রিমাইন্ডার

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 925 বার দেখা হয়েছে

(১ম পর্ব)

“তোমার নাম যেন কি বললে???”,নুম রিমাইন্ডার এর দিকে না তাকিয়ে ই ১৯তম বারের মতো জিজ্ঞেস করলো বেঁধে রাখা ঐ মেয়েটাকে।

“আমার নাম ইনা,এত ছোট নামই তোমার মনে থাকেনা আবার যুদ্ধ করে বেড়াও কিভাবে???”

“ওটা তোমার জানতে হবেনা,তোমাকে কিছুক্ষণের মধ্যে মেরে ফেলা হবে এটা কি তুমি জানো??”

 

“হ্যাঁ,আন্দাজ করতে পারছি।কিন্তু আমাকে মেরে কি লাভ তোমাদের??আমি কি কোনো হিংস্র কেউ যে আমাকে মারতে হবে?আমিও তো তোমার মত মানুষ”।

নুম হঠাৎ মেয়েটার জন্য মায়া অনুভব করলো।আজ পর্যন্ত সে ১০২৩ টি খুন করেছে কিন্তু কারো জন্য মায়া হয়নি,সে তার রিমাইন্ডার এর দিকে তাকালো,আর মাত্র একটা খুন করতে হবে তাকে,তাহলেই সে মুক্ত হয়ে যাবে,তার সেই পুরনো স্লাম এ ফিরে যেতে পারবে।কিন্তু শেষ খুন টা করতে এসেই সে কেন যেন থেমে গেলো??

“নুম,তুমি কি আমাকে বাঁচাতে পারোনা???এমনিতেই পৃথিবীতে নারীর সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছো তোমরা,আমাকে নাহয় না ই মারলে।”

নুম কিছু না বলে তার অ্যাসিড গান নিয়ে ওই রুম থেকে বের হয়ে আসলো।নুম বুঝতে পারছেনা সে কেন মেয়েটাকে খুন করতে পারলোনা???“আচ্ছা মেয়েটার নামটা যেন কি????ধুর,ভুলে গেলাম......”

 

২০ ডিসেম্বর...৪০২০ সাল,

            আর মাত্র ১২ মাস ১০ দিন বাকি পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার।গত ২০ বছর ধরে চলা এই ধ্বংসযজ্ঞ  তখন ই শেষ হবে।গত সহস্রাব্দেও এরকম ছিলনা পৃথিবীর অবস্থা।কিন্তু মানুষ প্রযুক্তির হাত ধরে চলতে চলতে এত অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো যে যখন ৪০০০ সালে যখন পৃথিবীর সব নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎের একসাথে মেজর ব্রেকডাউন হল তখন মানুষের ভেতরকার ভঙ্গুর রুপ দেখা গেলো।মানুষ পুরোপুরি অচল হয়ে গেলো।তারা কোন কাজ নিজের হাতে করতে পারছিলোনা,পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়েছিলো।এর মাঝে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর বিজ্ঞানী ও সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম শাসক ক্রুগা ঘোষণা দেয় যে পৃথিবী ৪০২২ সালের ১ জানুয়ারী ধ্বংস হয়ে যাবে।পৃথিবীতে তখন কোন আলাদা দেশ ছিলোনা,শুধু মহাদেশ ছিলো।তারপর থেকে ক্রুগা তার ইউরোপ মহাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালি যুদ্ধবাজ বাহিনী সৃষ্টি করে তাদের লেলিয়ে দেয় অন্যান্য মহাদেশ থেকে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছিনিয়ে আনতে,সাথে সাথে এই আদেশ ও দেয় যে পৃথিবীর সব নারীকে মেরে ফেলার,কারণ তখন নারীদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছিলো।যাতে পরে নারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে কিছু না করতে পারে।

 

তারপর থেকে শুরু হলো এক অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞ।পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন মাত্র ২৫ হাজার,গত ২০ বছরে কেউ মারা গেছে খাবারের অভাবে,কেউ চিকিৎসার অভাবে,আর বেশিরভাগই ক্রুগার নিষ্ঠুরতায়।গত ২০ বছরে মানুষের মাঝে যেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে তা হচ্ছে তাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া,সব মানুষ ই এখন হঠাৎ করে বিগত ১৫-২০ মিনিট এর সব কিছু ভুলে যায়।সব মহাদেশেই এই সমস্যা দেখা গেলেও শুধু মাত্র এশিয়া মহাদেশে এই সমস্যা দেখা দেয়নি এখন ও,কারণ এশিয়ার মানুষরা প্রযুক্তির উপর এতোটা নির্ভরশীল ছিলোনা।তাই ক্রুগা এবার তার যুদ্ধবাজ দলকে পাঠিয়েছে এশিয়া মহাদেশ আক্রমনের জন্য।ক্রুগা তার নিজের তৈরি অস্ত্র আর রিমাইন্ডার দিয়ে দিয়েছে তাদের।এশিয়া মহাদেশ খুব সহজেই দখল করে নিলো ক্রুগাস ফোর্স,ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে লাগলো।খাদ্যদ্রব্যের জন্য নানা প্রোটিন আর ভিটামিন ক্যাপস্যুল তৈরির কারখানায় হামলা চালালো,সব নারীদের প্রতিদিন তাদের ক্যাম্প এ এনে ক্রুগার আদেশে মেরে ফেলতে লাগলো।আর যাকে ক্রুগার পছন্দ হতো তাকে বাঁচিয়ে রাখা হতো।

 

ক্রুগার এই যুদ্ধবাজ বাহিনী কোনো প্রশিক্ষিত বাহিনী নয়,তারাও এরকম ধ্বংসযজ্ঞের শিকার।প্রতিটি স্লাম এ যখন হামলা চালানো হয় তখন শক্ত-সমর্থ কম বয়সী ছেলেদের আলাদা করে নিয়ে আসা হয়,তারপর তাদের কিছুদিন প্রশিক্ষন দিয়ে এই কাজেই পাঠিয়ে দেয়া হয়,প্রতিটি মানুষের জন্য রিমাইন্ডার এ ১০২৪ টি খুনের জন্য সময় সেট করে হাতের চামড়া ছাড়িয়ে বেঁধে দেয়া আছে।এই সময়ের মধ্যে সে তা না করতে পারলে ওই রিমাইন্ডারটি তখন স্বয়ংক্রিয় ভাবে একটি ক্যাপস্যুল তার দেহের ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে,যাতে পটাশিয়াম সায়ানাইড মূল উপাদান হিসেবে থাকে,ফলে তার মৃত্যু অনিবার্য।আর সময়ের মাঝেই যদি সে সব খুন করতে পারে তাহলে রিমাইন্ডারটি  নিজে নিজেই বিকল হয়ে তার হাত থেকে খুলে পরে যাবে।এই রিমাইন্ডার শুধু তার খুনের হিসেব আর সময় গণনা করেনা,প্রতিটি সেনা কে ট্র্যাক করা যায় এমনকি সব কিছু রেকর্ড হয়ে থাকে এর মাঝে যাতে ভুলে গেলে রিমাইন্ডার দেখলেই সব মনে পড়ে যায়।ক্রুগা যেকোনো গুরত্তপূর্ণ মেসেজ ও দিতে পারে যে কাউকে এই রিমাইন্ডারের মাধ্যমে।এর মাঝে ক্রুগা সন্তান জন্মদানের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো,কারণ হিসেবে সে বলেছিল যে আর কয়েক বছরে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে তাই এখন কেউ যদি সন্তান জন্ম ও দেয় তাহলে তো সেই সন্তানকে একরকম মৃত্যুদণ্ডই দেয়া হলো।এর জন্য কেউ সন্তান নেয়ার সাহস ও করেনি।আর যেহেতু নারীরাও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেখানে সন্তান নেয়ার প্রশ্নই আসেনা।এশিয়া মহাদেশ প্রায় পুরোটাই কভার করা শেষ ক্রুগার সেনাদের,বেশিরভাগ নারীদের মেরে ফেলা হয়েছে আর কিছু নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ক্রুগার কাছে।এখন তাদের ইউরোপ যেতে প্রায় ১০ মাস লেগে যাবে এসব খাবার,নারী আর অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে।সবাই বুঝে গেছে এটাই তাদের শেষ অভিযান ছিল,আর কোন মানুষ খুন করতে হবেনা তাদের,বেশিরভাগেরই টার্গেট পুরো হয়ে গিয়েছিলো তাই তাদের রিমাইন্ডার খুলে গিয়েছে,শুধু দুইজনের টার্গেট পূরণ হয়নি।একজন ওদের দলের ক্যাপ্টেন হুলার আর আরেকজন হচ্ছে নুম......

 

১ জানুয়ারী...৪০২১ সাল,

ক্যাপ্টেন হুলার তার তাঁবুতে বসে আছে আর উদাস চোখে তার রিমাইন্ডার এর দিকে তাকিয়ে আছে।একটু আগেই ক্রুগা তার সাথে যোগাযোগ করেছে,তাকে বলেছে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসতে,তার নাকি নতুন মেয়েগুলো কে দেখতে তর সইছেনা।এসব শোনার পর থেকে হুলারের মেজাজ চরম পর্যায়ে চলে গেছে।মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ক্রুগার মুখোশ পড়া মুখটা তার অ্যাসিড গান দিয়ে ঝলসে দিতে আর মগজে একটা সায়ানাইড বুলেট ঢুকিয়ে দিতে,কিন্তু এটা যে অসম্ভব তা সে ভালমতই জানে।রিমাইন্ডার যেখানে সেট করা সেদিকে তাকালো সে।হাতের মাংস গুলো কেমন যেন পচে গেছে মনে হচ্ছে।অনেকদিন পর সে রিমাইন্ডার এর যন্ত্রণা টা টের পেলো।হুলার তাবু থেকে বের হলো,তাকিয়ে আছে লাল হয়ে যাওয়া আকাশটার দিকে।মঙ্গল গ্রহ নাকি খুব কাছাকাছি চলে এসেছে তাই আকাশ এখন লাল।ক্রুগা বলেছে এই গ্রহের সাথেই নাকি পৃথিবীর সংঘর্ষ হবে আর ঠিক ১ বছর পর।হুলার এর একটু ও খারাপ লাগেনা যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে,সে মারা যাবে,বরং তার ভালোই লাগে এটা ভেবে যে পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে গেলে ভালোই হবে।এসব যুদ্ধ,খুনোখুনি সব কিছুর অবসান হবে,আর বিশেষ করে ক্রুগা ও মারা যাবে।এটা ভেবেই তার ভালো লাগছে।হুলার দেখল যে সব সেনারা নিজ নিজ তাঁবুতে ঘুমুচ্ছে,শুধু নুম এর তাঁবুতে বাতি জ্বলছে।হুলার কৌতূহলী হয়ে নুম এর তাঁবুতে ঢুকে পড়ল......

নুমঃআরে হুলার।কি ব্যাপার???ঘুমওনি এখনো???

হুলারঃনা নুম।আমি তো বিগত ৫ বছর ধরেই ঘুমাই না।

নুমঃকেন হুলার???

হুলারঃতুমি জাননা এর কারণ???তুমিও তো ঘুমোতে পারোনা।

নুমঃহ্যাঁ হুলার।আমি জানি।কবে যে আমি মুক্তি পাবো??আমার পুরনো সেই স্লাম এ ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।আমার ছোট বোনটা ওখানে একা আছে,কেমন আছে কে জানে???আমাদের স্লাম এ যখন তোমরা হামলা করেছিলে তখন ওকে আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম।

হুলারঃতাই নাকি???ভালোই করেছো।জানিনা যখন হামলা করি তখন কোন মায়া মমতাই কাজ করেনা,শুধু নিজের প্রতি ভালোবাসা কাজ করে।মন থেকে শুধু একটাই আর্তনাদ শুনতে পাই-নিজেকে বাঁচতে হলে অন্যকে মারতে হবে।আচ্ছা নুম তোমার আর আমার ই তো শুধু টার্গেট পূরণ করা বাকি তাইনা???তোমার সময় কতো বাকি আছে আর???আমার তো আরও ৮৭৫৩ ঘণ্টা:২৪ মিনিট:৩০ সেকেন্ড বাকি আছে।

নুমঃও...আর আমার বাকি ৮৭৫৯ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট ২২ সেকেন্ড।আমি আর পারিনা।কেন যে পৃথিবীটা এরকম হয়ে গেলো???

হুলারঃতুমি জানো নুম আগে ইউরোপ থেকে এশিয়া আসতে যেতে মাত্র ৩০ মিনিট সময় লাগতো??

নুমঃহ্যাঁ।আমি শুনেছিলাম।আর এখন ১০ মাস লেগে যাবে।আমার বোনটার সাথে তাহলে আর ২ মাস মাত্র কাঁটাতে পারবো।তারপর হয়তো সব শেষ।

হুলারঃহ্যাঁ।সব ধ্বংস হয়ে যাবে।

নুমঃএকটা কথা কি জানো হুলার???আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কি পৃথিবীটা আসলে ধ্বংস হবেনা।আমরা আরও অনেক বছর বেঁচে থাকবো।

হুলারঃএটা অসম্ভব।তবে ভাবতে ভালোই লাগে।

নুমঃএসো তোমাকে আমার নতুন তৈরি করা ইনুট* টা শোনাই।

হুলারঃহ্যাঁ শোনাও।আমি শুনেছি তুমি নাকি খুব ভালো ইটুলফ* বাজাতে পারো।

নুমঃহুম পারি কিছুটা...শোন।

নুম তার ইটুলফ দিয়ে মায়াবী এক ইনুট তুললো...সেই ইনুট শুনে দূরের এক তাঁবুতে বসে থাকা ইনা নামের মেয়েটির চোখে পানি চলে আসলো...

১৫ মিনিট পর......

হুলারঃঅসাধারণ ইনুট তুলেছো।

নুমঃধন্যবাদ হুলার।

হুলারঃআমার কেন যেন তোমার কথা টা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে।

নুমঃকোন কথাটা???

হুলারঃঐ যে...কি যেন বললে না তুমি?কি কথা যেন?

নুমঃআমি কি জানি?তুমি ই তো বললে আমার কোন কথা নাকি তোমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে?

হুলারঃকি জানি???

নুমঃআমিতো ভুলে গিয়েছি।

হুলারঃআমিও..

 

 

*ইনুট-একধরনের সুর।(tune=enut)

*ইটুল্ফ-এক প্রকার বাঁশি।(flute=etulf)

 

 

৫ জানুয়ারী...৪০২১ সাল,

নুম কিছু প্রোটিন ক্যাপসুল হাতে নিয়ে ইনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটা ক্যাপসুল দেখে কেমন যেন ঠোঁট উল্টিয়ে অভিমান করেছে।নুম এর দেখতে বেশ মজাই লাগছে।

ইনা রাগতস্বরে নুমের দিকে তাকিয়ে বলল,“আমি খাবনা।এসব কি খাওয়া যায় নাকি???এগুলো কি??প্রোটিন ক্যাপসুল??”

“খাওয়া না খাওয়া তোমার ব্যাপার।এগুলো খেয়েই তো আমরা বেঁচে আছি।”

“তোমরা কি মানুষ নাকি???তোমরা রোবট।আমি রুটি খাবো।”

“আমরা মানুষই।আর রুটি কি জিনিস??আমাদের এখানে এই নামে কোন খাবার নেই।”

“তাহলে মানুষ হয়ে মানুষ মার কেন তোমরা???”

“মানুষ না মারলে আমাদের মরতে হবে যে তাই।”

“ও।নিজে বাঁচার জন্য মানুষ মারো??ছিঃ ছিঃ।তোমাদের লজ্জা করেনা???”

“না,করেনা।”

“জানো মানুষ কে মারা কতো খারাপ কাজ???তুমি একটা মানুষকে যদি কখনো বাঁচাও তাহলে বুঝতে জীবন কি???”

“আমি নিজে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ মারিনা।আমার বোন একা আমাদের স্লাম এ আছে।ওর আমাকে দরকার।আমি আমার বোনের সাথে শেষ কয়টা দিন বেঁচে থাকতে চাই।”

“ও...তোমার কি মনে হয় তোমার বোন যদি জানে যে তুমি এতোগুলো মানুষ খুন করেছো,কারও মা,কারও বোন কেঁড়ে নিয়েছো তাহলে কি ও তোমাকে ভাই হিসেবে মেনে নিবে??”

“আমি এত কিছু জানিনা।আমার শুধু আমার বোনের কাছে ফিরে যেতে হবে।আমি আর কিছু চাইনা।”

“আচ্ছা নুম,আমার যেই কুব রিডার* গুলো তোমরা রেখে দিয়েছো,সেগুলো আমাকে ফেরত দাও??”

“সেগুলো পরিক্ষা করে দেখা হচ্ছে,তোমাকে দেয়া যাবেনা।”

“ওগুলো আমার খুব প্রিয় জিনিস।তুমি জানো আমি অনেক কষ্ট করে অনেক প্রাচীন কিছু কবিতার বই এতে লোড করেছিলাম।”

“কবিতা কি???বই কি??কি বলছ এসব??”

“তুমি যদি আমাকে ফেরত দাও তাহলে তোমাকে বলব”

“আচ্ছা আমি দেখি কি করা যায়।এখন তুমি খেয়ে নাও।”

“হুম...আচ্ছা যাও আমি খেয়ে নেবো নে।কিন্তু আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”

“কি??তাড়াতাড়ি বল।আমার সময় নেই।”

“তোমরা আমাকে আর ওই ১১ টা মেয়েকে কই নিয়ে যাচ্ছ???আমাদের মেরে ফেলছনা কেন???”

“তোমাকে মহামান্য ক্রুগার কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।তিনি তোমাদের চেয়েছেন।”

“চেয়েছেন মানে???কি জন্য চেয়েছেন???”

“জানিনা।”

“আমি ওই ক্রুগা ট্রুগার কাছে যাবোনা।আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যেয়ো।”

“মানে কি???আমার সাথে নেবো কেন তোমাকে???”

“এমনি।আমাকে রক্ষা করবে তুমি।তাহলে তোমার ভালো লাগবে।তুমি জীবনের মূল্য বুঝতে পারবে।”

“না আমি পারবোনা।ক্রুগার আদেশ অমান্য করা অসম্ভব।”

“ও...আচ্ছা,ঠিক আছে।আর তোমার হাতে এটা কি জিনিস????দেখি??”

“না দেখা যাবেনা।এটা রিমাইন্ডার।”

“ও এই সেই রিমাইন্ডার।এটার কথা তো সবাই জানে।আচ্ছা এটা নাকি অনেক শক্তিশালি একটা যন্ত্র??”

“হ্যাঁ।অনেক শক্তিশালী।”

“এটা দিয়ে কি তাহলে গুলি করা যায়???এটা দিয়ে কি অ্যাসিড ব্লাস্ট করা যায়???এটা দিয়ে কি পৃথিবী উড়িয়ে দেয়া যায়???”

“উহ...থামো,থামো।না এটা দিয়ে এসব কিছু করা যায়না।এটা দিয়ে নিজেকে খুন করা যায়” “কি?সত্যি??কিভাবে???”

“আমি আর ৮৬৫৯ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড এর মধ্যে আমার টার্গেট পূরণ না করতে পারলে রিমাইন্ডার থেকে সায়ানাইড ক্যাপস্যুল আমার শরীরে ঢুকে যাবে,আর আমি মারা যাবো।আর পূরণ করতে পারলে রিমাইন্ডার নিজে নিজে খুলে যাবে।কিন্তু রিমাইন্ডার খুলে গেলেও বিপদ,কারণ তাহলে আমার স্মৃতি হয়তো আরও বেশী করে লোপ পাবে”

ইনা তখন নুমের কাছে এসে নুমের হাত ধরে বলল-“তুমি চিন্তা করোনা নুম,তুমি তোমার টার্গেট পূরণ করতে পারবে,তোমার বোনের কাছে ফিরে যেতে পারবে,আমার মন বলছে তুমি পারবে”।

নুম হাত টা ছাড়িয়ে বলল-তুমি বড় বেশী কথা বল ইনা,এই বলে নুম বের হয়ে আসলো।এই পাগল মেয়েটা তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।কিন্তু সে আজ নতুন একটা শব্দ শুনল...মন...এই শব্দটার মানে কি???মন কিভাবে বলে???মন কি ওদের মতো কোন মানুষ??নুম এতকিছু ভাবতে পারেনা,তার মাথা ধরে যায়।

 

*কুব রিডার-এক প্রকার ই-বুক,যেখানে অনেক গুলো বই সংরক্ষণ করা যায়।(book=koob)

 

১৪ ফেব্রুয়ারী...৪০২১ সাল,

বাইরে অ্যাসিড বৃষ্টি হচ্ছে তাই সবাই যার যার তাঁবুতে বসে আছে।কিন্তু নুম এসেছে তাদের মেয়েদের কার্গোর তাঁবুতে।ইনাকে তার কুব রিডার দিতে এসেছিলো সে।নুম দেখছে যে মেয়েটা কুব রিডার পাওয়ার পর খুব খুশি হয়েছে।অনেকদিন পর সে কাউকে হাসতে দেখল।ইনার দৃষ্টি পুরোপুরি কুব রিডার এর দিকে।হঠাৎ ইনা নীরবতা ভাঙলো-

ইনাঃধন্যবাদ নুম...তোমাকে বলে বোঝাতে পারবোনা আমার কতোটা ভালো লাগছে।তুমি জাননা আমি আমার সারা জীবন ধরে এগুলো সংগ্রহ করেছি।আমার কাছে আজ থেকে ২০০০ বছর আগের কবিতাও আছে।

নুমঃএই কবিতা জিনিসটা কি???আর বই ই বা কি??

ইনাঃএসব শব্দ গত সহস্রাব্দেই বিলীন হয়ে গিয়েছিলো।তাই তুমি জানোনা।কবিতা হচ্ছে কিছু ছন্দময় কথা যেখানে মানুষ তার আবেগগুলো ভিন্নভাবে প্রকাশ করতে পারে।আর এসব কবিতাগুলো লিখে রাখা হতো যেখানে তা হচ্ছে বই।

নুমঃলিখে রাখে মানে?লিখে কিভাবে??এটা কি জিনিস??

ইনাঃঅনেক আগে মানুষ কলম,পেন্সিল এসব দিয়ে লিখত।আমাদের মহাদেশে তো মেজর ব্রেকডাউন এর পর থেকে আবার লেখালেখি শুরু হয়েছিলো।আমরা কালি ব্যবহার করে বিভিন্ন কথা যা আমরা বলি তা লিখে রাখি।

নুমঃঅনেক কঠিন কথা।আমি এগুলো বুঝিনা।

ইনাঃনুম বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে???

নুমঃহ্যাঁ।অ্যাসিড বৃষ্টি।

ইনাঃজানো একসময় আকাশ থেকে শুধু বিশুদ্ধ পানি পড়ত বৃষ্টি হয়ে??আচ্ছা নুম বৃষ্টি নিয়ে একটা কবিতা শুনবে????

নুমঃজানিনা।তোমার ইচ্ছা।

ইনাঃআচ্ছা শোনো...যদিও এই কবিতায় কি বলেছে তা আমিও ভালমত বুঝিনা।তবে বৃষ্টি নিয়ে এটা বুঝি।

                    আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো,গেলো রে দিন বয়ে   

                     বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।

                     একলা বসে ঘরেরকোনে      কি ভাবি যে আপন মনে

                    সজল হাওয়া যূথীর বনে       কি কথা যায় কয়ে।।

                    হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে,খুঁজে না পাই কূল-

                    সৌরভে প্রাণ কাঁদিয়ে তুলে ভিজে বোনের ফুল।।

                   আঁধার রাতে প্রহরগুলি কোন সুরে আজ ভরিয়ে তুলি-

                  কোন ভুলে আজ সকল ভুলি     আছি আকুল হয়ে-

                    বাঁধন হারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।।

 

নুম দেখল ইনা তাঁবুর বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে,তার চোখে পানি,কিন্তু কবিতা না কি যেন ওটা বলছে খুব দৃঢ় স্বরে।হঠাৎ ইনা নুম কে বলল-নুম,চল বৃষ্টি তে ভিজি।নুম অবাক চোখে তাকিয়ে আছে-“তোমার কি মাথা নষ্ট নাকি???বৃষ্টি তে আবার মানুষ ভেজে নাকি??এটা অ্যাসিড বৃষ্টি।এই বৃষ্টি গাঁয়ে লাগলে তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে,আমিও অসুস্থ হয়ে যাবো।জানোনা মানুষের বৃষ্টিতে ভেজা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।ইনা হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে গেলো-“হোক,তাও আমি আজ ভিজবো”।নুম বুঝলো যে মেয়েটা আসলেই মানসিক বিকারগ্রস্ত।

হুলার তার তাঁবুতে বসে ঝিমাচ্ছিলো তখন ই সে দেখতে পেলো ক্রুগার জন্য নিয়ে যাওয়া মেয়েদের কার্গোর একটা মেয়ে তাঁবুর বাইরে এসে বৃষ্টি তে ভিজছে।মেয়েটার নাম যেন কি???রিমাইন্ডার থেকে দেখে নিলো সে।মেয়েটার নাম ইনা।নুম এই মেয়েটাকেই তো মারতে পারেনি,এই মেয়েটাকে মারতে পারলোনা কেন নুম??ওই তো নুম কেও দেখতে পাচ্ছে হুলার।মেয়েটা অনেক শব্দ করছে,চিৎকার করছে।হুলারের ইচ্ছে করছে গিয়ে মেয়েটাকে একটা চড় মেরে আসতে,কিন্তু মেয়েটার হাসি দেখে তার রাগ কমে গেলো।কতদিন পর সে কাউকে হাসতে দেখল।তার ছোট মেয়েটাও অনেক হাসাহাসি করত।কাজে গেলেই প্রতিদিন তাকে বলতো-বাবা,আজ আমার জন্য চকলেট ক্যাপস্যুল এনো কিন্তু।সেদিন ও সে তার মেয়ের জন্য চকলেট ক্যাপসুল এনেছিলো,কিন্তু তার স্লাম এ এসে দেখে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে,তার মেয়েকে ক্রুগার বাহিনী নিয়ে গিয়েছে,স্ত্রী কে মেরে ফেলে রেখেছে।সে তখন কিছুই করতে পারেনি,তার মেয়েকে রক্ষা করতে পারেনি।আজ আবার এই মেয়েটিকে দেখে তার ছোট মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেলো।সে আবার বাইরে তাকালো।দেখল মেয়েটার হাসি,ক্রুগা একেও নিয়ে যাবে।এই হাসি হয়তো তখন আর থাকবেনা।সে দেখল নুম একদৃষ্টে ওই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে।এরকম দৃষ্টি অনেকদিন দেখেনি সে নুমের চোখে।কেন যেন তার হঠাৎ মনে হলো এই মেয়েটার কোনো চিন্তা নেই,নুম এই মেয়েটার কিছু হতে দেবেনা।আচ্ছা এই মেয়েটার নাম যেন কি???হুলার আবার তার রিমাইন্ডার এর দিকে তাকালো.........

 

২৫ ফেব্রুয়ারী...৪০২১ সাল,

হুলার খুব ই চিন্তিত।তারা এখন বরফ অঞ্চলে এসে পড়েছে,সে শুনেছে এদিকটায় নাকি অনিয়ন্ত্রিত কিছু রোবট গ্রুপ ঘোরাফেরা করে।কিন্তু ওদের কাছে এখন তো সায়ানাইড বুলেট গান আর অ্যাসিড গান ছাড়া  কিছুই নেই।এই দুই অস্ত্র মানুষদের জন্য ভয়ংকর হলেও রোবটদের কোন ক্ষতিই করতে পারবেনা,আর রোবটদের কাছে নাকি লেজার পাওয়ার গান আছে।তার কি করা উচিত তা সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা।ক্রুগার সাথে যোগাযোগ করেছে সে একটু আগে কিন্তু ক্রুগা উল্টো তাকে হুমকি দিয়েছে যে যতো সেনা মারা যায় যাক কিন্তু মেয়েদের কার্গোটার যাতে কোন ক্ষতি না হয়।তার ইচ্ছে করছিলো রিমাইন্ডার এর স্ক্রীন এ দেখানো ক্রুগার মুখে এক দলা থুতু দিয়ে দিতে,অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করলো সে।হঠাৎ হন্তদন্ত করে ওদের বাহিনীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর সেনা রীম দৌড়ে এলো...

রীমঃহুলার...হুলার...তুমি তাড়াতাড়ি চল।

হুলারঃকোথায়??কি হয়েছে রীম?

রীমঃহুলার...ওই অনিয়ন্ত্রিত রোবটগুলো আমাদের আক্রমন করেছে।ওদের কাছে অনেক ভারী অস্ত্র আছে।

হুলারঃনুম কোথায়???

রীমঃওকে খুঁজে পাচ্ছিনা।আর মেয়েদের কার্গোর একটা মেয়েকেও পাওয়া যাচ্ছেনা।

হুলারঃতুমি সেনাদের বল আমাদের অ্যাসিড গান দিয়ে ওদের কিছু হবেনা তাও ওদের আক্রমন করতে,ওদের কে অন্য কোন উপায়ে শেষ করতে হবে।আমি আসছি একটু পরে।

রীমঃআচ্ছা হুলার...

হুলার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো,এমন সময় নুম কোথায় চলে গেলো,এরকম পরিস্থিতিতে ও বেশ বুদ্ধির পরিচয় দেয়।হয়তো সময় থাকতে থাকতে এসে পড়বে।

 

হুলার যখন নুমের কথা ভাবছিলো তখন নুম মেয়েদের কার্গো কে এক নিরাপদ জায়গায় রেখে আসতে ব্যস্ত ছিল।নুম ই সবার আগে টের পেয়েছিলো রোবটদের আক্রমন।তাই সে মেয়েদের নিরাপদ অবস্থানে রেখে আসাটাই ভালো মনে করেছিলো,বিশেষ করে ইনা কে।নুম যখন ওদের নিরপদে রেখে আবার চলে যাচ্ছিলো তখন ইনা ওর কাছে এসে ওর হাত টা শক্ত করে ধরল...

“নুম তুমি ফিরে আসবে তো?????”

“হ্যাঁ ইনা।আমি ফিরে আসবো।’

“আমার মাথা ছুয়ে বল।”

“মানে কি???মাথা ছুয়ে বলার কি হল???”

“না তুমি বল।তুমি যদি মাথা ছোঁওয়ার পর ও না আস তাহলে আমি মরে যাবো।”

“আমি না আসলে তুমি এমনিতেও মরে যাবে।”

“জানি,তাও তুমি মাথা ছুয়ে বল।আমার মনে তাহলে একটা বিশ্বাস জন্মাবে।”

নুম ইনার কথা কিছু বুঝলোনা,কিন্তু এটা বুঝল যে ইনার মাথা ছুঁয়ে বললে ওর ভালো লাগবে।তাই সে ইনার মাথা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করে হাঁটা শুরু করলো।কি মনে করে পিছন ফিরে তাকাতেই সে দেখল যে ইনা তার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।নুম এর তখন ই মনে হল যে তার আবার ইনার কাছে ফিরে আসতেই হবে।হ্যাঁ...সে আসবেই...।

 

হুলার দেখল নুম দৌড়ে আসছে তাদের দিকে। তাদের অনেক সেনা মারা গেছে এর মধ্যেই। রোবটরা আপাতত যুদ্ধ থামিয়েছে,আবার কখন শুরু করে কে জানে? তারা এতক্ষণ  শুধু ফাঁকা গুলিই করেছে। সায়ানাইড বুলেট শুধু ওদের একটু দমিয়ে দিয়েছে আর কিছুই করতে পারেনি। হুলার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলোনা তাই নুম কে দেখে সে একটু স্বস্তি বোধ করছে। নুম তার  কাছে  এসে বসলো...... 

 

নুমাঃ আমি মেয়েদের কার্গোটাকে নিরাপদে রেখে আসতে গিয়েছিলাম। এদিকের কি  অবস্থা??? 

হুলারঃ অবস্থা ভালো না। আমরা কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারছিনা। ওরা ওদের লেসার গান দিয়ে সব কিছু উড়িয়ে দিচ্ছে। এখন তুমি ই বলো কি করবো?? আমার মাথায়  তো কিছুই  আসছেনা। 

নুমঃ ক্রুগা কে বলো সাহায্য করতে কিছু। কোনো বুদ্ধি দিতে। 

হুলারঃ ও বুদ্ধি দেবে??? ও বলেছে তার কার্গোর যাতে কোন ক্ষতি না হয়... তোমরা  মরলে মরো... 

নুমঃ হুম... ও তো তাই বলবে। এখন কি করি আমরা??? 

হুলারঃ জানিনা...এখানেই হয়তো মরতে হবে আমাদের।। 

নুমঃ না...আমি মরতে চাইনা...আমার স্লাম এ ফিরে যেতে হবে।আমার বোন টা নিশ্চয়ই  আমার জন্য অপেক্ষা করছে। 

হুলারঃ তাহলে একটা বুদ্ধি বের করো।। 

নুমঃ আমাকে ভাবতে দাও হুলার। 

হুলারঃ ওদের লেসার গান এর সামনে আমাদের কিছু করার নেই।কোনভাবে যদি আমরা  লেসার গান পেতাম কিছু তাহলেই লেসার রশ্মি দিয়ে ওদের উল্টো উড়িয়ে দিতে  পারতাম।। 

নুমঃ আচ্ছা হুলার তোমার মনে আছে তোমাকে একবার বলেছিলাম যে আমার মা বলেছিল  আমাদের রিমাইন্ডারগুলো লেসার রশ্মির প্রতিফলন করাতে পারে? 

হুলারঃ হ্যাঁ তাইতো।।কিন্তু সেটা তো পুরোপুরি না,৭০% পারে আর বাকিটা  প্রতিসরিত হয়ে যায়। 

নুমঃ যাই হোক,ওটুকুই যথেষ্ট। 

হুলারঃ কিন্তু প্রতিসরিত রশ্মি তো আমাদের ও ক্ষতি করবে অনেক।।আর আমাদের সবারই  রিমাইন্ডার খুলে পড়ে গেছে,শুধু তোমার আর আমার টা আছে।দুটো রিমাইন্ডার দিয়ে  ওদের কিছুই হবেনা। 

নুমঃ হুলার তুমি হয়তো জানো না।আমি সবার খুলে যাওয়া রিমাইন্ডার এনে নিজের  কাছে রেখে দিয়েছিলাম।আমি মাঝে মাঝেই দেখতাম সেগুলো বের করে যে এগুলো কিভাবে  খোলে!!যাতে আমার টা খুলতে পারি।কিন্তু কখনোই সফল হয়নি।আমরা সেই রিমাইন্ডারগুলো  কাজে লাগাতে পারি। 

হুলারঃ নুম,আর দেরি করোনা।চল ওগুলো নিয়ে এসে বিভিন্ন পয়েন্টে বসিয়ে দেই।ওরা  হামলা করলেই রিমাইন্ডারে প্রতিফলিত হয়ে যেন ওদেরকেই ধ্বংস করে দেয়,আর আমাদের  ও নিরাপদ  দূরত্বে থাকতে হবে।সেইরকম ভাবেই বসাতে হবে।চল...   ৩০ মিনিট পর...  ইনা ওপর থেকে এক ধ্বংসযজ্ঞ দেখলো এতক্ষণ বসে বসে।।ওর চোখের সামনেই ওদের  তাঁবুতে রোবটরা লেসার গান দিয়ে একের পর এক লেসার ছুঁড়তে লাগলো কিন্তু  বেশীরভাগ  লেসারই আবার কিভাবে যেন প্রতিফলিত হয়ে ওদের দিকে এসে ওদের উড়িয়ে দিলো।। ইনা  দেখলো প্রায়  সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে।রোবটরা ধ্বংস হয়ে গেছে কিন্তু ওদের তাঁবুর ওদিকেও  প্রায় সব  ধ্বংসপ্রাপ্ত।ইনার খুব ভয় হতে লাগলো নুমের জন্য।ও কি আর আসবেনা?নুম ও কি ওকে  ছেঁড়ে  চলে গেলো?এমন সময় ওর কাধে একজনের উষ্ণ স্পর্শ পেলো।পেছনে ফিরে দেখল নুম ওর  দিকে  হাসিমুখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইনা শক্ত করে নুমকে জড়িয়ে ধরল আর বলল-

“নুম আমাকে  ছেঁড়ে কখনো যেওনা কিন্তু,আমি আজ খুব ভয় পেয়েছিলাম।ভেবেছিলাম তুমি হয়তো মারা  গেছো।খুব একা একা লাগছিলো।নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছিলো।আমাকে ছেঁড়ে কখনো যাবেনা  বলো...” 

“হ্যাঁ ইনা,তোমাকে ছেঁড়ে কোথাও যাবনা আমি।তুমি চিন্তা  করোনা।আমি তোমার পাশেই আছি সবসময়।” 

 

আকাশ বেয়ে যখন গনগনে আগুনের কালো ধোয়া উঠে যাচ্ছে তখন ইনা আর নুম দুজন  দুজনকে জড়িয়ে ধরে তাকিয়ে আছে কোন দূর অজানার দিকে...  

 

২৬ ফেব্রুয়ারি...৪০২২ সাল,  কাল আবার যাত্রা শুরু করতে হবে ইউরোপের উদ্দেশ্যে।হুলার ভাবছে আজ যাত্রাবিরতি  দরকার ছিল সবার।সে দেখলো আজও নুমের তাঁবুতে বাতি জ্বলছে।কিন্তু হুলার জানে আজ  নুম  একা নেই তাঁবুতে,ইনা নামের ওই মেয়েটাও আজ ওর সাথে আছে।হুলারের ভয় হচ্ছে যে  তারা দুজনে  হয়তো সেই নিষিদ্ধ ভালবাসার জালে আটকা পড়ে গেছে।হুলার ইচ্ছা করলে নুমকে বাঁধা  দিতে  পারতো,কিন্তু সে দেয়নি কারণ তারও মনে হচ্ছে যে যা হচ্ছে ঠিকই হচ্ছে।ভালবাসাকে  নিষিদ্ধতার বেড়াজালে আটকে রাখা যায়না কখনো।।হুলারও তো ভালবেসেছিলো একটি  মেয়েকে,অনেক আগে।তাকে বিয়ে করে সুন্দর ঘর সাজিয়েছিল।কিন্তু আজ পৃথিবীর  নিষ্ঠুরতায়  তাকে ওই লাল আবছা অন্ধকার আকাশে মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া কোন তারা হয়ে যেতে  হয়েছে।নুমের তাঁবুর বাতি বন্ধ হয়ে গেছে,হয়তো এখন তাদের ভালবাসার উৎসবে জন্ম  নেবে  একদিন পৃথিবীর নতুন কোন প্রজন্ম।হয়তো সে ই হবে নতুন পৃথিবীর প্রথমজন্ম নেয়া  মানুষ।হুলারের আজ মনে কেমন যেন বিশ্বাস জন্মেছে যে পৃথিবী আসলে  টিকে থাকবে,টিকে থাকবে নুম আর ইনার ভালবাসার প্রতীক।এসব ভাবতে ভাবতে আর ওই  অন্ধকার  এক চিলতে আকাশের কোণে হঠাৎ দেখতে পাওয়া এক তারার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে  ঘুমিয়ে পড়লো হুলার।।শান্তির ঘুম...অনেক দিন পর এরকম শান্তির ঘুম ঘুমোতে পারছে  হুলার আর পাশে আস্তে আস্তে বিপ বিপ শব্দ করছে তার পচে যাওয়া হাতের ওপর বেঁধে  রাখা  রিমাইন্ডার......


 

(শেষ পর্ব)

ক্রুগা তার মেগা রিমাইন্ডারের দিকে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে।তার মাথায় ঢুকছেনা তার পাঠানো এত শক্তিশালী রোবট বাহিনী তার ওই গুটিকয়েক সেনাকে মারতে পারলোনা কেন?ক্রুগা চাইছিলো ওইসব সেনাদের ওখানেই মেরে ফেলতে তাই রোবটগুলোকে পাঠিয়েছিলো ওদেরকে শেষ করে দেয়ার জন্য।ওই সেনাদের ক্রুগার আর প্রয়োজন নেই,কারণ সবাই এসে তাদের স্লামে ফিরে যেতে চাইতো,তাই ইউরোপ থেকে দূরে থাকতেই ওদের শেষ করার পরিকল্পনা করেছিলো সে।

তার শুধু ওই মেয়েগুলোকে দরকার ছিলো কিন্তু কিভাবে যেন রোবটগুলোকে তার সেনারা ধ্বংস করে দিয়েছে।হুলারকে বারবার জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও সে কিছুই বলেনি এ ব্যাপারে।ক্রুগা ঠিক করেছে যে হুলার আসলেই ওর মস্তিষ্ক লেসার গান উড়িয়ে দেবে।ক্রুগা খুব ভালমতোই জানে যে হুলার ওকে কতোটা অপছন্দ করে।হুলার যে প্রায়ই ওর মুখোশ পড়া মুখে থুতু দিতে চায় সেটাও সে ভালোমতো জানে।কারণ ক্রুগার রিমাইন্ডার বাকি সবার রিমাইন্ডারের থেকে অনেক বেশী শক্তিশালী।ক্রুগার রিমাইন্ডার আকারে সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর সব রিমাইন্ডারের সাথে সরাসরিভাবে যুক্ত।

 

 

রিমাইন্ডার যখন প্রতিটি মানুষের হাতে বেঁধে দেয়া হয় চামড়া ছাড়িয়ে তখনই অচেতন অবস্থায় তাদের মস্তিষ্কে একটা করে রিমাইন্ডার চিপ ও প্রবেশ করানো হয়।।এই রিমাইন্ডার চিপ আবার ক্রুগার মেগা রিমাইন্ডারের সাথে কানেক্ট করা।।কিন্তু সমস্যা একটাই,ক্রুগা এর সাথে তখনই কানেক্ট অন করতে পারে যখন সে তার রিমাইন্ডারের দিয়ে অন্য কারও রিমাইন্ডারে কথা বলার জন্য সিগন্যাল পাঠায় ও স্ক্রিন এ তার চেহারা ভেসে ওঠে।তখন তাদের মস্তিষ্কে চলা সকল কার্যকলাপ সে বুঝতে পারে।কিন্তু হুলার খুব চালাক,সে আগে থেকেই এ ব্যাপারে জানে তাই বুঝে শুনে চিন্তা করে।।তাও মাঝে মাঝে রাগের বশে বাজে কিছু চিন্তা করলেই ক্রুগা সেটা ধরে ফেলে।হুলার জানতোনা এই ব্যাপারে যদিনা নুম ওকে বলতো এটা।।নুমের মা দ্রুম ছিল ক্রুগার রিমাইন্ডার তৈরির কারখানার প্রধান,ছোটবেলায় নুমকে রিমাইন্ডারের প্রায় সব খুঁটিনাটি জানিয়ে দিয়েছিলো সে।তবে রিমাইন্ডার চিপ আর তার মেগা রিমাইন্ডার সম্পর্কে কিছু জানানোর আগেই দ্রুমকে তুলে এনেছিলো ক্রুগা।এখনও ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে হুলার,কারণ রিমাইন্ডার সম্পর্কে অনেক প্রয়োজনীয় এক তথ্য সে তার মস্তিষ্কে লুকিয়ে রেখেছে।দ্রুমকে অচেতন করে ক্রুগা ১৫ বছর ধরে জানার চেষ্টা করছে যে সে কি জানে রিমাইন্ডার সম্পর্কে কিন্তু দ্রুম কিছুতেই মুখ খুলছেনা।মাঝে মাঝে দ্রুমকে জাগিয়ে ওকে হুমকি দেয়,কিন্তু কিছুতেই লাভ হয়না।।“দেখা যাক আজ কিছু বলে নাকি”,নিজেকেই বলল ক্রুগা।।

 

ক্রুগা ধীরে ধীরে দ্রুম কে যেই *niarb sisylana bed (n.s.b) নিয়ার্ব সিসিলানা বেডে শোয়ানো হয়েছে তার পাশে এসে দাঁড়ালো। দ্রুমকে আস্তে আস্তে চেতনা দেয়া হচ্ছে,পুরোপুরি চেতনা দেয়া হবেনা নাহলে দ্রুম তার ক্ষুরধার মস্তিষ্কের কোন প্যাঁচে ক্রুগাকে ফেলে দেয় কে জানে।

“দ্রুম,তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো”,ক্রুগা দ্রুমের কাছ থেকে একটু দূরে থাকা অবস্থায়ই জিজ্ঞেস করলো।

“হুম,বল ক্রুগা।কি বলতে চাও?”,নির্লিপ্তভাবে বলল দ্রুম।

“তোমার ছেলে নুমকে যে আমি মেরে ফেলেছি দ্রুম।”

“ভালোই করেছো,এরকম পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন মানে হয়না।মরে যাওয়াই ভালো।”

ক্রুগা জোরে জোরে হাসতে লাগলো...“হা হা হা,শোন দ্রুম তোমার ছেলে এখনো বেঁচে আছে কিন্তু বেশিদিন বাঁচবেনা।আর তোমার মেয়ে ও বেঁচে আছে।ওকে আমি যেকোনো সময় তুলে আনতে পারি।আর তুমি তো জানোই মেয়েদের সাথে আমি কি করি। তোমার সাথে কি করেছিলাম ভুলে গেছো?তাই চুপচাপ আমাকে বলে দাও রিমাইন্ডার সম্পর্কে তুমি এমন কি জানো যেটা আমি জানিনা?”

দ্রুম মুচকি হেসে বলল,“ক্রুগা তুমি যা খুশি করো কিন্তু সেই কথা আমি তোমাকে কখনোই জানাবোনা।আর নুমের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে সে ওর বোনের কিছু হতে দেবেনা আর তুমিও ওর কিছুই করতে পারবে না”।

ক্রুগা দ্রুত আবার দ্রুমকে অচেতন করে তার ব্রেইন এনালাইসিস করতে লেগে গেলো।যেভাবেই হোক তার জানতেই হবে এ ব্যাপারে...

* niarb sisylana bed (n.s.b) =brain analysis bed (মস্তিষ্ক বিশ্লেষক যন্ত্র)

 

২ ডিসেম্বর...৪০২১ সাল,

 

নুম একদৃষ্টে ইনার স্ফীত পেটের দিকে তাকিয়ে আছে।“তুমি সত্যি বলছ ইনা?এখানে আমার মানে আমাদের সন্তান আছে?আমিতো ভেবেছিলাম তুমি এমনিতেই মোটা হয়ে যাচ্ছ।” ইনা অট্টহেসে বলল-“হ্যাঁ বাবা,আমাদের সন্তান।আমাদের নিজেদের সন্তান।”নুম অবিশ্বাস ভঙ্গিতে ইনার পেটে হাত বোলাতে দিলো।তার চেহারায় অবর্ণনীয় খুশীর আভাস আর চোখে লবনাক্ত জলের চাকচিক্যও যেন তার আনন্দ প্রকাশে ব্যর্থ।হুলার একটু দূরে হু হু করে কাঁদছে।আজ তার জীবনের সবচেয়ে খুশীর দিন।ইনা মা হবে এই কথা শুনে তার জীবনের সকল সাধ যেন পূর্ণ হয়ে গেছে।এই কয়দিন আগে এই মেয়েটা তাকে বাবা ডেকেছিল,এই ৮-৯ মাসে হুলারকে তার মেয়ের কথা একবারও মনে করতে দেয়নি ইনা।হুলার যেন তার সেই ছোট্ট মেয়েটাকে ফিরে পেয়েছে তার জীবনে।আর এর মাঝেই নুম আর ইনার ভালবাসার প্রতীকের আগমনের সংবাদ শুনে হুলার নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেনি।হুলার কখনো ভাবেনি যে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সে এতোগুলো সুখ একসঙ্গে পাবে।

 

হুলার আর তার দল ইউরোপে প্রায় পৌঁছে গেছে।আর কয়েকদিনের মধ্যেই ক্রুগার শহরে প্রবেশ করবে।এই ৯-১০ মাসে তাদের তেমন কোন বাধার মুখে পড়তে হয়নি।বরং কিছু নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।ইনা মেয়েটা যেন সবাইকে ভালবাসার এক অস্পৃশ্য জালে বেঁধে দিয়েছে।পুরো দল মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা মেয়েদের কার্গো কে ক্রুগার হাতে তুলে দেবেনা বরং তারা ক্রুগাকে ধ্বংস করে দেবে।যদিও তারা জানে এটা অসম্ভব তাও তারা এই ঝুকি নিতে প্রস্তুত।কারণ জীবন আর কয়দিন পর এমনিতেও শেষ হয়ে যাবে তার চেয়ে ভালো ওই মানুষরূপী জানোয়ারটাকে শেষ করে মরে যাওয়া।তারা সবাই তাদের রিমাইন্ডারগুলো আবার নিজ নিজ হাতে বেঁধে নিয়েছে।কারণ ক্রুগার শহরে লেসার গানের চেয়ে ভয়ানক আর কোন অস্ত্র নেই তাই একমাত্র রিমাইন্ডার ই তাদের সুরক্ষা দিতে পারে।নুম সবাইকে রিমাইন্ডারের কার্যকারিতা ভালোমতো বুঝিয়ে দিয়েছে।এটাও বলেছে যে রিমাইন্ডারই ক্রুগার মৃত্যুর কারণ হবে।

 

ইনা আর নুম হাত ধরাধরি করে বসে আছে।সামনে ইউরোপ মহাদেশের সীমারেখা দেখা যাচ্ছে আর লাল আকাশটা আজ কেন যেন আরও বেশী লাল মনে হচ্ছে।

নুমঃআমার খুব ভয় লাগছে ইনা।

ইনাঃভয়?কেন?কিসের ভয়?

নুমঃএই যে আমাদের সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখতে পারবে কিনা তার ভয়।তোমাকে নিয়ে আমার স্লামে ঠিকমতো ফিরতে পারবো নাকি সেই ভয়।

ইনাঃতুমি ভয় পেয়োনা নুম।সব ঠিক হবে আমি জানি।ভালো মানুষদের সাথে সবসময় ভালো হয়।

নুমঃআমিতো ভালো মানুষ না ইনা।আমি কতো মানুষ মেরেছি,কতো ভাইকে বোনহারা করেছি,কতো মাকে ছেলেহারা করেছি।আমি খুব খারাপ।খুব...

ইনাঃহ্যাঁ তা করেছো কিন্তু তুমি একজনের জীবন বাঁচিয়ে তার প্রায়শ্চিত্তও তো করে যাচ্ছ।আমাকে না শুধু তুমি তোমার সব সেনাদের বাঁচিয়েছ।ওই মেয়েগুলিকে বাঁচিয়েছ।কতোগুলো মানুষকে তুমি রক্ষা করে যাচ্ছ দিনের পর দিন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে।তুমি খুব ভালো মানুষ নুম।এই দেখো তোমার মাথা ছুঁয়ে বলছি আমি।

নুমঃকিন্তু যদি আমার খারাপ কাজগুলোর জন্য আমার সন্তান শাস্তি পায় তাহলে আমি তা সহ্য করতে পারবোনা।আমার অনেক স্বপ্ন আমার সন্তানকে নিয়ে।ও কি এই পৃথিবীতে জন্মও নিতে পারবেনা?

ইনাঃঅবশ্যই পারবে।আমি তোমাকে ওয়াদা করছি নুম আমাদের সন্তান কে নিয়ে তোমার স্বপ্ন তুমি অবশ্যই পূরণ করতে পারবে।

নুম ইনার কথা শোনার সাথে সাথে ঝরঝর করে কেঁদে দিলো আর ইনা নুমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।“কাঁদুক আজ নুম,কান্না তো ভুলেই গিয়েছিলো ও।এতদিনের জমানো কষ্টগুলো আজ কান্না হয়ে কিছুটা ঝরে পড়ুক”,নিজেকেই বলল ইনা।ইনার চোখ বেয়েও পানি ঝরে পড়তে লাগলো নুমের রিমাইন্ডার বাঁধা পচে শুঁকিয়ে যাওয়া বাহুতে...

 

৫ ডিসেম্বর...৪০২১ সাল,

অতুল্পা আজ তার ভাই নুমের বাজানো ইনুটটা বারবার শুনছে।কি মায়া করেই না বাজাতো নুম এই ইনুটটা!অতুল্পা নিজ হাতে নুমের জন্য একটা ইটুল্ফ বানিয়ে দিয়েছিলো।সেটা তো নুম নিয়ে গেছে কিন্তু রেখে গেছে এই ইনুট।এই একটাই স্মৃতি আছে তার বড় ভাইয়ের।আজ বারবার এটা শোনার কারণ গতকাল তাদের স্লামে খবর এসেছে যে নুমের সেনারা নাকি সীমান্তের কাছাকাছি এসে পড়েছে।তারা নাকি ক্রুগার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।অতুল্পার খুব ভয় করছে।এতদিন পর তার ভাই এত কাছে এলো কিন্তু সে কি তাকে একবারও দেখতে পারবেনা?ক্রুগাকে শেষ করে লাভ কি আর?পৃথিবীতো আর দুমাস পরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।শুধু শুধু নিজের জীবনটা আগেই খুইয়ে ফেলার দরকার কি?অতুল্পা এত কিছু ভাবতে পারেনা তার কান্না পায়।সে ধীরে ধীরে হেঁটে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় আর ভাবে হঠাৎ করে যদি নুম এসে পড়তো তাহলে আর কিছুই চাওয়ার থাকতোনা তার।একবার আসলে নুমকে সে আর কোথাও যেতেও দিতোনা।এসব ভাবতে ভাবতেই অতুল্পা আচমকা কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ শুনতে পেলো তার পেছনে,উল্টো ঘোরার আগেই রিমাইন্ডারের শক্ত আবরনের আঘাতে অতুল্পা চেতনা হারিয়ে ফেললো...

 

২০ মাইল দূরে ইউরোপ সীমান্তে...

হুলারের দিকে একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে নুম।নুম বুঝে উঠতে পারছেনা কেন হুলার অভিযান পিছিয়ে দেবার কথা বলছে।তার বোন,ইনাকে নিয়ে কি তাহলে সে আর কয়েকটাদিনও কাঁটাতে পারবেনা?

নুমঃহুলার তুমি কেন এই কথা বলছ?তুমি কি জাননা অতুল্পা আমার জন্য অপেক্ষা করছে?আমরা কেন এখনো আক্রমন করছিনা?

হুলারঃআমি জানি নুম।কিন্তু এখন আক্রমন করা মানে নিশ্চিত পরাজয়।ক্রুগা জেনে গেছে যে আমরা ওর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি।ও এখন ওর সমস্ত শক্তি নিয়ে আমাদের অপেক্ষা করছে।

নুমঃতাহলে আমরা কবে কি করবো?পৃথিবী তো আর ২৫ দিন পরে ধ্বংস হয়ে যাবে।তখন এমনিতেও ক্রুগা মারা পড়বে।আমরাও মারা পড়বো।

হুলারঃনা নুম...তুমি বলেছিলে না পৃথিবী টিকে থাকবে,কিছু হবেনা।আর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আমরা ক্রুগাকে খুন করেই মরব।ওকে আমাদের হাতেই মরতে হবে।আমরা ঠিক ৩১ ডিসেম্বর আক্রমন করবো।আমি নিশ্চিত ক্রুগা তখন কল্পনাও করবেনা যে আমরা ঠিক শেষ মুহূর্তে ওকে আক্রমন করবো।আর ততদিনে হয়তো ইনা আর তোমার সন্তান ও পৃথিবীতে এসে পড়বে।

“হ্যাঁ নুম,বাবা ঠিকই বলছে।আমাদের কোন ধরনের ঝুঁকি নেয়া যাবেনা”,ইনা হঠাৎ করে ওদের তাঁবুতে ঢুকে বলল।তোমাদের সেদিনই আক্রমন করা উচিত।আর আমার আর এমিলিনের চিন্তা করোনা তোমরা।

“এমিলিনটা কে আবার?”,হুলার জিজ্ঞেস করলো।

“এমিলিন হচ্ছে আমাদের মেয়ের নাম”।নুমের দিকে চোখ টিপি দিয়ে বলল ইনা।

নুম হা করে ইনার দিকে তাকিয়ে বলল“তুমি নিজে নিজে নাম দিয়ে দিলে?আমাকে বললেও না?আর তুমি কিভাবে জানলে যে আমাদের মেয়ে হবে”।

“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমাদের মেয়ে হবে।আর আমার এই নাম ই পছন্দ।আমাদের ছেলে হলেও এই নাম ই রাখতে হবে।এটাই শেষ কথা”।

হুলার হো হো করে হেসে বলল,“হ্যাঁরে,ভালো নামই রেখেছিস।আমার নামের সাথে অনেকটা মিলে যায়”।

“তোমার নামের সাথে আবার কোনদিক দিয়ে মিলে গেলো হুলার?”,নুম চোখ কপালে তুলে বলল।

 

নুমের এই অবস্থা দেখে ইনা আর হুলার দুজনেই হেসে ফেলল।“হায়রে আমার যোদ্ধা,রসিকতাও তুমি বোঝনা।”বলেই হাসতে লাগলো ইনা।

নুম ও হেসে ফেলল।ওদের ৩ জনের হাসি যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো ইউরোপের সীমান্তে,অনিশ্চয়তার লাল মেঘ যেন সরে যাচ্ছিলো পৃথিবী থেকে,খুব ধীরে ধীরে।অপরদিকে অতুল্পাকে নিয়ার্ব সিসিলানা বেডে অচেতন করে রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল তখন ক্রুগা।নিজের মুখোশটা অনেকদিন পরে আজ খুলল সে।দেখা যাক নিজের মেয়েকে দেখে কিছু বলে নাকি আজ দ্রুম,ভাবলো ক্রুগা।এক কুৎসিত হাসি দিয়ে সে তাকিয়ে থাকল নিয়ার্ব সিসিলানার স্বচ্ছ কাঁচের দিকে।কিছুক্ষণ নিজেকে দেখে আবার তাকালো অচেতন অতুল্পার দিকে।আজ সমকামিতার স্বাদ নেয়া থেকে তাকে কেউ বিরত করতে পারবেনা।দ্রুমকে জাগিয়ে দেয়া যাক,তাহলে নিজের চোখেই তার মেয়ের এই অবস্থা দেখে রিমাইন্ডারের সব গোপন তথ্য ফাঁস করে দেবে নিশ্চয়ই,নিজেকেই বলল ক্রুগা।আস্তে আস্তে তার মেগা রিমাইন্ডারে দ্রুমকে চেতনা দেয়ার নির্দেশ দিয়ে অতুল্পার দিকে এগিয়ে গেলো ক্রুগা...

 

৩১ ডিসেম্বর...৪০২১ সাল                                রিমাইন্ডারে নুমের সময় বাকি-১২ ঘণ্টা ০২ মিনিট

সকাল ১০ টা ৫৮ মিনিট,                                রিমাইন্ডারে হুলারের সময় বাকি-৫ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট

 

                            পৃথিবী ধ্বংস হতে সময় বাকি-১৩ ঘণ্টা ৩ মিনিট

 

নুম বিস্ফোরিত চোখে ইনার দিকে তাকিয়ে আছে।পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার শেষ দিনই ইনার প্রসব বেদনা উঠেছে।নুম আর হুলার কেউই বুঝতে পারছেনা তারা কি করবে।রীম বলেছে যে ক্রুগাকে আক্রমন করার দরকার নেই কোন।ইনার সন্তান জন্ম হোক,সবাই একসাথে থাকুক।শেষ সময়টুকু সবাই একসাথে কাটাই।এর মাঝে খবর এসেছে যে নুমের বোন অতুল্পাকে বেশ কিছুদিন আগেই ক্রুগা তুলে নিয়ে গেছে।নুম এখন পাগলপ্রায়।একদিকে ইনা তার সন্তানকে জন্ম দিচ্ছে আরেকদিকে তার বোনকে উদ্ধার আর ওই নরপিশাচ ক্রুগাকে হত্যা করা।নুম কোথায় যাবে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা।সে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।ইনা হঠাৎ বিড়বিড় করে কি যেন বলতে লাগলো।নুম আর হুলার এগিয়ে গেলো তার কাছে।

ইনাঃনুম...নুম।।

নুমঃহ্যাঁ ইনা বল আমি শুনতে পাচ্ছি।

ইনাঃনুম...তুমি যাও।আমি আমার এমিলিনের কিচ্ছু হতে দেবোনা।তুমি যাও।ওই ক্রুগাকে ধ্বংস করে দাও।ওর জন্য পৃথিবীর আজ এই অবস্থা।পৃথিবীকে আবার নতুন করে গড়তে হবে।সেই নতুন পৃথিবীতে ওর মতো মানুষকে থাকতে দেয়া যাবেনা।তুমি যাও নুম।বাবা তুমিও যাও।

নুমঃআমি যাবো ইনা।আমি যাবো।আমি তুমি আর এমিলিন আমরা সবাই আবার এক হবো।তুমি আমাকে তোমার কুব রিডার থেকে কবিতা শোনাবে তখন আমি আর এমিলিন তোমার পাশে বসে থাকবো।তুমি ভেবোনা ইনা আমি ফিরে আসবো।

ইনাঃআমার মাথা ছুঁয়ে বল নুম।বল...

নুমঃহ্যাঁ ইনা তোমার মাথা ছুঁয়ে বলছি।আমি এসে তোমাকে আর এমিলিনকে নিয়ে যাবো।অবশ্যই নিয়ে যাবো।

ইনা নুমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো।নুম ইনার হাতে,পেটে চুমু খেয়ে তাবু থেকে বের হয়ে গেলো।ইনা তাকিয়ে রইল নুমের যাওয়ার পথের দিকে।তার চোখে জল নেই কিন্তু বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় বেয়ে দুঃখগুলো যেন অগ্নুৎপাতের লাভার মত তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে সব ছাড়খাড় করে দিচ্ছে।

হুলার এসে ইনার মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়েদের কার্গোর সবাইকে আর কয়েকজন সেনাকে সেখানে রেখে নুমের সাথে সাথে হাঁটতে শুরু করলো।হুলার কিছু বলতে পারলনা ইনাকে।আসলে সে আবেগের কথা বলতে পারেনা।হুলারের মনে হচ্ছে যে সে আর এখানে আসবেনা।ইনাকে আর দেখতে পারবেনা কখনো।আজ আবার তার ছোট মেয়েটার কথা বারবার মনে পড়ছে।হুলার কি ভেবে আকাশের দিকে তাকালো।আজ খালি চোখেই মঙ্গলের পৃষ্ঠ দেখা যাচ্ছে।লাল মেঘ নাকি ধোয়া ঘিরে ফেলেছে প্রায় আকাশটা,সূর্য তো ঢেকে গেছে আগেই আজ আকাশটাও পুরোটা ঢেকে গেলো।কেমন যেন আবছা লাল লাগছে সবকিছু,তার ছোট মেয়ের লাজুক চিবুকের মতো লাল,তার স্ত্রীর বুক থেকে ঝরা রক্তের মতো লাল,তার হাতে বাঁধা ওই রিমাইন্ডারের পাশে পচে যাওয়া মাংসের মতো লাল।দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে কিছুক্ষণ পরেই পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে মঙ্গল।শুধু শুধুই এতদিন মিছে আশা দিয়েছিলো নুম যে পৃথিবীর কিছু হবেনা।হুলার এসব ভাবতে ভাবতে কেমন যেন হতাশ হয়ে গেলো কিন্তু নুমের দিকে তাকাতেই তার হতাশা শক্তিতে পরিণত হল।নুমের চোখে মুখে আজ যেই সোনালী দিপ্তি তা যেন চারপাশের এত সব লালকেও হার মানিয়েছে।হুলারের মনে জোর এসে পড়লো হঠাৎ।তার মনে হচ্ছে রিমাইন্ডারে লাল লাল আলোতে দেখানো ওই ৫ ঘণ্টাই তার জীবন এখন।এই ৫ ঘণ্টার মধ্যেই ক্রুগাকে ধ্বংস করে দেবে সে।এরপর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেও আর দ্বিধা নেই তার।

 

                                                             রিমাইন্ডারে নুমের সময় বাকি-৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট

দুপুর ২ টা ৪৭ মিনিট,                                   রিমাইন্ডারে হুলারের সময় বাকি-১ ঘণ্টা ৩২ মিনিট

 

                            পৃথিবী ধ্বংস হতে সময় বাকি-০৯ ঘণ্টা ৩ মিনিট

হুলার,নুম আর প্রায় ২৫০ জন সৈন্য ক্রুগার বিশাল বাড়িটি ঘিরে ফেলেছে।কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে আশেপাশে তারা ক্রুগার কোন সেনাকেই দেখতে পারছেনা।আলো এখন প্রায় নেই বললেই চলে,শুধু লাল আভা চারপাশে।সেই আবছা আলোতেই তারা পর্যবেক্ষণ করছে বাড়িটা বিগত ১ ঘণ্টা ধরে।

“আমার মনে হয় সবাই চলে গেছে ক্রুগাকে একা ফেলে।পৃথিবী ধ্বংস হতে আর বেশী সময় বাকি নেই তাই হয়তো সবাই ভেগেছে”,নুমের দিকে তাকিয়ে বলল হুলার।

“আমার কিন্তু তা মনে হয়না।আমারতো মনে হচ্ছে সবকিছু সাজানো।যাতে আমরা বিনা বাধায় ভেতরে ঢুকতে পারি আর ওরা ক্যাঁক করে আমাদের ধরে ফেলতে পারে”,নুম বলল।বাকি সবাই ও নুমের কথায় সায় দিলো।

হুলার নুমকে কানে কানে এসে বলল-নুম আমার আর বেশী সময় নেই।তোমারও নেই তেমন।আমাদের এখনই আক্রমন করতে হবে।তাছাড়া কোন উপায় নেই।নুম হুলারের কথা শুনে চুপ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলো।তারপর জোর গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল-শোন তোমরা,আমরা কিছুক্ষণ পর হয়তো মারা যাবো,সেটা ক্রুগার বাহিনীর লেসারের আঘাতেই হোক আর ওই প্রায় কাছে চলে আসা মঙ্গলের আঘাতেই হোক।কিন্তু এখন মরার আগে আমাদের ক্রুগাকে ধ্বংস করে মরতে হবে নাহলে হয়তো আমরা মরেও শান্তি পাবোনা কেউ।এতদিন আমরা হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে মেরেছি শুধু নিজেরা বেঁচে থাকার জন্য কিন্তু আজ আমাদের ক্রুগাকে ধ্বংস করতে হবে গৌরবের সাথে মরার জন্য।তোমরা বল এখন কি চাও?কাপুরুষের মতো এতোগুলো নিরীহ মানুষের হত্যার দায় নিয়ে আর কিছুক্ষন বেঁচে থাকা নাকি ওই

ক্রুগাকে আমাদের রিমাইন্ডারের এই ধারালো ধাঁর দিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দায়মুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা?

নুমের কথা শুনে সাথে সাথেই সেনারা ক্রুগার বাড়ির লেসার লেয়ার দেয়া দেয়াল টপকে দৌড়ে যেতে লাগলো ক্রুগাকে ধ্বংস করার জন্য।নুম মৃদু হেসে হুলারকে নিয়ে প্রাণপণে তাদের পেছনে দৌড়াতে লাগলো।এত হইচইের মাঝেও তারস্বরে বিপ বিপ করে চলেছে হুলার আর নুমের রিমাইন্ডার।বারবার যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সময় প্রায় শেষ তাদের...

 

মঙ্গলগ্রহ দুর্বার গতিতে ছুটে আসছে পৃথিবী বরাবর।আর মাত্র ৮ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট ১৯ সেকেন্ড পর তা আঘাত করবে পৃথিবীকে।ক্রুগা একদম ঠিক বলেছিল তার গবেষণা অনুযায়ী যে মঙ্গলের আঘাতে পৃথিবী একদম চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।কিন্তু ঠিক একই সময়ে মঙ্গলের এই গতিপথের মাঝ দিয়ে যে এক বিশাল গ্রহাণুর (যদিও মঙ্গলের চেয়ে ২০০ গুন ছোট,কিন্তু গতি ঠিক ২০০ গুন বেশী ) গতিপথ পড়ে গেছে তা ক্রুগা তার গবেষণায় দেখেনি।এখন দেখার বিষয় যে পৃথিবীতে মঙ্গল আঘাত হানার আগে ওই গ্রহাণুর সাথে তার সংঘর্ষ হয় নাকি!যদি হয় তাহলেও হয়তো পৃথিবীতে মঙ্গলের বড় একটা অংশ এসে আঘাত হানবে।হয়তো তাতেই পৃথিবী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।আর পুরোপুরি যদি নাও হয় তাও পৃথিবীর অর্ধেকের বেশী অংশ হয়তো ধ্বংস হবে।এখন পৃথিবী পুরোপুরি ধ্বংস হবে কি না সেটা শুধু সময় ই বলতে পারে।সময় আর বেশী বাকি নেই,মাত্র ৮ ঘণ্টা ২৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড...

 

 

১ জানুয়ারি...৪০২৯ সাল, নুম দীঘির জলে দুই পা ডুবিয়ে বসে আছে আর তার হাতের শুঁকিয়ে যাওয়া ক্ষতটা বারবার পানি দিয়ে ধুচ্ছে।এই ক্ষতটা কিভাবে হয়েছে তার এই মুহূর্তে মনে আসছেনা কিন্তু পানি ঢালতে বেশ ভালোই লাগছে।আজ বেশ রোদ উঠেছিলো তবে এখন আস্তে আস্তে মেঘ করছে আকাশে।।সূর্যের পাশে লাল রঙের আধেক একটা গ্রহের মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে।নুমের এই মুহূর্তে ওই গ্রহের নামটাও মনে আসছেনা।কি যেন “ম” দিয়ে ছিল নামটা।নুম বেশী ভাবতে পারেনা,মাথা ধরে যায়।নুম হঠাৎ খেয়াল করলো তার পাশে একটা ছোট মেয়ে এসে বসে আছে কিন্তু সে টেরই পায়নি।মেয়েটা নুমের দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে।

“আমাকে চিনতে পারছোনা নুম,তাইনা?”,হাসি হাসি মুখ করেই বলল মেয়েটা।

“না চিনতে পারছি তো”।

“বলতো তাহলে আমার নাম কি?”

“তোমার নাম এমিলিন”।

এমিলিন হা করে নুমের দিকে তাকিয়ে বলল-“তুমি কিভাবে মনে রাখলে?”

“তা তো জানিনা”।এবার নুম ও হাসি হাসি মুখ করে বলল।

এমিলিন ঠোঁট উল্টে অভিমান করে বসে আছে এখন।ওর অভিমান দেখে নুমের কার ছবি যেন বার বার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে কিন্তু সে তাকে চিনতে পারছেনা।নুমের আবার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেলো।তাও সে এমিলিনের দিকে তাকিয়ে বলল-এমিলিন তোমার হাতে ওটা কি?

“এটা কুব রিডার।তোমাকে বলেছি তো কতবার।মনে নেই?”,নুমকে ভুলে যেতে দেখে আবার মজা পেয়ে হেসে উঠলো এমিলিন।

“না মনে নেই”,বলেই ফিক করে হেসে দিলো নুম।

হঠাৎ করেই মেঘের ভারী গর্জন শোনা গেলো,সাথে সাথেই বলতে গেলে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো।দীঘির জলে নুম আর এমিলিনের ছায়া ঝাপসা হয়ে গেলো চোখের পলকেই।“চল ভেতরে যাই নুম”,নুমের হাত টানতে টানতে বলল এমিলিন।কিন্তু নুম এক চুল ও নড়ল না।সে তাকিয়ে আছে আকাশের কালো কালো ওই মেঘের দিকে।চোখের পলক পড়ছেনা তার,বৃষ্টির ফোঁটা ওই পলকহীন চোখেই সজোরে আঘাত করছে কিন্তু নুমের কোন বিকার নেই।এমিলিন শুনতে পেলো নুম খুব আস্তে আস্তে কিন্তু স্পষ্ট স্বরে কিছু বলছে...

 

                      আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো,গেলো রে দিন বয়ে 

                           বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।

                    একলা বসে ঘরের কোনে      কি ভাবি যে আপন মনে

                    সজল হাওয়া যূথীর বনে       কি কথা যায় কয়ে।।

                    হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে,খুঁজে না পাই কূল-

                    সৌরভে প্রাণ কাঁদিয়ে তুলে ভিজে বনের ফুল।।

                   আঁধার রাতে প্রহরগুলি কোন সুরে আজ ভরিয়ে তুলি-

                  কোন ভুলে আজ সকল ভুলি  আছি আকুল হয়ে-

                    বাঁধন হারা...বাঁধন হারা...বা...বা...

 

এমিলিন কুব রিডার থেকে মুখ তুলে বলল-বাঁধন হারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।।নুম এমিলিনের দিকে তাকিয়ে মৃদুভাবে হাসল।এমিলিন বুঝতে পারছে যে তার বাবার স্মৃতিশক্তি দিন দিন উন্নত হচ্ছে।এভাবেই চালিয়ে যেতে হবে।তাহলে একদিন হয়তো বাবা তাকে তার মেয়ে বলে ডাকবে।এমিলিন আঙ্কেল রীমের দেয়া তার মায়ের কুব রিডার দেখে সব জেনেছে।মা সেখানে তার সব কথা লিখে গিয়েছে।এগুলো সে পড়ে পড়ে তার বাবা মা সম্পর্কে জেনেছে।এমিলিন নুমের বোন অতুল্পার কাছ থেকেও সব শুনেছে।যদিও সবকিছু সে বোঝেনা তাও মনোযোগ দিয়ে শোনে সবার কাছ থেকে।কারণ কারোই পরে সেই কথা আর মনে থাকেনা।তাই সে তার ছোট্ট রিমাইন্ডারে অর্থাৎ তার ব্রেইনে সব সেভ করে রাখে।তার বাবার হাতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে তার হাতে কিভাবে রিমাইন্ডার লাগানো হয়েছিলো।এমিলিনের খুব কষ্ট লাগে কিন্তু মা তাকে কুব রিডারে লিখে দিয়ে গেছে যে তাকে শক্ত হতে হবে।তাই এমিলিন খুব শক্ত হয়ে থাকে।এমিলিন জানে তার বাবা খুবই সাহসী একজন মানুষ তার নানু হুলার ও। নুম হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে গিয়েছিলো।এমিলিন তার হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো বাড়ির দিকে।নুমের মাথায় তখন একটাই নাম ঘুরছে-ইনা...ইনা।কিন্তু ইনা যে কে সেটা তার মনে আসছেনা।এমিলিন নুমের দিকে তাকিয়ে বলল-“নুম ইনা আমার মার নাম,আর তুমি আমার বাবা।তোমাকে এই কথা যদিও আমি ৩৯৮৬ বার বলেছি তাও আজ আবার বলছি।তোমার এটা মনে রাখতে হবে,ঠিক আছে?কারণ আমি ই তোমার রিমাইন্ডার।বেস্ট রিমাইন্ডার ইন দিস হাফ-ওয়ার্ল্ড”।

নুম মাথা নেড়ে সায় দিলো তার কথায়।এখন আবার নুমের মাথায় আরেকটা শব্দ ঘুরছে...“রিমাইন্ডার,রিমাইন্ডার...”।উহ...কবে যে এইসব ঘুরোঘুরি বন্ধ হবে মাথায় কে জানে????

 

 

(রিমাইন্ডার সম্পর্কে ২ টি তথ্য দ্রুম গোপন করে রেখেছিলো ক্রুগার কাছ থেকে-

১।রিমাইন্ডার লেসার রশ্মি অর্ধেকের বেশী প্রতিফলন করতে পারে।বাকিটা প্রতিসরিত করে।

*এই কাজটা সে করেছিলো কারণ রিমাইন্ডার তৈরির সময় সে দেখেছিলো যে ক্রুগার প্রায় সব প্রধান অস্ত্রই লেসার রশ্মি কেন্দ্রিক।সে বুঝেছিল যে এই অস্ত্র দ্বারাই সে পৃথিবীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে।তাই রিমাইন্ডারের সমগ্র পৃষ্ঠ কে সে লেসার রশ্মি প্রতিফলক হিসেবে বানায়।এই তথ্যটি সে ক্রুগাকে বলে দিয়েছিলো যখন ক্রুগা অতুল্পার ওপর নির্যাতন করছিলো।

২।ক্রুগার মেগা রিমাইন্ডার লেসার রশ্মি প্রতিফলন করেনা বরং পুরোটাই ৫ ডিগ্রি কোণে প্রতিসরিত করে।

 

*এই তথ্য সে ক্রুগাকে দেয়নি।যার ফলে হুলার,নুম ও তার বাহিনী যখন ক্রুগাকে আক্রমন করে তখন ক্রুগার সেনারা ভেতরে তাদের সাধারন রিমাইন্ডার আর লেসার ব্যবহার করে ওদের প্রায় পরাজিত করে দিয়েছিলো।কিন্তু নুম ও হুলার কোনমতে ভেতরে পৌঁছে ক্রুগাকে আক্রমন করে।ক্রুগা তার অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘের এবং সবচেয়ে শক্তিশালী লেসার ব্লাস্টার দিয়ে হুলারকে মেরে ফেলে কিন্তু নুমের সাধারন লেসার তার মেগা রিমাইন্ডার দিয়ে প্রতিফলিত করতে গিয়ে দ্রুমের ফাঁদে পড়ে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।ক্রুগা যে একজন নারী এবং সমকামী তা নুম তখন জানতে পারে।সময়ের আগে নুমের টার্গেট পূরণ হওয়ায় নুমের রিমাইন্ডার খুলে যায় এবং সে তার মা ও বোনকে নিয়ে তার স্লামে ফিরে আসে।রিমাইন্ডার খুলে যাওয়ায় নুম ইনার কথা ভুলে যায়।অপরদিকে মঙ্গলগ্রহ অন্য এক গ্রহাণুর সাথে ধাক্কা লেগে তার কক্ষপথ বদলে পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে  চলে যায়।কিন্তু সেই গ্রহাণু তার কক্ষপথ বদলে পৃথিবীকে এসে আঘাত করে যার ফলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।এখন শুধু ইউরোপ,এশিয়া আর ওশেনিয়া মহাদেশ আছে পৃথিবীতে।আর ইনা নুমের অপেক্ষা করতে করতে ঠিক ১২:০১ মিনিটে এমিলিনকে জন্ম দিয়ে মারা যায়।

 

মারা যাওয়ার আগে রীম কে তার কুব রিডার দিয়ে যায় আর বলে যায় এমিলিন ৬ বছরের হলে তাকে এই কুব রিডার দিতে,এখানে সে তার আর নুমের সব কথা নোট করে রেখেছে।ইনা তার কুব রিডারে একটা রিমাইন্ডার বসিয়ে যায় যাতে তা ঠিক ৬ বছর পর রীমকে এই কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।নতুন এক পৃথিবীর শুরু হয় এরপর থেকে।যেখানে কোন রিমাইন্ডার নেই,যার ফলে মানুষ তার স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে।হঠাৎ হঠাৎ কিছু মনে পড়ে তার কিন্তু পরক্ষনেই তা ভুলে যায়।তবে গত ৭ বছরে মানুষ রিমাইন্ডারের ওপর নির্ভরশীলতার ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছে।এভাবেই হয়তো একদিন পৃথিবীর মানুষ আবার স্বনির্ভর হবে,এই আধেক পৃথিবীতেই আবার গড়ে উঠবে নতুন সব সভ্যতা,নতুন সব সৃষ্টি।পৃথিবীর মানুষ আবার বাঁচতে শিখবে,বাঁচাতে শিখবে।হাতে বাঁধা রিমাইন্ডার দিয়ে নয় পৃথিবী জয় করতে শিখবে মস্তিষ্কে বসানো রিমাইন্ডার দিয়ে.........

 

................. সমাপ্ত .................

 

নির্ঘণ্টঃ

 

*রিমাইন্ডার=একটি কাল্পনিক যন্ত্র, যা দিয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ, অনুসরণ, যোগাযোগ, মস্তিস্কের অনুভূতি হরণ ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘের লেসার রশ্মি প্রতিফলন করতে পারে।

*ইনুট-একধরনের সুর।(tune=enut)

*ইটুল্ফ-এক প্রকার বাঁশি।(flute=etulf)

*কুব রিডার-এক প্রকার ই-বুক,যেখানে অনেক গুলো বই সংরক্ষণ করা যায় ও নিজের লেখাও নোট করে রাখা যায়। (book=koob)

*niarb sisylana bed (n.s.b) = brain analysis bed (মস্তিষ্ক বিশ্লেষক যন্ত্র)

*যে কবিতাটি ব্যবহার করেছি তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঞ্চয়িতা কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন করা হয়েছে।

 

 

উৎসর্গ - এখানে যাদের নাম উল্টো করে ব্যবহার করেছি তাদের।

সর্বপ্রথম, নুম (noom) = মুন, moon (মানে আমি)।

ইনা (ina) = অ্যানি (ani)। আমার বন্ধু। খুব কম সময়ে খুব কাছের একজন হয়ে গেছে।

অতুল্পা (atulpa) = আপ্লুত (apluta), সুষমা আপ্লুত। আমার আপন বোনের চাইতে কোন অংশে কম ভালোবাসিনা তাকে।

এমিলিন (amileen) = নীলিমা (neelima)। আমার মেয়ের নাম। হয়নি এখনো তবে আগেই নাম রেখে দিয়েছি।

 

আর সবশেষে নিজের একটা কথা-

 

চেষ্টা করেছি একটু ভিন্নভাবে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখার। সময় প্রচুর লেগেছে, কষ্ট ও অনেক হয়েছে। কিন্তু এরকম একটা গল্প লিখে নিজের খুব আনন্দ লাগছে। সেই আনন্দটা তাই পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করে নিলাম।

 

 

Share