মাত্রাহীন যাত্রা

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 1088 বার দেখা হয়েছে

 

১. 

“জনাব,ভালো আছেন?”

“জি ভালো।”

 

“আইচ্ছা আপনে একটু বসেন,আমি চা নাস্তা নিয়া আসতেসি।”

“না,না। এসবের কোন দরকার নেই।”

“কি যে বলেন,আপনে সাংবাদিক মানুষ। আপনেরে কি খালি মুখে যাইতে দিতে পারি?

এই বলে লোকটা আবার ভেতরে চলে গেলো।মেজাজটা আস্তে আস্তে চড়ে যাচ্ছে।শালা রবিউল নিজে না এসে আমাকে পাঠাল কেন এই পাগলের কাছে?যদিও প্রথম দেখাতে তাকে পাগল মনে হয়নি,বরং আঁতেলই মনে হয়েছে আমার।আমি নাসিফ,নাসিফ আহমেদ।দৈনিক কালান্তরের সাংবাদিক।আমার ডাইরিতে লিখছি এখন এসব কথা। ডাইরি লেখার অভ্যাস আছে ।বাজে একটা অভ্যাস।। কারণ, বলতে গেলে জীবনের সব কিছুই এই ডাইরিতে লিখে রাখি আমি ।তাই সবসময় ডাইরিটা আমার কাছেই থাকে। দুটো ডাইরি আমার,একটা পত্রিকার লেখার জন্য আর অপরটার কথা তো বললাম ই।দুটোই আমার ঝোলার ভেতরে সবসময় থাকে । অফিসের সবাই আমাকে ঝোলা নাসিফ নামেই ডাকে এজন্য । সাংবাদিক আসলে আমার হওয়ার কথা ছিলো না,ছিলাম ফিজিক্সের ছাত্র,বেশ ভালোই ছিলাম সেখানে । ভেবেছিলাম পাস করে কোন কলেজে ফিজিক্স টিচার হয়ে ঢুকে যাবো কিন্তু এর মধ্যে বাঁধ সাধে রবি ওরফে রবিউল খান । আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু,ওই শালাই আমাকে জোর করে তার সাথে এই সাংবাদিকতার পেশায় ঢুকিয়ে দেয় । খারাপ আছি বলবনা,কারণ এখানেও বিজ্ঞান নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয় । রবি অনেক কসরত করে আমাকে কালান্তরের বিজ্ঞান সাময়িকীর দায়িত্ব দিয়ে দেয় তাই আমার তেমন কোন সমস্যাই হয়না । আজ এসেছি এক পাগলের সাক্ষাৎকার নিতে । এই পাগল নাকি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হঠাৎ করে গায়েব হয়ে যায়,তারপর এই কিছুদিন আগে নাকি ফিরে আসে । সে নাকি দাবি করছে যে সে চতুর্মাত্রিক জগত ভ্রমন করে এসেছে । মানে পাগলের প্রলাপ আর কি ? এটা শোনার পর তো আমি হাসতে হাসতে চেয়ার থেকেই পড়ে যাই,রবি বেচারা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তখন । ও নাকি ড্যাম সিউর যে এর মাঝে একটা রহস্য আছে । রবিকে এই পাগলের খবর যে দিয়েছে সে নাকি ফিজিক্সের অনেক বড় একজন প্রফেসর । এটা শুনেই আসলাম নাহলে আসতাম না । এই লোকের বর্তমান অবস্থান সেই ফিজিক্স প্রফেসরের নিজের দানকৃত দুই রুমের একটা বাসা। আমি থাকি মেসে আর এই শালা পাগল আজগুবি কাহিনী শুনিয়ে দুই রুমের বাসা ফ্রি ফ্রি পেয়ে গেলো । হায়রে মানুষ । ওই যে এসে পড়েছে লোকটা, এখন এই পাগলের সাক্ষাৎকার নিতে হবে । পরের কাহিনী রাতে মেসে ফিরে ডাইরিতে লিখতে হবে । এখন এখানেই শেষ করি ।

 

২. 

রাত ১২ টা ৫৪ মিনিট,

৫ মিনিট ধরে লাইটের সুইচ হাতড়ে বেড়িয়ে মাত্রই সেটা খুঁজে পেলাম । লাইটটা জ্বালিয়েই ডাইরি লিখতে বসে পড়লাম আবার । মাথা ঝিমঝিম করছে । মনে হচ্ছে এই ত্রিমাত্রিক জগতের মাঝে আমি তুচ্ছ দ্বিমাত্রিক কেউ একজন । নিজেকে ত্রিমাত্রিক,দ্বিমাত্রিক মাঝে মাঝে এক মাত্রিক ও মনে হচ্ছে । সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে । চারপাশেই মাত্রা দেখছি মনে হয় । মাত্রার সাগরে ভেসে আছি । দৈর্ঘ্য,প্রস্থ,উচ্চতা,সময় প্রতিটি মাত্রা যেন ঘিরে ধরেছে আমায় । লোকটা যে এক বিন্দু মিথ্যা বলেনি তা আমি বুঝে গেছি । কোন অশিক্ষিত লোকের পক্ষে এসব জানার অবকাশ ই নেই । মাত্রই বরিশালে তার গ্রাম হয়ে তার নিজের সম্পর্কে বলা সব তথ্য নিশ্চিত করে আসলাম ।সব ই সত্য,তবে সে মাত্রিক জগতের ব্যাপারে যেসব তথ্য দিয়েছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর বিজ্ঞান ইতিহাস আবার নতুন করে লিখতে হবে । যাই হোক পুরো সাক্ষাৎকারটা না দিয়ে আমি ওনার মুখে শোনা গল্প বা সত্য ঘটনাটাই লিখে দেই-

 

আমি ইমামুদ্দীন পাটোয়ারি।থাকতাম বরিশালের দুধারিয়া গেরামে। দুধারিয়া জামে মসজিদের মোয়াজ্জেম ছিলাম । আমাগো মসজিদের ইমাম সাহেবের নাম ছিল জহিরুল্লাহ পাঠান,আমি ইমাম সাহেবকে চাঁচা বইলা ডাকতাম।আমাকে তিনি নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। মসজিদেই থাকতাম আমরা। চাঁচা মিয়া খুব ই ভালো মানুষ ছিলেন,উনি যতটা ভালো ছিলেন আমি ছিলাম ততটাই খারাপ মানুষ। হেন খারাপ কাজ নাই যা আমি করিনাই । চুরি, বাটপারি,মানুষরে ঠকানি এমনকি খারাপ মাইয়া মানুষরে মসজিদের পাশে আমার ঘরেও অনেকবার আনছি। চাঁচা মিয়া এসবের কিছুই জানতেন না। তখন সময় ছিল ১৯৭১ সাল ।বর্ষার সময়,গেরাম দেশে ওই সময় হাঁটু সমান পানি থাকতো। এর মধ্যেই একদিন মিলিটারি আইলো। আমি সহ আরও কয়েকটা পোলাপাইন ভাবলাম হ্যাঁগো লগে দেহা করুম,মিলিটারিগো নাকি অনেক পাওয়ার । চাঁচা মিয়ারে কইলাম এই কথা,ওমনি চাঁচা মিয়া হের চপ্পল খুইলা আমারে মারা শুরু করলো । আমার মাথায় রক্ত উইঠা গেলো,আমি করলাম কি চাঁচা মিয়ারে ধাক্কা দিয়া ফালায়া পোলাপাইন গুলারে নিয়া গেলাম মিলিটারি গো কাসে । মিলিটারিরা আমগো অনেক সম্মান দিলো,আমগো কইল একটা কমিটি বানাইতে। কমিটির নাম হইলো শান্তি কমিটি,এরপর শুরু হইলো আমগো অত্যাচার । সব জায়গা আমরা চিনাইয়া দিতাম,যেই বাড়িতে কচি কচি মাইয়া থাকতো ওই বাড়িতে বড় সাবরে লইয়া যাইতাম। মালাউনগো বাড়িত আগুন দিতাম,বুড়া ধামরা ব্যাডাগুলারে জবাহ দিতাম। সাক্ষাৎ শয়তান আইসা ভর করসিলো আমগো উপর। যেইদিনের ঘটনা বলমু ওইদিন ছিল শুক্কুরবার। মিলিটারি গো বড় সাব ওইদিন জুম্মার নামাজ আমগো মসজিদে পড়তে আইসিলো।চাঁচা মিয়ার সাথে অনেকদিন দেখা হয়নাই,তাই ভয়ও ছিল মনের মইদ্ধে।মসজিদে ঢুকতে নিমু এমন সময় চাঁচা মিয়া বাইর হইয়া আসলো।আমি বললাম-চাঁচা মিয়া,দেখো বড় অফিসার সাবে আইসে,আইজকা এইখানে নামাজ পড়ব।এই শুইনা চাঁচা মিয়া আমার মুখে থুতু দিলো,এমনকি অফিসার সাবের মুখেও থুতু দিলো আর বলল-তগো মতো মানুষরূপী শয়তানগো রে আমি জীবনেও নামাজ পড়ামু না।কি করবি কর?অফিসার সাব আমার দিকে কতক্ষণ তাকায়া রইলেন,তারপর বললেন যে-ইমু,ইস হারামজাদে কো আভি কে আভি জবাহ দো।আমার মাথায় তখন শয়তান ঢুকসে,শয়তান আমারে যা করায় আমি তাই করি।কি আর করার সবাই মিল্লা ওইখানে আমগো মসজিদের সামনেই চাঁচা রে জবাই দিলাম।চাঁচা মরার আগে একটা কথাই কইসিলো-তোরে আল্লাহ দোজখের গর্তে ঢুকাইবো,দোজখের গর্তে।

চাঁচার লাশ পুকুর পাড়ে মাটি চাপা দিয়া,সন্ধ্যার সময় সেই পুকুর ঘাটেই বইসা ছিলাম।সেইদিন যে কি তুফান হইসিলো,কিন্তু আমি পুকুর ঘাটেই ঠায় বইসা ছিলাম।হাতে ছিল রক্তমাখা রুমাল,রুমালে আম্মাজান ছোটবেলায় “মায়ের দোয়া” লেইখা সেলাই কইরা দিসিলো আর আমি সেই রুমালেই আমার চাঁচা মিয়ার রক্ত মুছছি।এইসব ভাইবা খুব কষ্ট হইতেসিলো এমন সময় ঘটলো এক আচানক ঘটনা।চাঁচা মিয়ারে যেই জায়গায় পুতসিলাম ওই জায়গাটা দেখলাম হঠাৎ গর্তের মতো হইয়া গেসে।আমিতো পুরা হা হইয়া গেসি,কি হইতেসে এইসব?আশেপাশে কেউ নাই ও তখন। সাহস কইরা কাছে গেলাম গর্তটার,যাওয়ার পরেই দেখি গর্তের কোন দিশা নাই?ভিতরে চাঁচা মিয়াও নাই,আর গর্তের কোন শেষ ও নাই।অন্ধকারে গর্তের ভিতরে হাত ঢুকাইলাম কিন্তু তলা আর খুইজা পাইনা।এমন ই ভয় পাইসিলাম আর ওইখানের মাটি বৃষ্টিতে এত কাদা কাদা হইয়া গেসিলো যে পিছল খাইয়া ওই গর্তের মধ্যেই পইড়া গেলাম।তারপরের কাহিনী যা ঘটসে তার কোন আগা মাথা নাই।আপনেরে কই,আপনি শিক্ষিত মানুষ বুঝলেও বুঝবার পারেন।

গর্তের মধ্যে যে পড়সি,পড়তেই আসি,পড়তেই আসি।কোন তল নাই,হাত পা ছুড়াছুড়িও করবার পারিনা।ধরার ও কিছু দেখি না।চক্ষে খালি আন্ধার আর আন্ধার।মনে হইতেসিলো কোন স্বপন এর দুনিয়ায় আসি।অনেকক্ষণ ধইরা পড়ার পর মাটির নাগাল পাই।আসলে ধপ কইরা পড়িনাই,বলতে গেলে আস্তে কইরা কেউ যেন নামায়া দিসে মনে হইলো।পায়ের নিচে কিসু আসে এইটা বুঝছি কিন্তু কিসের উপরে দাঁড়াইয়া আসি বুঝিনাই।তো আমি হাতের দিকে তাকাইলাম দেখি আম্মাজানের রুমালটা এখনো হাতে আসে।রুমাল টা দিয়া কপালের ঘাম মুছলাম আর ভাবতে লাগলাম মাটির নীচের কোন দুনিয়ায় আইসা পড়লাম না তো?নাকি মইরা গিয়া দোজখের গর্তে পড়সি।চাঁচা মিয়া তো কইসিলোই।এইসব ভাবতে ভাবতে কানতে শুরু কইরা দিলাম।এমন সময় কিছু আজিব কিসিমের আওয়াজ শুনলাম।কিসের আওয়াজ কইতে পারুম না,কিন্তু আওয়াজটা শুইনা আমার কলিজা আরও শুকাইয়া গেলো।অনেকক্ষণ এই ক্যাঁচক্যাঁচানি শুনার পর হঠাৎ কইরা কে জানি আমগো বাংলা ভাষায় বইলা উঠলো-“হে ত্রিমাত্রিক মনুষ্য জগতের একজন,তোমায় স্বাগতম।”আমি তো এইটা শুইনা কান্নাকাটি থামায়া দিলাম আর আন্ধারের মধ্যে ওই মানুষটারে খুঁজতে লাগলাম।

তুমি কি কাউকে খুঁজছ তৃতীয় মাত্রার অধিবাসী?

জনাব,আপনি কে?আপনি কই?আমি ই বা এখানে কেমনে আসলাম?

আমি চতুর্মাত্রিক জগতের অধিবাসী।তোমাকে আমরাই এখানে নিয়ে এসেছি।

আমি কি মইরা গেসি?এইটা কি দোজখ?

না,তুমি এখনো মৃত নও।তোমাকে আমরা চতুর্মাত্রিক জগতে নিয়ে এসেছি।

কেন আনছেন জনাব?আমি কি করসি?

তুমি কিছু করো নি কিন্তু আমরা তোমাকেই নির্বাচন করেছি,আমাদের জগতে প্রবেশাধিকার দিয়েছি।

কেন জনাব?আমাকে দিয়ে কি লাভ হবে আপনাদের?

তোমাকে দিয়ে আসলে আমরা একটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম যে আসলেই ত্রিমাত্রিক জগতের অধিবাসীদের আমাদের চতুর্মাত্রিক জগতে প্রবেশ করানো যায় কিনা?আমরা এই পরীক্ষায় সফল হয়েছি।তুমি সফলভাবেই আমাদের চতুর্মাত্রিক জগতে আসতে পেরেছো।তোমাকে অভিনন্দন।

শুকরিয়া জনাব,কিন্তু আমি অখনো কিছু বুঝতে পারতেসিনা।জনাব,আপনি কি মানুষ?আপনাকে দেখা যায়না কেন?

না,আমরা মানুষ নই।আর ইচ্ছা করেই আমরা তোমার সামনে আসছিনা।কারণ তুমি ত্রিমাত্রিক,আর আমরা চতুর্মাত্রিক।তুমি শুধু আমাদের ৩ টি মাত্রায় দেখতে পারবে।আর এতে তোমার ভয় পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।

থাক জনাব,এমনিতেই অনেক ভয়ে আছি আর ভয় খাওয়া লাগবেনা।কিন্তু জনাব আমি এখানে আসলাম কিভাবে?

তোমাকে আমরা ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে এনেছি।ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে তোমাকে সমান্তরাল মহাবিশ্বের এই মাত্রায় পরিভ্রমণ করিয়ে এনেছি।

জনাব আমার মাথায় কিসুই ঢুকতেসে না।আমার পড়াশুনা খুবই কম।

এটা তুমি কেন তোমাদের ত্রিমাত্রিক জগতের কেউ ই বুঝবেনা।তোমার হাতে ওটা কি?

জনাব এটা আমার আম্মাজানের দেয়া রুমাল?আপনার কি আম্মাজান আছে?তাকে আমার সালাম দিবেন।

না।তোমার হাতের জিনিসটায় আমি দ্বিমাত্রিক কিছু দেখতে পাচ্ছি।ওগুলো কি?

দ্বিমাত্রিক মানে?জনাব এটা রুমাল আর এটার উপরে তো মায়ের দোয়া লেখা।

হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই দ্বিমাত্রিক।এর শুধু দৈর্ঘ্য,প্রস্থ আছে।তোমাদের মতো উচ্চতা নেই।এই প্রথম প্যারালাল মহাবিশ্বের ইতিহাসে এক ই সাথে ৩ মাত্রার মিলন ঘটলো।ধন্যবাদ তোমাকে ত্রিমাত্রিক জগতের অধিবাসী।

জনাব শুকরিয়া।কিন্তু এখন কি আমি যাইতে পারি?

এখন তুমি যদি যেতে চাও তবে যেতে পারো কিন্তু মনে রেখো এখন তোমার আগের সময়ে ফিরে যেতে পারবেনা,এখন তুমি ফিরে গেলে তোমাদের পৃথিবীর সময় হিসেবে প্রায় ৪০ বছর পরে পৌঁছুবে।

কি বলেন জনাব,আমি তো আসছি মাত্র কয়েক মিনিট হইসে।

তুমি অকল্পনীয় দূরত্ব অতিক্রম করে এখানে এসেছ আর এজন্য তোমাকে ওয়ার্ম হোলের ভেতর দিয়ে আমাদের আনতে অকল্পনীয় গতির সৃষ্টি করতে হয়েছে।তাই এর মাঝে তোমাদের ত্রিমাত্রিক পৃথিবীতে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।

ইয়া মাবুদ,এখন আমি যাইয়া কি করবো জনাব?এখন তো এর চেয়ে মইরা যাওয়া ভালো।

তুমি গিয়ে আমাদের এই মাত্রিক বিপ্লবের কথা সবাইকে জানাবে।সাথে এটাও জানিয়ে দিবে যে আমাদের মাত্রায় আসার বা মাত্রিক জগতের খোঁজ করা অথবা ওয়ার্ম হোলের আবিষ্কার করে সময় পরিভ্রমণ করা ত্রিমাত্রিক জগতের পক্ষে কখনোই সম্ভব হবেনা যতদিন পর্যন্ত না আমরা চাচ্ছি।আমরা ত্রিমাত্রিক জগতের সাথে এভাবেই তোমার মতো মানুষের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখবো,তোমাদের কিছু তথ্য,উপাত্ত দেবো কিন্তু কখনোই আমাদের এই সমান্তরাল মহাবিশ্বে মাত্রিক পরিভ্রমনের অধিকার দেবো না।আমাদের সেই অধিকারও নেই,আমরা প্রতিটি মাত্রা আমাদের ওপরের মাত্রার কাছে জিম্মি হয়ে আছি বলতে গেলে।আর তোমার কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা আবার তোমাকে আমাদের চতুর্মাত্রিক জগতে নিয়ে আসবো।আবার প্যারালাল জগতে আসতে গেলে হয়তো তোমার মৃত্যুও হতে পারে কিন্তু তোমার এই কাজটা করতেই হবে।কারণ আমরা মানুষকে জানাতে চাই,তাদের সাহায্য করতে চাই।তাদের ভুল ধারণার পেছনে ছুটোছুটি বন্ধ করতে চাই।কিন্তু কেউ যাতে তোমার এই কাজে হস্তক্ষেপ না করতে পারে,আমাদের রহস্য কেউ অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করলে তোমার কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।তাই সাবধানে সব করতে হবে তোমাকে।

আচ্ছা জনাব।আমার আর বাঁচার ইচ্ছাও নাই।জীবনে অনেক পাপ করসি,এখন যদি মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু কইরা যাইতে পারি তাহলে মইরাও শান্তি পামু।

তাহলে ত্রিমাত্রিক জগতের অধিবাসী বিদায়।আবার ফিরে আসবে তুমি আমাদের মাত্রায়,চতুর্মাত্রিক জগতে।

হেরপর আমি আবার শূন্যে ভাসা শুরু করলাম।অনেকক্ষণ এরুম হওয়ার পর হঠাৎ কইরা ঠিক আরেকটা গর্তের ভিতরে দিয়া বাইর হইলাম।দেখি এক জনাবের বাসার সামনে দাঁড়াইয়া আসি।সেই জনাব ই আমাদের এই প্রফেসর সাব।এই হইলো আমার কাহিনী।অখন সইত্য মিথ্যা আপনেরা বিচার করবেন।

 

এই হল ইমামুদ্দীনের কাহিনী।খুব ক্লান্ত লাগছে,এখন ঘুমোতে হবে।কাল সকাল ১০ টায় রবি কে আসতে বলেছি।ও আসলে এই ব্যাপারে কথা বলব।তবে ইমামুদ্দীন যা বলেছে তা মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।এ ব্যাপারে বিস্তারিত পরে লিখে রাখবো।

 

.

সকাল ১১ টা বাজে,চা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে আছে রবি।চোখে শূন্য দৃষ্টি।সামনে পড়ে থাকা নাসিফের ডাইরিটা হাতে তুলে নিলো সে,পড়তে শুরু করলো শেষের পৃষ্ঠা টি...

.....................রাত ৪ টা ২১ মিনিট,

ঘুম আসছে না,তাই আবার ডাইরি লিখতে বসলাম।ভাবলাম ইমামুদ্দীনের কথাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো লিখে রাখা উচিত।প্রথমেই জানতে হবে ওয়ার্ম হোল কি?ওয়ার্ম হোলের ব্যাপারটি মাত্র কয়েকদিন আগে বিজ্ঞানীরা ধারণা করতে পেরেছেন তাও আবার স্পেসে ভ্রমনের ক্ষেত্রে,যা কেবল মাত্র একটা ধারণা।যার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই।এই অজ-পাড়াগাঁয়ের লোকের নিশ্চয়ই জানার কথা না ওয়ার্ম হোল সম্পর্কে,তাও আবার ১৯৭১ সালে।ওয়ার্ম হোল জিনিসটা বলতে আসলে আমরা কি বুঝি?

ওয়ার্মহোল আসলে সময় ও স্থানের একটা করিডোরের মত। ওয়ার্মহোলের উৎপত্তি হয় উচ্চ মাত্রার তড়িৎচৌম্বকিয় শক্তির দ্বারা (electromagnetic power)। চারপাশ থেকে প্রচন্ড শক্তির তড়িৎচৌম্বকিয় শক্তি ওয়ার্মহোলের কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হলে সেখানে উচ্চমাত্রার গ্রাভিটেশনাল ফিল্ড সৃষ্টি হয়ে কেন্দ্রের দিকে আশেপাশের বস্তুকে ধাবিত করে থাকে। আর কেন্দ্রের দিকে একটা সুরঙ্গের/হোলের মত পথ সেই গ্রাভিটেশনাল ফিল্ডকে অপর দিকে সমান গতিতে বিচ্ছুরন করে। আর এই বিচ্ছুরনশক্তি টাইম ও স্পেসকে ভেঙ্গে ফেলে।

 

এখন লোকটার কথা সত্যি হবার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে,যেহেতু সে ঠিক এরকমটাই বর্ণনা দিয়েছে।এই ঘটনাগুলোই তার সাথে ঘটেছে।যেহেতু এটা আমাদের অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক জগতের মানুষের পক্ষে কখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি হয়তো চতুর্মাত্রিক জগতে এর আবিষ্কার হয়ে গেছে।আর ওরা তার মাধ্যমে ইমামুদ্দীনকে তাদের চতুর্মাত্রিক জগতে নিয়ে গেছে।

পরের কথা হচ্ছে সে চতুর্মাত্রিক জগতের কাউকে তার নিজ চোখে দেখেনি,আর তার যুক্তি হিসেবে বলেছে যে আমরা ত্রিমাত্রিক প্রানিরা নাকি শুধু তাদের তিন মাত্রাই দেখতে পারবো।এটাও বিশ্বাসযোগ্য।

কারণ ইমামুদ্দীনের রুমালে আঁকা মায়ের দোয়া একটা দ্বিমাত্রিক ছবি।এখন মনে করি আমরা খাতায় একটা মানুষ আঁকলাম,তার হাত পা দিলাম।ধরি সে জীবন্ত,তবে তার কাছে শুধু আমাদের দুইটি মাত্রাই দৃশ্যমান হবে,কারণ সে দ্বিমাত্রিক।ঠিক তেমনি চতুর্মাত্রিক কাউকে দেখলে আমরাও কেবল তার তিন মাত্রাই দেখতে পাবো।আর সেটা যে ভয়াবহ হবে তা সহজেই অনুমেয়।

তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরত্তপূর্ণ কথা,সে বলেছে আমরা প্যারালাল ইউনিভার্সে কখনোই যেতে পারবোনা,সময় পরিভ্রমন করতে পারবোনা যতক্ষণ না ওরা আমাদের সাহায্য করবে।এটা আমি বুঝিনি প্রথমে,তবে পরে বুঝলাম।

আমরা সেই আঁকা মানুষের ছবিটাই ধরি।সেই দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমরা যদি টেবিলের ওপর থেকে বিছানার ওপর নিজের হাত দিয়ে না নেই অথবা ছুঁড়ে না মারি তা কখনোই বিছানার ওপর নিজে হেঁটে হেঁটে যেতে পারবেনা।আমরা এই দ্বিমাত্রিক ছবি নিয়ে ইচ্ছে করলে চাঁদেও যেতে পারি,তাহলে সে আমাদের সমান গতি অর্জন করে আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতেই দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারবে।ঠিক তেমনি হয়তো চতুর্মাত্রিক জগতের অধিবাসিরা আমাদের নিয়ে এরকম করছে।আমরা কখনোই তাদের সাহায্য ছাড়া মাত্রিক পরিভ্রমন করতে পারবোনা।

কোরআন শরীফসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ হতে  এর কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।কোরআনে সাত আসমানের কথা বলা আছে,অন্যান্য ধর্মেও আছে।এই সাত আসমান আমার মতে সাতটি মাত্রা।তার মানে আমার মাথার ওপর প্রথম আসমান মানেই হয়তো চতুর্মাত্রিক জগত।এরপরে ৫ম,৬ষ্ঠ,৭ম এভাবে হয়তো যেতে থাকে।বলা হয় সৃষ্টিকর্তা সব সময়ে,সব জায়গায় বিদ্যমান।যদি সৃষ্টিকর্তা ৭ আসমানের পরে থাকেন মানে বহুমাত্রিক কোন জগতে তাহলে অবশ্যই এটা বিজ্ঞানের এই অধ্যায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করে,তার সাথে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকেও।বিভিন্ন মাত্রিক জগত তথা ভেরিয়াস ডাইমেনশন হাইপোথিসিসস সম্পর্কে ধারনাটা আসলে আইন্সটাইনের আপেক্ষিক সূত্রের একটা অনুসিদ্ধান্ত। যেটা স্টিফেন হকিং সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে বিজ্ঞানী মহলে আলোড়ন তোলেন। ‘ব্রিফ হিস্টোরী অব টাইম’-এ এই ব্যাপারটা তুলে ধরা হয়।

এখন আমার মতে ইমামুদ্দীন ঠিক কথাই বলেছে,আমি ওনার প্রতিটি কথায় যুক্তি দেখেছি।প্রফেসর সাহেবও নিশ্চয়ই এর মধ্যেই এসব বের করে ফেলেছেন।ইমামুদ্দীনের কাজ শেষ,তাহলে তাকে তো আবার চতুর্মাত্রিক জগতে নিয়ে যাবার কথা।আবার একটা ওয়ার্ম হোল সৃষ্টি,আবার সেই অস্বাভাবিকতা।

ও মাই গড,প্রফেসর সাহেব নিশ্চয়ই এজন্যই ইমাম সাহেবকে ওনার বাসায় রেখেছেন যাতে তিনি ওয়ার্ম হোল সৃষ্টি দেখতে পান।না,এটা কখনোই হতে দেয়া যাবেনা।চতুর্মাত্রিক জগতের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করলেই চতুর্মাত্রিক জগত তা ঠিক করে নেয়।যেভাবে ঠিক করবে তা আমি বুঝে গিয়েছি,চতুর্মাত্রিক জগত সময় নিয়ন্ত্রণ করে কারণ ওদের চতুর্থ মাত্রা সময়।ওরা জানত প্রফেসর সাহেব এরকম করবেন,আর তাই ইমামুদ্দীনকে তারা এই কাজের জন্য নির্বাচন করেছেন।ইমামুদ্দীনকে তারা টের পাইয়ে দিবেন যে প্রফেসর তার জীবনের একমাত্র ভালো কাজে হস্তক্ষেপ করছেন আর তিনি প্রফেসরকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে নিজে আত্মহত্যা করবেন।এজন্যই ইমামুদ্দীনকে বলেছিল তারা যে পরেরবার সে মৃত অবস্থায়ও সময় পরিভ্রমন করতে পারেন।চতুর্মাত্রিক জগতের ওরাই সব করছে,ইমামুদ্দীন আর প্রফেসর শুধু পুতুলের মতো কাজ করে যাচ্ছে।আমার এখন ই প্রফেসর সাহেবকে গিয়ে বোঝাতে হবে যে ওদের রহস্য জেনে আমাদের কোন লাভ নাই,ওরা না চাওয়া পর্যন্ত আমরা কিছুই করতে পারবোনা।এখন ই বের হতে হবে আমার।প্রফেসর সাহেব কে বাঁচাতে হবে।ওনাকে ছাড়া সব রহস্য অভেদ্যই থেকে যাবে,আমার মতো ছাপোষা সাংবাদিকের কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা।এখন আমি যাই.........

 

ডাইরিটা রেখে রবি ক্যালেন্ডারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।আজ থেকে ঠিক ২০ বছর আগে এই দিনে এমন সময়েই নাসিফের সাথে দেখা করার কথা ছিল তার,সে গিয়েছিলো ঠিক ই কিন্তু নাসিফকে আর পায়নি।ডাইরি পড়ে প্রফেসরের বাসায় গিয়েও কাউকে পায়নি,শুধু দেখেছে কিছু ছোপ ছোপ রক্ত আর নাসিফের ঝোলাটা।নাসিফ আর কখনো ফিরে আসেনি,নাসিফের ডাইরিটাও রবি  কাউকে পড়তে দেয়নি।থাকুক সব রহস্য এই ডাইরির ভেতর বন্দী,জেনেই বা কি লাভ।ত্রিমাত্রিক জগতের মানুষের হাতে কিছুই নেই।তারা নিঃস্ব।তারা শুধু কলমের তীক্ষ্ণ ডগা দিয়ে সাদা পাতায় গর্ত করে করে ডাইরি ই লিখে যেতে পারবে।ধুলোর আস্তরণ পড়া কালো মলাটের ডাইরি।।এখন শুধু অপেক্ষাই করা যায়,হয়তো একদিন নাসিফ ফিরে আসবে,হয়তো একদিন শেষ হবে তার মাত্রাহীন যাত্রা...

 

.......................................।।সমাপ্ত।।.............................................

 

উৎসর্গ-রুপালী পরীকে।।যার আজ জন্মদিন।যে আমার গল্প লেখার অনুপ্রেরণা।

 

Share