বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে পার্ক থেকে উঠলাম

লিখেছেন - ইয়াসির আরাফাত | লেখাটি 598 বার দেখা হয়েছে

বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে পার্ক থেকে উঠলাম । বাসায় ফিরে যাবো । যেতে যেতে বৃষ্টিতে ভিজবো -এরকম একটা গোপন ইচ্ছা মনের আণ্ডারগ্রাউণ্ডে চাপা পড়ে ছিলো । সাইকেলের প্যাডেলে পা দিতেই ফুউররর্‌ শব্দে মাথার ভিতর ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল যেন । ঘেমে যাওয়া শরীরের ভিতর দিয়ে সেই ঠাণ্ডা স্রোত কোথায় মিলিয়ে গেল । নিজেকে উত্তম কুমার ভাবতে শুরু করার পর মস্তিষ্কে বেজে উঠলো পুরোনো দিনের হারিয়ে যাওয়া বাংলা গান , -এ পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হোতো তুমি বলোতো । যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয় তবে কেমন হোতো তুমি বলোতো -এই পর্যন্ত বাজার পর , মগবাজারের একটু আগে অন্ধকারে , রাস্তার ভাঙ্গাচোরা গর্তের মধ্যে সাইকেলের সামনের চাকা ঢুকে যাওয়ায় , প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে গানের সুর তাল কেটে গিয়ে - স্বপ্নের দেশ থেকে বাস্তবে পতনের আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি ।

বৃষ্টির দুই-একটা ফোঁটা মাথায় আর গায়ে পড়লো আবার । হাতিরঝিলের ঐদিক থেকে একপশলা ঠাণ্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগে । রাস্তার গর্তে পড়ে ভেঙ্গে যাওয়া রেকর্ড আবার বেজে উঠলো । --নীল আকাশের ওই দূর সীমা ছাড়িয়ে,
এই গান যেন যায় আজ হারিয়ে ...

হাতিরঝিলে ঢুকতে যাবো , অমনি বৃষ্টিতে ভেজার যে সামান্য আগ্রহটুকু অনেক তলে চাপা পড়ে ছিলো , সেটা প্রকাশিত হতে শুরু করলো একটু একটু করে , ঝিলের ঠাণ্ডা হাওয়ায় যতক্ষণে সেটা আমার চেতন-অবচেতন সবটুকু গ্রাস করে না-নিচ্ছে ততক্ষণ । আকাশের উপর থেকে কে যেন পৃথিবীর ছবি তুলে রাখলেন কয়েকটা । আমি ফ্লাসের আলো দেখতে পেলাম উত্তর-আকাশে । বৃষ্টির প্রতীক্ষা , এ যেন প্রিয়মানুষকে এক পলক দেখার , সময়জ্ঞানহীন-মনের এক ধরনের চাওয়া । মাঝে মাঝে এরকম হয় । হঠাত করে দেখতে ইচ্ছে করে কাউকে । তখনই । ঐ মুহূর্তে ।

আমার পথ ফুরিয়ে আসছে । আমি সাইকেলের গতি কমিয়ে আনলাম । বৃষ্টি শুরু হচ্ছে । ধীরে ধীরে বাড়ছে । আমি একটা দোকান থেকে পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে মোবাইল , মানিব্যাগ ভরে নিলাম তাতে । প্রথমে ঘামে , তারপরে বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা পানিতে ভিজে গেছে আমার চুল । আমি চুল থেকে পানি ঝেড়ে ফেলি । তখনই আমার মাথায় একটা চিন্তা আসে । আমি একটা ম্যান্থোল শ্যাম্পু কিনে , মাথায় মেখে ফেনা তৈরি করি । এবং তুলার মতো মাথাভর্তি ফেনা নিয়ে আমি একটা সিগ্রেট ধরাই । বৃষ্টির বেগ তখনো আগের মতো । যে রকম বেগে বৃষ্টি হলে ছাগলের পাল দৌঁড় দেয় আশ্রয়ের খোঁজে , সে রকম । ছাগল-দৌঁড়ানো-বৃষ্টি ।

আমি অপেক্ষা করি । বৃষ্টির বেগ বাড়বে । কমপক্ষে দুইদিন সজাগ চোখ মেলে কটকট তাকিয়ে থাকার পর , নির্ঘুম চোখের নিচে জমে উঠা কালো কালির মতো মেঘ জমেছে আকাশে । আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়বে । এই বুঝি পড়লো । শ্যাম্পুর ফেনা শুকিয়ে আসতে থাকে মাথায় । যখনই বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা বাতাস আসে লাগে , মাথার ভিতরে কোষগুলো এক অদ্ভুত শিহরণে দোলে উঠে । আমি ঝুমঝুম বৃষ্টির অপেক্ষা নিয়ে সিগ্রেটে টান দিই । বৃষ্টির ফোঁটা যখন খোলা শাওয়ারের পানির মতো ঝরঝর করে ঝরে পড়বে আমার মাথার উপর , তখনকার সুখদ অনুভূতির কল্পনা করে আমি সেই অনির্বচনীয় আনন্দের কথা ভাবতে থাকি । একসময় তর সইতে না পেরে , বৃষ্টির বেগ বাড়ার অপেক্ষাকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে পড়ি । একটু পর , বৃষ্টির ফোঁটা কয়েকটা মাথায় পড়লো কি পড়লো না , ততক্ষণে বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে । আমি এ রাস্তা - সে রাস্তা , এ-ব্রিজ-সে-ব্রিজ করে , এইতো আসলো-ঝুম ঝুম ঝুম- এসব চিন্তা করতে করতে , প্রায় দুই ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে অবশেষে আবিষ্কার করলাম , আমি ঘরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি ।

পাশ দিয়ে চলে যাওয়া এক রিকশাওয়ালেকে বললাম , চাপাবাজির এই দেশে , আকাশও চাপাবাজ হয়ে গেলো শেষমেশ !! সে জিজ্ঞেস করে , -কী হইছে ভাই ? আমি তাকে ঘটনা বর্ণনা করলে সে হাসতে হাসতে চলে গেলো । আমি ঘরে প্রবেশ করে , খুব দ্রুত ঢুকে পড়ি বাথরুমে । খোলা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে যেন , ম্যান্থোল শ্যাম্পু মেখে-বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ পেতে চাই আমি ।

____________________

ইয়াসির আরাফাত

Share