েটা এতটুকুন দেখতে হলে কি হবে ! গলায় যা জোর আছে ,তাতে পাড়াসুদ্ধ লোক এক জায়গায় করে ফেলতে পারবে একটা পেল্লাই চিৎকারে। ওর চিৎকার শুনেই দে ছুট। কাছে গিয়ে দেখি, মীম কে মাহিনের কোলে দিয়ে ওর মা একটু বেরিয়েছে দেখে চিৎকার জুড়েছে। ইস...মা ছাড়া কিচ্ছু বুঝেনা মেয়েটা। ওর মামাটাও এরকম ই ছিল ছোটবেলায়। হুট করে অনেকদিন আগের একটা দৃশ্য আমার মাথায় খেলে গেল।আমি তখন সবে একটা নতুন চাকুরীতে ঢুকেছি। নয়টা -পাঁচটা অফিস। সকালে বাসার চাবি আর ছোট ছেলে আরিফ কে পাশে দূর সম্পর্কের এক চাচীর বাসায় রেখে বড় মেয়ে আফসানাকে স্কুলে পৌঁছায়ে  দিতাম,তারপর যেতাম অফিসে। কিন্তু সারাক্ষণ  মন পড়ে থাকত বাড়িতে। ছেলেমেয়ে দুইটা খাইছে কি না ঠিকমত, বেশি ছুটাছুটি করতে গিয়ে পড়ে ব্যথা পেল কিনা এইসব আকথা কুকথা সারাক্ষণ  মাথায় ঘুরপাক খেত আর আমি বাংলা পাঁচের মত একটা মুখ নিয়ে অফিসে বসে থাকতাম। অফিসে অনেক কলিগ ই সামনাসামনি আমাকে ফোঁড়ন কাটত, আল্লাহর দুনিয়ায় আর কোন মহিলা বুঝি ছেলেমেয়ে রেখে চাকরি করেনা ! এইভাবে চলতে চলতে ঠিক উনিশদিনের মাথায় যখন অফিস থেকে ফিরে বাসায় ঢুকতে যাব,  দেখি মেইন গেটের সিঁড়িতে ছয় বছরের আফসানার কোলে আরিফ কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে, আর বলছে আম্মু যাব,আমার খিদা লেগেছে। পাশের চাচীরা ওকে খাওয়ানোর অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু আরিফের জেদ,আমার কাছে খাবে। অত্তটুকুন একটা ছেলেকে অভুক্ত রেখে আমি লোকের অফিসে কামলা খাটছি,এই চিন্তা করতেই আমার বুকটা হাহাকার করে উঠল।পরদিন থেকে চুলোয় গেল চাকরি বাকরি আর দুনিয়ার যতসব। আরিফ স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর অবশ্য বাচ্চাদের জন্য নিজেই একটা স্কুল করেছিলাম ছোটখাট ।

 

পাঁচটা দিন কোন দিক দিয়ে যে কেটে গেল,বুঝতেই পারলাম না। আজ আবার মাহিন মীমরা ঢাকায় ফিরে যাচ্ছে,নিজেদের বাড়ি। আবার আমার সেই একলা দিনরাত আর একলা প্রহর। ছেলেমেয়েদের বাবা চলে যাওয়ার পরপর এই বাড়িতে থাকলে দম বন্ধ লাগত। যেইদিকেই যেতাম ,খালি মানুষটার রেখে যাওয়া চিহ্ন। বাড়ির সামনের ফল গাছগুলা, পিছনের সবজি বাগান , আর ঘর ভরতি অগোছাল জমে থাকা জিনিস পত্র। ভুলেই যেতাম, মাঝ রাত্তিরে চটি পরে শব্দ করে হেঁটে হেঁটে সারা বাড়ি একবার চক্কর দেয়ার কেউ নেই , সকাল হলেই রাজ্যের উদ্ভট কাজ নিয়ে আমাকে বারবার তাড়া দেবার কেউ নেই। সে যাকগে সেসব কথা। উনি চলে যাওয়ার পর বড় মেয়ের বাসায় গিয়ে থেকেছিলাম বেশ কিছুদিন । অনেকটা জোর করেই আফসানা আর জামাই নিয়ে গিয়েছিল আমাকে।  মাস দুয়েক যাবার পর মাহিনের জন্মদিন এসে গেল । বাসায় সবার দাওয়াত। লোকজনের গিজগিজ অবস্থা । সারাদিন রান্নাবান্না করে আমি গিয়ে একটু শুয়েছিলাম আমার থাকার ঘরটায় । হঠাৎ শুনলাম ,পাশের ঘরে  আফসানার শশুরবাড়ির লোকজনের কথা বার্তা । একটা কথা কানে এল, আফসানার ফুপু শাশুড়ি হাসতে হাসতে আমার মেয়ে জামাই কে জিজ্ঞেস করছে,কিরে বাবা রিয়াদ, তোর ওই ঘরটা  কি শাশুড়ির কাছে সাবলেট দিলি নাকি ? এরপর আমার জামাই কি বলল ,আমার বেয়াই বেয়ান কি বলল ,কিচ্ছু জানিনা আমি। শুধু বুঝেছিলাম, পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকার জন্য তো আমি জন্মাইনি ! পরদিন ই ভোরবালা সোজা আমার এই বাড়িতে,যেইখানে প্রাণ ভরে আকাশ দেখা যায়, প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেয়া যায়, একবেলা না খেলেও খোঁজ করার কেউ নাই বা থাকল, তবুও তো বাঁচা যায় নিজের মত ।

 

 প্রথম প্রথম আরিফ নতুন চাকুরীতে ছুটি নিয়ে প্রায় ই  ই ছুটে  আসত আমাকে দেখার জন্য। বলত, ব্যাচেলর ফ্ল্যাট ছেড়ে নিজে ফ্ল্যাট নেয়ার সামর্থ্য হলেই আমাকে নিয়ে যাবে ।এতেই আমার দুচোখে আনন্দের জল জমত,গোপনে গোপনে স্বপ্ন ও বুঝি দেখতাম এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি পাবার।  কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। বছরখানেক পর আরিফ বিয়ে করল নিজের পছন্দের এক ক্লাসমেটকে। মাস খানেক যেতে না যেতেই আমাকে জানাল, ওদের দুজনের ই ভিসা হয়ে গেছে,চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। আমি আমার ছেলেমেয়েদের কখনই ইচ্ছের বিরুদ্ধে  কোন কাজ করাইনি ।এবার ই বা তার ব্যতিক্রম কেন হবে ! "শেষমেশ নেই, তোর কেউ নেই"  গানের মত আমি আবার একলা এই বাড়িতে ।

 

এবার আমি এই একাকীত্ব কাটানোর জন্য স্কুলে বেশি সময় দিতে লাগলাম। সারাদিন গাদা গাদা ছেলেমেয়ের মায়া মায়া চেহারার দিকে তাকিয়ে আর ওদের শৈশবের প্রানোচ্ছ্বাসে দিন যায় রথের পিঠে চেপে, বেশ ভালই কাটে দিনগুলো । মাঝে মাঝে সময়টা যে থমকে যায় না , তা না। ভাত ঘুম আচমকা ভেঙ্গে গেলে বিকেলের গা বেয়ে চুইয়ে পড়া বিষণ্ণ রোদে একাকীত্ব টা খুব বেশি পীড়া দেয় । প্রবল জ্বরের ঘোরে মনে হয়,কেউ যদি একটু তপ্ত কপালে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিত ! আর সন্ধ্যা নামলে ঝিঁঝিঁর ডাকে মফস্বলের এই পাড়া টা যখন নিঝুম হয় , এ ঘর ও ঘর ঘুরে এসে বিছানায় একা পড়া থাকা টা বড্ড অসহায় লাগে।ছেলেমেয়েরা যখন আগে স্কুলে যেত, বিকেল হলেই ওদের ফিরে আসার অপেক্ষায় বসে থাকতাম বারান্দায়। এখনও ইজি চেয়ারটায় একইভাবে বসে থাকি, পার্থক্য শুধু এটুকুই যে অপেক্ষাটা নেই । মাঝে মাঝে বড্ড অভিমান হয় , নিজের উপর, আমাকে ছেড়ে যাওয়া ওই মানুষটার উপর ,ছেলেমেয়েদের উপর ও হয় বই কি! সবথেকে বেশি অভিমান হয় বোধ হয় ওই ঈশ্বরের উপর।

 

এই অভিমানটাও মাঝে মাঝে ফিকে হয়ে যায় । খুব সকালে এসে এক ছেলের বাবা যখন কমপ্লেইন করে,"আপা,আমার ছেলেকে নিষেধ করেন তো আর যেন গাছে না ওঠে।" জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই ছেলেটার বাবা জানায়," কাল আপনার জন্য কদম ফুল পেড়ে নামার সময় হাত পিছলে সারা গা ছিলে গেছে। পিছনে দাঁড়ানো ছেলেটি তখন অপরাধী মুখ করে একগোছা কদম সুতো  দিয়ে বেঁধে আমার হাতে দেয়,ওই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয় অথবা নার্সারি ক্লাসের ছোটখাটো যেই মেয়েটা ক্লাসে ঢুকার আগে মায়ের আঁচল ছাড়তে চায়না, টিফিন পিরিয়ডে এক ছুটে ওই লাজুক মেয়েটিই যখন আমার হাতে একটা পেয়ারা দিয়ে পালায়,তখন আসলেই মনে হয়, বেঁচে থাকাটা মন্দ নয়।

 

হিসাবের বাইরের এই ভালবাসাতেই চলে আমার দিনযাপন, হিসাবের মধ্যেকার সুখটুকু না হয় বাকি ই থাক আজীবন। স্বপ্নরা ফুরিয়ে গেলে নাকি মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও থাকেনা ,কে জানি কতটুকু সত্যি ! স্বপ্ন বোধ হয় না থাকাই ভাল, স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট টা যে কি পরিমাণ মারাত্মক তা একটু আধটু বুঝতে শিখেছি । এখন আর স্বপ্ন দেখিনা আমার একমাত্র ছেলে ফিরে আসবে,স্বপ্ন দেখি না প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির  রাতে আমার নাতি আমার বুকে মুখ লুকিয়ে চড়ুই ছানার মত আশ্রয় নেবে, সেই ছোটবেলার মত মার খেয়ে চোখের জলে নাকের জলে একাকার করা আরিফ আর আফসানার অভিমান ভাঙ্গাতে ওদের প্রিয় সব খাবার রান্না করব অথবা আরিফ ভার্সিটিতে পড়ার সময়কার মত আমাকে না জানিয়ে কোনদিন আমার সামনে এসে চমকে দিয়ে বলবে- " আম্মু ,সারপ্রাইজ " !!! পুরানো এ্যালবামের ছবিগুলা একটা নিথর সময়ে বন্দী ই পড়ে থাকে চোখের সামনে।

 

 চলে যাওয়ার সময় এবার মীম আমার গলা জড়িয়ে চুপি চুপি বলেছিল, "নানাই নানাই,তুমি এলকা এলকা ভয় পেওনা, আম্মু মারলে আমি পালিয়ে তোমার কাছে চলে আসব।তখন আর তুমি ভয় পাবেনা । " তিন বছরের মীম রা জানেনা, একলা বেঁচে থাকা এই আমাদের ভয় পেতে নেই, পঞ্চান্ন পেরুনো এই ছানি পড়া চোখে স্বপ্নেরা আসতে ভুলে যায়, পথ হারায় বোধ হয়, স্বপ্ন হীন চোখেই নিরন্তর অপেক্ষায় থেমে থেমে চলে আমাদের  নিঃসঙ্গ দিনযাপন।

 

Share