মু-হা-হা-হা

লিখেছেন - -সালেহ তিয়াস- | লেখাটি 958 বার দেখা হয়েছে

সালেহ, এই সালেহ!

কে যেন আমাকে ডাকছে। কণ্ঠটা পরিচিত মনে হচ্ছে

এই শালা, ওঠ!

 

আমি চোখ মেলে তাকালাম। দেখি আমার রুমমেট কবির ভাই। হাতে ওটা কি? ঝাঁটা নাকি? হায় হায়, ঝাঁটা কেন? পিটাবে নাকি আমাকে?

 

আমি বড় একটা হাই তুলে দুনিয়ার সবটুকু বিরক্তি মুখে এনে বললাম, কি হইছে? চেচামেচি করতেছ কেন?

 

কবির ভাই বলল, রুম তো জঞ্জাল বানায়া রাখছ মিয়া। তোমার ঠেলায় রুমে পা ফালাইবার উপায় নাই। আজকে তোমার ঝাড় দেবার পালা। নাও কাজ শুরু কর।

 

হায় হায়, বলে কি? আমি দেব রুম ঝাড়? পাগল নাকি?

 

বললাম, প্লিজ কবির ভাই, তুমি একটু দিয়ে দাও না। পিলিজ পিলিজ জানটু মনটু কদু মধু।

 

আমার জানটু মনটু কদু মধুতে কোনই কাজ হল না। কবির ভাই ঝাঁটা দিয়ে আমার পায়ে একটা ভয়াবহ বাড়ি দিল। ওঠ শালা আইলসা মুরগি!

 

ভেবেছিলাম জীবনের প্রথম ঝাঁটার বাড়িটা বউয়ের হাতেই খাব, কিন্তু এ কি হল? আমার পক্ষে আর শুয়ে থাকা সম্ভব হল না। আমি তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। দীর্ঘদিনের সুপ্ত লুক্কায়িত পুরুষত্ব জেগে উঠল হঠাৎ করেই। গর্জে উঠে বললাম, দাও! ঝাঁটা দাও!

 

কবির ভাই মুখ ঝামটা দিয়ে ঝাঁটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। আমি পুরা জন্টি রোডস এর মত ঝাঁটাটা লুফে নিলাম। তারপর পরনের লুঙ্গিটা কাছা বেঁধে বিপুল উৎসাহ নিয়ে শুরু করলাম "রুম ঝাড় দেয়া অভিযান"।

 

নিজের বেডের নিচ থেকে পাঁচ কেজি মত ময়লা বের করার পর হঠাৎ কিসে যেন ঠং করে একটা বাড়ি লাগল। আমি হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে জিনিসটা বের করে আনলাম।

 

আরে, এটা কি? এটা তো দেখতে একদম প্রাচীন আমলের কুপিবাতির মত। আমি আমার ফেলে দেয়া একটা সবুজ আন্ডারওয়ার দিয়ে জিনিসটা পরিষ্কার করতে গেলাম। অবশ্য প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হচ্ছিল। এই একটা আন্ডারওয়ার দিয়ে গত বছর পার করেছি কিনা।

 

দুই একটা ঘষা দিতেই কুপির মধ্যে ভটভট শব্দ হতে লাগল। লাল নীল বেগুনী ধোঁয়া বের হতে লাগল কুপির মুখ থেকে। আমি ভয়ে কুপিটা হাত থেকে ফেলে দিলাম।

 

একটু পরেই “মু-হা-হা-হা” করতে করতে কানে হেডফোন আর নাকে মুখে কাপড়ের মাস্ক নিয়ে বেরিয়ে এল এক অতিকায় দৈত্য। বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে সে বলল, “আমি এই কুপির দৈত্য, মু-হা-হা-হা। আমি আপনার তিনটা ইচ্ছা পূরণ করব, মু-হা-হা-হা”।

 

আমি তো তাকে দেখে পুরাই টাশকি। দৈত্য আবার মাস্ক পড়ে আছে কেন? জিজ্ঞেস করলাম, “এই তুমি মাস্ক পরে আছ কেন?”

 

দৈত্য বলল, “আপনার বেডের নিচে যে ময়লা, মু-হা-হা-হা। আমার আবার অ্যালার্জি আছে, মু-হা-হা-হা”।

 

আমার বেডের নিচে ময়লা বলে তাকে মু-হা-হা-হা করে কেন প্রাণঘাতী হাসি হাসতে হবে এটা আমার উর্বর মস্তিষ্কে ঢুকল না। আমি বরং তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তা কানে হেডফোন কেন সেটা শুনি?”

 

“এফ এম রেডিওতে নিভা রহমানের গান শুনছিলাম, মু-হা-হা-হা। নিভা রহমান আমার প্রিয় গায়িকা, মু-হা-হা-হা”।

 

আমার খুব কৌতূহল হল। আমাদের মানুষদের রাজ্যে এক ইভা রহমানের জ্বালায় বাঁচি না, দৈত্যদের নিভা রহমান আবার কি মাল রে বাবা? একবার চেখে দেখা দরকার।

 

আমি দৈত্যের কাছ থেকে হেডফোনের এক মাথা নিয়ে কানে লাগালাম। প্রথমেই মনে হল অনেক গুলো মানুষ একসাথে বায়ুত্যাগ করলে যেরকম শব্দ সেরকম শব্দ। ফড়-ফড়-ফড়-ফড়াৎ। পক-পক-পক-পকাৎ। চট-চট-চট-চটাশ।

 

“এইটা কি?”

 

“আরে বস কি বলেন? মু-হা-হা-হা। এইটাই তো গান, মু-হা-হা-হা”।

 

এইটা গান!! এর চেয়ে তো আমাদের ইভা রহমান অনেক ভালো গান গায়!

 

আমি হেডফোন দৈত্যকে ফিরিয়ে দিলাম। এই ব্যাটা আমাকে তিনটা ইচ্ছা পূরণ করার কথা বলেছে। হুম, ভেবেচিন্তে তিনটা ইচ্ছা সিলেক্ট করতে হবে।

 

অনেক ভেবেচিন্তে আমি বললাম, “আমাকে একশ সুন্দরী এনে দাও”।

 

“জো হুকুম, মু-হা-হা-হা”, বলে ভ্যানিশ হয়ে গেল দৈত্য।

 

আমি আনন্দে কয়েকটা লাফ দিয়ে উঠলাম। একশ সুন্দরীকে নিজের বাহুডোরে কল্পনা করে চরম সুখে আত্মহারা হয়ে উঠলাম আমি। রুমের আয়নায় বারবার ঘুরেফিরে নিজের চেহারা দেখতে লাগলাম আমি।

 

কি করব একশ সুন্দরী আসলে? তাদের তো বসার জায়গাই দিতে পারব না। রুমে আবার একটাই ফ্যান। তাছাড়া সব রুমমেট আছে, এদের সামনে একটু ফষ্টিনষ্টিও করা যাবে না, তাহলেই আম্মুকে বলে দেবে। কি করা যায়?

 

নাহ, দৈত্য আসলে পরের উইশটা করতে হবে একটা বড় নির্জন প্রাসাদের জন্য। অবশ্যই উইথ কমপ্লিট প্রাইভেসি।

 

একটু পরে “মু-হা-হা-হা” করতে করতে আবার দৈত্য এসে হাজির। কিন্তু এ কি? তার গালে এরকম পাঁচ আঙ্গুলের দাগ কেন? আর সুন্দরীরা কই? একশটা দূরে থাক, একটাও তো নাই।

 

বললাম, “কি হইল?”

 

দৈত্য বিশ ত্রিশ বার “মু-হা-হা-হা” করে হেসে ওঠার ফাঁকে ফাঁকে আমাকে যা বলল তার সারমর্ম এরূপ, সে কোন এক মেডিকেল কলেজের ডালিম হলে পেয়ারা বেগম নামে এক সুন্দরীকে হাইজ্যাক করে আনতে গিয়েছিল। সেই ডাকসাইটে সুন্দরী নাকি তার মাথায় রবিনস দিয়ে বাড়ি মেরে তারপর গালে জোরে একটা চড় মেরেছে। এক চড়েই নাকি তার পঁয়তাল্লিশ পাটি দাঁত নড়ে গেছে। দুই তিনটা নাকি পড়েও গেছে।

 

ধুর, এইটা হইল কিছু? কত স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলাম আমি সুন্দরীদের নিয়ে। এটা করব, ওটা করব। ও নাচবে, এ গাইবে। আর আমি শুয়ে শুয়ে মুক্তোর মালা ছুঁড়ে দিয়ে রাজা বাদশা স্টাইলে বলব, মারহাবা মারহাবা। তোফা তোফা। ধুর। সব গেল।

 

আমি হতাশ হয়ে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আমাকে এমন একটা প্রাসাদ বানিয়ে দাও যেটা কোনদিন ধ্বসে পড়বে না”।

 

দৈত্য আবার “জো হুকুম, মু-হা-হা-হা” বলে ভ্যানিশ হয়ে গেল।

 

যাক, এবার তো আর মেয়েমানুষ আনতে হচ্ছে না। এবার ডিস্কো দৈত্য নিশ্চয়ই আমার মনস্কামনা পূরণ করতে সক্ষম হবে। আর আমি এই ভাঙ্গাচোরা হলের ভাঙ্গাচোরা রুম বাদ দিয়ে রাজার হালে প্রাসাদে থাকতে পারব। সেখানে আমার থাকবে অনেকগুলো দাসী, অবশ্যই সুন্দরী...এই রে আবার মেয়েমানুষের চিন্তা করছি।

 

“মু-হা-হা-হা”! এই তো দৈত্য এসেছে। কিন্তু, প্রাসাদ কই?

 

“এবার কি হল?”

 

“আরে বস বইলেন না, মু-হা-হা-হা। দুনিয়ার সব মার্কেটেই ভেজাল, মু-হা-হা-হা। সিমেন্টের জায়গায় সিমেন ধরায়া দিলেও ধরতে পারবেন না, মু-হা-হা-হা। এইজন্য রিস্ক নিলাম না বস, মু-হা-হা-হা। যদি দুই তিন বছরেই ধ্বসে পড়ে আপনার প্রাসাদ, তাহলে কি হবে? মু-হা-হা-হা”।

 

মনে মনে খুবই ক্ষিপ্ত হলাম আমি। সিমেন্টের জায়গায় সিমেন ধরায়া দিলেও ধরতে পারব না?ফাইজলামি নাকি? শালা আইলসা, সিমেন চিনস তুই? শালা আইলসা মুরগি! কোন কামের না!

 

আর মাত্র একটা ইচ্ছা বাকি আছে। এই আইলসা, মুরগির কলিজা-অলা দৈত্যটার কাছে আর কি চাওয়া যায়? অনেক ভেবেচিন্তে চাইতে হবে।

 

নাহ, পেয়েছি। হ্যাঁ, এটাই চাওয়া যায়। কাজটা বেশি কঠিন না, দৈত্যটা সহজেই করতে পারবে। হ্যাঁ, এটাই।

 

অনেক, অ-নে-ক ভেবেচিন্তে আমি বললাম, “আচ্ছা, তাহলে আমাকে একটা সহজ কাজ করে দাও। কালকে হরতাল, এমন একটা ব্যবস্থা করে দাও যাতে কালকে ডিএমসি বন্ধ থাকে”।

 

 

দৈত্য আমার দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। যেন এত অবাক সে জীবনেও হয় নি। ধীরে ধীরে তার মুখে ভর করল গভীর, গভীর দুঃখ। এত দুঃখ কাউকে পেতে আমি জীবনেও দেখি নি। তার উঁচু দুটো শিং আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ল, কানদুটোও। ধীরে ধীরে খসে পড়ল তার হেডফোন। ভিতর থেকে নিভা রহমান চিৎকার করতে লাগল, ফড়-ফড়-ফড়-ফড়াৎ। পক-পক-পক-পকাৎ। চট-চট-চট-চটাশ।

 

দৈত্য দৌড়ে এসে আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। তার চোখদুটো হয়ে গেল অশ্রুসজল। সে হেঁচকি তুলে বলতে লাগল, “আমি আপনাকে একশটা না, দুইশটা পেয়ারা, থুক্কু পেয়ারা বেগম এনে দেব, আপনাকে একটা না, একশটা প্রাসাদ বানায়া দেব...কিন্তু এত্ত অসম্ভব একটা কাজ আমাকে কেন দিলেন বস? এত্ত বড় শাস্তি আমাকে কেন দিলেন বস?”

 

আমি লক্ষ্য করলাম, এই প্রথম সে “মু-হা-হা-হা” করে হাসতে ভুলে গেছে।

 

 

 

                                                                            ***

 

 

ঘুম ভেঙ্গে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম। নয়টা সাতচল্লিশ বাজে।

 

কবির ভাই দেখি প্যান্ট পরে ইন করছে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কি সালেহ, যাইবা না?

 

আমার সব মনে পড়ে গেল। আজকে আমার প্যাথো পরীক্ষা। নাজমুল স্যারের কাছে। রাত তিনটায় উঠে সিলেবাস শুরু করার কথা ছিল। অথচ এখন বাজে নয়টা সাতচল্লিশ। পরীক্ষা দশটায়।

 

আমি লাফ দিয়ে উঠে রেডি হতে থাকি। আজ অবশ্য হরতাল। দেশের সব ভার্সিটি কলেজ বন্ধ। অফিস বন্ধ। সবাই ঘুমে।

 

বাট, হরতাল ডাজনট ম্যাটার চপিং স্টুডেন্টস অফ ডিএমসি।

 

 

Share