পার্থক্য

লিখেছেন - তনুশ্রী তালুকদার | লেখাটি 867 বার দেখা হয়েছে

ট্যানট্যানান....ট্যানান ট্যানান [সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কিত মিউজিক দিয়ে গল্পে নায়িকার প্রবেশ]

ক্লাশের সবার গল্পের মাঝে আমি আমার সবর্কালের বোঁচা নাক নিয়ে সেটা আবার বিগলিতো করার মহৎ উদ্দ্যেশ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করলাম।

-কিরে আজ কি নিয়ে গল্প হচ্ছে শুনি???

-এখোনো কিছু জমেনিরে। তুই না আসলে জমে কি করে???

 

-হুমম সাধু সাধু...।এইবার জমবে মামা,জমে ক্ষীর হবে বুঝলি।

 

আমরা বন্ধুরা মিলে এবার জম্পেশ আড্ডা শুরু করলাম,বিষয় বস্তু ছিলো কোন মেয়ের জামা দিন দিন সাইজে ছোটো হয়ে কয়েকদিন পর জামার কাপড় ব্যাবসায়ীর ভাত মারবে,কোন ছেলের বাম পায়ের মোজাটা ছেড়া,আর ক্লাশের মাঝে কে কাকে আই লাবু লিখে চিরকুট পাঠায়...।

এতোক্ষন যতো প্যাঁচাল আমি পারলাম সেটার মূলে যে আমি সেই আমিই এই গল্পের নায়িকা....আমি তনুশ্রী। বিবর্তনবাদে যে নাম এখন তনুশ্রী>তানুশ্রী>ট্যানুশ্রী>ট্যাঁনুশ্রীঁ তে গিয়ে দাড়িয়েছে। কি করি বলেনতো সবাই ভালোবেসে নাম দেয়,ফেলি কি করে??? আদরের চরম পর্যায়ে পৌঁছে এক দাদা তো আবার ছোট বিল্লিও ডাকে...।

 

এইবার.......

 

কাহিনী যদি এইভাবে চলতো তাইলেতো আমারে নিয়াই কাহানী সিনেমা হইতো তাইনা??? তাই গল্পের মোড় ঘুরাইতে আমি একটা কথা না বলে কিছুতেই পারছিনা, এই যে মানুষ আমারে এতো ভালোবাসে, আমি বুঝি,কেন??? আমার দুঃখ সবাই ভুলাইতে চায়। আমি সেইটাও বুঝি। কিন্তু ওদের বুঝতে দেইনা.... একা একা আমি আমার ঘড়ের লাইট অফ করে কাঁদি।

আমার চোখের সামনে এখোনো দিনটা ভাসে,আমার বাবা যেদিন আমার মা’কে একটা চড় মেরেছিলো...। আমি ছোট,অনেক ছোট..কিন্তু কিচ্ছু ভুলিনি।

আমার মায়ের দোষ ছিলো মা যে জবটা করতেন সেটাতে ওইদিন কিছু ডকুমেন্টে নাকি কি যেনো ভুল ছিলো বলে মা সহ আরো ৫ জন কলিগকে রাত ১২.৩০টা অব্দি অফিসে থাকতে হয়েছিলো।

মা বাবা কে ফোন করে জানিয়েছিলো নাকি,কিন্তু বাকীটা আমি নিজের চোখের সামনেই দেখি,বাবা মা’কে কিছু না বলে কয়ে একটা চড় মেরে দিলো আর বললো আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও,কোনো বেহায়া মহিলার ঠাঁই নেই এখানে।

আমার শক্ত মা’কে আরো শক্ত হতে সেদিন দেখলাম,জাস্ট আমার খালামনিকে একটা ফোন করে সেদিন এক কাপড়ে মা বের হয়ে গেছিলো বাড়ি থেকে...।সাথে সাথে আমিও।

বাবা যদিও মামলা করতে চেয়েছিলেন আমার জন্য,কিন্তু আমার কাছে পরে জানতে চাইলেন আমি কার কাছে থাকতে চাই....আমি বলেছিলাম মায়ের কাছে থাকবো...।বাবা আর কোনোদিন আমাকে নিতে আসেননি।

 

অনেক পরিশ্রম করে মা মানুষ করেছে আমাকে,ভালো একটা ভার্সিটিতে পড়ছি আমি।তবে কোনোদিন টাকার অভাব বোধ করিনি...। মা’তো দিতই আর প্রতি মাসে বাবা আমার ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠাতো...।আমি কোনোদিন না করিনি,কারন বাবা যে তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন।

মা চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর বাবা তার নিজের ভুল বুঝতে পারে,কিন্তু আমার আত্মসম্মানী মা আর কোনোদিন ফিরে যাননি বাবার কাছে।

আজ তাই আমি একটা ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে।...

 

এবার আসি অন্য কথায়,সবার কথা মতে আমি দেখতে বেশ সুন্দর,মায়ের সৌন্দর্য্য পেয়েছি।তাই প্রোপোজাল পেয়েছি বেশ...।তার মানে কি প্রেম আসেনি আমার...???এসেছে এসেছে...!!! ক্রমশ প্রকাশ্য।

আমাকে ভালোবাসতো একটা ছেলে,হ্যা বাসতো...কারন ওটা এখন পাস্ট টেন্স।ওর বাবা মা আমাকে কেন মেনে নেয়নি যানেন???আমি ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে বলে।সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে আমার এক্স ভালোবাসার মানুষ...

 

ঈদের ঠিক ৩ দিন আগে....

 

আমি স্কুটিটা চালিয়ে যাচ্ছি বাসায় যাবো বলে,একটা বাচ্চাকে কান্না করতে দেখে থামলাম,জানতে চাইলাম তার নাম কি আর সে কেনো কাঁদছে। বাচ্চাটা বললো “আমার নাম রশিদ। আমগো অনেক টাকার অভাব,আব্বা রিকশা চালায়। সেই টাকায় আমগো ৪ ভাইবোনের খাওয়া,পরা চলেনা। তাই আমগো মা সংসদ ভবনের সামনে কেন জানি রাতের বেলায় সাইজ্জাগুইজ্জা দাড়ায়,সেইডাতো জানিনা। আর তাই আব্বা মা’রে আর আমগো ৪ জনরে বাইর কইরা দিছে...। মায়রে পিডাইছে অনেক।....” আমি বাচ্চাটাকে নিয়েই ব্যাংকে গেছি টাকা তুলতে, বাবা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন আমার ঈদের শপিংয়ের টাকা পাঠিয়েছেন ।

 

বাচ্চাটার জন্য লাল একটা জামা কিনলাম,অবশ্য ওরই পছন্দ করা। আর ৩টা জামা কিনলাম বাকী ভাই বোনদের জন্য। আর ওর মায়ের জন্য একটা শাড়ী।

এক বন্ধুকে ফোন করলাম আমার সাথে ওদের বস্তিতে যাওয়ার জন্য,কাপড় গুলো দিতে। রশিদের মা’কে ৫০০ টাকা দিসিলাম যেনো ওরা ঈদের দিন ভালো কিছু খায়। দিলাম,আর একটা পরিবার দেখলাম,কতোটা খুশির ঝিলিক তাদের চোখে মুখে থাকতে পারে,শুধু একটু ভালো খাওয়া আর ভালো কাপড়ের জন্য...।

 

মনে পড়ে,সেদিন আমি কত কেঁদেছিলাম,আমার আর রশিদের মাঝে কোথায় যেনো একটু মিল আছে...। পার্থ্যক্য শুধু একটা হয়তো সেটা শিক্ষা অথবা বোঝার ভুল।

আজ ঈদ,একটা অন্ধকার ঘরে আমি একা।......

Share