তুলতুলের এডভেঞ্চার

লিখেছেন - সত্যজিৎ রায় | লেখাটি 795 বার দেখা হয়েছে

একমনে গোল একুরিয়ামটায় রাখা ছোট্ট গোল্ডফিসটার ছোটাছুটি দেখছে তুলতুল। মনটা ভীষণ খারাপ ছোট্ট তুলতুলের আর তাই কিছুই করতে ইচ্ছে হচ্ছে না ওর। এজন্য কিছুক্ষণ পর পর ড্রয়িংরুমে এসে সে গোল্ডফিসটা দেখছে। মাছটা খুব প্রিয় ওর,গত জন্মদিনে বাবা উপহার দিয়েছিলো ওকে। তুলতুলের সাথে মিলিয়ে নাম ও দিয়েছিলো একটা “চুলবুল”। বাবা টা ভীষণ দুষ্ট,আপনমনে বলতে বলতে হেসে উঠে তুলতুল। একটু পরেই আবার মন খারাপ করে মুখটা গম্ভীর করে ফেলে। আর মাত্র তিন দিন পরেই ওর জন্মদিন।

পাক্কা পাঁচ বছরে পা দিবে ছোট্ট তুলতুল। অথচ মা বাবার সাথে ঝগড়া করে তুলতুলকে নিয়ে দাদু বাড়ি চলে এসেছে। বাবা আর মাকে এ সময়টাতেই কেন এমন ভয়াভয় ঝগড়া টা করতে হল তা ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না তুলতুল।

 

অনিন্দিতা আর রজত, তুলতুলের বাবা-মা, ভালবেসেই বিয়ে করেছে দুজন। প্রায়ই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয় ওদের আর তারপর কথা বন্ধ হয়ে যায়। তুলতুলের ভাষায়,আড়ি হয়ে যায় দুজনের। কিন্তু পরদিন সকাল হতেই একে অপরকে স্যরি বলে ঝগড়া মিটমাট করে নেয়। তুলতুলের ভাষায়,আড়ি থেকে দুজনের আবার ভাব হয়ে যায়। কিন্তু এবার যে কি হলো কিছুই বুঝতে পারছে না তুলতুল। মা’টা বাবার সাথে আড়ি দিয়ে একেবারে দাদুর বাড়ি চলে এলো!

 

বাবাকে ছাড়া কিভাবে এবার জন্মদিন করবে ও! বাবা কে ছাড়া কি জন্মদিন হয়! ভাবতেই ওর চোখে পানি চলে আসছে। কিছু তো একটা করতেই হবে,তবে কি করবে সেটাই বুঝতে পারছে না তুলতুল। মা’টা এমনিতেই অনেক কান্নাকাটি করেছে,তার উপর এখন কিছু বলতে গেলে যদি মাইর দিয়ে বসে! সেই ভয়ে মাকে কিছু বলার সাহস পায় না তুলতুল। একমাত্র মাহি ই কোনো একটা উপায় বলে দিতে পারবে। মাহি তুলতুলের বেস্ট ফ্রেন্ড,আর তাছাড়া মাহি ক্লাসের সবচেয়ে স্মার্ট গার্ল হিসেবে পরিচিত তাই ওর উপর ভরসা করা যায়। আগামীকাল স্কুলে গিয়েই এই ব্যাপারে মাহির সাথে একটা মিটিং করতে হবে,মনে মনে ভাবে তুলতুল।

 

এই ভাবনা নিয়েই সেদিনকার মতো শান্ত মনে ঘুমাতে যায় তুলতুল। পরদিন স্কুলে গিয়ে এসেম্বলিতেই তুলতুল মাহিকে বলল ‘জরুরী মিটিং আছে টিফিনের সময় ক্লাসে থাকিস’। মাহি খুব বিচক্ষনের মতো হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। তারপর সকালের ক্লাস শেষ করে দুজনে টিফিন পিরিয়ডে মিটিং এ বসে। সবকিছু শুনে মাহি বলল, “হুম বুঝলাম। মনে হচ্ছে একটা মাস্টারপ্ল্যান বানাতে হবে আর এজন্য নিরিবিলিতে বসে একা চিন্তাভাবনা করা দরকার। তার জন্য আমাকে কিছু সময় দিতে হবে। তুইও চিন্তা কর কি করা যায় তবে হ্যাঁ,একটা কথা মনে রাখিস যেহেতু এটা বড়দের ব্যাপার তাই যে প্ল্যান ই করি না কেন সেটা সফল করতে হলে একজন বড় কারও সাহায্য লাগবে। তুই এটার ব্যবস্থা কর বাকিটা আমি দেখছি। এখন যাই,কালকে দেখা হবে”। নতুন করে চিন্তায় পরে যায় তুলতুল। আইডিয়া বের করার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেল কিন্তু সাহায্য করবে এমন বড় একজনকে কোথায় পাবে সে? দাদু বাড়িতে বড় বলতে দাদু-দিদা আর মাসিমণি। দাদু যে পরিমান খটমট তাকে তো এই কথা বলাই যাবে না আর দিদা যে পরিমান ভুলোমনা তিনি এসবের কিচ্ছু বুঝবেন না। একমাত্র ভরসা মাসিমণি,তাকে যে করেই হোক রাজি করাতে হবে।

 

সানন্দা, তুলতুলের মাসিমনি,এবার এস.এস.সি. পাশ করেছে। বাস্তবিক অর্থে অনেক বড় হয়ে গেলেও বাড়ির ছোট মেয়ে হওয়ার কারণে তাকে এখনও সবাই ছোটই ভাবে। তাই কলেজে উঠেও একটা মোবাইল ফোনের আবদার করে সে পায়নি। তার বাবা মানে তুলতুলের দাদু সানন্দাকে বলেছেন তার নাকি এখনও ফোন ব্যবহার করার বয়স হয়নি, এইজন্য তাকে আরও একটু বড় হওয়া প্রয়োজন। এ নিয়ে সানন্দার সাথে তার বাবার বেশ কয়েকবার ঝগড়া হয়ে গেছে কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তাই ইদানিং খুব মেজাজ খারাপ থাকে সানন্দার। বাসার সবার সাথেই কোনো কারণ ছাড়াই সে এখন খটমট করে কথা বলে।

 

সেদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই তুলতুল সারাক্ষণ সানন্দার পিছে পিছে ঘুরতে থাকে কিন্তু সুবিধা করে উঠতে পারে না। ব্যপারটা খেয়াল করে সানন্দা। তাই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তুলতুলকে জিজ্ঞেস করে “ব্যাপারখানা কি হে বৎস? খুলে বলো দেখি। এভাবে সারাদিন পিছে পিছে ঘুরে বেড়ানো হয়েছে কি হেতু?”। তুলতুল খুশি হয়ে সানন্দাকে আগা গোঁড়া সবকিছু খুলে বলে। সবকিছু শুনে সানন্দা মুখ বাকিয়ে বলে, ‘ছোটদের এত বেশি পাকনামো করতে হয় না। ছোট আছিস ছোটই থাক। এত বড় বড় চিন্তা তোকে করতে হবে না। আর তোর এসব কাজে আমি কোনো হেল্প করতে পারবো না’। এই বলেই নিজের রুমে চলে গেল সানন্দা।

 

তুলতুলের মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। সে ঘরে চুপচাপ বসে বসে ভাবতে লাগলো কি করা যায়। কিছুই ভালো লাগছে না ওর। তাই সে ড্রয়িংরুমে রাখা একুরিয়ামটার কাছে গিয়ে একা বসে রইলো। গোল্ডফিসটাকে মনের দুঃখ বুঝিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘরে ফেরার সময় তুলতুল হঠাৎ শুনতে পায় কোথায় যেন ফিসফিস আওয়াজ হচ্ছে। একটু ভয় পেয়ে যায়। কারণ ততক্ষনে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে আর পুরা ঘরের লাইট নেভানো।

 

তাও সাহস করে তুলতুল আওয়াজের কাছে যায়। বারান্দার দিকে যেতেই তুলতুল দেখতে পায় মাসিমনি ব্যাল্কনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। কিছুটা স্বস্তি পেয়ে রুমের দিকে যেতে থাকে তুলতুল। চলতি পথেই তার হঠাৎ খেয়াল হয় মাসিমণিকে তো দাদু ফোন কিনে দেননি আর এইজন্য তার চোখের সামনেই মাসিমনি কত ঝগড়া করেছে দাদুর সাথে। তাহলে মাসিমণি কার ফোনে কথা বলছে? হঠাৎ করে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়। সে আবার বারান্দার দিকে যায় তারপর পিছন থেকে মাসিমণিকে ডেকে জোরে জোরে জিজ্ঞেস করে ‘কার সাথে ফোনে কথা বলছ মাসিমনি’?

 

থতমত খেয়ে সানন্দা বলল, ‘চুপ কর,চুপ কর এত জোরে চেঁচালে সবাই তো উঠে যাবে’। ‘তাতে আমার কি’? দুষ্টুমি ভরা হাসি দিতে দিতে তুলতুল বলল, ‘এক শর্তে এখন চুপ থাকতে পারি যদি তুমি আমাকে সাহায্য করো’। অসহায়ের মতো সানন্দা বলল, ‘আচ্ছা বল কি করতে হবে’। এবার তুলতুল মুখ বাকিয়ে বলল, ‘যথাসময়ে বলে দেওয়া হবে, প্রস্তুত থেকো’। সানন্দা কটমট করে তুলতুলের দিকে চেয়ে থাকল কিন্তু তুলতুলের সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেয়। সে সমস্যা সমাধানের আনন্দে নাচতে নাচতে ঘুমাতে চলে গেল।

 

পরদিন কিছুটা নিশ্চিন্ত মনে তুলতুল স্কুলে গেল। টিফিনের সময় হলে মাহি আর ও আরেক দফা মিটিং এ বসলো। প্ল্যান করা হলো কি কি করা হবে। মাহি তুলতুলকে সব বুঝিয়ে দিল ঠিক কি কি করতে হবে। তুলতুল সেদিন বাসায় গিয়ে মাসিমণিকে প্ল্যানের সব কথা বলল আর তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল। তারপর সারা সন্ধ্যা ধরে প্র্যাকটিস করলো কিভাবে কি করবে। রাতে খুব সাহস করে তুলতুল মায়ের সামনে গেল আর তারপর বলল যে জন্মদিনে তার বাবাকে চাই-ই। বাবাকে ছাড়া সে কোন অবস্থাতেই কেক কাটবে না। যেভাবেই হোক বাবাকে সে তার জন্মদিনের দিন দেখতে চাই। এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অনিন্দিতার সাথে ওর অনেক ঝগড়া হল এবং একটা দুটা মারও খেল তুলতুল। অনেক কষ্ট সত্ত্বেও প্ল্যান অনুযায়ী রাগ করে সেদিন রাতে তুলতুল কিছু খেল না। অনিন্দিতাও রাগের চোটে আর কিছু বলল না মেয়েকে।

 

অন্যদিকে প্ল্যান অনুযায়ী সানন্দা রজতকে ফোন দিয়ে সবকিছু খুলে বলল সাথে আরেকটু বাড়তি মাত্রা দিয়ে বলল যে তুলতুল সারাদিন কিছু খায়নি আর খুব কান্নাকাটি করেছে। রজত সব শুনে বলল সে অনিন্দিতার সাথে এই ব্যাপারে কথা বলবে। সেদিন রাতে অনিন্দিতা নিজেও খায়নি এমনকি ঘুমাতেও পারেনি। ছোট্ট মেয়েটা তার না খেয়ে আছে এটা ভাবতেই চোখে পানি চলে আসছে ওর। মেয়েটা খুব বেশি কিছুতো চায়নি। অনিন্দিতা ঠিক করলো কাল সকালেই কথা বলবে রজতের সাথে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও নিজেদের ঝগড়াটা মিটমাট করা উচিত। পরদিনসকাল হতেই অনিন্দিতা খাবার তৈরি করতে লাগলো  নিজ হাতে মেয়েকে খাওয়াবে বলে।

 

নাস্তা রেডি করার সময়ই সানন্দা দৌড়ে এসে বলল, ‘দিদি তুলতুলের তো অনেক জ্বর এসেছে মনে হয়’। এক দৌড়ে মেয়ের রুমে গিয়ে শরীরে হাত বুলিয়ে অনিন্দিতা অনুভব করলো মেয়ের শরীর অনেক গরম তার মানে সত্যি জ্বর চলে এসেছে। আর জ্বরের ঘোরে তুলতুল তখন অবিরত বাবা-বাবা ডেকে চলেছে। বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে উঠল অনিন্দিতার। চোখের জলকে আটকাতে পারলো না সে। সাথে সাথে সবার আগে রজতকে ফোন দিল অনিন্দিতা। তারপর তাদের পারিবারিক ডাক্তার ‘ডাক্তার দাদু’কে ফোন দিল। বাসার বাকি সবাইকে চিৎকার করে ডাক দিল সানন্দা। সবাই এখন ছোট্ট তুলতুলের পাশে বসে তাকে আশ্বাস দিতে লাগলো যে তার বাবা আসছে। একটু পরেই ডাক্তার দাদু চলে আসলেন। বেশ খানিকক্ষণ দেখে তিনি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পরলেন কারণ সবকিছুই ঠিকঠাক আছে শুধু শরীরটা গরম। হঠাৎ তার চোখ পড়ল বালিশের পাশে একটা ছোট জিনিসের উপর। সাথে সাথে তিনি মুচকি হাসলেন তারপর বলে উঠলেন আগামিকাল তুলতুল মামনির জন্মদিন ছিল তাই না?

 

তুলতুল আলতো করে চোখ খুলে বলল হ্যাঁ দাদু। তারপর ডাক্তার দাদু মুখ গম্ভীর করে বললেন, শরীরের যে অবস্থা দেখছি তাতে করে এবার মনে হয় তোমার আর কেক কাটা হবে না মামনি। তুলতুলের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল কিন্তু তাও চুপ করে রইলো। ‘আমি এখন ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি, রাতে এসে একটা বড় ইনজেকশন দিয়ে যাবো’এই বলে ডাক্তার দাদু বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। এবার আর চুপ করে থাকতে পারলো না তুলতুল। লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসলো তুলতুল তারপর চেঁচিয়ে বলতে লাগলো ‘আমি কোনো ইনজেকশন দিব না,কিছু হয়নি আমার। আর কেক কাটতে পারবোনা মানে! এত কষ্ট করলাম কেন যদি কেকটাই কাটতে না পারি! এটা ঠিক না,একদম ঠিক না। আমার সাথে অন্যায় করা হচ্ছে’। ডাক্তার দাদু আর সানন্দা জোরে হেসে উঠলো। বাকি সবাই তখন দর্শক। আসলে কি হচ্ছে এসব কিছুই তাদের মাথায় ঢুকছে না।

 

ডাক্তার দাদু হেসে বললেন তাহলে বলো দেখি মামনি আসল ঘটনা কি? মুখটা কাচুমাচু করে তুলতুল বলল, ‘আসলে আমি সারারাত রসুন রেখে দিয়েছিলাম হাতের নিচে। নানুর কাছে শুনেছিলাম এমন করলে শরীর গরম হয়। আসলে আমি এতসব করেছি বাবাকে এখানে আনার জন্য। তোমরাই বলো বাবাকে ছাড়া কি জন্মদিন হয়! এতসব করলাম বাবার জন্য অথচ বাবাটা এখনও এল না। বলতে বলতে চোখে জল চলে এল ছোট্টো তুলতুলের।

 

আসলে রজত এসেছে অনেক আগেই। এতক্ষন দরজায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সে তার পিচ্চি রাজকুমারীর কাণ্ডকারখানা দেখছিল। সারাটা পথ সে অনেক চিন্তিত ছিল কিন্তু একবারও দুশ্চিন্তায় তার চোখে পানি আসেনি কিন্তু এখানে এসে তার ছোট্ট মেয়েটির এত বড় কাজ দেখে চোখের আনন্দাশ্রু সামলাতে পারলো না রজত। দুচোখ মুছে নিয়ে মেয়েকে সজোরে ডাক দিল রজত। বাবাকে দেখতে পেয়েই মহানন্দে এক দৌড়ে কোলে উঠে গেল তুলতুল। সবাই অবাক চোখে তখন বাবা মেয়ের মিলন দেখছে। এদিকে অনিন্দিতা একবার চোখ মুছে হাসছে আবার কেঁদে ভাসাচ্ছে। রুমে অবস্থানরত বাকি সবার চোখেমুখে তখন হাসি কান্নার মিশ্র এক অদ্ভুত অনুভূতি।

 

আর তুলতুলের অনুভূতি? “মিশন সাকসেসফুল” ;)

 

Share