বেলা বোস, তুমি পারছো কি শুনতে?

লিখেছেন - নিশম | লেখাটি 1012 বার দেখা হয়েছে

১)

মনটা খারাপ। এটা নতুন কোনো ঘটনা না, তবে ঘটনার পিছনে কারণ নতুন এবার। আগে ইন্টারভিউ দিলেও চাকরি পেতাম না, এখন ইন্টারভিউই দিতে পারিনা। ডাকই দেয় না! না দেবার অবশ্য কারণ আছে, চিপায় চুপায় গড়ে উঠা আকাশ-পাতাল ভার্সিটির ছেলে-পুলেদের মতো আমি গাল ভরে ইংরেজী বলতে পারি না। তাদের মতো দামী শার্ট গায়ে দেয়ার মুরোদ আমার নেই, আমার গায়ে থেকে ভুরভুর করে দামী সেন্টের গন্ধ বের হয় না। কিছু করার নাই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অবশ্য বড় চাকরির আশাও করি না। কিন্তু মেজাজটা চড়া হয়ে যায় ভাবলে, মন চায় কলেজের আজহার স্যারের মুন্ডুটা পট করে দেই গুড়ো করে। এই ব্যাটাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার ঢাবি’তে ফিশারিজ পেয়েছি। জানি অতো ভালো না, তবুও দোয়া করবেন”, ব্যাটা কিনা দিলো আমার ব্রেইন ওয়াশ করে! সাহিত্য কি, কেনো বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন না থাকলেও সাহিত্য আমাকে ফুসফুস ভরা জীবন দিবে, কিভাবে সাহিত্য আমাকে পৃথিবীর বুকে ভাস্বর করে রাখবে – এইসব ছাতা-মাথা বুঝিয়ে দিলো মাথার বারোটা বুঝিয়ে। আমিও নুড়া পাগলের মতো গেলাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে ভর্তি হয়ে! একেকটা শেক্সপিয়ার-কিটো পড়ি আর আহা-উহু করি! আহা, এই না জীবন, এই না রস আস্বাদন! ছাতার, রস সব এখন চিপে চিপে বের করে নিচ্ছে। পকেটে দুশো টাকা ছাড়া একটা ফুটা পয়সাও নাই। জীবনটা ত্যানা ত্যানা হয়ে গেলো। আল্লা জীবনে দিছোটা কি? হ্যাঁ? দেয়ার মতো খালি একটা প্রেমিকাই দিছো, সেইটা আরেক পেইন! মেয়েটা এত্তো ভালোবাসে, মন চায় বিয়ে করে রেঙ্গুনে পালায় যাই, কপালের নাম গোপাল! সেইখানে যেতেও পাসপোর্ট লাগে! কথা বেশী বলে ফেলছি, জুতা সেলাতে হবে। আমার কপাল হলো ফাটা, আর জুতায় হলো ফুটা। জীবনটাই পুরা ফাটা-ফুটা হয়ে গেলো!

 

২)

 

-       হ্যালো

-       ব্যাপার কি? ফোন দিলে ধরো না কেনো?

-       টিউশনিতে আছি।

-       বুঝি তো! ছাত্রী পড়াও, এই জন্য ফোন ধরতে পারো না। কারেন্ট ও তো নাই, না? ভালো তো! শুনো, ঐ হাত দিয়া যদি আমারে ধরছো, হাত কেটে ভাসায় দিবো, বলে রাখলাম!

-       একটা কথা জিজ্ঞেস করি? কোনো দরকারে ফোন দিয়েছো?

-       আমাকে দেখতে আসতেছে। তুমি ছাত্রী পড়াও, আমারে বিয়ে পড়াক। পড়ানো শেষ হলে এসে বিরিয়ানী খেয়ে যেও!

-       সত্যি বলতেছো?

-       হ্যাঁ, তোমার মতোন মিথ্যুক নাকি আমি!

-       (ফিসফিস করে) কাইটো না, দশ মিনিটে ফোন দিচ্ছি।

 

মাথা ঘুরাচ্ছে, ঘাম আসছে শরীরে। মিনমিন করে বললাম, “ইয়ে নাজনীন, শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। এ সপ্তাহে এসে এক্সট্রা পড়িয়ে যাবো নে আরেকদিন। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, খুব খারাপ লাগতেছে। আজকে যাই, কিছু মনে করো না, আচ্ছা? আন্টিকে একটু বুঝিয়ে বলো, কেমন?”

 

-       জান! প্লীজ, আর দুইটা মাস জান! প্লীজ, পায়ে পরি সোনা!

-       আর কতো! দুই মাস করতে করতে দেড় বছর হয়ে গেছে! চুলে পাক ধরলে তো তখন তুমিই বিয়ে করবেনা আমাকে!

-       তোমার দাঁত পরে ফোকলা হয়ে গেলো তোমাকে বিয়ে করবো আমি। কথা দিলাম জান, আর কয়টা মাস! একটা চাকরী ঝুলে আছে, হয়ে যাবে আশা করি। প্লীজ !

-       কয়েকটা মাস? মাত্র বললা দুই মাস! মজা করো আমার সাথে! একটা মেয়ের অবস্থা বুঝো, বাসায় কতো কিছু শোনা লাগে? আব্বা-আম্মা আমার সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। তারা ধরেই নিছে আমি নষ্ট হয়ে গেছি, চরিত্র বিক্রী করে দিছি আরও কতো কি!

-       দুইটা মাস বর্ষা। হাত জোর করতেছি, তুমি কিছুক্ষনের জন্য না হয় পালায় বাইরে এসে পরো! আমি আর তুমি কিছুক্ষন রিকশায় ঘুরি।

-       তুমি মানুষ হবা না কোনোদিন। আসতেছি।

 

দুশোটা টাকা ছিলো পকেটে, বের করে আবারও গুনলাম। ইশশ, ভুল করেও একটা নোট বেশী গুনলে এক মুহুর্তের জন্য কী আনন্দটাই না পেতাম! কিছু ভুল কি আনন্দই না দেয়!

 

৩)

 

মুখ কালো করে বললাম, “দোস্ত! দে না পাচশোটা টাকা! দিয়ে দিবো, এই আল্লার কিড়া!”

 

রাজীব অন্য দিকে তাকিয়ে ভুস করে এত্তোগুলা বিড়ির ধোয়া ছেড়ে বললো, “তোর কাছে আগের পাঁচশো পাই। আবার নিবি। আমাকে কি বাংলাদেশ ব্যাংক পাইছিশ? তোর ভালোর জন্য একটা কথা বলি, এভাবে আর কয়দিন! বয়স কি কম হলো? অনার্স পাশ করে বের হইছিশ বছর খানেক হয়। একটা কিন্ডারগার্ডেনে মাস্টারি তো করতে পারিশ! বন্ধুদের থেকে ধার-দেনা আর কতো! লজ্জা দিচ্ছি না, তোর লজ্জা নাই। প্রেম করিশ, তোর মতো আবালকে কি দেখে ঐ মেয়ে পছন্দ করছে, আমি জানিনা!”

 

হজম করলাম সব কথা। এছাড়া কিছু করার নাই, রাজীব এই ব্যবহারের সাথে পরিচিত। মাটির দিকে তাকিয়ে আছি, রাজীব সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো। পাশের টেবিলে দেখলাম সব সময়ের মতো নোটটা রেখে গেছে। নির্লজ্জের মতো বড় নোটটা দুই ভাজ করে বুক পকেটে রেখে বেড়িয়ে পরলাম। এই বুকে অনেক লজ্জা, অনেক কষ্ট, না বলা কান্না, চিৎকার, আহাজারি আর সাথে ৫০০ টাকার একটা নোট। বেমানান, খুবি বেমানান।

 

৪)

 

একটা সত্যি কথা কি, বর্ষাকে যে দু মাসের মাথায় চাকরী পাবো বলেছিলাম, বানিয়ে বলেছি। এছাড়া মাথায় আর কিছু আসছিলো না। সত্যি বলতে, আমি বিরাট স্বার্থপর। তা না হলে, প্রেম করি বলে মেয়েটাকে এতো আরামের জীবন থেকে আমার মতো ফকিন্নীর জীবনে আনার চেষ্টা করতাম না। শেষ কবে উপহার দিয়েছিলাম মনে নেই। ওকে নিয়ে যখন বের হই, খুব সাবধানে এদিক ওদিক তাকায়, যাতে চোখে কোন দামী জিনিস না পরে। দেখা যাবে কোন একটা জামার দিকে তাকিয়েছে, আমি সেটা দেখে বুঝে ফেললাম ওর পছন্দ হয়েছে। না দিতে পেরে আমি যতোটা কষ্ট পাবো, তার থেকে শত গুন বেশি কষ্ট পাবে মেয়েটা, কারণ আমি কষ্ট পাচ্ছি। মেয়েটার মাথা একটু গরম, কিন্তু এতো ভালোবাসে যে রাগ-টাগ সব কিছুই ভুয়া মনে হয়। মাঝে মাঝে কষ্ট লাগে ভাবলে যে হয়তো বর্ষা জানেই না আমি ওকে কী তীব্র ভালোবাসি! কিভাবে বুঝাবো? না পারি জন্মদিনে উপহার দিতে, না পারি রাতের পর রাত ফোন দিয়ে আহলাদ করতে। মোদ্দা কথা, আমার মতো হত দরিদ্র ছেলেকে ভালোবেসে মেয়েটা যে ঠকেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লজ্জাও লাগে, আগে বেশী লাগতো অবশ্য। তবে মেয়েটা যখন হাত ধরে তাকিয়ে থাকে চোখের দিকে, খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, আমার মতো সৌভাগ্য আর কারো নেই। চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, “দেখো ! তোমরা দেখো! তোমরা আমাকে গরীব করে রেখেছো, তোমরা আমাকে সমাজের কীট বানিয়েছো, তোমরা আমাকে ডিগ্রীধারী ফকির বানিয়ে রেখেছো। তবুও, এক জীবনে কতো ভালোবাসা পেয়ে গেছি আমি!”

 

৫)

 

-       চাকরীর কদ্দুর তোমার?

-       এই তো, বলতে গেলে প্রায় কনফার্ম! ইন্টারভিউ এতো অসাধারণ হয়েছে, বললে বিশ্বাস করবে না! ছয়জন অফিসার, বুঝলে? প্রশ্ন তো না, যেনো গ্রেনেড মারছে একেকটা! আমিও কম যাই না, আমিও মাইন ছোড়া শুরু করলাম! শেষে তো বলেই ফেললো, “আপনি সাহিত্যের ছাত্র, কে বলবে! আপনার সায়েন্স আর কমার্সের জ্ঞান দেখে তো আমরা অবাক”।

-       সত্যি তো? নাকি বানিয়ে বলছো?

-       একেবারে তিন সত্যি! এই যে, এই যে তোমার মোবাইল ছুয়ে বললাম!

-       বেতন কতো দিবে? কিছু জানো?

-       ভালোই, মানে চলে আর কী! প্রথম তিন মাস ৬০০০। তারপর থেকে নয় করে দিবে যদ্দুর জানি। হবে না আমাদের?

-       হবে।

 

“হবে” কথাটা বলার সময় বর্ষার চোখে যে আনন্দ দেখেছি, সেটা বলতে ঈশ্বরের দেয়া ভাষা যথেষ্ট নয় হয়তো। কে বলবে, এই মেয়ের ঈদে কেনা একটা শাড়ির দামই পনেরো-বিশ হাজার টাকা!

 

-       এই মেয়ে! কাঁদো কেনো?

-       এমনি। শুনো, তুমি এই টাকা গুলো খরচ করবে না একদম, আচ্ছা? আমার কাছে কিছু টাকা আছে, আমরা প্রথম কয়েক মাস ঐ টাকা দিয়েই চলতে পারবো। ঠিক আছে? আর শুনো, আমি এখন একটা কাজ করবো, তুমি এক্কেবারে মানা করতে পারবা না, মানে করলে তোমার ঘাড় গুড়ো করে দেবো।

-       কি?

-       তুমি নতুন চাকরিতে জয়েন করবা, এই পঁচা শার্ট পরে? আমি তোমাকে কয়েকটা শার্ট কিনে দেবো এখন। শুনো, এতো লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই, আমিও ফকির, অল্প কয়টা টাকা আছে এখন, ব্র্যান্ডের দামী শার্ট কিনে দিতে পারবো না, বুঝছো?

-       দরকার নেই তো।

-       দরকার আছে, তুমি বুঝবে না। জান, চাকরিটা পেতেই হবে, তোমার নিজের জন্য না, আমাদের জন্য। আমি যে বাসায় কিসের মধ্যে আছি, কোনোদিন বুঝতে পারবে না।

 

আমার খুব বলতে ইচ্ছা করছে, সব মিথ্যা কথা। আমি কোনো চাকরি পাইনি, কিচ্ছু না। পারি না বলতে। চোখ ফেটে কান্না এসে পরছে, আটকাতে পারছি না। মানিক বন্দোপাধ্যায় মানুষটাও হয়তো আমার মতোই কষ্টে ছিলো। আসলেই, ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে, যেখানে টাকার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে গলায় ধরাধরি করে একসাথে পেচ্ছাব করে আর বাইক লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তারা লদকা লদকি করে, তারা গলা ভেজায়। ঈশ্বর তাদের দেখেন না, ঈশ্বর আমাকে দেখেন, আমার পরীক্ষা দেন। আমি আর পরীক্ষা দিতে চাই না। আমি বাঁচতে চাই, আমাকে একা নাইলে কষ্ট দাও আল্লাহ। এই মেয়েটারে আমি কেমনে বুঝাই, স্বার্থপর, মিথ্যুক এই আমি, অন্ধের মতো ভালোবাসি মেয়েটাকে। বর্ষাকে জড়িয়ে ধরি আমি, পাছে আমার চোখে পানি দেখে ফেলে। বুকে মাথা রেখে বর্ষা অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। সে কান্নায় শার্ট ভিজে যায় আমার। ময়লা সে শার্টও ভালোবাসার জলে কেঁদে কেঁদে উঠে, ইতর আমি সেই ইতরতম বস্তুর কান্না শুনতে পাই।

 

৬)

 

এ মাসে ছ জায়গায় এপ্লাই করলাম, ফাইল বড় স্যারদের টেবিল পর্যন্ত এগোয়নি। পকেটের তিনশো টাকা খরচ করে পিয়নকে হাত করলাম। ফলাফল, পিয়নের ভাগনে হিসেবে দেখা করবার সুযোগ পেলাম। ঈশ্বরের প্রতি বিরক্ত আমি, সেদিন সকালে দু রাকাত নামাজ পড়ে, বুকে ফু দিয়ে গেলাম দেখা করতে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রিন্সিপাল। কাপজ পত্র দেখলেন, ইংরেজী সাহিত্যে ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট দেখে সমাদর করলেন। সমস্যা একটাই, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। শালারা, রেখেছিশ কেনো তাহলে এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়? লাখ লাখ ছেলে-মেয়ের জীবন কেনো আর্সেনিকের মতো এতো ধীরে ধীরে নষ্ট করছিশ? ইন্টার পরীক্ষার পরে না হয় বিষ কিনে দিতি, লাখ খানেক ছেলে মেয়ে একবারে বিষ খেয়ে নিতাম। তোদের ও টাকা বাঁচতো! এই তিলে তিলে মেরে ফেলার চেয়ে বিষ খেয়ে মরলেও তো কম কষ্ট। এখানেও কিছু হলো না।

 

          আমি ঠিক করেছি, বর্ষাকে সব খুলে বলে দেবো। এরপরে পালিয়ে যাবো। হয় জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াবো আর না হয় পৃথিবী থেকে। একটা না একটা কনফার্ম। আমি আর পারছি না। প্রতিদিন ধুতে ধুতে সাদা হয়ে যাওয়া জিন্সটা আমার হাটু গেড়ে কান্নার জল আর নিতে পারছেনা। বর্ষাকে ফোন দিলাম রাস্তা থেকে।

 

-       বর্ষা, শুনতে পাচ্ছো?

-       তোমার গলা এমন লাগছে কেনো? কি হয়েছে তোমার?

-       আমার কিছু হয় নাই, ঠিক আছি।

-       তুমি ঠিক নাই জান, কি হইছে বলো আমাকে! চাকরিটা নিয়ে সমস্যা কোনো?

-       ওরকম কিছু না। আজকে একটু রমনায় আসতে পারবা?

-       পারবো, বিকালে আসি? এখন আসলে আব্বা এক্কেবারে আস্ত রাখবে না।

-       আচ্ছা বিকালেই এসো

-       তুমি দুপুরে প্লীজ কিছু খেয়ে নিয়ো

 

আমি ফোন কেটে দিলাম, দুপুরে খাওয়ার মতো বিলাসিতার ধার ধারি না বহুদিন। আমি চোখ মুখ কুঁচকে সূর্যের দিকে তাকালাম, প্রচন্ড টগবগে সে তরুন সূর্যেরও বিকেল ঘনিয়ে আসছে। বিকেল শেষে সন্ধ্যে বেলায় টুপ করে পালিয়ে যাবে। অন্ধকারে সুর্যরা পালিয়ে থাকে, হারিয়ে যায় না।

 

৭)

 

বর্ষার মোবাইল বন্ধ। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, বর্ষা আসেনি। আমি ওর আম্মার নাম্বারে ফোন দিলাম, আন্টি ফোন ধরলো।

-       খালাম্মা স্লামালিকুম

-       আমি তোমাকে চিনেছি। শুনো, খুব অল্প কথায় বলি ব্যাপারটা। বর্ষাকে দেখতে এসেছে, তারা বর্ষাকে খুবি পছন্দ করেছে। ছেলে এ মাসেই বিদেশে চলে যাবে, তাই তারা আজকেই ঘটক এনে বিয়ে পড়াতে চাচ্ছে। তুমি দয়া করে আর ফোন দিয়ে বা কিছু করে ঝামেলা করবেনা। বর্ষাকে ভালোবাসো না? নিশ্চয়ই চাও, ও ভালো থাকুক?

-       খালাম্মা, কী বলছেন এইসব! আমাকে একটাবার কথা বলতে দিন, একটাবার! আমি মরে যাবো খালাম্মা।

-       শুনো, এভাবে কাপুরুষেরা মারা যায়, তুমি কি কাপুরুষ? অনেক জীবন পরে আছে, অনেক বড় হবে জীবনে। আমার মেয়েটাকেও ভালো থাকতে দাও। আর, বর্ষাকে এখন ডাকা যাবেনা। ওর আব্বা ওকে নিয়ে মেহমানদের পাশে বসে আছে।

-       খালাম্মা, আপনার পায়ে ধরি খালাম্মা, একটাবার একটু কথা বলতে দিন!

 

আমি দৌড়াচ্ছি, কানের পাশ দিয়ে সাই সাই করে বাতাস কেটে যাচ্ছে, মনে হয় বাতাসের চেয়েও বেশী বেগে দৌড়াচ্ছি। রাস্তার সোডিয়াম হলুদ বাতি আরও ক্ষীপ্র করে দিচ্ছে আমাকে। এই সোডিয়াম বাতির আলোয় কতো কান্না-হাসি, খুনসুটি। চোখের পানি গুলো উড়ে উড়ে যাচ্ছে, এতোকিছু কিভাবে দেখছি আল্লাহই জানে! ফুসফুসটা যেনো ফেটে যাবে বাতাসের জন্য, আমি দম নিতে পারছিনা, সেই সময় নেই। আমি দৌড়াচ্ছি, আমার বর্ষাকে আরেকজন নিয়ে যাবে। এতো বড় সাহস!

 

৮)

 

র‍্যাট কিল খাবার মতো সাহস আমার ছিলো না। মদ-গাঁজাও ধরতে পারিনি, টাকা নেই। আমি এখনও ইন্টারভিউ দেই। বর্ষার অবশ্য মাথা গরম, সে ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলো।

 

           ধানমন্ডির আরসিসিতে বড়লোকের পোলাপানেরা সব হই হল্লা করছে। করবেই বা না কেনো? অঞ্জন দত্ত এসেছেন যে! স্টেজে উঠা মাত্র সব ছেলেমেয়ে চিৎকার করে উঠলো – বেলা বোস! বেলা বোস! অঞ্জনদা হাসি দিয়ে গিটার হাতে গান ধরলেন -

 

স্বপ্ন এবার হয়ে যাবে বেলা সত্যি,

এতোদিন ধরে এতো অপেক্ষা

রাস্তার কতো সস্তা হোটেলে

বদ্ধ কেবিন বন্দী দু জনে,

রুদ্ধ্বশ্বাস কতো প্রতিক্ষা!

 

চুপ করে কেনো,

এ কী বেলা তুমি কাঁদছো!

চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি সত্যি!

কান্নাকাটির হল্লাহাটির সময় গেছে পেরিয়ে

হ্যালো তুমি শুনতে পাচ্ছো কী!

 

 

এটা কি ২৪৪১১৩৯,

দিন না ডেকে বেলাকে একটিবার,

দশ-বারোবার রঙ নাম্বার

পেড়িয়ে তোমাকে পেয়েছি

দেবো না কিছুতেই আর হারাতে!

 

             আমার বেলা বোস হারিয়ে গিয়েছে। অঞ্জনদা, গানটা কি নতুন করে লেখা যায়?

 

Share