অমানুষ

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 810 বার দেখা হয়েছে

আসগর আলী আকাশপানে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন।চাঁদ উঠেছে আজ।মস্ত বড় চাঁদ।আসগর আলীর কাছে নষ্ট ডিমের কুসুমের মতো লাগছে আজ চাঁদকে।জোছনার আলোও তার বিরক্তি ধরিয়ে দিচ্ছে।বৃদ্ধ বয়সে কি তাহলে প্রকৃতিও অসহ্য লাগা শুরু করে মানুষের?নাকি এই প্রকৃতি,এই সৌন্দর্য তাকে অপাংক্তেয় করে দিলো।বুঝিয়ে দিলো যে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এ শরীর আর পচে গলে যাওয়া আবেগহীন এ হৃদয় পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছে।আসগর আলীকে অবশ্য কখনোই প্রকৃতি তেমন টানেনি।বরং এই নিস্তব্ধ রাত,মাতাল হাওয়া,বৃষ্টিস্নান অথবা জোছনা রাতে উলঙ্গ চাঁদের নিচে হা করে দাঁড়িয়ে থাকা সব ই তার বন্ধু মাহবুবকে টানত।ওইতো মাহবুবকে দেখা যাচ্ছে আবছা অন্ধকারে।আজও নিশ্চয়ই সে আলো মাখছে বেশ আয়েশ করে।আগে তো তিনি ই টেনে ঘরে নিয়ে আসতেন।এসব ছ্যাবলামি দেখলে গা জ্বলে যেতো তার।কিন্তু এখন তো আর তার বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা নেই।

 

আসগর আলী তার হাতের ডায়েরিটা একপলক দেখে নিলেন।চাঁদের আলো বেশ ভালোই আছে,উঠোনের বাল্বটাও কিছুক্ষণ পরপর জ্বলছে নিভছে।ডাইরিটা পড়তে কোন সমস্যা হবার কথা নয়।তার ওপর মাহবুব ও বলে দিয়েছে পড়ে নিতে,ভাবলেন আসগর আলী।

 

“মতিন,এই মতিন।আছিস নাকি আশেপাশে?”,হঠাৎ চিৎকার করে মতিনকে ডাকলেন আসগর আলী।

“জে স্যার,আমিতো আছি এইখানেই।মাহবুব স্যারেরে দেখতে মন চাইলো হঠাৎ”,গাল চুলকোতে চুলকোতে বলল মতিন।

“মাহবুবকে দেখতে হবে না তোর।তুই আগে আগরবাতিগুলো নিভিয়ে ফেল।গন্ধে তো টেকা যাচ্ছে না।আর ওই বুড়া হুজুরকে বল প্যানপ্যানানি থামাতে।সেই কখন থেকে প্যানপ্যান করেই যাচ্ছে।”

“প্যানপ্যানানি হইবে কেন স্যার?তেলাওয়াত করতেসেন আর কানতেসেন।একটু কানতেও পারবে না মানুষ?”

“চুপ কর।যা বলছি তাই কর।যা এখন সামনে থেকে।”

 

আসগর আলী দেখলেন মতিন আবার মাহবুবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।কেউ ই তার কথা শোনেনা আসলে।প্রতিটি মুহূর্তেই নিজেকে বোঝা মনে হয় তার।হৃদয়জুড়ে পাহাড়প্রমাণ কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকাটাও মূল্যহীন।৭০ এর ওপর বয়স হয়ে গেলো তাও যে কেন পড়ে আছেন এ পৃথিবীতে তা তিনি নিজেও বুঝতে পারেন না।মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে অন্য কোথাও চলে যেতে কিন্তু কোথায় ই বা যাবেন তিনি?যাওয়ার কোন জায়গাই তো নেই তার।গেটের পাশে পড়ে থাকা ধুলোমাখা,ক্ষয়ে যাওয়া সাইনবোর্ডটার দিকে চোখ পড়লো আসগর আলীর।

                                    “আশা বৃদ্ধাশ্রম”

তার আর তার মত আরও ৪০ জন বৃদ্ধ,অপাংক্তেয়,পচে যাওয়া অমানুষদের একমাত্র আশা এই আশা বৃদ্ধাশ্রম।ও না ৩৯ জন হবে তো,মনে মনে বললেন আসগর আলী।হাতে থাকা ডাইরিটা খুলে নিলেন তিনি।পুরো ডাইরি জুড়ে শুধু চিঠি।পড়তে শুরু করলেন,এতদিনের জমে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর আর মাহবুবের সব জানা অজানা কথাগুলো হয়তো চিঠিগুলো পড়লেই জানা যাবে...

 

 

১৯ ফেব্রুয়ারি,১৯৭২

প্রিয় কবিতা,

              তোমার দেয়া ডাইরিতে আজ লিখতে বসেছি।কি লিখবো জানিনা।তবে যা লিখবো তা তোমাকে কখনো দেখাবো না নিশ্চিত।আমার হৃদয়ের গোপন কথাগুলো শুধু লিখে রাখবো এখানে।যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছি মাত্র দেড় মাস হল।তোমাকে যে ফিরে পাবো তা ভাবতেই পারিনি।মার সাথে কথা বলেছি আমাদের ব্যাপারে।মা বাবাকে বুঝিয়ে বলবে বলেছে।আর মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু করেছি,চাকরিও নিশ্চয়ই জুটে যাবে একটা না একটা।তুমি চিন্তা করো না একদম।যুদ্ধের আগে তো টুকটাক কবিতা লিখতাম কিন্তু এখন কেন যেন আর ছন্দ খুঁজে পাইনা।খটমট দু চার লাইন লিখে আর লিখতে পারি না।ছন্দরা বেশ রুষ্ট আমার ওপর।কানের পাশ দিয়ে উড়ে যায় কিন্তু ধরতে গেলেই নাগাল পাওয়া যায়না আর।তুমি একটু ধরে এনে দেবে ওদের আমার কাছে।নাহলে তোমাকে কবিতা শোনাবো কিভাবে বল?জানো,তোমার জন্য না আমি একটা “নীলজল” ফুল এনেছি।তোমার খোঁপায় গুজে দেবো সেই নীলজল আর তার সাথে একডোরে বাঁধবো আমার এই ছন্দহীন হৃদয়।

 

              “সদ্য ফোঁটা নীলজল,আর সূর্যের লাল টিপ,

                সাথে একরাশ স্নিগ্ধ মায়ায়

                   মিশিয়ে তোমায়...

                     করবো আমায়...

                        পাগলপারা...”

 

দেখেছো আর ছন্দ মিলাতে পারছি না।না মিলছে ছন্দ,না মিলছে কোন বিশেষণ।কি বিপদ!কি করা যায় এখন তুমি ই বল...

                                             ইতি

 

                                                 তোমার কবি

 

 

 

আসগর আলী এটুকু পড়ে থামলেন।যুদ্ধ তিনি করেন নি।কিন্তু মাহবুব যে করেছে তাও তিনি জানতেন না।আসগর আলী কেমন যেন নিঃসঙ্গতা অনুভব করছেন নিজের মাঝে।কেমন যেন একটা শূন্যতা।আবার ডাইরির দিকে চোখ দিলেন তিনি...

 

১৫ জুন,১৯৭২

 

এই নীলাঞ্জনা মাধুকরী,

                        কপট অভিমানে যে মুখ বাঁকিয়ে আছো তা কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি নীলাঞ্জনা।বিয়ের দিন তোমাকে নীল শাড়ি পড়তে বলেছি দেখে কি রাগ করেছো?নাকি এই যে বিয়ের রাতে আমি তোমায় একলা রেখে টেবিলে বসে ডাইরি লিখছি তাই এতো অভিমান?আসলে আমাদের এতদিনের স্বপ্নপূরণ হলো তো আজ তাই ভাবলাম কিছু লিখে রাখি।বাইরে কি সুন্দর জোছনা,দেখেছো নিশ্চয়ই!আজ আমরা বাইরে যাবো।চাঁদকে আজ পেছনে ফেলার চেষ্টা না করে আলিঙ্গনে বাঁধবো।তোমার নাকের ডগায় জমে থাকা একগুচ্ছ অভিমান অল্প অল্প করে ভাঙাবো আজ।তোমায় আজ ভালবাসব।নতুন জীবনের নতুন স্বপ্নগুলো একসাথে বসে বুনবো দুজনে।কি আসবে আমার আমার সাথে?

                                                    ইতি

                                                          তোমার নীলজল

 

 

ডাইরির পাতাগুলো লেগে গেছে একটা আরেকটার সাথে।ছুটিয়ে নিতে বেশ কসরত করতে হল আসগর আলীর।চাঁদ যেন আজ আলোকচ্ছটায় রাতকে দিন করে দেবে।আসগর আলীর পড়তে কষ্ট হচ্ছে বেশ।এতদিনের পুরনো হারিয়ে যাওয়া আবেগগুলো আজ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে।তাই আবার পড়তে ব্যাস্ত হয়ে গেলেন তিনি...

 

 

২৯ ফেব্রুয়ারি,১৯৭৪

প্রিয় নীল ও নীলিমা,

                         ঠিক ১ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড আগে আমি বাবা হয়েছি।নার্স কোথা থেকে যেন একফালি রাত এনে আমার কোলে তুলে দিলো।নিস্তব্ধ রাতের মতো অন্ধকার সে আবার চোখের মাঝে যেন আকাশের নীল।আমিতো ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম।বাবা বলে উঠলো আমার ছেলে নাকি কালো হয়েছে।কালো কি খারাপ বল নীলিমা?তুমি নীলের মা তাই নীলিমা বললাম,রাগ করো না আবার।জানোই তো আমার স্বভাব।চাঁদ কি এমন জোছনা ছড়াতো যদি রাত কালো না হতো?মানুষ পারেও।কালো বলেই কি অমানুষ হয়ে যাবে নাকি?ওর মাঝে আমরা শিক্ষার আলো দেবো,শেখাবো প্রকৃত মানুষ হতে।কি তুমি আছো না আমার পাশে?মা বলল তুমি নাকি চলে গেছো।নীলের মাঝে নাকি নীলিমা হারিয়ে গেছে!আমি বিশ্বাস করি নি।এটা কি হয় নাকি?তোমাকে ছাড়া কি থাকা যায়?নীল কি আমার একার নাকি?এভাবে তোমাকে যেতে দেবো না।আমার “নীলজল” ফুলখানি যে এখনও তোমার কাছে।তার মাঝে তো আমার হৃদয়ও গেঁথে দিয়েছি।তুমি হারিয়ে গেলে তো সেও হারিয়ে যাবে।হারিয়ে যেওনা কবিতা,হারিয়ে যেওনা নীলাঞ্জনা,হারিয়ে যেওনা নীলিমা......

                                 ইতি

                                       জানি না

 

চাঁদ হঠাৎ ঢেকে গিয়েছে কালো মেঘের আড়ালে।এক রাতেই জোছনা,এক রাতেই বৃষ্টি?উঠোনের বাল্বটা অবশ্য ঠিক হয়ে গেছে।আসগর আলী চোখের কোণে জমা জলকে প্রশ্রয় দিলেন না।আরেকটা চিঠি বাকি।সেটাও পড়ে ফেলতে হবে তার...

 

 

১৫ জুন,২০০২

 

 

প্রিয় মানুষ,

           হ্যাঁ।তোকেই বলছি নীল।তুই তো মানুষ হয়ে গেছিস রে।একজন পরিপূর্ণ মানুষ।তাই তো আমার আজ প্রায় ৩০ বছর পর তোর মায়ের দেয়া ডাইরি বের করে লিখতে বসতে হল।ভেবেছিলাম সুখপাখি যখন চলেই গেছে তখন তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করলে কষ্ট কেবল বাড়বেই।সেই সময়টুকুও আমি তোকে দিয়ে দিয়েছিলাম।মা-বাবা দুজনের ভালবাসা তোকে দেয়ার চেস্টায় মত্ত ছিলাম আমি।মনে আছে তোর- তোর পায়ে যেন কাঁদা না লাগে সেজন্য আমি তোকে কাঁধে করে স্কুলে নিয়ে যেতাম বৃষ্টির দিনে?আর সেই তুই কিনা আমার কোঁচকানো চামড়ার রুগ্ন হাতটা ধরে দুই কদমও চলতে পারিস না?মাঝে মাঝে যখন তোকে স্কুল থেকে আনতে যেতে দেরী হতো তখন তোর কেঁদে বুক ভাসানো দেখে যে তোকে আমি কতো চকলেট,কুলফি কিনে দিয়ে তোর মুখে হাসি ফোটাতাম সেই আমার চোখের জল এখন তোর কাছে মায়াকান্না?আমিতো তোর কাছে কিছু চাই নি নীল।শুধু চেয়েছি একটুকরো আশা।এই আশা যে-তুই আমার পাশে সবসময় আছিস,থাকবি।আর চেয়েছি ভালবাসা।খুব কি বেশী চেয়ে ফেললাম?হয়তো বেশী ই।তাইতো তুই এখন আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস।আমাকে দূরে ঠেলে তোর কি লাভ বল তো?আমি থাকি না হয়...তোর লাল রঙের গাড়িটা ময়লা হয়ে যায় তো।ওটা মুছে ধুয়ে দেবার জন্যও তো একজনকে দরকার।অথবা বাগানের ওই ফুলের চারাগুলো,যেখানে গোলাপ-জবার সাথে আমার নীলজলকেও দেখাশোনা করতে হয়।ওই কাজগুলোই নাহয় করি আমি।তাও তো তুই দু চোখের সামনে থাকবি।এভাবে আমাকে দূরে পাঠিয়ে কি লাভ?আমি যে ভালবাসা ছাড়া থাকতে পারি না।কষ্ট হয় রে।আমিও তো একটা মানুষ নাকি?

আচ্ছা আমি কি মানুষ নই?

                                      ইতি

 

                                              অমানুষ

 

ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।“আশা বৃদ্ধাশ্রম” এর উঠোনের ছাউনির ফুটো দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে।আসগর আলীর চোখ দিয়েও।মাহবুব যখন আসে এই বৃদ্ধাশ্রমে,তখন থেকেই আসগর আলী তাকে দেখেছেন।কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকতো,হাসি যেন তার মুখ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে কেউ।আসগর আলী ভেবেছিলেন সময়ের সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে।কারণ প্রথম দিকে সবার ই এই অবস্থা থাকে।পরে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়।কিন্তু মাহবুবের ক্ষেত্রে তা হয়নি।

কিছু কিছু মানুষ আছে যারা শুধু ভালবাসতেই পৃথিবীতে আসে।বিনিময়ে তারা কিছুই পায় না।মানুষ হয়ে আসে,অমানুষ হয়ে বিদায় নেয়।

আসগর আলী ডাইরিটা বন্ধ করে দিলেন।মাহবুবের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে তার।কিন্তু বৃষ্টি যে তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না।চেয়ার ছেঁড়ে উঠতেই ডাইরি থেকে একটুকরো কাগজ পড়লো।আসগর আলী কাগজটা তুলে নিলেন।দেখলেন আরও একটা চিঠি...

 

 

প্রিয় অমানুষ,

               আসগর...অমানুষ বলা তে রাগ করো নি তো?এই চিঠিটা তোমার জন্যই লেখা।তোমাকে কিছু বলার আছে আমার।আমার জীবনের অব্যক্ত কিছু কথা।ছোটবেলায় আমি মাদ্রাসায় পড়েছিলাম।আমাদের গ্রাম থেকে দূরে এক হাফিজিয়া মাদ্রাসায়।ছোট ছিলাম তখন তাই স্বপ্নগুলোও ছিল ছোট ছোট।কিন্তু আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো করে দেয় কিছু তথাকথিত মানুষ নামধারী পশু।স্বপ্নালু চোখ আমার দেখে সেই মানুষদের বর্বরতা।১১ বছরের আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে ওরা।তখন আমি বুঝতামও না যে ওরা আমার সাথে কি করছে।রাতে হুজুর ঘর থেকে বাতি নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ‘বড় ভাই’ বলে সম্মান দেয়া সেই মানুষগুলো আমার উপর ঝাপিয়ে পড়তো।আমার আর্তনাদ,আমার চিৎকার সব গলাতেই আটকে রইতো।আমি সেই কষ্টের বিচারও চেয়েছিলাম।কিন্তু মাদ্রাসার হুজুর থেকে শুরু করে আমার মা-বাবা পর্যন্ত কেউই সেই বুজে যাওয়া আর্তনাদে কান দেয় নি।তাদের ধারণা এসব খুব ছোটখাটো ব্যাপার।এসব ঘটনা তখনকার সমাজে চিন্তা করাও পাপ ছিল।আমি আর স্বাভাবিক হতে পারিনি কখনো আসগর।কারণ-আমি মানুষের আসল রুপ দেখে ফেলেছিলাম।মানুষ কতোটা নিচে নামতে পারে সেটা এতো ছোট বয়সে দেখে ফেলাটা যে কতোটা কষ্টের তা হয়তো কেউ বুঝবে না।তাও আমি চেষ্টা করেছি স্বাভাবিক জীবনযাপনের।কষ্টগুলোকে ছন্দে বুনে কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম।কিন্তু সেই ছন্দ হারিয়ে গেলো।ভালবেসেছিলাম একজন মানুষকে।সেও মিশে গেলো।এরপর যাকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টায় দিনরাত এক করে ফেলেছিলাম সেই ছেলেও আমাকে অমানুষের কোটায় ফেলে দিয়ে চলে গেলো।

 

যখন এখানে আসলাম তখন ভেবেছিলাম অভিশপ্ত জীবনের এখানেই পরিসমাপ্তি।ভালবাসা পাওয়ার আকাঙ্খাও শেষ হয়ে গিয়েছিলো।কিন্তু বিধাতা কি খেলাটাই না খেলল আমার সাথে দেখো?এক অমানুষ পেলো আরেক অমানুষের ভালবাসা।আমরা সবাই বিভিন্ন পরিবার থেকে এসেছি এখানে কিন্তু কষ্টটা সবার এক ই।ভালবাসা জিনিসটা পাই নি আমরা।একাকীত্বই তখন থেকে আমাদের একমাত্র সঙ্গী।কিন্তু যখন দেখলাম আমি বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর লাগাতাম আর তুমি এসে বকা ঝকা করে তারপর আবার ঠিক ই মতিনকে দিয়ে ডাক্তার আনাতে তখন বুঝলাম এখানেও ভালবাসা আছে।আবার যখন আমার শ্বাসকষ্টের সময় মতিন এসে পায়ের কাছে বসে মরাকান্না জুড়ে দিতো তখন বুঝলাম অমানুষদেরও ভালবাসা যায়।তোমরা সবাই আমাকে অনেক ভালবাসা দিয়েছ।কিন্তু আমি তোমাদের কিছুই দেয় নি।কারণ ভালবাসতে বড্ড ভয় হয় আমার।যাকেই ভালবেসেছি সেই আমাকে একা রেখে চলে গেছে।আমি শুধু তাই ভালবেসেছি চাঁদকে,জোছনাকে আর বৃষ্টিভেজা রাতকে।বিশ্বাস করো ওদের ভালবেসে আমি শুধু তৃপ্তি ই পেয়েছি।নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে কেবল প্রকৃতি ই পারে।ওরা দেখেনা কে মানুষ আর কে অমানুষ।এই চিঠি তোমার হাতে কখন যাবে তা আমি জানি না।কিন্তু তোমাকে বলি আসগর,কষ্টগুলো চেপে না রেখে প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে দাও।বৃষ্টির জলে ভাসিয়ে দাও,চাঁদের আলোয় ডুবিয়ে দাও।অমানুষ হয়ে বাঁচতে হলে,বাঁচার মতই বেঁচে নাও।

                                                               ইতি

 

                                                                 আরেকজন অমানুষ

 

 

আসগর আলী উঠোনের সিঁড়ি ভেঙ্গে নামলেন।বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লো তার চোখে।বৃষ্টির জলে ঢেকে যাওয়া সেই অশ্রু মুছে তিনি মাহবুবের পাশে এসে দাঁড়ালেন।সদ্য কবরে দেয়া মাটি বৃষ্টির জলে ভিজে এক সোঁদা সোঁদা গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে।কবরের অপর পাশেই একজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে।হয়তো মতিন...মিহি সুর করে কাঁদছে সে।তবে বৃষ্টির শব্দ সবকিছুকে ছাপিয়েছে।আসগর আলী বুকে জমা কষ্টগুলোকে মুক্ত করে দিতে চাইছেন,পারছেন ও হয়তো।তার মাথায় অবশ্য এখন অন্য চিন্তা খেলা করছে-আচ্ছা,মৃত্যুর পর অমানুষেরা কোথায় যায়?স্বর্গে না নরকে?

 

 

(অমানুষ কোন সিরিজ গল্প নয়।এর আগেও “অমানুষ” শিরোনামে আরেকটি গল্প লিখেছি।আসলে আমাদের চারপাশে এতো মানুষরূপী অমানুষের বাস যে আবার একই শিরোনামে ভিন্ন পটভূমিতে গল্প লিখতে চেষ্টা করলাম।হয়তো আবারও কখনো লিখবো একই শিরোনামে অন্য কোন অমানুষের জীবন উপাখ্যান।।)

 

 

Share