অদৃশ্য ভালোবাসা

লিখেছেন - মেহেদী হাসান মুন | লেখাটি 2287 বার দেখা হয়েছে

ভালোবাসা কখন কোন  রুপে এসে হাজির হয় তা বোঝার  সাধ্যি নেই কারোই।পৃথিবীটাই  মূলত ভালোবাসার ওপর নির্ভরশীল।যে মানুষ একবার ভালোবাসার  স্বাদ পেয়েছে তাকে তার  ভালোবাসার মানুষটির কাছ  থেকে দূরে রাখা দুরহ হয়ে পড়ে।প্রতিটি  মানুষেরই ভালোবাসার প্রয়োজন রয়েছে,জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এসে তার একজন সঙ্গীর দরকার হয়,যে ভালোবাসার চাঁদরে তার একাকীত্ব কে মুড়ে দেবে,যে স্নেহের পরশ বুলিয়ে সব দুঃখগুলোকে মুছে দেবে।আমার এই গল্পটিও ভালোবাসার।যেখানে এক উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়ে আছে,যে আর দশটা মেয়ের মতই তার অনাগত ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে নানান স্বপ্ন সাজিয়েছিলো,তার রাজপুত্র কে কল্পনার সুতো দিয়ে বুনে বুনে তার অবয়ব সৃষ্টি করেছিলো। মূল গল্পে ঢোকার আগে পাঠকদের এটুকুই বলবো-ভালোবাসা ছাড়া জীবন পরিপূর্ণতা লাভ করেনা,তাই হন্যে হয়ে সবাই ভালোবাসা খুঁজে বেড়াই,ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরতে চাই,যেমনটা চেয়েছিল আদৃতা।হোক না সে “অদৃশ্য ভালোবাসা”,কিন্তু ভালোবাসা তো!!!!

 

১.

 

বর্ষাঃ কীরে আদৃতা??এখনো তো আসলোনা তোর বয়ফ্রেন্ড!!!কি ব্যাপার??তোর বান্ধবী আসবে দেখে কি লজ্জা পেল নাকি???

আদৃতাঃ ফাজলামো করিসনা তো।ও আসলে কারো সাথে দেখা করতে চায়না।ওর খুব বিরক্ত লাগে।আর  আমিতো ওকে বলি ই নি যে তুই আসবি আজ।

বর্ষাঃ দেখ,হয়তো দূর  থেকে আমাদের দেখে চলে গেছে।

আদৃতাঃ তাও হতে পারে।ফোন ও তো দিতে পারিনা।তাহলে তো অন্তত জানা যেত আসবে নাকি আসবেনা।।

বর্ষাঃ আমিও তো তাই  বলি।কীরকম আজিব বয়ফ্রেন্ড  তোর??আমাদের বয়সী একটা ছেলে অথচ তার কোন মোবাইল নেই।অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

আদৃতাঃ আরে তোকে তো বললাম  ই যে মোবাইল জিনিসটা ও  পছন্দ করেনা।সারাদিন কানের  কাছে নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে ওর বিরক্ত লাগে।

বর্ষাঃ হুম...বুঝেছি আর ওর তরফদারি করতে হবেনা।

আদৃতাঃ উহ...বুঝিস না কেন??ও একটু অন্যরকম।সবার চেয়ে আলাদা,তাই তো ওকে এত ভালো লাগে আমার।

বর্ষাঃ একটু বেশী ই  অন্যরকম।তোর মতো।হা হা।তোর না আজ ড.হাসান এর সাথে এপয়েনমেন্ট ছিল??

আদৃতাঃ আরে আমি এখন  ঠিক আছি তো।বাবা শুধু শুধুই এরকম করে।আমি যাবনা।আই এম অলরাইট।

বর্ষাঃ আচ্ছা,বাবা...তোর  ইচ্ছা।আমি এখন যাই।আর থাকতে  পারবোনা রে।

আদৃতাঃ আচ্ছা চল,আমিও বের হই।ও আসবেনা আজ।

 

১ দিন আগে,রাত ১১:০২ মিনিট,

আদৃতাঃ তুমি যে প্রতিদিন বারান্দার রেলিং টপকে আসো,তোমাকে কি কেউ দেখেনা আদর???

আদরঃ না।।কেউ দেখেনা।আমি তো আসি তোমার ভালোবাসার  চাঁদর মুড়িয়ে...... অদৃশ্য হয়ে...তোমায় ভালবাসতে...প্রাণ  জুড়িয়ে...

আদৃতাঃ ইশ...কি ঢং।এই দেখনা আজ আমি চোখে কাজল দিয়েছি,হাতে নীলাভ চুড়ি পড়েছি।কেমন লাগছে আমায় বললেনা???

আদরঃ খুব সুন্দর...তোমায়  দেখে চূর্ণ হলো আজ মোর  সকল গরিমা... মর্তে নেমে এল যেন কোনো  স্বর্গীয় প্রতিমা......

আদৃতাঃ উহহ...তুমি কথায় কথায় এত সুন্দর কবিতা কিভাবে বলো???

আদরঃ তোমার ভালোবাসা মোরে করিয়াছে কবি... যদিও নই আমি নজরুল,নই  আমি রবি...

আদৃতাঃ হি হি।তুমি  আমাকে এত ভালোবাসো কেন??সত্যি  করে বলোতো???

আদরঃ কারণ আমি জানি যে তুমি আমাকে আমার চেয়েও  বেশী ভালোবাসো।তাই।

আদৃতাঃ হ্যাঁ আদর...তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।তুমি  আমার প্রাণহীন জীবনে প্রাণ  এনেছো।আমার একাকীত্ব গুলোকে সরিয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়েছ।তোমায়  আমি অনেক ভালোবাসি।

আদরঃ হুম...আচ্ছা আদৃতা  তুমি কি কখনো আমায় ভুলে যাবে???আমি যদি হারিয়ে যাই।

আদৃতাঃ না...এটা তো অসম্ভব।আমি কখনোই তোমাকে হারিয়ে যেতে দেবনা আমার জীবন থেকে।আর  তোমায় ভুলে যাব??তোমার মাঝে যে আমার অস্তিত্ব এটা তুমি জাননা???তোমায় ভুলে যাওয়া  মানে আমায় ভুলে যাওয়া।

আদরঃ হ্যাঁ আমি জানি।আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।

আদৃতাঃ আদর...কাল আমার সাথে দেখা করতে পারবে???

আদরঃ কখন??

আদৃতাঃ এইতো ১১ টার  দিকে।

আদরঃ আচ্ছা।তুমি যখন  ই আমাকে মন থেকে ডাকবে  দেখবে আমি তখন ই চলে  আসবো।

আদৃতাঃ হি হি...কেন  তোমার পাওয়ার আছে নাকি কোনো??আধ্যাত্মিক শক্তি???

আদরঃ হ্যাঁ আছে...ভালোবাসার  শক্তি।

আদৃতাঃ হি হি।।হুম...যাও  এখন ঘুমুতে যাও।অনেক রাত  হয়ে গেছে।

আদরঃ আচ্ছা।যাই।

আদৃতাঃ হুম...বাই......

 

২.

আদৃতার বাবা রিফাত  চৌধুরী,দেশের সবচেয়ে ধনী  শিল্পপতিদের মধ্যে একজন।তার একমাত্র মা মরা মেয়েটার  প্রতি তার অনেক মায়া।মেয়েটা  নিজে নিজেই বড় হয়েছে,তিনি কোন দেখাশুনা ই করতে পারেন  নি।শুধু আদৃতা যখন যা চেয়েছে তা এনে দিতে পেরেছেন।তিনি জানেন যে তার মেয়ে একাকীত্বের মাঝে বড় হয়েছে,মায়ের ভালোবাসা পায়নি,বাবার আদর ও পায়নি  ঠিকমতো,তাই আদৃতা যা চায়  তাই তিনি এনে দেন,আদৃতা  কিছু করবে বললে তিনি মানা করতে পারেন না।কয়েকবার মানা করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তার ফল খুব ই ভয়াবহ হয়েছে।যার জন্য তিনি এখন ড.হাসানের পরিকল্পনা মতো সব করতে হচ্ছে।তিনি চান না আবার সেরকম কিছু হোক।মেয়ের বয়স ২৮ হয়ে গেছে,কিন্তু মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না।আদৃতাই রাজি হচ্ছে না।সে বলে যে তার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করবে,তিনিও রাজি।কিন্তু আদৃতার কাউকেই পছন্দ হয়না।তিনি জানেন,আদৃতা যে জিনিসটা পছন্দ করবে তার জন্য ও সবকিছু করতে পারে।আর যা পছন্দ করবেনা তা ওর সামনে কখনোই আনা চলবেনা।তিনি এসব কিছুর জন্য নিজেকেই দায়ী করেন।তিনি জানেন তার টাকা-পয়সার প্রতি টান,নিজের কারখানায় বেশী সময় দেয়া এসব ই আদৃতা কে এরকম করেছে।কিন্তু তিনি কি করবেন,ছোটবেলায় অনাহারে-অর্ধাহারে কাটানো সেই সময়গুলো তাকে তাড়া করে ফিরে।টাকার জন্য তিনি তার বাবাকে হারিয়েছেন,বোনের ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারেন নি।সেই দুঃখের সময়গুলো কে তিনি তার অর্জিত টাকা দিয়ে মনের গভীরে কবর দিয়ে দিতে চান।কিন্তু আজ কোটি কোটি টাকা থাকা সত্ত্বেও তিনি সুখ পান নি।তিনি ভেবেছিলেন টাকা দিয়েই সুখ কেনা যায়,কিন্তু এখন সেই টাকার জন্য তার পৃথিবীতে একমাত্র আপনজন তার মেয়েকেই এরকম হয়ে যেতে হল।তিনি আর ড.হাসান ছাড়া কেউ অবশ্য জানেনা আর তিনি কাউকে জানতেও দিতে চান না।ড.হাসান তাকে বার বার বললেও তিনি বিশ্বাস করেন নি।কিন্তু সেদিন আদৃতার রুমে ঢোকার সময় ই তিনি বুঝে যান যে ড.হাসান এর সব কথা সত্যি।তিনি আদৃতাকেও জানতে দেন নি।তাই আগে যেরকম নর্মালি আদৃতা যেত ড.হাসান এর কাছে,সেরকম ভাব করেই আদৃতা কে যেতে বলেছেন আজ।দেখা যাক আজ কি বলে ড.হাসান।তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেন নি,যখন আদৃতার ঘরে ঢুকতে গিয়েছিলেন।এখন ও সেই প্রতিটি কথা তার কানে বাজছে।ড.হাসান যে যে লক্ষন এর কথা বলেছিল,তার সবগুলোই তিনি তৎক্ষণাৎ আদৃতার মাঝে অনুভব করেন।এখনো কানে বাজছে কথাগুলো।তিনি অফিস থেকে এসে যখন আদৃতা কে দেখতে ওর রুম এ ঢুকতে যান তখন ই শুনতে পেলেন এক অভাবনীয় কথোপকথন............আর তার সাথে মনে পড়তে থাকে ড.হাসানের প্রতিটি কথা............

 

হাসানঃ রিফাত সাহেব।আমি আদৃতার মানসিক অবস্থা বিগত ৩ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছি।ওর প্রতি টি কথা,প্রতি টি চিন্তা আমি মন দিয়ে বিশ্লেষণ করি।ও আমাকে হয়তো অনেক কিছুই বলেনি এতদিন।তাও আমি ওর অভিব্যক্তি দেখে আন্দাজ করে নেই।আমি জানি যে আদৃতা ছোটবেলা থেকেই কিছু না কিছু মানসিক বিকার গ্রস্ত কাজ করে আসছে,তার ওপর ওর জেদ এর সামনে আপনার হার মানা ও ওকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করতে বাধ্য করেছে।ও সেই ছোটবেলা থেকেই নিজের ভেতর একটা পৃথিবী গড়ে তুলেছে,সেই পৃথিবী কে নিজের মতো করে সাজিয়েছে।কিন্তু এখন হয়তো ওর ভেতরের পৃথিবী বাইরের পৃথিবীতে আসতে চাচ্ছে।

 

রিফাত সাহেবঃ আপনি কি বলতে চাইছেন পরিষ্কার করে  বলুন??আই ওয়ান্ট সল্যুশন,আই আম নট ইন্টারেস্টেড ইন প্রব্লেমস।।

হাসানঃ বাট,দিস টাইম ইয়ু হাভ টু আন্ডারস্ট্যান্ড  দ্যা প্রব্লেম।বিকস,ইন দিস  প্রবলেম উই হাভ নো সল্যুশন।আমার সন্দেহ হচ্ছে যে আদৃতা  স্কিজোফ্রেনিয়া  তে আক্রান্ত।

রিফাত সাহেবঃ হোয়াট  ইস দিস ব্লাডি থিং??খুলে বলুন।

হাসানঃ এটা একটা মানসিক রোগ।এটা বেশিরভাগ হয় তাদের  সাথে যারা দীর্ঘদিন ধরে একাকীত্বের মাঝে থাকে,তারা নিজেদের অন্তর্জগতে একটা পৃথিবী সৃষ্টি করে নিজের  পছন্দ মতো।একাকীত্ব কাটানোর জন্য মানুষের একজন সঙ্গীর দরকার হয়,তাই সে একজন সঙ্গীও সৃষ্টি করে নিজের মতো করে।যে তার পাশে থাকবে সবসময়,আর একসময় সে তাকে বাস্তব মনে করা শুরু করে।বাস্তব জগতে তার মনের জগতের অনুপ্রবেশ হয়।

 

রিফাত সাহেবঃ থামলেন কেন??বলতে থাকুন।আপনি জানেন  আমি এত সহজে রিঅ্যাক্ট  করিনা।

হাসানঃ বাস্তব জগতে তখন তার সামনে সেই কল্পিত মানুষটিকে দেখতে পায়  এমনকি তাকে সে অনুভব করে,তার ছুঁতেও পারে,তার সাথে কথাও বলতে পারে।আমার মনে হচ্ছে আদৃতা স্কিজোফ্রেনিক।

রিফাত সাহেবঃ এই রোগ থেকে মুক্তির উপায় কি???

হাসানঃসত্যি কথা বলতে এই রোগ থেকে মুক্তির কোন  উপায় নেই।কারণ মানুষের মন এর ভেতরের জগত কে বোঝা এমনিতেই  খুব কষ্টকর,আর যখন তা বাস্তবে  এসে পড়ে তা আরও কঠিন হয়ে  যায়।

রিফাত সাহেবঃ আমি আদৃতা  কে বিদেশে নিয়ে যাব,বড় বড় সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে যাব।যতো টাকা লাগে দেবো।এদেশের সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে কিছু হবেনা বুঝেছি।

হাসানঃ হা হা।রিফাত সাহেব টাকা দিয়ে কিছুই  হয়না,আমার সামনে এত টাকা টাকা করবেন না।আপনার যদি এত টাকা থাকে তাহলে আপনি ই  সুস্থ করে তুলুন না আপনার  মেয়েকে।একটা কথা জেনে রাখেন-টাকা দিয়ে হয়তো দেহ কেনা যায়,কিন্তু মনের জগতে টাকার কোনো দাম  নেই।

রিফাত সাহেবঃ সরি হাসান।আমি আসলে ওভাবে বলতে চাই নি।এখন আমি কি করবো সেটা বলুন।

 

হাসানঃ আপনাকে আদৃতার মনের জগত টাকে বাস্তবে  অনুপ্রবেশ করতে বাঁধা দিতে হবে।আদৃতা কে অন্য যেকোনো কিছুতে ব্যস্ত রাখতে হবে।তার  সাথে ওকে অনেক ভালোবাসা দিতে হবে।ও যাতে কখনো একা না হয় সেরকম কিছু করতে হবে।তাহলে হয়তো ওর অন্তর্জগত ওর অন্তরেই থেকে যাবে।বের হয়ে আসতে পারবেনা।

রিফাত সাহেবঃ হাসান  আপনি ভালমতই জানেন যে আমি ইতিমধ্যেই ১ টা স্ট্রোক করেছি।আমি আর কয়দিন ই বা বাঁচবো!!আমি তো আর ওর পাশে সারাজীবন থাকতে পারবোনা।

হাসানঃ হ্যাঁ,আমি জানি।তাহলে আপনি ই ভেবে বলুন কি করা  যায়???

রিফাত সাহেবঃআমার মনে  হয় ওকে কোনো ভালো একটা ছেলের  সাথে বিয়ে দিয়ে দিলে সবচেয়ে ভালো হয়।

হাসানঃতা করতে পারেন।কিন্তু খেয়াল রাখবেন ওকে কোন  প্রকার জোর করবেন না,তাহলে  অবস্থা আরও খারাপ হতে  পারে।

রিফাত সাহেবঃ যদিও আমি  আপনার সন্দেহ পুরোপুরি বিশ্বাস  করি নি,তাও আমি খেয়াল  রাখব ওর প্রতি।আমাকে প্রথমে জানতে হবে ও আসলেই স্কিজোফ্রেনিক নাকি???

 

ড.হাসানের কথা যদিও রিফাত সাহেব বিশ্বাস করতে চান নি,কিন্তু কাল রাতে আদৃতার রুমে ঢোকার সময় ই তার সব সন্দেহ সত্য হয়ে যায়।রুমে ঢোকার আগেই তিনি শুনতে পান আদৃতা কার সাথে যেন কথা বলছে......কথোপকথন টা ছিল তার জন্য জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃখের অভিজ্ঞতা.........

 

১ দিন আগে,১১:০৪ মিনিট,

রিফাত সাহেব আদৃতার রুমে ঢোকার সময় শুনলেন,                               

আদৃতাঃ চুড়ি পড়েছি।কেমন লাগছে আমায় বললেনা???

এই শুনে রিফাত সাহেব  থমকে গেলেন।কেউ উত্তর দিলোনা,কিন্তু কিছুখন পর আদৃতাই আবার কথা বলল

আদৃতাঃ উহহ...তুমি কথায় কথায় এত সুন্দর কবিতা কিভাবে বলো???

রিফাত সাহেব স্তব্ধ হয়ে গেলেন।তিনি আরও শোনার  জন্য একটু এগিয়ে গেলেন।

আদৃতাঃ হি হি।তুমি  আমাকে এত ভালোবাসো কেন??সত্যি  করে বলোতো???

আবার আদৃতা কেই  কথা বলতে শুনলেন তিনি......

আদৃতাঃ হ্যাঁ আদর...তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।তুমি  আমার প্রাণহীন জীবনে প্রাণ  এনেছো।আমার একাকীত্ব গুলোকে সরিয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়েছ।তোমায়  আমি অনেক ভালোবাসি।

রিফাত সাহেব কিছু না বুঝে ভেতরে তাকালেন  কিন্তু আদৃতার সামনে কাউকে  দেখতে পেলেন না।দেখলেন  আদৃতা একা একা কথা বলছে তার অদৃশ্য ভালোবাসার মানুষটির সাথে।

আদৃতাঃ না...এটা তো অসম্ভব।আমি কখনোই তোমাকে হারিয়ে যেতে দেবনা আমার জীবন থেকে।আর  তোমায় ভুলে যাব??তোমার মাঝে যে আমার অস্তিত্ব এটা তুমি জাননা???তোমায় ভুলে যাওয়া  মানে আমায় ভুলে যাওয়া।

তার মানে ড.হাসানের কথাই ঠিক।আদৃতার মনের পৃথিবীর বাস্তবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে।আবার আদৃতা বলে উঠলো,

আদৃতাঃ আদর...কাল আমার সাথে দেখা করতে পারবে???

 

আদৃতাঃএইতো ১১ টার  দিকে।

 

আদৃতাঃ হি হি...কেন  তোমার পাওয়ার আছে নাকি কোনো??আধ্যাত্মিক শক্তি???

 

আদৃতাঃ হি হি।।হুম...যাও  এখন ঘুমুতে যাও।অনেক রাত  হয়ে গেছে।

 

আদৃতাঃ হুম...বাই......

 

কিছুক্ষণ পর পর আদৃতার কথাগুলো শুনে তার বুক  কেঁপে কেঁপে উঠছিলো।তার জীবনের একমাত্র আপনজন,তার  মেয়েকে কি সবাই পাগল বলবে???না...এটা  হতে পারেনা।আমি তা হতে  দেবনা।আমার যেভাবেই হোক আদৃতা কে কোন ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে হবে।তাহলেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।আদৃতা কেও রাজি হতে হবে।তিনি ছোটবেলা থেকে আদৃতার সব আবদার রেখেছেন,তাহলে আদৃতাও নিশ্চয়ই রাজি হবে।ড.হাসান বলেছিল যে আদৃতা যাকে ভালোবাসে তার জন্য সব করতে পারে,সে নিশ্চয়ই আমার কথা শুনবে।এখন তাকে কে সাহায্য করতে পারে???কে কে??যে আদৃতার খেয়াল রাখবে,আদৃতাকে সুখে রাখবে।হুম...এখন শুধু ড.হাসান ই আমাকে হেল্প করতে পারে।আমাকে তার কাছেই যেতে হবে।

 

 

৩.

ড. হাসান আদৃতার ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।অবশেষে তার প্ল্যান সফল হয়েছে।আদৃতা কে নিয়ে প্রথম যেদিন রিফাত সাহেব তার চেম্বার এ এলেন সেদিন ই তিনি আদৃতাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।এত মায়া মেয়েটার চেহারায়।এত সুন্দর কোন মানুষ হতে পারে তা হাসান কল্পনাও করতে পারেনি।রিফাত সাহেব যখন বললেন যে আদৃতার মানসিক সমস্যা আছে তখন তো তার বিশ্বাস ই হচ্ছিলো না।৩ বছর আগে থেকেই আদৃতাকে ভালবাসতে শুরু করেছে হাসান।আদৃতার মনের অসুখ সারাতে গিয়ে কখন যে নিজের মন ই অসুস্থ হয়ে গেছে আদৃতার ভালোবাসায় তা টের ই পায়নি সে।এখন তার আদৃতাকে চাই ই চাই।কিন্তু হাসান এটাও ভালোমতো জানে যে রিফাত সাহেব আদৃতার অমতে কখনো ওকে বিয়ে দেবেনা।তাই এর মাঝে আদৃতাকে অনেক ভাবে বুঝাতে চেয়েছেন যে সে তাকে কতো ভালোবাসে।কিন্তু আদৃতা কখনোই হাসান কে ওভাবে দেখেনি।সে হাসানের প্রতিটি কথা মানে, হাসানকে বলতে গেলে তার সব মনের কথাই বলে,কিন্তু কখনো হাসান আদৃতাকে বোঝাতে পারেনি যে সে তাকে পছন্দ করে।ভালোবাসা মানুষকে দিয়ে সবই করাতে পারে,আর এটা তো শুধু একটা নাটক।হাসান হিউম্যান সাইকোলজির এমন জাল বুনেছে যে রিফাত সাহেবের মতো ধুরন্ধর লোক ও তার বোনা জালে সহজেই ফেঁসে গেছেন।হাসান আদৃতাকে যখন বলেছিল যে-“আদৃতা,তোমার মানসিক যেই সমস্যাগুলো আছে সেগুলো থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য তোমাকে তোমার মনের ভেতরে একজন মানুষের সৃষ্টি করতে হবে,যে তোমার বন্ধু হবে,তোমার সব কথা শুনবে,তোমাকে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে,তাকে বাস্তব মনে করতে হবে,তুমি তার সাথে কথা বলতে পারবে,তাকে তোমার অনুভূতিগুলো জানাতে পারবে,যার ফলে তোমার মানসিক অশান্তি দূর হবে,আর তুমিও পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে”।একজন মানসিক রোগীকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট খুব সহজেই এসব ব্যাপার বোঝাতে পারে,এগুলো বিশ্বাস করাতে পারে।হাসান ও পেরেছিলো।সে সেদিন আদৃতা কে এগুলো বলার পর আদৃতা আর আসেনি তার মানে আদৃতা তার বলা মতই সব করছে আর ভাবছে যে সে ঠিক হয়ে গেছে তাই আর আসার প্রয়োজন মনে করেনি।একজন মানসিক রোগীকে যদি এটুকু বিশ্বাস করানো যায় যে সে ঠিক আছে তাহলেই সে পুরোপুরি ঠিক হয়ে যায়।আর হাসান আদৃতাকে সেটা খুব সহজেই বিশ্বাস করিয়েছে।তারপর হাসান তার প্ল্যানমতো রিফাত সাহেব কে ফোন দিয়ে বলল যে আদৃতা স্কিজোফ্রেনিয়া তে আক্রান্ত তখন রিফাত সাহেব বিশ্বাস ই করছিলোনা।তখন হাসানের একটু ভয় লেগেছিলো,কিন্তু পরে সে সামলে নিয়েছিলো।হাসান নিশ্চিত ছিলো যে রিফাত সাহেব এখন আদৃতার ওপর নজর রাখবে,আর আদৃতা যদি হাসানের কথামত কাজ করে তাহলে একদিন না একদিন রিফাত সাহেব এর চোখে পরবেই।আর ঠিক তাই হয়েছে।একটু আগেই রিফাত সাহেব এর ফোন এসেছিলো,আর ঠিক তার মনের কথাগুলোই তিনি বলেছেন.........

রিফাত সাহেবঃহ্যালো হাসান,আপনার ধারনাই সঠিক।আপনি  যেই লক্ষন গুলোর কথা  বলেছিলেন তার প্রমাণ আমি  পেয়েছি।আদৃতা আসলেই স্কিজোফ্রেনিক।কিন্তু এই ব্যাপার টা কেও জানবেনা।আমি  কাউকে জানতেও দেবোনা।

হাসানঃআপনি আমাকে  বিশ্বাস করতে পারেন।এই কথা  কেউ জানবেনা।

রিফাত সাহেবঃএখন শুনুন  হাসান।আমি এই কদিন অনেক চিন্তা ভাবনা করলাম।তারপর আমি  ভেবে দেখলাম যে আপনি ই আদৃতাকে  এবং আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন।

হাসানঃআমি??কিভাবে???

রিফাত সাহেবঃতার আগে  আমার একটা প্রশ্নের উত্তর  দিন,এই মানসিক রোগটা কি স্থায়ী???মানে আমি জানতে চাচ্ছি আমাদের এই বাস্তব জগতে এর কি প্রভাব পড়ে???

হাসানঃএই রোগটা  একটু অন্যরকম।তবে আমি যতোটুকু  জানি কোন স্কিজোফ্রেনিক  রোগী যদি জানতে পারে তার  কল্পনার মানুষটি বাস্তবে  নেই তখন সে মানসিক ভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে  পড়ে।মাঝে মাঝে তো মৃত্যু ও  হয়।আর তার আশপাশের মানুষ,কাছের  মানুষগুলোর ওপর ও তখন  এর প্রভাব পড়ে।

রিফাত সাহেবঃতার মানে যতক্ষণ পর্যন্ত আদৃতা জানছেনা  যে তার কল্পনার মানুষটি  অবাস্তব ততখন পর্যন্ত সে আর বাকি ১০ টি মেয়ের মতো  সাধারণ,তাই না???

হাসানঃজী।

রিফাত সাহেবঃহাসান  আমি চাই আদৃতা কে আপনি বিয়ে করুন।

হাসানঃহোয়াট????

রিফাত সাহেবঃআপনি এমন  ভাবে হোয়াট বললেন যেন  মনে হচ্ছে আপনি আকাশ থেকে পড়েছেন।শুনুন ড.হাসান,আমার অনেক বড় প্রপার্টি।আমার আর বেশী দিন ও বাকি নেই।এর মাঝে আদৃতার ও এই অবস্থা।আমার মেয়ে আর আমার প্রপার্টি সবই আপনার চেয়ে ভালভাবে কেউ সামলাতে পারবেনা।আপনি ই তো বললেন আমার মেয়ে বাস্তব না জানা পর্যন্ত অন্য সব সাধারণ মেয়ের মতই।আপনি ই শুধু ওকে বাস্তব জানা থেকে বিরত রাখতে পারবেন,আপনি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট,একজন বুদ্ধিমান মানুষ ও।তাই আপনার হাতেই আমার মেয়েকে তুলে দিতে চাই।

হাসানঃকিন্তু আদৃতা  তো ওই ছেলেকে বাস্তব মনে করে  বসে আছে।ও কি আমাকে বিয়ে করবে???

রিফাত সাহেবঃসেটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।জীবনে ওর বাবা প্রথমবারের মতো ওর কাছে কিছু চাইবে।ও যদি ওর বাবা কে ভালবেসে থাকে তাহলে  ও অবশ্যই রাজি হবে।কিন্তু আগে আপনাকে রাজি হতে হবে।

হাসানঃহুম...আমি বুঝতে  পারছি।কিন্তু আমাকে একটু ভাবতে হবে।আমাকে একটু সময়  দিন।

রিফাত সাহেবঃঠিক আছে।কিন্তু বেশী সময় নেই।পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই আমাদের সব করতে হবে।

হাসানঃজী।

রিফাত সাহেবের ফোন  পাওয়ার পর থেকে হাসান এর খুশির  বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।যদিও তার  খারাপ লাগছে এই ভেবে যে আদৃতার মতো নরমাল এক মানসিক রোগী যে এখন প্রায় সুস্থ  তাকে স্কিজোফ্রেনিয়া নামক রোগের রোগী বলতে হচ্ছে।কিন্তু হাসানের আর কোন উপায় ছিলোনা আদৃতা কে পাওয়ার।আর এখন তো তার সাথে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ও পেয়ে যাচ্ছে সে।হাসান আবার একদৃষ্টে আদৃতার ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।

 

(হাসানের জঘন্য খেলা  যে আসলেই আদৃতার বাস্তব  হয়ে উঠেছিলো তা হাসান  বুঝতেও পারেনি,হাসান ভেবেছিলো  আদৃতা সে রাতে তার কথামতো  কল্পনায় তৈরি মানুষের  সাথে কথা বলছিলো,হ্যাঁ  সে কল্পনায় তৈরি কিন্তু  আদৃতার জন্য যে সে আসলেই  বাস্তব তা হাসান কল্পনাও  করতে পারেনি।মানুষের মনের  সাথে হাসান যেই খেলা  খেলতে চেয়েছিলো তা সে  খেলেছে ঠিক ই,তার পাশা  সে গড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু বিধাতার পাশা গড়ানও যে বাকি ছিল তখনো।বিচিত্র মন মানুষের।আদৃতা যে হাসানের কথা মতই কল্পনায় আদরের অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছিলো,কিন্তু আদৃতার বিশ্বাস তাকে বাস্তবে এনে দিয়েছে।হয়তো হাসান একদিন জানতে পারবে যে আসলেই আদৃতা স্কিজোফ্রেনিক,কিন্তু তখন বেশী দেরি না হলেই হয়।তা না হলে...............)

 

 

১০ বছর পর......

 

আদৃতাঃনবনী,টিফিন  দিয়ে দিলাম ব্যাগের সাইড পকেট এ।খেয়ে নিও কিন্তু মামণি।

নবনীঃআচ্ছা মামনি।এখন  যাই,আব্বু গাড়ি থেকে হর্ন বাজাচ্ছে তো।

আদৃতাঃদাঁড়া না।মামনি কে একটা পাপ্পি দিয়ে যা।

............................................................................................................................................................................................................................................................

 

নবনীঃবাবা,তুমি এত হর্ন বাজাও কেন???জানোনা আমার রেডি হতে একটু টাইম লাগে।

হাসানঃআচ্ছা,বাবা।সরি।চল,তোর  স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে,আমরা এখনো যাই নি দেখলে তোর  মামণি আমাকে সাইজ করে  দেবে।

নবনীঃবাবা,মামনি কে একা রেখে আমরা সবাই চলে  যাই,মামনির খারাপ লাগেনা???

হাসানঃখারাপ লাগার  কি আছে???

নবনীঃহুম...আমি জানি মামনির অনেক খারাপ লাগে।

হাসানঃতুই কেমনে জানিস???

নবনীঃনা...আমি মাঝে মাঝে শুনি মামনি কাকে যেন  বলে যে-আমার বাসায় একা  থাকতে খুব খারাপ লাগে।তুমি  আসো বলে এখনো টিকে আছি।তোমার  কবিতা শোনার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করি।

হাসানঃহা হা।হয়তো ফোন এ কারো সাথে কথা বলে,কোনো ফ্রেন্ড এর সাথে।তোর এত চিন্তা করতে হবেনা।

নবনীঃহুম......

.......................................................................................................................................................................................................................................

 

         :......তোমার কাছে ছুটে আসি আমি,আসি করতে প্রেমের খেলা......

           অনন্ত কাল ধরে ভাসিয়ে  চলেছি মোদের প্রেমের ভেলা......

আদৃতাঃআজ এত তাড়াতাড়ি???কি ব্যাপার?আমাকে মিস করছিলে বুঝি???

        :হুম...তা তো অবশ্যই।তোমায় ছাড়া যে টেকা দায়।তোমায় ভালোবাসি না??

আদৃতাঃহি হি...আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি আদর...আমাকে ছেড়ে কখনো যেওনা কিন্তু।

আদরঃতুমি আছো যতদিন...আমিও থাকবো ততদিন...

              এ ভালোবাসা তাই কভু  হবেনা মলিন...

        তোমার  কল্পনার মাঝে আছে আমার  অস্তিত্ব...

এ অস্তিত্ব মুছতে  পারবেনা,কোনো ধন অথবা বিত্ত......

        এ  জীবন যে বিধাতার গড়িয়ে  দেয়া পাশা......

                   তাই তো এখনো বেঁচে আছে  তোমার অদৃশ্য ভালোবাসা............

 

 

 

Share