বহুরূপী

লিখেছেন - -সালেহ তিয়াস- | লেখাটি 736 বার দেখা হয়েছে

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে। কোনভাবেই তাদের ছাড় দেয়া হবে না”।

 

এই নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। তাদের মধ্যে দৈনিক শনিবার (The Daily Saturday) পত্রিকায় সাংবাদিক অমল সেন লিখেছেন...

 

“একাত্তরে যারা নিজেদের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাদের কোন মাফ নেই। নিজেদের ঘৃণ্য জীবনের বিনিময়ে ওরা কত মা বোনের ইজ্জত বিকিয়ে দিয়েছে, কত মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছে তার ইয়ত্তা নেই। ধর্ষণ হত্যা ও লুণ্ঠনেও এরা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। এদের কোন ক্ষমা নেই। এদের যা যা করা যেতে পারে...

 

১/ উলঙ্গ করে রাস্তার মাথায় ঝুলিয়ে দেয়া যেতে পারে। একটা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। টিকিটের দাম পাঁচ টাকা পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। সরকার রাজস্ব পেল, জনগণও মজা পেল।

 

২/ একাত্তরে নিজের বন্ধু ও প্রতিবেশীর বাড়ির মেয়েদের ধরে এরা যেভাবে নিজেরা ধর্ষণ করেছে ও হানাদারদের হাতে তুলে দিয়েছে, সেভাবে চিকন বাঁশ দিয়ে এদেরকে পশ্চাৎদেশ দিয়ে ধর্ষণ করা যেতে পারে।

 

৩/ এদের মুখ, যা দিয়ে এইসব জারজরা পাকিস্তানী বাবাদের তেল দিত, সেগুলো কমোড হিসেবে ব্যবহার করে বিদেশী কমোডের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা যেতে পারে...”  ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

 

এই প্রবন্ধ যে-ই পড়ে সে-ই ভালো বলে। বলে, মার সব শালাকে ধরে মার। মার রাজাকার মার। তরুণ প্রজন্মের ভালো লাগে এই লেখা পড়ে।

 

কিন্তু সব মানুষ একরকম না। কেউ কেউ তাদের পাকিস্তানী বাবাদের সাথে কাটানো সুখের মুহূর্তগুলো ও পাকিস্তানী মেয়েদের আপেল আপেল গালগুলোকে কল্পনা করে এই প্রবন্ধে থু থু নিক্ষেপ করে। তাদের বরং ভালো লাগে দৈনিক কিছুমিছু (The Daily Something Something) পত্রিকায় নাজমা হুসাইনির লেখা কলাম...

 

“যুদ্ধাপরাধ একটা ভাঁওতাবাজি। স্রেফ জনগণের মনোযোগ পাঁচ বছরের জন্য একদিকে নেবার চেষ্টা। সরকারের ঢং দেখে মনে হয় দেশে যেন আর কোন সমস্যা নেই। যুদ্ধাপরাধী না কি খোদা মালুম, এইটার বিচার করলেই যেন দেশে ভাত মাছ সম্পদের বন্যা বয়ে যাবে! যেন যুদ্ধাপরাধ বিচার করলেই সরকারের সাত খুন মাফ, দ্রব্যমূল্য সন্ত্রাস হত্যা গুম এইগুলা মনে হয় তখন জনগণ অটোমেটিক মাফ করে দিবে!

 

সরকারী দলের প্রতি আমার অনুরোধ, আগে নিজেরা ঠিক হন। আপনাদের নামে ঘুষ ধর্ষণ সহিংসতার অভিযোগের তো অভাব নাই। আগে সেইগুলা ঠিক করেন। দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীদের দল থেকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলেন। আর যুদ্ধাপরাধ? যুদ্ধে আবার অপরাধ কি? যুদ্ধে সব জায়েজ। পাকিস্তান সাপোর্ট করা তো একটা আদর্শিক ব্যাপার, এটা আপনারা বোঝেন না কেন? বাংলাদেশের বেলায় দেশপ্রেম, আর অখণ্ড পাকিস্তানের বেলায় ফুটা কলসি? ছি ছি!”

 

এই কলাম পড়ে বাংলাদেশের বিশেষ শ্রেণীর একদল লোক মজা পায়। ভাবে, যাক, তাহলে তাদের পক্ষে লেখার মতও কেউ আছে? ভালো ভালো। এই তো আমাদের দলে লোক বাড়ছে! উই দি ব্রেইনওয়াশড টিম আর হ্যাভিং মোর ম্যানপাওয়ার!

 

 

কিন্তু পাঠক জানে না, আমরাও জানি না, শামসুদ্দিন আক্তার নামে এক সাধারণ মানুষ, যে কি না বি এ পাশ করার পর চাকরি পাচ্ছিল না, যার কিনা কলেজে নাম ছিল “পিছলা বোয়াল”, যে কিনা তিনটা মেয়েকে প্রপোজ করে ছ্যাকা খেয়ে একটার গায়ে গোপনে এসিড মেরে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই ছেলেটা এখন পত্রিকায় লিখে দারুণ টাকা কামায়। তার এখন গাড়ি বাড়ি সব আছে। পত্রিকায় দেবার জন্য নিজের নামটা কোন বিশেষ কারণে দেয় নি সে, বরং সে দুটো নাম ব্যবহার করে, ওগুলো হচ্ছে যথাক্রমে “অমল সেন” ও “নাজমা হুসাইনি”।

 

 

(লেখকের কথাঃ একাত্তরের রাজাকারেরা নিজের স্বার্থের জন্য যখন যাকে তেল দেবার দিয়েছে। তখন তেল দিয়েছে পাকিস্তানী হানাদারদের, এখন তেল দিচ্ছে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দলকে। এভাবেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় তেল মেরে এইসব তেলবাজরা চামচিকার মত টিকে আছে এখনও। হায় মরার দেশ! এই দেশে মুক্তিযোদ্ধা না খেয়ে মারা যায়, আর শালার বাচ্চা রাজাকার দেশের পতাকা মার্সিডিজে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এ দেশ!

 

 

ফেসবুকে এটা আমার ১০০তম নোট। একটু অন্য ধরণের কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল, লিখলাম। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ। আইডিয়াটার জন্য কৃতজ্ঞ প্রিয় লেখক আনিসুল হকের কাছে। আর আরেকটা কথা, এই গল্পের মূল চরিত্র কিন্তু রাজাকার টাইপের, বুঝতে পেরেছেন আশা করি।)

Share