স্বপ্নচোর

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 823 বার দেখা হয়েছে

১.

ড.এনায়েত উল্লাহ রুদ্রের দিকে এক পলকে তাকিয়ে আছেন।ছেলেটা নাকি কোন কথা বলছেনা কারো সাথে।না কথা বলাটাই অবশ্য স্বাভাবিক।যেই ছেলে ২৫ বছর পর কোমা থেকে বের হয়েছে তার কারও সাথে কথা বলাটাই বরং অস্বাভাবিক।৫ বছর বয়সে গাড়ি দুর্ঘটনায় রুদ্রর মা-বাবা মারা গেলেও রুদ্র বেঁচে যায়।তবে মস্তিষ্কে গুরতর আঘাত পাওয়ায় সেরিব্রাল কর্টেক্স ও সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের বেশ কিছু টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয় মারাত্মকভাবে। অচেতন অবস্থার এই অপরিবর্তনীয় জগতে ২৫ বছর ধরে সে নিঃস্ব ভ্রমন করেছে।অবশেষে এমন সময় জেগে উঠেছে যখন পৃথিবীতে তার আপনজন বলতে আর কেউ বেঁচে নেই।

ড.এনায়েত উল্লাহ রুদ্রর দিকে একটা ফল বাড়িয়ে দিলেন।রুদ্র কতক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলো,তারপর হাত বাড়িয়ে ফলটা নিলো।এনায়েত উল্লাহ দেখলেন যে রুদ্রর হাতে বেশ কয়েকটা আঁচড় আর ক্ষত।এরকম অনেক ক্ষত তিনি গত ২৫ বছর ধরে দেখেছেন রুদ্রর শরীরের বিভিন্ন জায়গায়।রুদ্রকে কেউ আঘাত করেনি,রুদ্রর নিজের করার তো প্রশ্নই আসেনা।তাও প্রতিদিন এসে তিনি দেখতেন রুদ্রর সারা শরীরে ক্ষত,ধুলোবালি,রক্ত।এই রহস্যের সুরাহা এখনো হয়নি। কিন্তু এর চেয়েও বড় রহস্য লুকিয়ে আছে রুদ্রর মাঝে।কারণ যখন রুদ্র কোমায় যায় তখন তার বয়স ছিল ৫।২৫ বছর পর জেগে ওঠার সময় তার ৩০ বছর হয়ে যাওয়ার কথা,শরীরে নানা পরিবর্তন আসার কথা,যেমন দাড়ি-গোঁফ ওঠা,দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বাড়া,বিভিন্ন অঙ্গ সুগঠিত হওয়া।কিন্তু তিনি এই ২৫ বছর ধরে দেখছেন যে ছেলেটার শরীরের বৃদ্ধি খুব ধীরে ধীরে হচ্ছে।এখনো রুদ্রর সব অঙ্গ সুগঠিত নয়,সদ্য দাড়ি-গোঁফের রেখা দেখা যাচ্ছে।৩০ বছরের যুবককে এখনো ১৬-১৭ বছরের কিশোরের মতো লাগছে এবং এমনকি তার সব মেডিকেল রিপোর্ট ও তাই বলছে।

 

ড.এনায়েত উল্লাহ তার জীবনের ২৫ টি বছর এই ছেলের পেছনে খরচ করেছেন।নিজের নার্সিং হোমে রেখে ওর চিকিৎসা করিয়ে যাচ্ছেন।শুধু জানতে যে কিভাবে একজন মানুষ পৃথিবীতে ৩০ বছর ধরে থাকার পর ও তার বয়স ৩০ হয় না?কিভাবে ক্ষতগুলো তার শরীরে সৃষ্টি হচ্ছে?কিভাবে সে এখনো কিশোর?কেন সে তরুন হয়নি?এমন হতো যে তার কোন বৃদ্ধি ই হতোনা তাহলে একটা কথা ছিল।কিন্তু তা তো না,রুদ্রর শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছে।কিন্তু স্বাভাবিক গতিতে না।ড.এনায়েত উল্লাহ প্রথম প্রথম ধরতে পারেননি রুদ্রর দেহের এই অসঙ্গতি।কিন্তু ৪-৫ বছর পর ও যখন রুদ্রর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছিলনা তখন তিনি কৌতূহলী হয়ে পড়েন।আর এখন তো তিনি পাগলপ্রায়।এই ছেলে যদি তাকে জানাতে পারে যে কিভাবে তার বয়স ধীরলয়ে এগুচ্ছে?এর পেছনের কারণ কি?তাহলে তিনি জগৎবিখ্যাত হয়ে যাবেন।খ্যাতির নেশায় এখন পাগল তিনি।২৫ বছর অপেক্ষা করেছেন এই দিনটির জন্য যে কখন রুদ্র উঠবে,আর আজ সে তার সামনে বসে আছে।কিন্তু কোন কথা বলছেনা কোন।এটাই সমস্যা।

 

“আপনাকে আমি দেখেছিলাম।”,হঠাৎ করেই রুদ্র কথা বলে উঠলো। 

 

ড.এনায়েত উল্লাহ প্রায় লাফিয়ে উঠে রুদ্রর কাছে গিয়ে বসলেন,“তাই নাকি?কই দেখেছিলে?”

“মনে নেই।কিন্তু আপনি আমাকে ধরার চেষ্টা করছিলেন আর আমি পালাচ্ছিলাম এটা মনে আছে।আপনাকে অনেকবার দেখেছি।প্রতিবারই আপনি আমাকে ধরতে চান।”

ড.এনায়েত উল্লাহ হতভম্ব হয়ে গেলেন।তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন যে রুদ্র তার দেখা স্বপ্নগুলোর কথা বলছে।এনায়েত উল্লাহ মাঝে মাঝে রাতে এই স্বপ্নটা দেখেন যে রুদ্র দৌড়াচ্ছে আর তিনি ওকে ধরার জন্য ছুটছেন।কিন্তু সেটা তো তার স্বপ্ন,রুদ্র তার কথা জানলো কিভাবে?

“আর কি কি দেখ তুমি রুদ্র?”ড.এনায়েত উল্লাহ কোনমতে নিজেকে সামলে বললেন।

“অনেক কিছু।আমি এখানে শুয়ে আছি কেন?আমিতো অন্য জায়গায় ছিলাম।সেখানে আমাকে আটকে রেখেছিলো কতোগুলো লোক।আমাকে  মারধোর করছিলো।তারপর আমি  বসে বসে কাঁদছিলাম।তারপর  হঠাৎ করেই এখানে এসে পড়লাম।”

“তুমি বোধহয় স্বপ্ন দেখছিলে  রুদ্র।”,নিজের কথাটা নিজের  কানেই কেমন যেন বেখাপ্পা শোনাল ড.এনায়েতের।

“আমার মাথা খুব ব্যাথা করছে।উহ...আপনি এখন যান।”,রুদ্র ককিয়ে উঠে বলল।

ড.এনায়েত আর কিছু না বলে তাড়াতাড়ি চলে এলেন রুম থেকে।তিনি কিছু একটা আন্দাজ করতে পারছেন কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব তা বুঝতে পারছেন না।

 

২.

প্রচণ্ড বাতাস বইছে।নিকষ  কালো অন্ধকার।ড.এনায়েত উল্লাহ হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।দূরে একটা ল্যাম্পপোস্ট দেখতে পেলেন।দৌড়ে কাছে যেতেই দেখলেন কে যেন দাঁড়িয়ে আছে ল্যাম্পপোস্টের নিচে।তিনি কাধে হাত দিতেই পেছনে ফিরে তাকালো সে।রুদ্রর বিস্ফোরিত চোখ দেখে এনায়েত উল্লাহ থমকে গেলেন।রুদ্র জোরে দৌড়ানো শুরু করলো,পেছন পেছন এনায়েত উল্লাহ ও।“রুদ্র,দাঁড়াও দাঁড়াও”,বারবার চিৎকার করছেন তিনি কিন্তু রুদ্রর থামার নাম নেই।হঠাৎ সামনে একটা গহ্বর দেখা দিলো আর রুদ্র তার মাঝে ঢুকে গেলো।ড.এনায়েত প্রাণপণে লাফ দিয়ে রুদ্রকে ধরার শেষ চেষ্টা করলেন কিন্তু রুদ্রর গেঞ্জির এক টুকরা ছেঁড়া কাপড় ছাড়া আর কিছুই হাতে এলো না তার।তার সামনে থেকে রুদ্র ও উধাও,ওই গহ্বরটাও উধাও...

 

এনায়েত উল্লাহ ধপ করে উঠে বসলেন বিছানায়।পরনের গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে লেপটে আছে তার পিঠের সাথে।আবারও সেই স্বপ্ন দেখলেন আজ।কিন্তু আজ তিনি রুদ্র গেঞ্জি ধরতে পেরেছিলেন।এনায়েত উল্লাহ তার ডান হাত চোখের সামনে ধরলেন কিন্তু হাতে কিছুই দেখতে পেলেন না।নিজের বোকামিতে নিজেই হাসলেন।ঘড়ির দিকে তাকালেন।দেখলেন তিনি ঘুমিয়েছেন মাত্র ১১ মিনিট হয়েছে,কিন্তু এর মধ্যেই মনে হল যেন কতো কিছু হয়ে গেছে।চটি পায়ে দিয়ে এনায়েত উল্লাহ নিজ রুম থেকে বের হলেন।রুদ্রর রুমে ঢুকতেই তিনি স্থির হয়ে গেলেন।রুদ্রর সারা শরীরে ধুলোবালি আর ময়লা লেগে আছে।কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা রুদ্রর গেঞ্জির পেছন দিকটা ছেঁড়া।এটা কিভাবে সম্ভব?তাহলে কি রুদ্র স্বপ্ন চোর?মানুষের স্বপ্নে চুরি করে ঢোকার ক্ষমতা আছে তার?রুদ্রের জন্য কি স্বপ্ন বাস্তব?তাহলে এই অলৌকিক ব্যাপারের সাথে রুদ্রের অস্বাভাবিক ধীরলয়ের বৃদ্ধির কোন সংযোগ নেই তো?এনায়েত উল্লাহ বেশি কিছু ভাবতে পারছেন না।তিনি বিজ্ঞানের মানুষ,এসব অলৌকিক ঘটনা এখন তার মাথায় কোনমতেই ঢুকছেনা।তিনি ধীরে ধীরে নিজের বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলেন।আবার ঘুম আসছে হয়তো।আবার কি দেখবেন কোন নতুন স্বপ্ন?

 

৩.

“বাবা,এই অংকটা একটু বুঝিয়ে দাও না।টিচার কি একটা অদ্ভুত অংক দিয়েছে করতে।”,এনায়েত উল্লাহর ছেলে নিভৃত খুব নিচু স্বরে কথাটা বলল।এনায়েত উল্লাহ আজ বেশ কয়েকদিন পর বাসায় এসেছেন।সাধারনত নার্সিং হোমেই থাকেন তবে মাঝে মাঝে এসে বাসায় ঢু দিয়ে যান।এনায়েত উল্লাহ বিরক্তি মাখা চোখে ছেলের দিকে তাকালেন।একদিনের জন্য বাসায় এসে শান্তিতে বসে থাকার ও জো নেই এদের জ্বালায়,মনে মনে বললেন এনায়েত উল্লাহ।

“দে দেখি কি অংক।”

“এই নাও বাবা।”,খুশী হয়ে  নিভৃত অংকটা দেখিয়ে দিলো।

“এত সোজা অংক পারিস না কেন?দেখ আমি এক মিনিটে করে  দিচ্ছি।তুই আগে প্রশ্নটা পড় জোরে জোরে।”

“একজন মহাকাশচারীর বয়স ২৮ বছর।যদি সে আলোর বেগের কাছাকাছি (ধরা যাক,v=2.4x10^8 m/s) বেগসম্পন্ন রকেটে করে মহাকাশ ভ্রমনে যায় এবং এরপর যদি পৃথিবীতে ৫০ বছর পর সে ফিরে আসে তবে তার আসল বয়স কতো হবে?আমরা জানি,আলোর বেগ c=3x10^8।”

“হ্যাঁ এবার দেখ,এটা আইন্সটাইনের  সময় সংকোচন সুত্র দিয়ে করতে হবে।আইনস্টাইনের সময়  সংকোচন সূত্র টা আগে দেখ,

 

এখন এখানে  হচ্ছে স্থির সময় অর্থাৎ পৃথিবীর ৫০ বছর।আর হচ্ছে গতিশীল সময় অর্থাৎ মহাকাশে কতো সময় কাঁটালো।আগে আমাদের বের করতে হবে,তারপর তা ওই মহাকাশচারীর মূল বয়স মানে ২৮ বছরের সাথে যোগ করতে হবে।তাহলেই উত্তর পেয়ে যাবো। c,v এর মান তো দেয়াই আছে।এখন মান গুলো বসাই,

 

 

অর্থাৎ তাহলে মহাকাশচারীর  বর্তমানে বয়স =২৮+৩০ বা ৫৮ বছর।মানে ২০ বছর কম।পৃথিবীর ৫০ বছরে গতিশীল রকেটে তার সময়  কেটেছে ৩০ বছর।”

“এত সোজা অঙ্ক।আর আমি ভেবেছিলাম  কি না কি।আচ্ছা বাবা আমি যদি  মহাকাশে যেয়ে অনেকদিন থাকি তাহলে কি আমারও বয়স কমে  যাবে?”,নিভৃত হাসিহাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো।

“আরে না।তুই যেই রকেটে  থাকবি সেটার বেগ তো আলোর বেগের কাছাকাছি হতে হবে।নাহলে  হবেনা কিছুই।”,এ কথাটা  বলতে বলতেই এনায়েত উল্লাহ থমকে গেলেন।তিনি মাথায় হাত  দিয়ে বসে পরলেন।নিভৃতের  হাত থেকে খাতা কলম নিয়ে তাড়াতাড়ি ওই সূত্রে t মান ২৫ বছর ধরে বসালেন।উত্তর দেখে তার মুখ থেকে রক্ত সরে গেলো। এর মান তিনি পেয়েছেন ১৫ বছর।তার মানে রুদ্র???কিন্তু কিভাবে সম্ভব সেটা?এটা তো আর মহাকাশ না আর আলোর সমান গতি ই বা কিভাবে সম্ভব?

 

পৃথিবীতে এধরনের সময় সংকোচন কিভাবে সম্ভব?তিনি নিভৃতকে  ওর খাতা ফেরত দিয়ে নিজের স্টাডি রুমে গিয়ে ঢুকলেন।এনায়েত  উল্লাহর কাছে সবকিছু আবছা আবছা লাগছে।কিভাবে এইসব অসম্ভব বিষয়ের সমাধান করবেন তিনি?এই মাত্র অঙ্ক করে যে উত্তর পেলেন তা রুদ্রকেই নির্দেশ করছে।রুদ্র ২৫ বছর কোমায় ছিল কিন্তু বয়স বেড়েছে মাত্র ১৪-১৫। এটা তখনই সম্ভব যখন সে ২৫ বছর আলোর গতিতে গতিশীল হয়ে থাকবে।কিন্তু এক জায়গায় শুয়ে থেকে রুদ্র কিভাবে আলোর গতিতে সময় পরিভ্রমন করবে?একটা যন্ত্র বা অবলম্বন তো লাগবে।ও তো আর মহাকাশে যায়নি।আর আলোর গতির কাছাকাছি কিছু কল্পনা করাটাও তো বোকামি।কিছুই মাথায় আসছেনা তার...এনায়েত উল্লাহর মনে হচ্ছে তিনি পাগল হয়ে যাবেন।তিনি পুরো ব্যাপারটাকে না অলৌকিক বলতে পারছেন নাই বা বিজ্ঞানসম্মত।পুরো ব্যাপারটা এতই ঘোলাটে যে সাধারন মস্তিষ্কে সেটার তল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।।এনায়েত উল্লাহ নিজের মনে মনেই বললেন-অসম্ভব...অসম্ভব...

৪.

রুদ্র লোকটার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।লোকটা এতক্ষণ একটা ডাইরিতে খসখস করে কি যেন লিখছিলো,এখন ডাইরির ওপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।অনেকক্ষণ ধরে রুদ্র চোখ বন্ধ করে লোকটার এসব কার্যকলাপ দেখছে।চোখ বন্ধ থাকলে এমনিতে সে কিছু দেখেনা,কিন্তু এটা তো স্বপ্ন।তাই রুদ্র সব দেখতে পাচ্ছে,কারণ স্বপ্নে তো তার চোখ খোলা থাকে।এটা তার নিজের স্বপ্ন।রুদ্র আসলে বুঝতে পারেনা কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব।এই লোকটাই তাকে বলেছিলো সে যে এই বিছানায় শুয়ে আছে,পাশে এত যন্ত্রপাতি,এতো মানুষ এটাই নাকি বাস্তব।তাহলে সে যে এতদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত,একটা গহ্বর তাকে কতো জায়গায় নিয়ে যেতো সেগুলো কি?স্বপ্ন?রুদ্র নাকি স্বপ্নচোর।ওই লোকটা বলেছিলো তাকে যে সে নাকি স্বপ্নে চুরি করে ঢুকে পড়তে পারে।কিন্তু রুদ্র তো নিজে কিছু করেনা।রুদ্রর এই স্বপ্ন আর বাস্তবের দ্বন্দ্ব আর ভালো লাগেনা।আগেই তো ভালো ছিল,সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতো,মাঝে মাঝে স্বপ্ন প্রহরীরা তাকে ধরে ফেলত,খুব মারত,কিন্তু আবার সে পালিয়ে যেতো।সেটা স্বপ্ন হলেও তো তার জন্য বাস্তব।এইতো এখনো সে ওই লোকটার পেছনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে এসব দেখছে।এখন যদি লোকটা তাকে দেখতে পেয়ে তাকে মার দেয় তাহলে তো সে ব্যথা পাবে না,কিন্তু যদি ওই লোকের স্বপ্নে ঢুকে পড়ে সে তখন যদি মার দেয় তাহলে ব্যথা পাবে।তাহলে একে স্বপ্ন বলে কেন?এটা তো বাস্তব ই হয়ে গেলো তার জন্য।লোকটা হয়তো এবার পেছনে ফিরবে,ওই যে গহ্বর টা এসে গেছে।এই গহ্বর এলেই সে বুঝতে পারে যে তার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।রুদ্রর ইচ্ছে করছে ওই লোকটার স্বপ্নে ঢুকে পড়তে,কিন্তু ওই লোকের স্বপ্নে ঢুকলেই সে শুধু ওকে তাড়া করে।তাই এবার হয়তো তার আরেক জায়গায় যেতে হবে,অন্য কোন,অন্য কারও স্বপ্নে।

 

এনায়েত উল্লাহ ধড়মড় করে  উঠে পেছনে ফিরলেন।দেখেলন  কেউ নেই,অথচ তার স্পষ্ট মনে হচ্ছিলো যে কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে আছে।ডাইরি  লিখতে লিখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তা টেরই পান নি।ডাইরির পাতাগুলোর দিকে চোখ বুলাতে লাগলেন আবার।৩ দিন ধরে লিখেই যাচ্ছেন,হয়তো তলের দেখাও পেয়েছেন কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তার কাছে।কিন্তু সব যুক্তি এগুলোই নির্দেশ করছে।এনায়েত উল্লাহ আবার পড়তে লাগলেন যা যা লিখেছেন এতক্ষণ...

 

 

“কতো রাত বসে ছিলাম  এই ছেলেটার পাশে কিন্তু কখনো এই জিনিসটা কেন আমার চোখে পড়লোনা তা ভাবতেই অবাক লাগে।সেদিন বাসা থেকে ফিরে রাতে সিদ্ধান্ত  নিলাম রুদ্রের পাশে বসেই রাত কাটাবো।আর যা ধারণা  করেছিলাম তাই হলো।সাধারণত onierology(স্বপ্নবিজ্ঞান) অনুযায়ী মানুষের ঘুমের সময় প্রতি ৯০ মিনিটে ১০ মিনিটের জন্য rem(rapid eye movement) নিদ্রা হয়।অর্থাৎ পুরো ৮ ঘণ্টার ঘুমে প্রায় ৪-৫ বার।এ সময় দর্শন ইন্দ্রিয় গতিশীল থাকে যার ফলে চোখের পাতা,অক্ষিগোলক নড়াচড়া করে,তবে বাকি ইন্দ্রিয়গুলো শিথিল থাকে।আমি রুদ্রকে খেয়াল করলাম যে ও ঘুমিয়ে পড়ার প্রায় সাথে সাথেই ওর rem period শুরু হয়ে গেছে।কারণ ওর অক্ষিগোলকের মুভমেন্ট আমি স্পষ্ট দেখতে পারছিলাম।নিদ্রাহীন সেই রাতে আমি ওকে সারারাত ই বলতে গেলে rem period এ থাকতে দেখেছি।তার মানে এই দাঁড়ায় যে ও সারারাত স্বপ্নের জগতে ছিল।কোমায় থাকা অবস্থায়ও আমি বেশ কয়েকবার খেয়াল করেছিলাম কিন্তু গুরত্ত দেয়নি।সকালে উঠে ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে কাল রাতে কি কি দেখেছো,কিন্তু ও কিছুই বলতে চাইলো না।আমি ওকে আমার ধারণা টা বলে দিলাম।বললাম যে ও স্বপ্নচোর।ওর অভিব্যক্তি দেখতে চাচ্ছিলাম কিন্তু ওর চেহারায় কোন কিছুই দেখলাম না।”

 

“স্টাডি রুমে আসলাম একটু আগে।ক্লান্ত লাগছে খুব।আমার ধারনাই সঠিক মনে হচ্ছে।রুদ্র  স্বপ্নচোর।পুরো ব্যাপারটা  গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করি।রুদ্র  ৫ বছর বয়সে কোমায় চলে  যাওয়ার পর থেকেই তার স্বপ্নচুরি শুরু হয়।এর পেছনের কারণ কেউ  জানেনা,আমার ধারণা ও নিজেও  জানেনা।একজন মানুষ কোমায়  চলে গেলেও তার চেতনা  কিছুটা হলেও থাকে,সে স্বপ্ন দেখতে পারে।এই পুরো ২৫ টা বছর সে স্বপ্নের জগতে ছিল।স্বপ্নের জগতে সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়েছে।আমার স্বপ্নে  চুরি করে ঢুকেছে,আরো অনেক মানুষের স্বপ্নেও হয়তো ঢুকেছে।অনিচ্ছাকৃত  ভাবেই এগুলো হতো তার  মস্তিষ্কে।মস্তিষ্কের পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করার কথা থাকলেও এখানে তার সমগ্র শরীর ও তার সঙ্গী হয়েছে।অর্থাৎ যেমন আমার স্বপ্নে ঢুকে সে দৌড়াচ্ছে,আছাড় খাচ্ছে,তার শরীরে কিন্তু এর প্রভাবটা বাস্তবেই পড়ছে।আবার সেদিন স্বপ্নে আমি ওর গেঞ্জি ধরে ফেলি তাই বাস্তবেও যেয়ে দেখি ওর গেঞ্জি ছেঁড়া কিন্তু আমার হাতে ছেঁড়া অংশ টা নেই কারণ আমিতো স্বপ্নই দেখেছি।আমার জন্য তো আর সেটা বাস্তব না,রুদ্রর জন্য বাস্তব।তারপর আমি খেয়াল করলাম যে স্বপ্ন দেখাটাও সময় সংকোচনের একটা ব্যাপার।একটা মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে তখন সেই স্বপ্ন দেখার সময় মনে হয় যে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে কিন্তু উঠে ঘড়ির দিকে তাকালে দেখবে যে ১ মিনিট ও হয়নি।তার মানে স্বপ্নে সে একটা গতির মধ্যে আছে যার ফলে সেখানে সময় টা ধীরে চলছে।কিন্তু বাস্তবে স্থির সময় কিন্তু ঠিক ই চলছে তার মতো।আইনস্টাইন এর সময় সংকোচন সুত্রের উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে-ধরি একটা ঘড়ি স্থির অবস্থায় এক জায়গায় রেখে দেয়া হল,আর আরেকটি ঘড়িকে আলোর কাছাকাছি গতিতে যদি কোন যানে করে কিছুদূর নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে স্থির ঘড়ির তুলনায় গতিশীল ঘড়ির সময় কিছুটা হলেও কম দেখাবে।স্বপ্নের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে।

 

রুদ্র ২৫ বছর স্বপ্নের জগতে থেকেছে।সেখানে আলোর গতির সমান গতিতে সে এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্ন,এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়েছে।যেহেতু এটা বাস্তবেই তার সাথে হয়েছে তাই তার বয়স,শারীরিক বৃদ্ধি সব ই সেই বাস্তব স্বপ্নের সাথে মিল রেখে হয়েছে,বাস্তব পৃথিবীর সাথে মিল রেখে হয়নি।রুদ্র কে তুলনা করা যায় সেই নভোচারীর সাথে যে ২৫ বছর মহাকাশে আলোর গতি সম্পন্ন কোন রকেটে করে মহাকাশ ভ্রমন করে এখন পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব ছিল আমার জন্য যদি না আমি নিজ চোখে সব দেখতাম।এখন কথা হচ্ছে এরকম আলোর গতিসম্পন্ন কোন পদার্থ পৃথিবীতে এখনো সৃষ্টি হয়নি,হওয়ার সম্ভাবনাও খুব ই কম।কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞান দাঁড়িয়েছে।এখন রুদ্রর মস্তিষ্ক যে স্বপ্নের জগতে এরকম গতি সৃষ্টি করে তা বাস্তব হিসেবে আজ আমার সামনে উপস্থাপিত হয়েছে,এটা ভাবতেই আমার গা শিরশির করে উঠছে উত্তেজনায়।আমি এখন বিখ্যাত হয়ে যাবো।হয়তো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী।এখন শুধু আজ রাতের অপেক্ষা।কাল ই রুদ্রকে নিয়ে যাচ্ছি আমার এক বিদেশি বিজ্ঞানী বন্ধুর কাছে।”

ডাইরিটা বন্ধ করে দিলেন  এনায়েত উল্লাহ।তার চোখ চকচক করছে।পৃথিবী তার হাতের  মুঠোয় আসতে আর বেশি সময়  বাকি নেই।এখন শুধু আরেকটা ঘুম।তারপরে কাল ই তার  এতদিনের কষ্টের ফল পাওয়া  শুরু হবে।এসব ভাবতে ভাবতেই ড.এনায়েত উল্লাহ গভীর ঘুমে চলে গেলেন...

 

৫.

প্রচণ্ড বাতাস বইছে।নিকষ  কালো অন্ধকার।ড.এনায়েত উল্লাহ হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।দূরে একটা ল্যাম্পপোস্ট দেখতে পেলেন।দৌড়ে কাছে যেতেই দেখলেন কে যেন দাঁড়িয়ে আছে ল্যাম্পপোস্টের নিচে।তিনি কাধে হাত দিতেই পেছনে ফিরে তাকালো সে।রুদ্রর বিস্ফোরিত চোখ দেখে এনায়েত উল্লাহ থমকে গেলেন।রুদ্র জোরে দৌড়ানো শুরু করলো,পেছন পেছন এনায়েত উল্লাহ ও।“রুদ্র,দাঁড়াও দাঁড়াও”,বারবার চিৎকার করছেন তিনি কিন্তু রুদ্রর থামার নাম নেই।হঠাৎ একটা গহ্বর দেখা গেলো।কিন্তু রুদ্র তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।এনায়েত উল্লাহ হাপাতে হাপাতে সেখানে পৌঁছে রুদ্রকে জিজ্ঞেস করলেন-“এটা কি রুদ্র?এটা দিয়ে প্রতিবার তুমি কোথায় যাও?”।

“এটা জানিনা কি?তবে এটা  দিয়ে এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নে  যাওয়া যায়।আপনি যাবেন?”

“হ্যাঁ যাবো,অবশ্যই যাবো।”

“তো ঢুকে পড়ুন জলদি।”

এনায়েত উল্লাহ ওই গহ্বর  এর মধ্যে ঢুকে পড়লো আর সাথে সাথেই গহ্বর টা অদৃশ্য হয়ে গেলো।রুদ্র হা হা করে  হাসতে লাগলো।।ওর অট্টহাসিতে নিকষ কালো অন্ধকার আরও  যেন জেঁকে বসতে লাগলো  স্বপ্নের জগতে।।

রুদ্র বিছানা ছেঁড়ে উঠে  দাঁড়ালো।তার বিশ্বাস হতে  চাচ্ছেনা যে সে তার কাজ  সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে।এখন শুধু নিশ্চিত হতে হবে।রুদ্র  ড.এনায়েত উল্লাহর রুমের দরজার নব ধরে মোচড় দিলো।দরজা খুলতেই রুদ্রের চোখে মুখে আনন্দের হাসি খেলা করতে লাগলো।বিছানা খালি,কেউ শুয়ে নেই।তার মানে সে সফল।এনায়েত উল্লাহকে সে স্বপ্নের জগতে বন্দী করে দিতে পেরেছে।এখন আর কোন বাঁধা নেই...কোন বাঁধা নেই।

 

এনায়েত উল্লাহ চোখ মেলে তাকালেন।আজকের স্বপ্নটা এত বড় হল কেন?নিজেকেই মনে  মনে যেন জিজ্ঞেস করলেন।কি সব আজগুবি জিনিস দেখলেন ভাবতেই হাসি পাচ্ছে তার।নিজেকেও  এখন কেন যেন স্বপ্নচোর  মনে হচ্ছে।

“আপনি ঠিক ই ধরেছেন।আপনিও স্বপ্ন চোর।আর এটাও একটা স্বপ্ন।এটা আমার স্বপ্ন।এখন আমাকে চলে  যেতে হবে।তাই আপনাকে এখানেই মরতে হবে।”,রুদ্রের কথা  শুনে চমকে উঠলেন এনায়েত উল্লাহ।রুদ্রের হাতে ছুরির ফলা চকচক করছে।এনায়েত  উল্লাহ পালাতে চাইলেন কিন্তু তার আগেই ছুরির ফলা তার  শরীরে প্রবেশ করলো।

রুদ্র রক্তমাখা ছুরিটা আবার হাতে নিলো।শালা মরার আগে  হাতে আঁচড় কেটে দিয়ে গেছে।প্রতিটা স্বপ্নে শালা এরকম করে।ধুর...

 

.............................................সমাপ্ত.............................................

কিছু কথা-বিজ্ঞান আর কল্পনা মিশিয়ে লেখা একটা কল্পকাহিনী।তাই বেশি ভাবতে যাবেন না।ভেবেছেন তো মরেছেন...

Share