সখি, ভালবাসা কারে কয়?

লিখেছেন - রিয়াজুল আলম শাওন | লেখাটি 1125 বার দেখা হয়েছে

১.

অবস্থা সঙ্গিন এবং ভয়াবহ। একটি চেয়ারের সাথে আমাকে কঠিনভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। হাত এবং পায়ের রক্ত চলাচল সম্ভাবত এতক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। নাকটা চুলকাচ্ছে ক্রমাগত। মনে হচ্ছে কেউ নাকটা চুলকে দিলে তাকে অর্ধেক পৃথিবী দিয়ে দিতাম। আমার পাশে দৈত্য আকৃতির দুই যুবক। তাদের হাতে মোটা লাঠি। তারা লাঠি হাতে ক্রমাগত আমার চারপাশে ঘুরছে। এদের দেখে একটা গান মনে পড়ে গেল, “বিন্দু আমি তুমি আমায় ঘিরে......।”

এমন সময় বাড়ীর কর্তা জাহাঙ্গীর আকন্দ ঢুকলেন। তিনি বিশেষ কৌশলে আমার চুলের কলি ধরে টান দিলেন। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “বল, আমার মেয়ের সাথে তোর কি সম্পর্ক?”

আমি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু ফ্যাসফ্যাস শব্দ হল। আমার চারপাশে ঘুরতে থাকা বলশালী যুবকের একজন বলল, “এই বদমাইশকে এত প্রশ্ন করার কিছু নেই। ওর সাহস দেখে আমি অবাক হই। আমাদের বাড়িতে চুরি করে ঢুকে আমার বোনের সাথে দেখা করার চেষ্টা করে! ও আমাদের চেনে না। ঘুঘু দেখেছ এবার ঘুঘুর ফাঁদ ও দেখবা।”

জাহাঙ্গীর আকন্দ মুখ সূচালো করে বলল, “ এরে কি শাস্তি দেয়া যায়?”

: বাবা, দুই ঘণ্টা কমোডে মাথা ঢুকিয়ে রেখে দেন।”

জাহাঙ্গীর আকন্দ মাথা নাড়লেন। মনে হচ্ছে শাস্তি তার পছন্দ হয়েছে।

তার তিন কন্যা শায়লা, লায়লা, নাইলা মাঝে মাঝে দরজার আড়াল থেকে আমাকে দেখছে। নাইলার সাথে আমার দীর্ঘদিনের প্রণয়। প্রণয় এতই গভীর যে একদিন ওকে না দেখে থাকতে পারি না। তাই তো চুরি করে ওদের বাড়িতে ঢুকেছিলাম। কিন্তু হাতে নাতে ওদের ভাইয়ের কাছে ধরা পড়লাম। আমার বাড়িতে ঢুকার উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করতেই বোকার মত বলে ফেললাম, “আপনার বোনের সাথে দেখা করতে এসেছি।” এরপর থেকে আমাকে এই চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে।

আমি যথাসম্ভব করুণ দৃষ্টিতে জাহাঙ্গীর আকন্দের দিকে তাকালাম। তিনি আমাকে অগ্রাহ্য করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “না একে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ও আমার মেয়েকে পছন্দ করেছে। আমি ওর সাথেই আমার মেয়ের বিয়ে দিব।”

জাহাঙ্গীর আকন্দের দুই ছেলে সেন্টু, মিন্টু হতবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার মুখে হাসি ফোটে। এই মহান পিতাকে দাড়িয়ে সম্মান করতে ইচ্ছা হয়।

জাহাঙ্গীর আকন্দ বললেন, শায়লা এদিকে আয়।” শায়লা ঘরে ঢুকলেন। ঢুকতে অবশ্য কষ্ট হল। কারন তার স্বাস্থ্য অতি উত্তম ধরনের। তাই দরজায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হল। শায়লা এসে আমার পাশে বসলেন। তার ভয়ংকর দর্শন দাঁত বের করে হাসলেন।  ‘এইবার তোরে খাইছি’ টাইপ হাসি।

জাহাঙ্গীর আকন্দ ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ রাতেই শায়লার সাথে এই ছেলের বিয়ে দিব। বিয়ের আয়োজন কর। ” আমি বলার চেষ্টা করলাম আমি শায়লাকে না নাইলাকে ভালবাসি। কিন্তু বলতে পারলাম না।

জাহাঙ্গীর আকন্দের মেজ মেয়ে লায়লার বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু বড় মেয়ে শায়লার বিয়ে হচ্ছে না। তাই তিনি এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছেন না।

 

২.

শায়লা আর আমি রুমে একা বসে আছি। আমার দড়ি খুলে দেওয়া হয়েছে। শায়লা খুব শক্ত করে আমার হাত ধরে আছেন। মনে হচ্ছে যে কোন মুহূর্তে আমার কচি হাত মটমট শব্দ করে ভেঙে যাবে।

আদুরে গলায় শায়লা বলল, “ইশ! আপনি আমাকে এত ভালবাসেন, পছন্দ করেন! এক পাড়ায় থেকেও কখনো বুঝতে পারি নি। ” আমি জোম্বি দৃষ্টি নিয়ে শায়লার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

শায়লা আবার বলল, “ আমি কিন্তু খুব রোমান্টিক। আপনাকেও রোমান্টিক হতে হবে। আজ থেকে আমি আপনাকে আদর করে ঝুনুমুনু বলে ডাকব। আপনি ও আমাকে অন্য কোন নামে ডাকবেন।

আমি ঢোক গিলে বললাম, “ মানে? আপনাকে কি নামে ডাকব?”

: আদর করে যে কোন নামে ডাকতে পারেন। যেমন আমার মেজ বোন লায়লার বর ওকে আদর করে লালা বলে ডাকে।

আমি বিব্রত মুখে বললাম, “ইয়ে মানে... তবে কি আপনাকে শালা বলে ডাকব?”

শায়লা পছন্দ ক্ষেপে উঠল। বলল, “আমার সাথে রসিকতা করবেন না। আমার একটা স্ট্যাটাস আছে। আমি ‘মনের মাঝে কাঁপুনি’ ছবিতে নায়িকার পাঁচ নম্বর সখি ছিলাম। আমার সাথে উল্টাপাল্টা করলে এমন চড় দিব যে আক্কেল দাঁত নড়ে যাবে।”

ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। সেন্টু মিন্টুকে ও এত ভয় পাই নি। শায়লাকে বিয়ে করার চেয়ে কমোডে দুই ঘণ্টা মাথা ঢুকিয়ে বসে থাকার শাস্তিই ভালো ছিল।

 

রাত আটটা। বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন। কাজী সাহেব চলে এসেছেন। আমার ব্যাপক পেট খারাপ হয়েছে। সম্ভাবত অতিরিক্ত টেনশনের কারনে। মিনিটে মিনিটে বাথরুমে যাচ্ছি। ফ্ল্যালাজিল ৫০০ মি.গ্রা. খেয়েও কাজ হচ্ছে না।

জাহাঙ্গীর আকন্দ উত্তেজিত গলায় বললেন, “ পেট খারাপ কোন বিষয় না, তুমি তিনবার কবুল বল। তারপর যত ইচ্ছা বাথরুমে যাও।”

আমি হঠাৎ মৃগী রুগীর মত কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “আমি শায়লাকে বিয়ে করব না। আমি নাইলাকে ভালবাসি।” সেন্টু, মিন্টু এবং জাহাঙ্গীর আকন্দ উসাইন বোল্টের মত দ্রুততায় আমার দিকে তেড়ে এলেন। সেন্টুর পছন্দ এক ঘুষিতে আমি নিচে পড়ে গেলাম। টের পেলাম একটা দাঁত নড়ে গেছে। আমি জ্ঞান হারালাম।

জ্ঞান ফিরে দেখলাম নাইলা আমার মাথায় পানি ঢালছে। উদ্বিগ্ন গলায় নাইলা বলল, “একটু পরই তোমার আমার বিয়ে হবে। শায়লা আপা সবাইকে বুঝিয়ে রাজি করেছেন। তিনি আসলে খুবই ভালো একজন মানুষ।” অদ্ভূত আনন্দ পুরো আমাকে গ্রাস করল। আমি একটু বেশি অসুস্থ হওয়ার ভান করলাম। নাইলার উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে ভালো লাগছে।

 

৩.

নাইলা আর আমি বাসরঘরে। নাইলা লাজুক দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি রোমান্টিক কিছু বলার চেষ্টা করছি। কিন্তু মাথায় রোমান্টিক কিছু আসছে না।

আমি বললাম, “ নাইলা, একটা কথা বলতে চাই।

                : হ্যাঁ। বলো...

                : ইয়ে মানে......

                : আহা! লজ্জা কিসের? বলো তো।

                : পেটটা খুব কামড়াচ্ছে একটু বাথরুমে যাব।

হতভম্ব নাইলা অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এমন চড় দিব যে আক্কেল দাঁত নড়ে যাবে।”

Share