অধরা কিছু স্বপ্ন এবং একটি সম্পূর্ণ গল্প

লিখেছেন - মারিয়া অহনা | লেখাটি 1423 বার দেখা হয়েছে

(১).

আজকাল আর কলম এগোয় না……….

কেন জানি অনুভূতিগুলো দিন দিন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে।মরীচিকার আস্তরণে পুরনো স্মৃতিগুলো ঢাকা পড়ে  যাচ্ছে।সবকিছু কেমন জানি রঙহীন ধূসর ফ্যাকাসে মনে হয়।

ডায়েরির পাতাগুলো আগের মত আর ভরাট হয়ে উঠে না।মুঠোফোনের INBOX ও খালি পড়ে থাকে এখন।স্ক্রীনে পরিচিত  নামগুলো খুব কম ই ভেসে উঠতে দেখা যায়।ল্যাপটপের মনিটরে একটি IMAGE এই বারবার  চোখ দুটি  আটকে যায়।প্রিয় দুটি গানের লাইন বার বার মনে পড়ে—

 

“ আমায় একটু আড়াল দেবে কি ??

 লুকবো……

ভিজতে ভিজতে দুচোখ ক্লান্ত,

শুকবো …….. ”

 

তবুও মেয়েটি আজো কোনো এক অলস দুপুরে জানালার পাশে পড়ার টেবিলে কলম হাতে বসে থাকে ; কিসের যেন অপেক্ষায়।তবুও আজো মেয়েটির কিছুই লেখা হয়ে উঠে না……………….।

 

(২).

ক্রিং ক্রিং ক্রিং …………….

 ভোর ৫.৩০ টা। ফোনের অবিরত রিংটোনে বিরক্ত হয় শ্রাবন্তি।এতো সকালে আবার কে ফোন করে, ভাবে সে।

এক বার, দুই বার।তিন বারের সময় বিরক্তিভরে ফোন ধরে।ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘হ্যালো’ । কোন সাড়া পায়না।ফোনের ডিসপ্লে টা ভালো করে দেখে।অপরিচিত নাম্বার।আবার বলে,

-হ্যালো…….. কে বলছেন ??

 

এবার ইথারের ওপাশ থেকে বলে ওঠে- ‘আমি…….’  

চমকে যায় শ্রাবন্তি।এ কণ্ঠস্বর তো তার বহুদিনের চেনা।এতদিন পরেও চিনতে একটুও ভুল হচ্ছেনা।

বিস্ময়ে হঠাৎ ধাক্কা লাগে।কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-

 

-তুমি !!! হঠাৎ !!!!!!

-হুম। ভালো আছো তো ???

-হুমম  ভালোই।

এরপর দুজন ই  চুপ।

কোন কথা খুঁজে পায়না শ্রাবন্তি।কি বলবে সে।ওপাশ থেকেই ভেসে আসে,

-ঠিক আছে ,ভালো থেকো তুমি।

সংযোগ বিচ্ছিন্নের শব্দ শুনতে পাওয়া যায় ।

তারপর ?????

শুধুই এক ঝাঁক নীরবতা…………………….

 

(৩).

বর্ষাস্নাত এক অলস দুপুরের শেষ ভাগে সেই মেয়েটির কাছে নামঠিকানা বিহীন একটি খাম আসে।খামের ভিতরে ছিল গুনে গুনে সতের টি শুকিয়ে যাওয়া লাল গোলাপ।অবাক হয়ে যায় সে।কিছুদিন আগেই তার ডায়েরির পাতায় চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া ঠিক এমনই একটি শুকনো লাল গোলাপ স্থান পেয়েছে মেয়েটির ঘরের একমাত্র জানালার সামনের পরিত্যাক্ত ডাস্টবিনে। সেই সাথে মনের ঝাঁপি থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে দুই বছর আগেকার পুরনো কিছু স্মৃতি।

 

দুই বছর আগে ঠিক এমনি করেই সতের মাসে ১৭ টি লাল গোলাপ দিয়েছিল কাউকে মেয়েটি।বিনিময়ে পেয়েছিল শুধু ঐ একটিমাত্র লাল গোলাপ।তাতেই খুশি ছিল সে।কিন্তু আজ তাও নেই।মনের ঝাঁপি টি পুনরায় খুলে বসে।কি করে সেই বিশেষ একজন মানুষটির সাথে মধ্যবিত্ত মেয়ের আড়ষ্টতার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে কার্জন হলের সবুজ ঘাসের মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয়া,রাস্তার পাশের দোকানে একসাথে ফুচকা খাওয়া,রবীন্দ্র সরোবরে বিকেলের প্রতিটি মুহূর্ত কাটিয়ে দেয়া আর ধানমণ্ডি লেকের নির্জনতায় হাতে হাত রেখে প্রথম মনের কথা বলা ; এসবের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিলো।আর শেষ বার টিএসসি তে সেই মানুষটির সাথেই আর একজনকে দেখা।

 

(৪).

তিন বছর আগের কথা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের প্রথম ক্লাস আজ।সব শিক্ষার্থীর মাঝেই অন্যরকম এক উত্তেজনা।এর মাঝেই চশমা পরা জীর্ণ শীর্ণ একটা মেয়ে গুটিসুটি মেরে একাই এক বেঞ্চে বসে আছে।সবাই সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত।শুধু মেয়েটি নির্লিপ্ত।ক্লাস শুরু হয়ে যায়।কিছুক্ষণ পর  একটা ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ক্লাসে প্রবেশ করে।কোনো কিছুর খেয়াল না করেই মেয়েটির পাশে ফাঁকা বেঞ্চে বসে যায়।ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেয়েটি।কিন্তু কিছু বলেনা।ক্লাসের মাঝেই একটু পর পর বলে উঠে, ‘ধুর কখন ক্লাস শেষ হবে’। আবার বলে ‘উফফ বোরিং’। ছেলেটির অস্থিরতায় বিরক্ত হয় মেয়েটি।এক সময় জিজ্ঞেস করে ছেলেটি, “এক্স কিউজ মি, তোমার নাম কি ? ” বিরক্ত হয়ে মেয়েটি বলে,

 

-শ্রাবন্তি ।

-ওহ আমি অর্ণব।

 

একটু পরেই আবার অর্ণব বলে, “ এই , তোমার বোরিং লাগছে না ক্লাস ? ”

চুপ করে থাকে শ্রাবন্তি।জবাব দেয় না।অর্ণব নিজের মনেই বলে, “আমার তো খুব বোরিং লাগছে।একটু সবার সাথে পরিচিত হবো, আড্ডা দিবো। তা না ঘোড়ার ডিম ক্লাস”।

এবার শ্রাবন্তি চশমার ফাঁক দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।চুপ মেরে যায় অর্ণব।

ক্লাস শেষ হয়।ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসে শ্রাবন্তিকে বলে, “ এই মেয়ে, এতো ঝিম মেরে বসে থাকো কেনো? কথা বলতে কি খুব অসুবিধা ? ”

শ্রাবন্তি তবু ও চুপ।শুধু চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে নেয়।অর্ণব বলে, ‘উফফ তোমার ঝিমুনি দেখলে নিজেরও ঝিমুনি আসে ’। ওর কথা বলার ধরন দেখে শ্রাবন্তি এবার হেসে উঠে, সাথে অর্ণবও।

 

(৫).

দিন যায়।অর্ণব-শ্রাবন্তির ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।এক সাথে ক্লাস করা, নোট করা, লাইব্রেরিতে বসে পড়াশুনা করা, আড্ডা দেয়া , গ্রুপ স্টাডি সব কিছুতেই দুজন একসাথে।অর্ণব ভালো গান গায় , গিটার বাজায়।আর শ্রাবন্তি ভালো কবিতা লেখে।শ্রাবন্তির কথামালায় অর্ণব সুর তোলে।তাদের বন্ধুত্বের জুটি একসময় ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ হতে থাকে।

কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন সব এলোমেলো হয়ে যায়।প্রেমে পড়ে যায় অর্ণব।আস্তে আস্তে দূরে সরতে থাকে শ্রাবন্তির কাছ থেকে।প্রথম প্রথম কষ্ট পেলেও আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নেয় শ্রাবন্তি।ভাবে, তার চিন্তা তো শুধু চার দেয়াল আর তার কবিতার কথার মাঝেই বন্দি।আধুনিক ও ফ্যাশনেবল মেয়েকে পছন্দ করাই অর্ণবের মতো ছেলের জন্য স্বাভাবিক।তার মতো মেয়ে কখনই অর্ণবের উপযুক্ত নয়।এরপর শ্রাবন্তিও তার নিজস্ব জগত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

(৬).

স্মৃতির ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে আসে শ্রাবন্তি।নিজেকে আবিষ্কার করে তার চিরচেনা পরিবেশে ; সময় যেখানে থমকে ছিলো সেখানে।

শ্রাবন্তির সাথে অর্ণবের যোগাযোগ বন্ধ প্রায় এক বছর হলো।কিন্তু হঠাৎ আজ অর্ণবের ফোন পেয়ে দ্বিধায় পড়ে যায় সে। আজ এতদিন পর কি এমন হলো যে অর্ণব ফোন করলো তাকে।

উত্তর খুঁজে পায়না সে।খুঁজতে চায় ও না।কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানাই থাকুক না।……………………….

 

(৭).

খাম হাতেই এতক্ষন বসে ছিল মেয়েটি।আকাশের গর্জনে হঠাৎ চমকে উঠে সে।একমাত্র জানালার ফাঁক গলে দেখতে পায় বিদ্যুতের ঝলকানি।দিনের অপরাহ্ণে মেয়েটির সাথে আকাশটাও যে কাঁদছে আজ …………………….

 

(৮).

আরো কয়েক বছর পর ……………..

বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ হয়ে বৃষ্টি দেখছে শ্রাবন্তি।আকাশের দিকে উদাস দৃষ্টি তার।

হঠাৎ গাড়ির হর্নের শব্দে বাইরের দিকে দৃষ্টি চলে যায়।এতক্ষনে মনে হয় দুষ্টি-মিষ্টিকে নিয়ে চলে এসেছে ফারহান।

হ্যাঁ ফারহান ; এই মানুষটার সাথেই তার জীবনের গাঁট বেঁধে নিয়েছে সে। সময় যে কারো জন্যে থেমে থাকে না, ফারহানই তা বুঝাতে শিখিয়েছে। কোন এক ঝড়ে হয়তো তার জীবনের নৌকার পাল দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু সেখান থেকে তাকে বাঁচতে শিখিয়েছে এই মানুষটিই।এই হাতকে অগ্রাহ্য করার শক্তি কোথায় তার।

 

মামণি মামণি বলে ছোট্ট দুই পরী গলা জড়িয়ে ধরে শ্রাবন্তির।আর চোখের কোণে চিকিমিকি কণা নিয়ে ভালবাসার মানুষটির দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসে সেই মেয়েটি।

তাদের জীবনে যে ভালবাসার রঙ লাগতে শুরু করেছে তাকে হারাতে দিবে না তারা কখনও।

 

 

 

[ ভার্চুয়াল জগতে আমার যে কয়জন প্রিয় আপু আছে , শ্রাবন্তি আপু তাদের মধ্যে একজন। এই গল্পটা মূলত তাকে মাথায় নিয়েই লেখা । কিছুদিন আগে আমার এই আপুমনি টার  আকদ হয়ে গেল। দোয়া করি আপু তোমার জীবনের নতুন পথ চলা যেন অনেক আনন্দময় হয়।

 

আর একটা কথা , আমাকে নিয়ে আমার বন্ধুদের অভিযোগ কেন শুধু ছ্যাঁকা টাইপ গল্প লিখি। তাই এই লেখা টা লেখার সাহস যুগিয়েছি  বহু কষ্টে। যার পিছনে অনেক বড় হাত  আছে "তৃপ্ত সুপ্ত" আপুর । যদিও  আপুটার সাথে আমার কখনও প্রত্যক্ষ ভাবে কথা হয়নি কিন্তু পরোক্ষ ভাবে আপুর কাছে অনেক  কৃতজ্ঞ আমি  ]

 

Share