সংকোচ

লিখেছেন - -সালেহ তিয়াস- | লেখাটি 984 বার দেখা হয়েছে

ধরি আমি একজন বিবাহিত পুরুষ। মাত্র দু মাস আগে আমার বিয়ে হয়েছে।

 

পাঠকেরা হয়ত এরই মধ্যে নড়েচড়ে বসেছেন। এত উত্তেজিত হবার কিছু নেই। এই গল্প ঠিক দাম্পত্যের নয়।

 

দু মাসে আমি স্ত্রীর সাথে মোটামুটি ফ্রী হয়ে গেছি। কথাবার্তা বলতে সমস্যা হয় না। একসাথে কোন জায়গায় যেতে ইত্যাদিতে আর সংকোচ বোধ হয় না। তাও একটু সমস্যা তো হয়ই।

 

কী করে কী হল, হঠাৎ একদিন দেখি তার মুড অফ। শুয়ে আছে সারাদিন।

 

ভাবলাম অভিমান।

 

কিন্তু কারণ কি?

 

অনেক ভেবে চিন্তেও বের করতে পারলাম না।

 

দু তিন ঘণ্টা পর।

 

খাবার সময় হয়েছে।

 

খাবার জন্য ডাকলাম।

 

এল না।

 

কথা নেই।

 

আবার ডাকলাম।

 

বলল, খাব না।

 

বললাম, কেন?

 

বলল, এমনি।

 

আমি একটু সাহসী হয়ে ওর পিঠে হাত রাখতে গেলাম। ইচ্ছা ছিল ধরে ধরে খেতে নিয়ে আসব।

 

ব্যাপারটা প্রায় আলিঙ্গনের পর্যায়ে চলে গেল।

 

তখনি একটা জিনিস টের পেলাম।

 

ওর অসম্ভব জ্বর।

 

হৃদয়টা কেমন যেন মোচড় খেয়ে উঠল।

 

ভাবলাম, মাথায় পানি ঢেলে দেব নাকি।

 

বললাম, গোসল করে নাও।

 

ভাবলাম, ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যাব।

 

বললাম, ওঠো তো, গোসল করলে জ্বর নেমে যাবে।

 

ভাবলাম, এখনি দৌড়ে গিয়ে থার্মোমিটার নিয়ে আসি।

 

বললাম, জ্বর মনে হয় অনেক বেশি। এখনি মাপা দরকার।

 

ভাবলাম, দৌড়ে গিয়ে কিছু ওষুধ আর ফলমূল নিয়ে আসি।

 

বললাম, এখন বোধ হয় ভাল কিছু খাওয়া লাগবে।

 

ভাবলাম, ফোন করি শাশুড়িকে। এখুনি।

 

বললাম, মা-কে ফোন করি? (এই প্রথম ও জবাব দিল, থাক মা টেনশন করবে।)

 

ভাবলাম, জড়িয়ে ধরে বলি, এত ভয় কিসের, আমি আছি না?

 

বললাম, এ তো সামান্য জ্বর, এতে আর কি হবে।

 

ঘটনা পরম্পরায় পরের দিনের দৃশ্যপট একটি প্রাইভেট হাসপাতালের সুসজ্জিত রুম। স্ত্রী শয্যাশায়িনী। শাশুড়ি সেবারতা। শ্বশুর সাহেব আগেই লোকান্তরে।

 

আমি কোনমতে অফিস শেষ করে দৌড়ে দৌড়ে কেবিনের দরজা পর্যন্ত এলাম। তারপর খুব গম্ভীর ভাব করে রুমে ঢুকে আস্তে আস্তে এগুলাম ওর দিকে।

 

সুন্দর চেহারাটা একদম মলিন হয়ে গেছে।

 

ভাবলাম, নিজ হাতে খাইয়ে দিই।

 

বললাম, মা ওকে কিছু খাওয়ান।

 

যতক্ষণ রুমে ছিলাম ততক্ষণ খালি কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা বলেছি ও পায়চারি করেছি। কিন্তু বেরিয়ে আসার পরপরই আবার আমার হৃদয়ের থেমে থাকা ঝড়ো বাতাস প্রবল বেগে বইতে শুরু করল।খুব ইচ্ছা করল সারাদিন ওর হাত ধরে পাশে বসে থাকতে। আর বারবার বলতে, তোমার কিছু হবে না, আমি আছি না? কিন্তু দরজার ওপাশে আমি টানা আট ঘণ্টা খালি হাঁটাহাঁটিই করলাম, ভিতরে ঢুকতে পারলাম না।

 

এরপর প্রতিদিন যা হতে লাগল তা এরকম।

 

দৌড়ে দৌড়ে আমি উস্কখুস্ক অবস্থায় হাসপাতালে আসি।

 

আসার পথে অনেক গুলো ফুলের তোড়া কিনি।

 

ফুল হাতে নিয়ে টানা দু ঘণ্টা দরজায় দাড়িয়ে থাকি। ঢুকি না।

 

অতঃপর নার্সের হাত দিয়ে ফুল পাঠাই। নার্সের অবাক দৃষ্টির সামনে আমাকে চোখ নামিয়ে নিতে হয়।

 

ফলমূল পাঠাই। চকলেট পাঠাই। কার্ড পাঠাই। কিন্তু নিজে যাই না।

 

গেলেও গম্ভীর হয়ে যাই।

 

ভাবি যে বলব, ওগুলো তোমার জন্য, দুষ্টু মেয়ে।

 

বাস্তবে বলি, জ্বর মেপেছ আজকে? ও কিছু না, সেরে যাবে।

 

ডাক্তারকে ডিসটার্ব করি খুব। সারাক্ষণ পিছনে লেগে থাকি। এই টেস্ট, ঐ টেস্ট - সব টেস্ট করাই। কিছুতেই ক্লান্ত হই না।

 

কিন্তু শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলে বলি, ঐ তো, ডাক্তার কি যেন বলল......ও, ঐ তো, টেস্ট করছে, রোগ ধরা পড়বে, সমস্যা নাই।

 

ও যে রাতে খেতে পারেনা সেই রাতে আমিও খাই না। ও যতবার বমি করে আমিও ততবার বাথরুমে গিয়ে গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে আসি। বগলের নিচে রসুন রাখলে নাকি জ্বর হয়, আমি বগলের নিচে রসুন রেখে সারারাত ওর কেবিনের বাইরে ঘুরে বেড়াই, ও জানেনা, ওর মা-ও জানেনা।

 

বাসায় থাকা হয় দিনে দু তিন ঘণ্টা। বাসায় ফিরলেই আমি ওর বাবহারের কাপড়, তোয়ালে, চিরুনি, ওর পড়ার বইগুলো, ওর গানের সিডি, পার্স, বসার চেয়ার, বেডশিট-সবকিছুতে পাগলের মত চুমু খেতে থাকি, ঘ্রাণ নিতে থাকি আবিরাম। বারবার উলটে পালটে দেখি ডাক্তারের দেয়া রিপোর্ট, পাগলের মত ঘুরে বেড়াই সারা বাড়িতে, মাঝে মাঝে মনে হয় মাথা ঠুকে দিই দেয়ালে, আয়নায়, আর ভর্তি হয়ে যাই ওর পাশের কেবিনে।

 

রোগের নামটা বলব না। এইটুকু জানাই যথেষ্ট যে, রোগটা দুরারোগ্য।

 

একদিন আমি কি একটা কারণে শহর থেকে দূরে একটা জায়গায় গিয়েছি, ঢাকার বিরক্তিকর জ্যামের কারণে আসতে আসতে রাত হয়ে গেল। এত সময় লাগবে আগে বুঝতে পারিনি, মোবাইলটারও চার্জ ফুরিয়েছে বহু আগে, আমি আর ওর কোন খবরই পাইনি।

 

তখন আমি হাসপাতাল থেকে পাঁচ মিনিট দূরে। আসতে আসতে ওর কথা ভাবছিলাম। আর ভাবছিলাম গত রাতের ইন্টারনেটে বিদেশি ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করার কথা। বিদেশি হাসপাতালে ব্যবস্থা হয়ে যাবে দুই দিনের মধ্যেই। ভাবনায় ঘুরে ফিরে আসছিল নানা জায়গায় কোরআন শরিফ খতমের ব্যবস্থা করার কথা, একদিন অসংখ্য এতিম খাওয়ানোর কথা, রাতে আলতু ফালতু কাজ বাদ দিয়ে সারারাত নামাজে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করার কথা।

 

আর বারবার ওর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

 

হঠাৎ আমার কি হল, আমি আর এই ছদ্ম আবরণে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। ওকে আমি এতটা ভালবাসি, এতটা ভালবাসি, কেন এত ভালবাসি জানি না, কখন এত ভালবাসা জন্মে গেল তাও জানি না, তবু কেন আমি ওর বা ওর মার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারি না? ও আমার স্ত্রী, মনের মানুষ, ওর সাথে আমার কিসের এত সংকোচ? মানুষ দেখে হাসবে তাই? বউপাগল বলবে তাই? নাকি ও নিজেই সুস্থ হয়ে বলবে, ‘তুমি যা পাগল না’, এইজন্য? নাকি আমার সেবা ওর প্রাপ্যই নয়, সত্যিই তো সামান্য জ্বর, বাংলাদেশের নারীদের কি সামান্য জ্বরের কাছে হার মানলে চলে?

 

আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছিল। আমার সংকোচ টা কিসের? কেন আমি সকল সংকোচের উর্ধে যেতে পারছিনা? আমি যে ভালবাসি এটা প্রকাশ করলে কে কি বলবে? আর বললই বা, তাতে আমার কি? আমি আমার বউয়ের জন্য যা ইচ্ছা করব, তাতে কার কি? নাকি বেশি লাই দেয়া ঠিক হবে না, ‘ বউদের বেশি লাই দিও না, তোমাকে শুষে নেবে.........

 

উফফফফ......আমি কি মানুষ, না অন্য কিছু? এরকম চিন্তা মানুষ করে? মনে হল ছুটে যাই ঐ ঘাতক ট্রাকের চাকার নিচে।

 

ওর কেবিনের সামনে চলে এসেছি আমি।

 

নাহ, আর নয় লুকোচুরি। no সংকোচ। আমার ভালবাসা আমি প্রকাশ করব, তাতে কার বাপের কি?

 

হয়ত মানুষ হ্যাংলা বলবে। শাশুড়ি অবাক হয়ে যাবে। ও সুস্থ হয়ে প্রতিদিন ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করবে।

 

অবাক হয়ে বুঝতে পারলাম, আমি আসলে তাই-ই চাই।

 

বড় একটা দম নিয়ে হুড়মুড় করে রুমে ঢুকে পড়লাম। উদ্দেশ্য, জড়িয়ে ধরা। কাঁদা, ক্ষমা চাওয়া।

 

এবং, to kiss.

 

....................................

 

কিন্তু গল্পটা ট্রাজেডি হয়ে গেল।

 

 ......................................

 

লেখকের কথা:

আমি মনে করি সমস্যাটি শুধু আমার নয়, আরও অনেকের আছে। যাদের অন্তরে স্নেহ-মায়া-মমতা-ভালবাসার স্রোত বয়ে যায়, অনেক কিছু করার ইচ্ছা জাগে, কিন্তু অজ্ঞাত সংকোচে তারা কিছুই করতে পারে না। আমার ক্ষেত্রে এটা সবচেয়ে বেশি হয় বাবা-মার সাথে। ফলে একটি আপাতদৃষ্ট মধুর স্বর্গে নরক রচিত হয়। ‘বাবা, কেমন আছ’ বা ‘বাবা, তোমায় ভালোবাসি’-এ কথাটা সংকোচে বলতে না পারার যে যন্ত্রণা, আর না বলতে পারার ফলে বাবা-ছেলের মধ্যে যে অপ্রত্যাশিত ‘কাছে থেকেও দূরে’ সম্পর্কের সূত্রপাত, এ সবই এমন এক পৃথিবীকে বিষাদময় করে তোলে, যা হয়তো এই একটি কথাতেই স্বর্গসুখের আকর হতে পারত।

ধুর, বাংলা ভুলে গেছি। বোঝাতে পারলাম না। পাঠক, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর এই গল্পটি কঠিন জমত যদি অসুস্থ লোকটি আমার বাবা হতেন। কিন্তু আমি সেই সাহসটি পেলাম না। তাই এখনও যার কোন অস্তিত্ব নেই তারই মৃত্যু এখানে ঘটানো হল।

Share