দানব

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 738 বার দেখা হয়েছে

১.

 

আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম

আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম......

 

আব্দুল্লার কানে এসে বারবার কড়া নাড়াচ্ছে বড় হুজুরের সুললিত আজানের ধ্বনি।পূবাকাশের বুক চিঁড়ে সূর্য সবেমাত্র লালিমা মাখা একটা বক্ররেখা একেছে ।চোখ কচলে আব্দুল্লা মোটা মোটা জানালার সিঁদগুলো তার কালো পোড়া আঙুল দিয়ে ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ।একটু পরেই বড় হুজুর আসবেন মেহগনি গাছের চিকন একটা ডাল হাতে নিয়ে,যে যে এখনো ঘুমিয়ে আছে তাদের লুঙ্গি তুলে লাগাবেন দু-চার ঘা।আব্দুল্লার মার খেতে ভয় লাগেনা,অবশ্য সে মার খায়ও না তেমন একটা।মাত্র ১ মাস ই তো হল সে এসেছে এ মাদ্রাসায়।

“বাজান যে কেন আমারে এইখানে পাঠাইলো!!”,নিজেকেই যেন নিজে প্রশ্ন করে সে।গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকা সব কষ্ট কান্না হয়ে চোখ ফেটে বেড়িয়ে আসতে চায় তার।১২ বছরের ছোট্ট আব্দুল্লার নিজেকে হঠাৎ খুব বয়স্ক কেউ মনে হয়।খুব বয়স্ক।।মাদ্রাসার পাশের ওই বটগাছটার চেয়েও বয়স্ক,ওর গ্রামের কালী মন্দিরের চেয়েও বয়স্ক।

“কীরে তোরা সব উঠলি না এখনো?”

বড় হুজুরের চিৎকারে আব্দুল্লার বয়সের গুনতি থেমে যায়।সপাৎ সপাৎ শব্দে যেন দলা পাকানো কষ্টগুলো ক্ষণিকের জন্য ভয়ে রুপান্তরিত হয়।লুঙ্গির গিঁট ঝুলে থাকা অবস্থাতেই সে সবার সাথে দৌড়ে যেতে থাকে কলতলায়,অজুর জন্য।এভাবে দৌড়াতে গিয়ে তার মনে পড়ে যায় গ্রামের সব স্মৃতি,গ্রামের সব কথা, গোপালের কথা।।গোপাল।।এভাবেই তো দৌড়াত তারা দুজনে,মাঠে-ঘাঁটে,হাটে-বাজারে।গোপালের কাধে চড়ে গাছে উঠাতো তার সাড়ে চার ফিটের ছোট্ট শরীরটি।তারপর একসাথে সাঁতরে গোসল করা,কালী মন্দিরের প্রসাদ চুরি,গোপালের মায়ের বানানো পূজোর মিঠাই খাওয়া,আরও কতো কি ই না করতো তারা।এর সব ই এখন স্মৃতি।

“গপু,তুই কেমন আছিস রে?আমাকে কি মনে পড়ে তোর?”,এই প্রশ্নটা কখনোই করা হয়নি গোপাল কে।হয়তো যেদিন দেখা হবে সেদিন করবে।হয়তোবা আর কখনোই করা হবেনা।দেখা কি হবে?অনিশ্চিত জীবন তার,অনিশ্চয়তায় ভরা।

২.

 

মাদ্রাসা-ই-আলিয়া,কলকাতার হিন্দু অধ্যুষিত পদ্মপুকুর লেন থেকে সরিয়ে ওয়েলেসলি হাজী মুহসিন স্কয়ারে স্থানান্তর করা হয় ১৮২৭ সালের অগাস্ট মাসে।উগ্র হিন্দুদের বারবার মাদ্রাসার কাজে হস্তক্ষেপে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।মাদ্রাসাটি...

মাওলানা খান বাহাদুর এটুকু পর্যন্ত পড়ে থেমে গেলেন।এখন আর আগের ইতিহাস পড়ে লাভ নেই।ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে তার।উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসাটির অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।সদ্যই অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি।ছাত্র-শিক্ষকরা তাকে বড় হুজুর ডাকে,সম্মান করে।তিনি বিমোহিত হয়ে যান।আবার মাঝে মাঝে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে ভাবতে থাকেন তিনি কিভাবে সামলাবেন এত বড় বড় সব দায়িত্ব।এসব ভাবতে ভাবতে শানবাঁধানো পুকুর ঘাঁটে বসে পড়েন তিনি।

“দ্বি-জাতি তত্ত্ব,ছ্যাহ...এসব তত্ত্ব-ফত্ত দিয়ে কি লাভ?হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান,মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান।এসবের মানে কি?আল্লাহপাক যেখানে কোন ভাগ-বাটোয়ারা করেন নি মানুষের মাঝে,সেখানে মানুষের হাত দেয়ার অধিকার কিসের?কে যাবে তার ভিটে-মাটি ছেঁড়ে এক অপরিচিত দেশে?তাহলে দেশপ্রেমের মূল্য কি?দেশ ভাগ করার ই বা কি আছে?আমাদের দেশ তো পুরোটাই,ওই ইংরেজ গুলো না এসে সব প্যাঁচ লাগিয়েছে।শা...”,খারাপ শব্দটা মুখ থেকে আরেকটু হলেই বেরিয়ে যেতো প্রায় খান বাহাদুরের।তওবা পড়তে থাকেন তিনি একমনে।এর ফাকে মুখে দলা পাকানো কফ থু দিয়ে ফেলেন পুকুরের পানিতে।নৌকোর মতো ভেসে ভেসে কফগুলোও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়,ঠিক যেন এই দেশের মতো।আবার তওবা পড়েন তিনি।

ওই পাড়ে কে যেন বসে আছে একদম পুকুরের পাড় ঘেঁষে,হয়তো কোন ছাত্র হবে।যেয়ে একটা ধমক লাগাব নাকি,ভাবলেন খান বাহাদুর।এই ছাত্রগুলোর জন্যই তো তার যতো চিন্তা,উঠে হাঁটতে লাগলেন তিনি।হিন্দুরা নাকি যেখানে মুসলমান পাচ্ছে সেখানেই তাদের পুড়িয়ে ফেলছে।মুসলমানরাও নাকি বেশ কয়েক জায়গায় সক্রিয় হয়ে পড়েছে।কাল পত্রিকায় দেখলেন পূর্ব বঙ্গে নোয়াখালী না কোথায় যেন হিন্দুদের গ্রাম পুরোটা জ্বালিয়ে দিয়েছে মুসলমানরা।মুসলমানরা হিন্দু পেলে জবাই করে,আর হিন্দুরা পুড়িয়ে মারে ।মানে যে যেটা ভালো পারে সেটাই করে বেড়াচ্ছে।দানব হয়ে গেছে সব মানুষ,দানব।মহত্মাজী নাকি নোয়াখালিতে গিয়ে এসব দাঙ্গা দেখে শোক প্রকাশ করেছেন।এদের শোক প্রকাশ আর শেষ হয়না।আজ মহত্মাজী শোক প্রকাশ করেন নোয়াখালীতে,কাল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেদিনীপুর গিয়ে শোক প্রকাশ করেন।মহত্মাজীর কাজ পূর্বে আর সোহরাওয়ার্দীর কাজ পশ্চিমে।এদের শোক প্রকাশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তো আর থেমে নেই।সোহরাওয়ার্দী এই মাদ্রাসা থেকেই পাশ করেছিলো এক সময়,তার কাছে সাহায্য চাইবেন নাকি তাই ভাবছেন খান বাহাদুর।নাহলে হিন্দুরা তার এই মাদ্রাসা হাতের কাছে পেলে জ্বালিয়ে দিতে যে দ্বিধা করেবনা তা তিনি ভালমতোই জানেন।

“এই ছেলে,তোর নাম কীরে?এখানে বইসা আছিস কেন?”

আব্দুল্লা হাতের মাটি ফেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি সালাম দিলো, “আসসালামু আলাইকুম বড় হুজুর,আমি কিসু করিনাই।আপনেরে দেখবার পারিনাই।মাফ কইরা দেন।”

“আমি কি বলসি তুই কিছু করসস?এখন বল কি করতাসিলি?”

“কিসু না হুজুর,মাটি দিয়া নাও বানাই।”

“তোর কি আমপারা খতম হইসে,কোরআন শরিফ ধরসস?”

“না হুজুর,আগামী মাসে ধরমু।”

“ও,তোরে প্রায়ই দেখি পুকুর পাড়ে বইসা থাকস।কারণ কি?”

“কিসু না হুজুর,গেরামের কথা মনে পড়ে।”

“নতুন আসলে সবার ই খারাপ লাগে।আস্তে আস্তে ঠিক হইয়া যাবে।যা ভিতরে যা,মাগরিবের ওয়াক্ত হইয়া গেসে।”

খান বাহাদুর আব্দুল্লার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ।ছেলেটা কেমন যেন পা টেনে টেনে,কায় ক্লেশে, কোন এক বৃদ্ধ বটের মতো হেঁটে যাচ্ছিলো।আব্দুল্লার ভাবলেশহীন চোখ-মুখ দেখে তার বুক কেঁপে উঠছিলো বারবার।১১-১২ বছরের এক ছেলের চোখে মুখে কেন এত কষ্টের ছাপ?কি দেখেছে সে ওই চোখে যে তার চোখে কৈশোরের উচ্ছলতা নেই?নেই ভয়ের ছাপ?শুধু আছে কষ্ট।।অব্যক্ত কিছু কষ্ট।

৩.

সময়টা ১৯৪৭ সাল।দেশভাগের গুজবে মুখরিত এই উপমহাদেশ।বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ।উগ্রবাদী হিন্দুরা ভাবছে ভাষার কারণে হয়তো তাদের পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে হবে।তাই পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় মুসলমানদের উপর নেমে আসে বিভীষিকা।ধর্মের নামে মানুষরূপী দানবগুলো ঘোষণা দিয়েই হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র উপমহাদেশে।হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে শুরু হয় ধর্মের নামে অধর্মের যুদ্ধ।পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর,সচ্ছল ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইংরেজ আর দেশীয় ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কেন্দ্রস্থল।

 

(ক)

“আমরা শুনলাম পশ্চিমবঙ্গের বালিঘাটায় দু’জন গোয়ালাকে মারা হয়েছে এবং বউবাজারে দাঙ্গা শুরু হয়েছে।….এটা ছিল দেশের জন্য এক ক্রান্তিকাল, দেশকে অবশ্যই বাঁচাতে হবে। যদি আমরা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাই, আমরা শোষিত হব। আমি আমার ছেলেদের ডাকলাম, তাদের বোঝালাম, এবার আমাদের বিদ্রোহী হতে হবে, এবং হিংস্রতার জবাব হিংস্রতা দিয়েই চোকাতে হবে…. আমরা তাদের হামলা করছিলাম যারা আমাদের হামলা করছিল…আমরা তাদের সাথে মারামারি করছিলাম এবং তাদের খুন(শহীদ) করছিলাম। আমরা যখনি শুনতাম একটা হিন্দু মরেছে, আমরা আরও দশজন মুসলমানকে শহীদ করতাম। একজন হিন্দু মারার সংবাদ(গুজব) শোনামাত্র দশজন মুসলমানকে শহীদ করতে হবে, আমার ছেলেদের নিকট ছিল এই নির্দেশ”।।

-গোপাল পাঠা

 

(খ)

আমি দেখলাম চারটি ট্রাক দাড়িয়ে আছে, শহীদদের লাশ নিয়ে, কমপক্ষে তিন ফিট উঁচু স্তুপ হবে একেকটায়। লাশগুলো গাদাগাদি করে ছিল, রক্ত ও মগজের চৌবাচ্চায় যেন ভাসছিল শহীদদের লাশগুলো। এ দৃশ্য আমাকে খুব প্রভাবিত করে। একজন মুসলমানকে শহীদ করতে পারলে দশরুপি, আহত করতে পারলে পাঁচরুপি পাওয়া যেত।

-যুগলচন্দ্র ঘোষ

***বিবিসি(B.B.C) তে ভারতের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেয়া সাক্ষাৎকার।(তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া)

৪.

 

“আব্দুল্লা...ওই আব্দুল্লা।।লে হালুয়া,ওই ব্যাটা মরলি নাকি?”

“আরে না,দাঁড়া।কি হইসে বল?”

“লে হালুয়া,আইজ নাকি কালী মন্দিরে পূজা আসে,যাবি?”

“প্রসাদে কি দিবো রে?”

“খিচুড়ি রান্না করতাসিল দেখলাম।”

“চল,চল তাইলে।”

ধপ করে উঠে পড়লো আব্দুল্লা।আজো সেই এক ই স্বপ্ন।বারবার এই স্বপ্ন দেখে সে ক্লান্ত।জানালার কাছে গিয়ে তার রুল টানা খাতাটা টেনে নিলো।পেন্সিলের ভোঁতা মাথা দিয়ে লিখতে শুরু করলো কাঁপা কাঁপা হাতে-

 

‘লে হালুয়া’ বলা গপুর বদভ্যাস।একবার শবে বরাতের রাতে হালুয়া আর রুটি খাওয়ার পর থেকেই গপু হালুয়ার বিরাট ভক্ত হয়ে গেছে।গপুর বোন তনুকেও হালুয়া দিতাম মাঝে মাঝে।অবশ্য তনুকে আমি পছন্দ করতাম কিন্তু ও আমাকে করতোনা।আমি নাকি শ্রী মদন দাস।ও যখন এই কথা বলতো তখন আমার চোখে পানি চলে আসতো।লুকোতেও পারতাম না,ও দেখে ফেলত আর হি হি করে হাসত।তনুর গায়ের রং কালো হলেও ওর চুলগুলো অনেক বড় আর সুন্দর ছিল।আমি যখন গপুর সাথে ওর বাড়ি যেতাম,প্রায়ই দেখতাম তনু হাতে নারকেল তেল নিয়ে মাথার বড় চুলগুলো জবজবে করে ভেজাচ্ছে।ওর ওই তেলে ভেজা চুলে আমি দ্বিতীয়বারের মতো সূর্যোদয় দেখতাম।তারপর ও যখন পুজো করতে বসতো আমিও গপুর সাথে ওর পিছে পিছে ঢুকে বসে পড়তাম।সবাই তাকিয়ে থাকতো মা কালীর দিকে আর আমি তাকিয়ে থাকতাম তনু কালীর দিকে।অবশ্য ও মা কালীর চেয়ে শুভ্র সাদা অনেক।গপু মাঝে মাঝে ধরে ফেলত,তখন ওকে আমার হালুয়া খাওয়াতে হতো।নাহলে ও নাকি তনুকে বলে দিবে।গপুর হালুয়া খেয়ে তৃপ্তির হাসিটা দেখতে আমারও খুব ভালো লাগতো।মুখভর্তি হালুয়া নিয়ে ওর হাসি শুনতেও ভালো লাগতো।আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলতাম,তুই একটা দানব। রাক্ষস ।আর ও পেট দুলিয়ে দুলিয়ে হাসত।বিকেলবেলা ঘুড়ি আর নাটাই নিয়ে খেলতে যেতাম নদীর ধাঁরে।গপুর বাবার অবস্থা ভালো ছিল না,তাই আমার ঘুড়ি ও ই ওড়াত।আকাশের দিকে ঘুড়ির সুতোয় চিলচোখে তাকিয়ে ও যেন ঘুড়ির সাথেই উড়ে চলত।আর আমি নাটাই নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম।।তারপর ঘুড়ি ওড়ানো শেষে পুকুর পাড়ে বসে ওর ঢোলের মতো পেটটাতে ঢোল বাজাতাম।আর নৌকায় যাওয়া মানুষদের খিস্তি দিতাম।এভাবেই চলে যাচ্ছিলো জীবন।।আমাদের হুগলী নদীটার মতন।কখনো জোয়ারের মতো উচ্ছল আবার কখনো ভাটার মতো শান্ত।

তারপর একদিন আসলো সেই ভয়ংকর রাত।আমি উঠোনে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।হঠাৎ মানুষের আহাজারি শুনে উঠে বসলাম।সামনে তাকিয়ে দেখলাম,কালী মন্দিরের মাথায় আগুনের শিখা খেলা করছে।বাজান আসার আগেই অজানা ভয়ে দৌড় লাগালাম।প্রাণপণে ছুটছি তো ছুটছি।কালী মন্দিরের কাছে গিয়ে দেখলাম মা কালীর সারা অঙ্গে আগুন,মন্দিরের দ্বারে দ্বারে আগুন,প্রসাদের খিচুড়িও পুড়ছে সে আগুনে,পুড়ছে পুরোহিত মশাইও।আমি ভয়ে ভয়ে গপুর বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলাম।যেদিকেই তাকাই শুধু আগুন আর আগুন।সব হিন্দু বাড়ি পুড়ছে।ঘোষাল কাকার বাড়িতে আগুন,দেবু দাদার গোয়ালে আগুন,আগুন ওই প্রীতিলতা বৌদির গায়ে।এমন সময় একদল লোক এসে ধরল আমাকে।আমার লুঙ্গি খুলে আমার গোপনাঙ্গ দেখে আবার আমাকে ছেঁড়ে দিলো।আমি লুঙ্গির গিঁট খোলা অবস্থাতেই দৌড়ে দাঁড়ালাম গপুর বাড়ির সামনে।গপুর বাড়িটা আগুন যেন গিলে খেয়ে ফেলেছে বহু আগেই।সামনে দেখি তনু পুড়ে ঝলসে গেছে।ঠিক মা কালীর মতই লাগছিলো ওকে তখন।চুলগুলো পুড়ে ন্যাড়া পোড়া মাথা বের হয়ে ছিল ওর।এগুতে লাগলাম...দেখলাম গপুকে।আমার গপু।।ওর মোটা পেটটা দেখে চিনলাম,নাহলে চেনার উপায় ছিলোনা।গপুর বুক ওঠানামা করছিলো তখনো।আমি কাছে গিয়ে পোড়া চামড়া আর কাঠের ওপর বসলাম।

“আব্দুল্লা,আইজ রাক্ষস আইসিলো।দানো...হাতে আগুন নিয়া।মানুষের মতন ই।কিন্তু দানো।।”

আমি মূর্তির মতো বসে ছিলাম শুধু।চোখে ছিলোনা কোন অশ্রু,না ছিল কোন ভয়।শুধু ছিল বিস্ময় আর হতাশা।গপুর পোড়া আঙুলগুলো ধরে শুধু বসে ছিলাম আমি।।...।।

পেন্সিল তুলে নিয়ে পৃষ্ঠা দুটো ছিড়ল আব্দুল্লা।জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে রইল পুকুরপাড়ের ওই বটগাছটার দিকে।শুধু তাকিয়েই রইল...

৫.

হাতে দুটো পৃষ্ঠা।।খান বাহাদুর আব্দুল্লার পাশে বসে আছেন ফজরের পর থেকেই।আব্দুল্লার কোন চেতনা নেই ভোর থেকে।আব্দুল্লার লেখা পৃষ্ঠা দুটো পড়ে খান বাহাদুর পর্যন্ত সহ্য করতে পারেন নি,অথচ এই বাচ্চা ছেলেটা কিভাবে এসব মর্মান্তিক ঘটনাগুলো বুকে চেপে রেখেছিল তা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠছে।উগ্র হিন্দুরা নাকি একদম কাছে চলে এসেছে।আজকের মধ্যেই তাদের রওনা দিতে হবে ডাক্কার উদ্দেশ্যে।নাহলে প্রানে বাঁচা দায় হয়ে পড়বে আর এর মধ্যে আব্দুল্লার এই অবস্থা।খান বাহাদুর ভালমতোই বুঝেছেন যে এই ছেলের হৃদয়ে বেঁচে থাকার জন্য সামান্য ইচ্ছাশক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।তিনি ছাত্রদের সবকিছু গুছিয়ে নিতে বলেছেন আগেই।কিন্তু আব্দুল্লাকে নিয়ে কি করবেন বুঝতে পারছেন না।আশেপাশে কোন ডাক্তার-বৈদ্যিও নেই।খান বাহাদুরের জীবনে প্রথমবারের মতো খুব ভয় করছে।ভয়ে তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।তার খুব দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।।খুব দ্রুত।

আগুন আর আগুন।।হাবিয়াহ দোজখ যেন নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।শয়ে শয়ে মানুষ দৌড়ে পালাচ্ছে।।চোখে মুখে তাদের ভয়।মাওালানা খান বাহাদুরও আজ যেন সব মানসিক আর শারীরিক শক্তি এক করে দৌড়াচ্ছেন।তাকে দৌড়াতেই হবে।তার কোলে একটা নিরীহ ছেলে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।নিজে না বাঁচলেও তার আব্দুল্লাকে বাঁচাতে হবে।আব্দুল্লাকে তিনি নতুন জীবন দেবেন।যেখানে তিনি আব্দুল্লাকে মানবধর্মের আসল শিক্ষা দেবেন।আগে একজন মানুষ হতে শেখাবেন,তারপর ধর্ম।যে অমানুষ,সে ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা করে,মানুষকে নিয়েও এমনকি দেশকে নিয়েও।তাকে আব্দুল্লাকে,তার সব ছাত্রকে এই আগুনের সাথে সাথে সাম্প্রদায়িকতার আগুনের আঁচ থেকেও রক্ষা করতে হবে।একদিন হয়তো মানুষ বুঝবে তাদের ভুল।ধর্মের মূল ভিত্তি যে শান্তি তা তারা জানবে।সেদিন হয়তো মানুষরূপী দানবের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষা পাবে,রক্ষা পাবে সাম্প্রদায়িকতা নামক দানবের হাত থেকেও।

 

 

তথ্যসূত্র ও উৎস- **উইকিপিডিয়া

**দৈনিক ইত্তেফাক

Share