আকাশ কেন লাল?

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 796 বার দেখা হয়েছে

 

.

লাল।।প্রিয় রং আমার।আমায় নাকি বেশ মানাতো লালে,লাল শাড়িতে।হাতে লাল কাঁচের চুড়ি আর কপালে বড় একটা বৃত্ত লাল টিপ।সাজ্জাদ তো এই রুপেই আমাকে দেখেছিলো প্রথম।পরদিনই তো আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে দৌড় দিয়েছিলো।

 

                      -তোমায় দেখে মনে হয় আমার আকাশটাও লাল

                       রক্তিম আভায় যেন পোড়ে তোমার ওই গাল।।

                                   আচ্ছা,আকাশ কেন লাল?

 

আকাশ কেন লাল?অদ্ভুত সুন্দর একটা কথা।সাজ্জাদ প্রায়ই এ কথাটা বলতো।আমি হেসে কুটিকুটি হতাম।বলতাম যে তোমার মতো বোকারাই আকাশ লাল দেখে সবসময়।আকাশ তো লাল হয় কেবল ঊষা আর গোধূলিতে,তাও আকাশের কিয়দংশ।আর তুমি কিনা সারাক্ষণই আকাশ লাল দেখো।সাজ্জাদ কেবল হাসতো,কিছু বলতো না। আজ তো আমি লাল।আপাদমস্তক লালের চাদরে ঢাকা।উলঙ্গ দেহে লাল চাদর।আচ্ছা সাজ্জাদ কি আজ আমাকে এভাবে দেখলে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতো?নাকি লজ্জা,ঘৃণা আর হতাশায় চোখ ফিরিয়ে নিতো?খুব জানতে ইচ্ছে হয়।

 

এখান থেকে আকাশ দেখা যায়না।তা নাহলে দেখতাম আকাশ আজ লাল নাকি?লাল হলে কেমন লাল?আমার ওই লাল শাড়ির আঁচলের মত শুভ্র লাল?যে আঁচল সাজ্জাদের ঘাম মুছে দিতে দিতে রংচটে গিয়েছিলো?নাকি এখন আমার কেটে নেয়া স্তনবৃন্তের জায়গায় জমে থাকা রক্তের মতো কালচে লাল?

 

আচ্ছা বাবা-মা,শিপু ওরা কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে ওপারে?শিপুর তো স্কুলেও যাওয়া লাগছেনা বোধহয় এখন।পাজি ছোড়া একটা।কি মারটাই না খেত ভাইটা আমার বাবার কাছে স্কুলে না গেলে।তাও জেদ ধরে বসে থাকতো ঠায়।ঠিক তেমনি সেদিনও জেদ ধরেছিলো শিপু।আমাকে রাস্তায় নামিয়ে ঠেস দিয়ে ধরেছিলো ওরা ওদের জীপের সাথে আর শিপুকে বলেছিল যে আমার জামা টেনে খুলতে।তখন আমার শিপু,ভাইটা আমার তার ১৪ বছরের ছোট শরীরটা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল ওদের ওপর আমাকে রক্ষা করার জন্যে।হঠাৎ একঝাক গুলি এসে ফুট ছয়েক দূরে নিয়ে ফেলল আমার শিপুকে।আমার বুনে দেয়া শিপুর হলদে সোয়েটারটা নিমেষেই লাল হয়ে গেলো।সাথে সাথে আমার বাবা আর মাকেও সেই লালের মাঝে ডুবিয়ে দিলো ওরা।চোখের পলক শুধু একবার কি দুবার ফেলেছিলাম আর এর মাঝেই আমি একা হয়ে গেলাম,অনেক একা।এখনো আমি একা।আমার আশেপাশে আরও যে ২০-২২ জন আছে তারাও একা।

 

আচ্ছা উল্টো করে রাখলে নাকি দেহের সব রক্ত মাথায় চলে আসে?তাহলে আমার যোনি থেকে এতো কালচে লাল গড়াগড়ি খাচ্ছে কেন?এত লাল আসলো কোথা থেকে?বড্ড জানতে ইচ্ছে হয় আমার।ওই তো এসে গেছে ওদের একজন।ওর হাতে দেখছি বেয়নেট।ও বেয়নেটে লেগে থাকা লাল পরিষ্কার করছে কেন?শাণ দিচ্ছে হয়তো।হয়তো কারও যোনি ভেদ করে প্রবেশ করাতে সুবিধা হবে তার।আচ্ছা,এটা কি তাদের কাছে একধরণের খেলা?আমরা যেমন ছোটবেলায় কুতকুত,বৌ-ছি খেলতাম ওভাবেই ওরা খেলছে আমাদের সাথে ধর্ষণ খেলা,শরীরের অঙ্গ কাটা খেলা,বেয়নেট দিয়ে শরীর ফুটো করার খেলা,তাই না?ওদের সব খেলাই দেখা যায় লাল।৭০-৮০ বার করে ধর্ষণ,নানান অঙ্গ কেটে নেয়া এসব খেলা এখন শেষ তাই ওদের নতুন খেলা শুরু।আমাকে দিয়েই শুরু করবে হয়তো...আমি???না না...নাআআআআআআআআআআআ...............

 

 

.

সময়টা ১৯৭১ সাল।বাংলাদেশ লড়ে চলছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য।পাকিস্তানি হায়েনাদের শোষণের হাত থেকে এ দেশকে মুক্ত করার জন্য।মুক্তিযুদ্ধ।পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোন যুদ্ধে এত মানুষ মৃত্যুবরণ করেনি,এতোসংখ্যক নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়নি।৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয় এ যুদ্ধে।৩ থেকে ৪ লক্ষ নারী তাদের সম্ভ্রম হারায়।মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি মিললেও বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ ও মহিমার কথা চাপা পড়ে যায়।সামাজিকভাবে,পারিবারিকভাবে বারবার লাঞ্ছিত হতে হয় তাদের।৭১ এ পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারেরা নারীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়।তাদের নির্যাতনের কিছু বর্ণনা-

## সৈনিকেরা অনেক সময় হঠাৎ করে গ্রামে বা বসতিতে আক্রমণ চালিয়ে পলায়নরত মহিলাদের ধরে এনে উন্মুক্ত স্থানেই ধর্ষণে লিপ্ত হতো। ## গণহত্যার প্রথম দিকে ক্যাম্পে পাকিস্তানি সৈনিকদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক মেয়ে ওড়না বা শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।এর পর থেকে এসব মেয়েকে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা হয়। 

 

## অনেক সময় বন্দি বাঙালি মেয়েদের নদীতে শিকল বাঁধা অবস্থায় গোসল করতে যেতে দিত।এসময় একটু দেরি হলেই সৈনিকেরা তাদের ঘাঁটি থেকে শিকল ধরে টানাটানি করতো।এধরণের টানাটানিতে অনেক সময়ই প্রায় বিবস্ত্র শরীরে এসব মেয়েকে ঘাঁটিতে ফিরতে হতো।

 

## অনেক সময় যুবতী মেয়েকে মোটা লোহার রডের সাথে চুল বেধে ঝুলিয়ে রাখা হতো।পাকসেনারা প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত করতো,কেউ কেউ এসে সেই উলঙ্গ যুবতীদের উলঙ্গ দেহে উন্মত্তভাবে আঘাত করতো,কেউ তাদের স্তন কেটে নিয়ে যেত,কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করতো।এসব অত্যাচারে কোন মেয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হতো। 

## সাধারণত যে সকল বাঙালি মেয়ে এধরণের পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করতো তাদেরকে তখনই চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছিঁড়ে ফেলে,যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যা করা হতো। 

 

## অনেক সময় পিতার সামনেই মেয়েকে,সন্তানের সামনে মাকে,স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করতো পাকিস্তানি সৈনিকেরা।কখনও কখনও পিতাকে,ছেলেকে বা ভাইকে আদেশ করতো মেয়েকে,মাকে অথবা বোনকে ধর্ষণ করতে।এতে অবাধ্য হলে সাথে সাথে তাদের হত্যা করা হতো।

 

সূত্র- ৭১ এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ-এম..

হাসান

২। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান-ড.শাহনাজ পারভিন

 

 

 

"জেনারেল এ এ খান নিয়াজী (পূর্ব পাকিস্তানে) ধর্ষণের ঘটনা অস্বীকার করেন নি। বরং লালসাময় কন্ঠে তিনি  বলেছিলেন, "তুমি কখনোই এটা আশা করতে পারো না যে একজন মানুষ পূর্ব পাকিস্তানে বাস করবে, যুদ্ধ করবে এবং মারা যাবে- কিন্তু যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য ঝিলাম(পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অঞ্চল) যাবে।" (ইস্ট পাকিস্তান: দি এন্ড গেইম, ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী) 

 

"ধর্ষণ ব্যাপারটি শুধুমাত্র সুন্দরী নারীদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না," ব্রাউনমিলার লিখেছেন, "আট বছরের মেয়ে থেকে শুরু করে ৭৫ বছর বয়সী দাদীরা পর্যন্ত যৌন আক্রমণের শিকার হন।....পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালী নারীদের ঐ স্থানে আক্রমণ করেই ক্ষান্ত হয় নি। তারা অসংখ্য বাঙালী নারীকে অপহরণ করে নিজেদের ব্যারাকে নিয়ে যেত। উদ্দেশ্য রাতে চাহিদা মেটানো।" কোন কোন নারী সম্ভবত আশি বারের মতো ধর্ষণের শিকার হন (ব্রাউনমিলার, পৃষ্ঠা ৮৩)কতজন নারী নৃশংস অত্যাচারের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন আর কতজন নারীকে গণহত্যার অংশ হিসেবে হত্যা করা হয়েছিল তা শুধু অনুমান করা যাবে। 

 

কতোগুলো জীবন,কতোগুলো স্বপ্ন সব নিমেষেই ধূলিসাৎ যায়।সবকিছুই লালের মাঝে ডুবে যায়।

 

.

আমাকে কই যেন নিয়ে যাচ্ছে ওরা?ট্রাকের ভারী চাকার আওয়াজ পাচ্ছি।আমার পাশের সব মেয়েরা হয়তো মৃত।কিন্তু আমার জীবনের স্পন্দন এখনো মৃদুভাবে দুলছে।চোখ বুজে আসছে প্রায়।আমাকে মৃত ভেবে ট্রাকে তুলে দিয়েছিলো হয়তো ওরা।অবশ্য আর মাত্র কিছুক্ষণ।আমি বুঝতে পারছি যে আমি মৃত্যুর খুব কাছে চলে এসেছি।আমার উলঙ্গ দেহে লালের চাঁদর আরও গাঢ় হয়েছে।আসলে সবাই ই বলতে গেলে লালের সমুদ্রে ভেসে আছি।মানুষের শরীরে এত লাল কিভাবে থাকে?ট্রাকের দুলুনিতে লালগুলোও কাঁপছে থরথর করে।শুকনো লালের সাথে তরলীকৃত লাল মিশে যাচ্ছে।কোন মেয়ের স্তন দুলছেনা,সব ই যে কাটা,সবই ওই লালের মাঝে তলিয়ে গেছে।আচ্ছা,ওই মেয়েটা কে?রুপা নাকি?চেনা যাচ্ছেনা ঠিক?আঁধারের চেয়েও গাঢ় ও জায়গাটা।কালচে লালে মুখটা ভরা।চিনবো কিভাবে?যেই ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে এতদিন আমাদের সবাইকে অনুপ্রেরণার বানী দিতো সে ঠোঁট দুটোও ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে।যে সপ্নালু চোখে ও আমাদের মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখাত সেটাও রক্ত-ক্লেদে বুজে গেছে।আমারও এক চোখ বোজা লালে।আরেক চোখ মেলে দেখছি সব।সাজ্জাদ আমার চোখে তাকালেও নাকি লাল দেখত।আজো ও তো আমার চোখ লাল।কিন্তু এই লাল দেখতে ওর নিশ্চয়ই ভালো লাগতো না।সাজ্জাদ তুমি ভালো থেকো সবসময়।তুমি নিশ্চয়ই এখন মুক্তিযুদ্ধে।হাতে রাইফেল নিয়ে কোন এক অপারেশনের প্ল্যানিং করছ।তোমার প্রেয়সীর কথা কি তোমার একবারও মনে পড়ে?না পড়লেই ভালো।কখনো না পড়ুক মনে।দেশটাকে একদিন স্বাধীন করে তুমি কোন এক নীল শাড়ি পড়ে থাকা নীলাঞ্জনাকে বিয়ে করে ফেলো।সুখে থেকো তুমি,আর লাল খুঁজতে যেওনা কখনো।লাল খুব খারাপ।খুব বাজে।

 

আমার সময় বোধহয় হয়ে এলো।চোখের মণির ওপর এসে পড়ছে লাল।ভেসে যাচ্ছে চোখ লালে।আকাশটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে পুরোটা।রাতের আকাশ কালো কাঁথা মুড়ি দিয়ে থাকার কথা কিন্তু একী?আমি আকাশ লাল দেখছি।চোখটাও প্রায় বুজে আসছে।কিন্তু আমিতো দেখতে চাই।আর কিছুক্ষণ কি আমাকে বেচে থাকতে দেয়া যায়না।আমার দেখতে হবে তো আকাশটা।সাজ্জাদকে জানাতে হবে।আকাশ এতো লাল কেন?আকাশ কেন লাল???

 

.......................................।।সমাপ্ত।।.............................................

 

Share