আমার বিবাহ কথা

লিখেছেন - রিয়াজুল আলম শাওন | লেখাটি 1569 বার দেখা হয়েছে

বাংলা সিনেমার প্রতি প্রীতি আমার কোনকালেই ছিল না। তবে ইদানিং অন্তত একটা বাংলা সিনেমা দেখি। কারন এই বাংলা সিনেমার জন্যই নিঝুমের (আমার ইয়ে) সাথে আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে। নিঝুম বাংলা সিনেমার পাগল। নতুন কোন সিনেমা মুক্তি পেলে সবার আগে ওর তা দেখা চাই। সাথে অবশ্য আমাকে ও যেতে হয়। দীর্ঘ চার বছরের প্রেমে আমরা একসাথে প্রায় শ’দুয়েক সিনেমা দেখে ফেলেছি। আমি এখন বাংলা সিনেমা এক্সপার্ট। কোন সিনেমার দশ মিনিট পার হলেই আমি বলতে পারি এরপর কি ঘটবে। সিনেমার শুরুতেই নায়িকা মারা গেলে আমি অন্যদের মত আপসেট হই না। কারন নায়িকার অবশ্যই যমজ বোন আছে। সবই এক্সপেরিয়েন্স রে ভাই। ইদানিং শাকিব খানের মারদাঙ্গা ড্যান্সটাও আয়ত্ত করে ফেলেছি। নিঝুম তা দেখে মুগ্ধ।

 

আমার মাও বাংলা সিনেমার পোকা, যে সে পোকা নয়, রীতিমত ছারপোকা। কারণ দুদিন সিনেমা না দেখলে তার কথার তুবড়িতে বাবার সারাদেহে চুলকানি ও জ্বলুনি শুরু হয়ে যায়। তাই সংসারের শান্তি বজায় রাখতে বাবা প্রতি সপ্তাতেই মাকে  নিয়ে সিনেমা দেখতে যান। আর টিভি চ্যানেল তো আছেই। মাঝে মাঝে মা রাতে ডিসিডিতেও সিনেমা দেখেন। বাবা ঘুমিয়ে পড়লেই শুরু হয় মায়ের চেঁচামেচি। “তোমার সংসারে এসে কি পেলাম? একসাথে একটা সিনেমা দেখার সাধ তাই পূরণ হয় না।” আমার বাবার বাগান করার শখ আছে। একদিন দুপুরে তিনি তার শখের বাগানে পানি দিচ্ছেন তখনই মা হন্তদন্ত হয়ে আসলেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, “তুমি এখানে কেন?  জান না এখন ‘সংসার হলো সুখের কারখানা ’ সিনেমার টিভি প্রিমিয়ার হবে।” বাবা একট দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “হ্যাঁ সংসার তো সুখেরই কারখানা।” 

 

: তুমি এত বড় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস কেন ফেললে? আমি কি তোমাকে কষ্টে রেখেছি? আর তুমি এই ভর দুপুরে এখানে কেন, তা আমি জানি। 

: মানে!! 

: ওই তো শিল্পীর মা বারান্দায় বসে আছে। তুমি ওই বাড়ীর দিকেই এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলে। 

: কি বলছ এসব! 

: শিল্পীর মা তো তোমার ক্লাসসেট ছিল। পুরনো প্রেম তো জেগে উঠতেই পারে।  

: ওখানে শিল্পীর মা বসে আছে তা তো আমি জানিই না। আজকাল চোখে কম দেখি। বয়স হচ্ছে তো। 

: কি চোখে কম দেখ! আচ্ছা আজই তোমাকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।”

 

বাবা কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলেন। মাকে সামলানোর অনেক চেষ্ঠা করলেন। শেষ পর্যন্ত লক্ষী ছেলের মত দেখতে বসে যান ‘সংসার হলো সুখের কারখানা।’ সিনেমা দেখার পরও বাবার বিপদ কাটল না। মা বাবাকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। সাথে আমিও গেলাম। ডাক্তার অনেকক্ষণ ধরে বাবার চোখ পরীক্ষা করে বললেন, “সুসংবাদ। আপনার চোখ পুরোপুরি ঠিক আছে।” বাবা হতাশ হয়ে বললেন, “এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কিছু নেই।” ডাক্তার সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

 

বাড়ীতে এসেই শুরু হলো মায়ের চিৎকার “এত বড় মিথ্যা! প্রতারক! তুমি অন্য নারীর প্রতি আসক্ত। তুমি স্বামী নামের কলঙ্ক.............।” মা বলতেই থাকেন। আর আমার মনে হতে থাকে যেন কোন সিনেমা দেখছি।

 

 

নিঝুমের সাথে ও প্রায়ই আমার সিনেমা নিয়ে মনোমালিন্য হয়। নিঝুমের সমস্যা হচ্ছে কোন সিনেমা দেখার পর তার মধ্যে সেই সিনেমার প্রভাব দেখা যায়। যেমন সেদিন নিঝুম ‘কান্নায় বসতি’ সিনেমা দেখার পর আমার সবকিছু নিয়েই সন্দেহ করতে লাগল। তার কথার কিছু নমুনা দিই। “ইদানিং আমাকে এত কম ফোন কর কেন?”  “গতকাল তোমার ফোন ওয়েটিং পেলাম কেন?”  “মোবাইলের ম্যাসেজগুলো আর কললিস্টটা দেখাও তো।”  “এখন রোদ নেই তবু সানগ্লাস পড়ে আছ কেন?”  “তোমার দুলাভাইয়ের বোন কি নিয়মিত তোমাদের বাসায় আসে?” নিঝুমের প্রশ্ন যেন শেষ হয় না।

 

যা হোক, আমার আর নিঝুমের বিয়ে কিভাবে ঠিক হলো সে ঘটনা বলি। কিছুদিন আগে নিঝুমকে নিয়ে সামাজিক অ্যাকশান, পরতে পরতে রোমান্টিকতা নির্ভর ছবি “কচু ক্ষেতে লিচু কেন?” দেখতে গেলাম। আমি ছবি দেখতে দেখতে হাই তুলছি। আর নিঝুম টিস্যু দিয়ে চোখ মুছছে। খুবই emotional কাহিনী তো। কাহিনীর এক জায়গায় দেখা গেল নায়িকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। নায়িকা স্বামীর সাথে গাড়ীতে উঠছে। গাড়ী স্টার্ট নিচ্ছে না। তখন নায়ক এসে গাড়ী ধাক্কা দিল। নায়িকার স্বামী নায়ককে দশ টাকা বখশিস দিল। নায়ক তখন গান ধরল, 

 

“দশ টাকা চাই না,

চাই সুখের পায়রা 

যাচ্ছ তুমি স্বামীর ঘরে,

সব অধিকার ছাইড়া।”

 

 

এমন সময় ছবির বিরতি হলো। লাইট জ্বলে উঠল। হঠাৎ আমি পিছনে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। আমাদের পেছনের সারিতে মা বাবা বসে আছেন। একেবারে হাতে নাতে কট বিহাইন্ড। মা আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “মেয়েটা কে রে?” আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। মা নিঝুমের সাথে আলাপ শুরু করলেন। আর যাবে কোথায়। শুরু হলো সিনেমা নিয়ে আলোচনা। রাজ্জাক থেকে শুরু করে রিয়াজ, কবরী থেকে অপু বিশ্বাস কেউ বাদ গেল না। মা নিঝুমকে খুব পছন্দ করলেন। মা’র পছন্দ মানেই বাবার পছন্দ। ব্যস আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমার বিয়ের আর সাড়ে তিন মাস বাকি। আমার সময়টা কাটছে চরম ব্যস্ততায়। কারণ প্রতিদিন রাত জেগে সিনেমা দেখা প্র্যাকটিস করছি। যাতে নিঝুম বলতে না পারে "তোমার সংসারে এসে কি পেলাম? এক সাথে একটা সিনেমা দেখার................।”

 আমার জন্য দোয়া করবেন।

Share