অনেক ভালবাসি বাবা ...

লিখেছেন - জয় কবির | লেখাটি 685 বার দেখা হয়েছে

১৯৮৬ সালের একটা বিকেল, বারান্দায় বসে খেলছিলাম আমি আর আমার বোন। বাইরে গাড়ীর হর্ন শুনে এক দৌড়ে দুজন গিয়ে দ্রুত হাতে বইখাতা টেনে পড়তে বসে যাই। ড্রয়িং রুমে গল্প করছিলেন মা আর বড় খালু। খালু খেয়াল করেন ব্যাপারটা। বাবা ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হতে গেলে মা’কে খালু বলেন “বিকেল বেলাতে বাচ্চারা পড়তে বসে গেলো কেন? এখন তো খেলার সময়”। “ওদের বাবার ভয়ে” মা’র উত্তর। পরে খালু এই ব্যাপারে কথা বলেন বাবার সাথে। সেদিনের পর থেকে আমরা বিকেলে খেলতে যাবার অনুমতি পাই।

বাবাকে অসম্ভব ভয় পেতাম ছোটবেলা থেকেই। এর মূল কারণটা হয়তো বাবার সাথে বেশী দেখে না হওয়া। বাবা অফিস নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতেন, বাসায় এসেও বসে যেতেন কাগজ পত্র নিয়ে। আমাদের সাথে নিয়ে বাবা কবে কখন বাইরে গেছেন, সেগুলো আমরা এখনো মনে করতে পারি, কারণ সেই যাওয়ার সংখ্যাটা হাতে গোনা। আমি হোস্টেলে চলে যাবার পর বাবা আমাকে মিস করতে শুরু করেন, মা’র মুখে শুনেছি। সে জন্য বাবা আমার বোনটাকে পরে অনেক সময় দিয়েছেন, কিন্তু আমি কোনদিনই বাবাকে সে ভাবে পাইনি।

আমি রাজশাহীতে অনার্স পড়ার সময় বাবা থাকতেন নওগাঁতে, মাঝে মাঝে দেখতে যেতেন আমাকে। আমি তখনও খুব ভয়ে থাকতাম, সাদা কোন জীপ দেখলেই আমার ভয় লাগতে। অনেকদিন বাবা আমাকে নওগাঁয় নিয়ে গেছেন, খেতে দিয়েছেন অনেক কিছু, কিন্তু বাবার সাথে তেমন কোন কথা হয়নি আমার। একটা সময় এসে সংসারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বাবার সাথে সাথে আমার মতামতেরও প্রয়োজন হয়। তখন আমি অনুভব করি বাবা’র এই কাঠিন্য আসলে শুধু বাইরেই। ভেতরে বাবা খুবই নরম একজন মানুষ। এখন আমি যে কোন জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হলে বাবার সাথে আলাপ করে নেই, কিন্তু তিনি কোনদিনই আমাকে কোনকিছু করতে বাধ্য করেননা।

বাবা’র সাথে দূরত্বটা অনেক কমে এসেছে এখন। কিন্তু তবুও আমি অনেক কথাই আমার বাবা’কে বলতে পারি না। বাবা’র বয়েস হয়েছে, একদিন চলে যাবেন হঠাৎ করেই। জীবনে আর দেখে হবে কিনা আমার সাথে, সে কথা ভেবে মন খারাপ করেন। আমি চলে আসার সময় বাবা এয়ারপোর্টে আমাকে প্লেনের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান, কিন্তু চোখের পানি গোপনে মুছতে পারলেও এগিয়ে এসে ছেলেকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারেননি।

বাবা’র সময়ে হয়তো নিয়ম ছিল ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার, অন্তত আমার তাই মনে হয়। তারা হয়তো ভালোবাসার প্রকাশটাকে দুর্বলতা মনে করতেন, তাই ভালোবাসতেন গোপনে। প্রকাশ করতে পারতেন না। অবশ্য সব বাবাও আমার বাবার মতো না। অনেকেই হয়তো পারেন, কিন্তু আমার বাবা পারেননি। আমি বাবা’র চরিত্রের এই একটা দিক নিজের ভেতরে আসতে দেইনি।

আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ, এই বিষয়ে আমার কোন কম্প্রোমাইজ নেই। আমি আমার বাবা’র মত হতে চাই, আমার বাবা’র ছেলে হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। এই দুটি কথা আমি বাবাকে জানাতে পারিনি কোনদিন।

অনেক ভালবাসি বাবা ...

- জয় কবির

Share