মাঝরাতের প্যাসেঞ্জার

লিখেছেন - বিকেল চড়ুই | লেখাটি 1778 বার দেখা হয়েছে

রাস্তাটা এবড়োখেবড়ো ।
রিকশাওয়ালা উল্কার বেগে রিকশা চালানোর প্রতিজ্ঞা নিয়েছে সম্ভবত । সাজ্জাদ ঝাঁকুনি খেতে খেতে ভাবছিল বাড়ি পৌঁছানোর আগে গায়ের হাড়গোড় আস্ত থাকলে হয় !

রাত বাজে আড়াইটা । এত
রাতে রিকশার প্রতিটা ঝাঁকুনি যে পরিমান বিকট শব্দ তৈরি করছে তা আর কিছুক্ষন চলতে থাকলে গাঁয়ের লোকজন ঘুম ভেঙ্গে উঠে আসবে লাঠি সোটা নিয়ে ।

এক পাশে ছোট একটা খাল অন্য পাশে ধানী জমি ।
মাঝে শিমলতা ,সুপারি,নারকেল গাছ আর বুনো ঝোপঝাড়ে ছাওয়া কাঁচা পাকা রাস্তা ।
ঝিঁঝিঁ ডাকছে ক্লান্তিহীন ।

রিকশার টিমটিমে হ্যারিকেনের আলো আর সাজ্জাদের হাতে ধরা টর্চটার আলো নিশুতি রাতের আঁধার কাটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে ।
রিকশাওয়ালা জোয়ান মরদ । গায়ে জোর আছে বেশ । খুব দ্রুত তালে প্যাডেলে পা চালাচ্ছে । একটু কেমন যেন । সরকার
বাড়ির দক্ষিনে নাকুন্দপাড়া কমসে কম দশবার বলার পর তারপর রিকশাওয়ালা চুপচাপ মাথা হেলিয়ে রিকশায় ওঠার ইঙ্গিত করেছে ।

সরকারবাড়ির সামনে আসতেই
একটা দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো সাজ্জাদ । কত দিন পর এই
দৃশ্যটা দেখছে সে ! ছোটবেলায় একদিন বাবার হাত ধরে গভীর রাতে হাট থেকে ফেরার সময় ঠিক এই দৃশ্যটা দেখে সে থমকে দাড়িয়ে গিয়েছিল ।

বিশাল দীঘির একূল ওকূল
চোখে পড়েনা । শ্বেত
পাথরে বাঁধানো ঘাট ।
মাঝদীঘিতে একরাশ শাপলা ফুটে আছে ।
শাপলাবন ঘিরে হাজার হাজার
জোনাকের নাচের আসর । দীঘির
অন্ধকার জলে ফোটা ফোটা জোনাক আলোর
ছায়া । নিশুতি রাতের হিম বাতাসে তিরতির
করে কাঁপছে দীঘির কালো জল ।
মনে হচ্ছে আকাশের সব নক্ষত্র জলের মায়ায় দীঘিতে নেমেছে ।
তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিল সাজ্জাদ ।


ব্যাগটায় হাত বুলিয়ে তৃপ্তিতে চোখ মুদল ও । আজ চাঁদ উঠলে পরশু ঈদ
। ছেলেটার জন্য সোনালি সুতোয়
বোনা পাজামা পাঞ্জাবি আর আয়েশার জন্য শাড়ি আলতা চুড়ি । শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনের জন্যেও অনেক কিছু কিনেছে ।

সারাদিনের ক্লান্তিতে গা ভেঙ্গে আসতে চাইছে ওর ।
। ঢাকা থেকে দিনাজপুর সহজ
জার্নি নয় ।
একটা বেসরকারি ফার্মে চাকরি করে সাজ্জাদ ।
। দিনরাত গাধার খাটনি । বেতনও অত বেশি নয় ।

সাতপাঁচ ভাবছিল । গোরস্থান
ঘেষে যাওয়ার সময় বাবা মায়ের
কবরের বেড়াটা চোখে পড়ল ওর ।
একটু বিমর্ষ হয়ে গেলো সাজ্জাদ ।
গতবছর মা একটা শাড়ি চেয়েছিল ।
সাদা শাড়ি । সাজ্জাদ সবার জন্য
কেনাকাটা করেছিল সেবার । ওর
শালা সম্বুন্ধী শ্বশুর শাশুড়ি সবার জন্য
। শুধু মায়ের শাড়িটা কিনতে বেমালুম
ভুলে গিয়েছিল ।সেই ঈদের দুদিন পরেই মা মারা গিয়েছিলেন । কাফনের সাদা কাপড়ে জড়ানো মায়ের পা ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল সাজ্জাদ ।

একটু ঝিম ধরেছিল । রিকশার তীব্র ঝাকুনিতে সচকিত হলো সে। হঠাত্ খেয়াল হলো ওর একটু যেন বেশিই নীরব হয়ে গেছে আশপাশ । গা ছমছম করা নিস্তব্ধতা নেমেছে রাস্তা জুড়ে ! ঝিঁঝির ডাক থেমে গেছে ।
একটু গা শিরশির করে উঠল বিনা কারনে আর টর্চটা শক্ত হাতে আকড়ে ধরল সাজ্জাদ ।

কি ভেবে পিছন ফিরল ও ।

রিকশার হুডের ফাঁক দিয়ে ফেলে আসা রাস্তাটার দিকে তাকাল ও ।
চমকে উঠে চোখ বড় বড় হয়ে গেল সাজ্জাদের !

অন্ধকার রাস্তাটা ধরে পুরো শরীরে সাদা কাপড়ে জড়ানো একটা মানুষ প্রবল বেগে দৌড়ে আসছে ।সাদা কাপড় হাওয়ায় উড়ছে ।

অপার্থিব সেই দৃশ্য দেখে
সাজ্জাদের গলা শুকিয়ে গেল । প্রচন্ড ভয় পেয়ে সামনে ফিরল ও ।

কাঁপা কাঁপা স্বরে একটু চেঁচিয়ে উঠল , ও ভাই একটু তাড়া তাড়ি চালান !

রিকশাওয়ালা নির্বিকার ।যেন শুনতেই পায়নি ।

পিছন রাস্তা থেকে কে যেন
মায়াবী কন্ঠে ধীর স্বরে চিত্কার
করে ডেকে উঠলো ,
'খোকা ও খোকা আমার জন্য কিছু
আনিসনি ?
একটা সাদা শাড়ি ? গতবছরও
আনলিনা ..

সাজ্জাদ থরথর করে কেঁপে উঠলো ! এই কন্ঠ সে চেনে ! জন্ম
থেকে শুনে এসেছে ! এ তার মায়ের কন্ঠ !

রিকশা প্যাডেলের ক্যাঁচকোঁচ শব্দ হচ্ছে অবিরাম !
"ও ভাই একটু শুনেন কে যেন
আসতেছে একটু
তাড়াতাড়ি চালান" ,সাজ্জাদ কম্পিত স্বরে রিকশাওয়ালাকে ডাক দেয় ।
রিকশাওয়ালা পিছন ফেরেনা ।
রিকশা ঝাঁকুনি খেতে খেতে চলেছে আগের মতই !
একটা নিশাচর পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল । বুনো লেবুর গন্ধ ভেসে আসছে ।

আচমকা পিঠের উপর ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ ! সাজ্জাদ
শিঁরদাড়া সোজা করে স্থির হয়ে গেল !
কানের কাছ বেয়ে ঘামের ফোটা টপ টপ ঝরতে শুরু করেছে ।
ভয়ে আতংকে বোধশুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল ওর ।

হিমশীতল স্পর্শটা ওঠানামা করছে ওর পিঠের উপর ,যেন কেউ আদর করে হাত বোলাচ্ছে ওর পিঠে ।
"ও খোকা মানিক আমার" , ওর মায়ের কাতর কন্ঠটা ফিসফিস করে বলছে , "
আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা ,আমার জাদুর কপালে টিপ দিয়ে যা !খোকা আমার ,লক্ষী আমার , বাছা আমার এখনো খাসনি ? আমার সাথে চল মাছের মুড়ো রেঁধে খাওয়াব তোকে । কবরে শিয়াল বাসা বেঁধেছেরে আমি ঘুমাতে পারিনা বাছা ।
শাড়ি এনেছিস খোকা ? একটু দেখি ? ও
খোকা .. তোর বাবার ও খুব কষ্ট হয় তোকে না দেখে । আয় খোকা একটা চুমু দিই তোর কপালে .. পিছ ফির .. খোকা ..
ও খোকা ..

আতংকে দিশেহারা সাজ্জাদ শক্ত
করে টর্চটা আকড়ে থরথর কাঁপতে থাকে ।
ফিরবেনা ফিরবেনা করেও পিছ
ফেরে ও। যেন কেউ জোর করে ওকে পিছন ফিরালো !

রিকশার হুডের ফাঁকে ঘোমটা ঢাকা একটা মাথা আবছা অন্ধকারে মুখ বাড়িয়ে রেখেছে । জ্ঞানহারাবার প্রাকমুহুর্তে কপালে একটা শীতল ঠোঁটের স্পর্শ টের পেল সাজ্জাদ !

নাকুন্দপাড়ার বাজারে একটা দোকান তখনো আধখোলা ছিল । দোকানি দোকান গুছিয়ে মাত্র ঘুমানোর পায়তারা করছিল ।
রিকশাওয়ালা করিম বিরক্ত
হয়ে অজ্ঞান পেসেঞ্জারটাকে দোকানে নিয়ে এসেছে ।
সে কানে কম শুনে ।
পেসেঞ্জারটা খামাখা একটু আগে জোরেসোরে চিক্কুর পেড়ে রিকশা থেকে ফাল মেরে বেহুঁশ হয়ে গেছে ।
টর্চলাইট ভেঙ্গে হাতে কাঁচের
টুকরো গেঁথে
রক্তারক্তি কান্ড !

করিম বিরক্ত হয়ে গালি দেয় গোটা দশেক ।
মহামুসিবত !

Share