অমানুষের ভালোবাসা

লিখেছেন - রিয়াজুল আলম শাওন | লেখাটি 1103 বার দেখা হয়েছে

চোখের পানির নোনতা স্বাদ তবু সহ্য করা যায়, তবে রক্তের নোনতা স্বাদ সহ্য করা কেমন জানি কঠিন। আর তা যদি নিজের রক্ত হয় তবে তা আরও কঠিন। আমার নাক ও কপাল বেয়ে রক্তের রেখা ঠোঁটের উপর পড়ছে। কিছুটা মুখের ভিতরও ঢুকে যাচ্ছে। আমার হাত পা চেয়ারের সাথে কঠিনভাবে বাঁধা। তাই হাত দিয়ে রক্ত মোছার উপায়ও নেই। মুখের উপর একটা মাছি বারবার বসার চেষ্টা করছে। আমি বারবার মুখ নাড়িয়ে ওটাকে তাড়াবার চেষ্টা করছি। তবে মাছিটার ধৈর্য্য অসীম। কিছুতেই সে ক্লান্ত হচ্ছে না। পুরো রুমটা অন্ধকার। মাছি কি অন্ধকারে দেখতে পায়? এই চিন্তাটা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। পুরো ঘরটা অন্ধকার হলেও ঘরের প্রতিটা জায়গা আমার চেনা। এই ঘরের ভিতর বসে থাকতে তাই খুব একটা খারাপ লাগছে না। ওরা আমার মুখটা বাঁধে নি। এজন্য আমার মনে ওদের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জেগে উঠল। তবে ওরা জানে আমি চিৎকার করার মানুষ না। আর চিৎকার করলেও মানুষজন ছুটে আসার আগে কয়েকটি বুলেট আমার মাথা অথবা বুক ভেদ করে চলে যাবে।

 

এই ঘরে আমরা অনেক মানুষকে আটকে রেখেছি। এই ঘরেই অনেকেই হত্যা করা হয়েছে। এই বাড়ীটা লোকালয় থেকে বেশ দূরে। এটা আমাদের গোপন আস্তানা । আমরা একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার গোলাম। সহজ কথায় আমরা দেশের এক আলোচিত নেতার ক্যাডার। তিনি আমাদের বুক আগলে রক্ষা করেন। আমাদের প্রত্যেকের মাথার উপরই নানা মামলা ঝুলছে। কিন্তু নেতা যতদিন আছেন ততদিন আমাদের কিছুই হবে না। তার বিভিন্ন কাজ সমাধা করাই আমাদের লক্ষ্য । আমাদের সংখ্যা অনেক। অসংখ্য। ভালই চলছিল আমার জীবন। হেন খারাপ কাজ নেই যা আমি করিনি। কিন্তু হঠাৎ নিঝুম নামের একটি মেয়ে আমার জীবন ওলট পালট করে দিল। ভালবাসা জিনিসটা আমি নিঝুমের কাছ থেকে শিখেছি। ও আমার মত অমানুষের দেয়া সব কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করেছে। আমার দুঃস্বপ্নগুলোকে সপ্নে রুপান্তরিত করেছে । আমার মনের ঘুমিয়ে থাকা মনুষ্যত্বকে একটু হরেও বের করে এনেছে। ওকে বিয়ে করার পরে খুবই ইচ্ছা হলো ভালো হতে। তাই বস যখন দেশের একজন প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিকের ছেলেকে ধরে আনতে বললেন, আমি অস্বীকৃতি জানালাম। আর তাতেই বিপত্তি ঘটল। বসের নির্দেশে ওরা আমাকে মারধর করে এই ঘরে আটকে রাখল। আসলে এই পথে দুর্বলতার কোন স্থান নেই। ওদের সবার ধারণা আমার সাময়িক মতিভ্রম হয়েছে। মারধর করলে এবং ঘরে আটকা থাকলেই আমি আবার আগের মানুষ হয়ে যাব।

 

দরজা খুলে কেউ ঢুকল। বাতি জ্বালাল। আমি দেখলাম এমদাদ দাড়িয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে এমদাদ বলল, "কিরে, মাথা ঠিক হইছে?" আমি কিছু বললাম না। এমদাদ আবার বলল, "দ্যাখ, রিয়াজ তোর প্রতি ভালবাসা আছে, তাই বলতাছি মাথার ভূত ঝাইড়া ফ্যাল। বসরে তো চিনিস। একেবারে কল্লা নামাইয়া দেবে।"

 

এসময় রবিন একটা চার পাঁচ বছরের ছেলেকে টেনে হেচড়ে নিয়ে ঘরে ঢুকল। রবিন হাসতে হাসতে বলল, "ওই হারামজাদা লেখকের ছেলে। ওর সাহস বেশি বাড়ছিল। এইবার বুঝবে। হা হা হা।"

 

আমি ছেলেটির দিকে তাকালাম। কি মিষ্টি চেহারা। সারা মুখে ভয়ের ছাপ। ছোট্ট শরীরটা বারবার কাপুনি দিচ্ছে ওর। ভয়ে, কাঁদতে ও ভুলে গেছে বাচ্চাটি। রবিন এবং এমদাদ বাচ্চাটিকে একটি চেয়ারে বসিয়ে দড়ি দিয়ে ভালভাবে বেঁধে রাখল। এরপর এমদাদ, রবিন বাইরে চলে যায়। মৃত্যুর আগে মানুষের চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্য হয়ে যায়। বাচ্চাটির চোখে মুখেও মৃত্যুর ছায়া পড়েছে। বাচ্চাটির জন্য বড্ড মায়া হলো আমার। আমি বললাম, "বাবু, ভয় পেয়ো না।" বাচ্চাটি কাঁদতে শুরু করল। প্রথমে আস্তে আস্তে । তারপর হাউমাউ করে। বলতে লাগল, "আমাকে মেরোনা, আমাকে মেরো না। আমি মার কাছে যাব।" আমি বললাম, 'কেঁদো না, কেঁদে লাভ হবে না। তোমাকে কেউ মারবে না। আমার মিথ্যা সান্ত্ম্বনা কাজে লাগল। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরে। আর এতো ছোট বাচ্চা। বাচ্চাটি বলল, "সত্যি মারবে না?" আমি বললাম, "না মারবে না।" বাচ্চাটি কান্না থামিয়ে বলল, "আমি মারা গেলে মা খুব কাঁদবে।" আমি চমকে উঠলাম। এই বিপদের মাঝেও বাচ্চাটির কাছে মায়ের কষ্টটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

এসময় এমদাদ এবং রবিন আবার রুমে এসে ঢুকল। ওরা বাচ্চাটিকে খাবার দিয়ে গেল। বাচ্চাটির হাতের বাঁধন খুলে দিল। কিন্তু আমার বাঁধন খুলল না। আমি খেয়ে আছি বা না খেয়ে আছি এ ব্যাপারে ওরা চিন্তিত না। বাচ্চাটির হাতে কলা, পাউরুটি ধরিয়ে দিয়ে ওরা চলে গেল। বাচ্চাটি মনে হয় ক্ষুধার্ত। কি আগ্রহ করেই না পাউরম্নটি কলা খাচ্ছে। একসাথে অনেকখানি পাউরুটি মুখে নিয়ে ফেলেছে, এখন গিলতে কষ্ট হচ্ছে। আমি বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ ওর নজর পড়ল আমার দিকে। বলল: তোমার কি খিদে পেয়েছে?"

 

: না।

 

: তোমার খিদে পেয়েছে। তুমি মিথ্যা বলছ। এই নাও।" বাচ্চাটি আমার মুখের কাছে রুটি ধরল। আমার চোখে পানি আসার উপক্রম হলো। না, কি যে সমস্যা। আজকাল মেয়েমানুষের মত অল্পতেই চোখে পানি আসে। আমি এক কামড় রুটি মুখে নিলাম। বললাম, "আমি আর খাব না। তুমি খাও।"

 

: আচ্ছা খাওয়ার পর ওরা কি আমাকে মেরে ফেলবে?

 

: না। তোমাকে কেউ মারবে না।

 

: সত্যি???

 

: হ্যাঁ। সত্যি।"

 

বাচ্চাটি আস্তে আস্তে সহজ হয়ে যায়। আমার সাথে অনেক গল্প করতে শুরু করল। তার স্কুলের গল্প, বাবা মার গল্প, বন্ধুদের গল্প।

 

: সেদিন কি হয়েছে জান, সুমন আমাকে চিমটি দিয়েছে। আমিও রাগ হয়ে সুমনের অংক হোমওয়ার্ক লুকিয়ে রেখেছিলাম। সেদিন অংক মিস হোমওয়ার্ক না আনার জন্য সুমনকে খুব বকুনি দিয়েছিল।

 

: কাজটা ঠিক হয় নি।

 

: তা ঠিক। সুমন সব জেনে আমার উপর খুব রাগ করেছে। আমি অবশ্য অনেকবার সুমনকে সরি বলেছি। তবু সুমনের রাগ কমে নি। সুমনকে একটা সারপ্রাইজ গিফট দিতে হবে।

 

: সেটাই ভালো।"

 

ঠিক এসময় এমদাদ রবিন আবার এসে ঘরে ঢুকল।

 

এমদাদ বলল, "বসের জরুরি অর্ডার এসেছে। এখনই বাচ্চাডারে মাইরে ফেলতে হবে। তারপর লাশটা কয়েক টুকরা কইরে ওর বাড়ীতে পাঠামু।"

 

রবিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "বস চায় কাজটা তুই কর। তোর শরীরে মরিচা ধরছে। কাজটা শেষ করলে দেখবি তুই আবার আগের মানুষ হয়ে যাবি।"

 

আমি বললাম, "ঠিক আছে।"

 

: এই তো শালা লাইনে আসছিস। তোরে ছাড়া জমে না রে রিয়াজ। কামটা শেষ কর। তোরে আজ এক নম্বরের ভদকা খাওয়াব।

 

এমদাদ : মনে আছে রিয়াজ, নোয়াখালির অপারেশনটার কথা। পুলিশের সাথে মুখোমুখি আমাদের গোলাগুলি হইল। তুই একাই কিযে সাহস দেখিয়েছিলি। তোর গুলির জন্য পুলিশ পিছু হটেছিল।

 

 

রবিন : এরপর রহমান সাহেবের মেয়েকে কিভাবে তুলে এনেছিলাম, মনে আছে? সব তোর জন্যই সম্ভব হয়েছে রিয়াজ। আর সেই তুই কিনা হঠাৎ মহামানব হয়ে গেলি?

 

: আরে বুঝিস না বিয়ের পরই রিয়াজ বদলায়ে গেছে।

 

: কিরে রিয়াজ, খাবারে কি মিশিয়ে তোর বউ তোকে বশ করছে? হা হা হা।'

 

 

আমি ওদের কোন কথারই উত্তর দিলাম না। এমদাদ আমার বাঁধন খুলে দিল। এরপর আমার প্রিয় অস্ত্রটা আমাকে ফেরত দিল। আমি অস্ত্রটা নাচাতে নাচাতে বললাম, "এই বাড়ীতে ডিউটিতে কি শুধু তোরা দু'জন আছিস?"

 

এমদাদ : হ্যাঁ। সব বাইরে। চলে আসবে। কথা না বাড়ায়ে বাচ্চাডারে গুলি কর।

 

রবিন : তুই কাম শেষ কর।"

 

আমি রিভালবারটা উঁচু করলাম। হঠাৎ এমদাদ এবং রবিনের মুখে ভয়ের চিহ্ন দেখলাম। ওরা বুঝতে পারল আমি কি করতে চাইছি। ওরা পালানোর চেষ্টা করল না।ওরা জানে পালানোর চেষ্ঠা কওে লাভ নেই। আমার নিশানা নিঁখুত। গুলি করবার সময় এতটুকু উদ্বিগ্ন হই না। আমি পর পর পাঁচটা গুলি করলাম। রবিন, এমদাদ লুটিয়ে পড়ল। ওরা আমাকে বিশ্বাস করেছিল। ওদের ধারণাই হয়নি এতটা সাহস আমার হবে। বাচ্চাটি হঠাৎ দৌড় দিল। আমি তাড়াতাড়ি ওকে ধরে ফেললাম। বাচ্চাটি হাত পা ছুড়ে বলল, "আমাকে মেরো না। আমাকে মেরো না।"

 

আমি বললাম, "তোমার ভয় নেই। তোমাকে আমি বাসায় পৌঁছে দেব।" ছেলেটা অবিশ্বাসের হাসি হেসে বলল, "তোমরা রাক্ষস, তোমরা পঁচা। আব্বু আমাকে বলেছে।"

 

আমি বাচ্চাটাকে জোর করে কোলে তুলে নিলাম। আমার হাতে বেশি সময় নেই। সিঁড়ি ঘর থেকে আমার মোটর সাইকেলটা বের করলাম। গায়ে খুব বেশি শক্তি অবশিষ্ট নেই আমার। বাচ্চাটিকে আমি ওর চাচার বাসায় পৌছে দিলাম। বাচ্চাটি বলল, "তুমি ভাল। অনেক ভাল।"

 

: যাও ভিতরে যাও, বাবু।

 

: তুমি আসো।

 

আমি বাচ্চাটিকে আদর করে বললাম, "বাবা, পারলে আমায় মাফ করে দিও।" বাচ্চাটি দৌড়ে ভিতরে চলে গেল। বাচ্চাটির কাছে আমি কেন মাফ চাইলাম তা আমার নিজের কাছেই পরিস্কার নয়।

 

আমি আমার বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। নিঝুম আমাকে দেখে চমকে উঠল। নিঝুম আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কি হয়েছে তোমার? কোথায় ছিলে এতদিন?"

 

: নিঝুম, কোন কথা না। তুমি এখনই এই বাসা ছেড়ে, এই শহরে ছেড়ে দূরে চলে যাও।

 

: কি উল্টাপাল্টা বলছ? কি হয়েছে তোমার? গায়ে রক্ত কেন ?

 

: হাতে বেশি সময় নেই নিঝুম। ওরা আসছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবাই জেনে গেছে। তাড়াতাড়ি যাও।" আমি দ্রুত নিঝুমকে সব বুঝিয়ে বললাম।

 

নিঝুম জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল, "তোমাকে ওরা মেরে ফেলতে আসছে? আর আমি একা একা পালাব? এত বেশি বাঁচার ইচ্ছা নেই আমার। "

 

আমি নিঝুমের মুখ স্পর্শ করে বললাম, "নিঝুম এখন পাগলামির সময় নয়। আমার মত অমানুষ মারা গেলে কিছু হবে না। কিন্তু সুন্দর পৃথিবীটা তোমার জন্য কাঁদবে নিঝুম। তোমার পুরো জীবনটা পড়ে আছে। আজ হোক কাল হোক আমার মৃত্যু এভাবেই হওয়ার কথা। তুমি আমাকে এতটুকু ভালবেসে থাকলে পিলিজ চলে যাও।"

 

নিঝুম বলল, "চলো দুজনেই পালিয়ে যাই। আমাদের কিছুর দরকার নেই। চলো এখনই বেরিয়ে পড়ি। অনেক দূরে গিয়ে জীবনটা শুরু করি।" আমি হেসে বললাম, "যত দূরেই যাই, ওরা আমাদের খুঁজে বের করবেই। তুমি তো বসকে চেনো। বড্ড ভাল মানুষ। তিনি ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন। তিনি মৃত্যুদন্ড দিলে সে মৃত্যু কেউ এড়াতে পারে না। "

 

: আমি অতশত বুঝি না। তোমাকে ছেড়ে আমি যাব না।" নিঝুম পাগলের মত কাঁদতে লাগল। আমি ওকে শক্ত করে আকড়ে ধরলাম। আমি অনেক বড় অমানুষ। কতদিন কাঁদিনি। নিঝুমকে জড়িয়ে আমিও কাঁদতে লাগলাম। আমি বললাম, "নিঝুম মনে আছে, সমুদ্রের পাশে আমাদের একসাথে হাঁটার কথা। মনে কর আমরা এখন সমুদ্রের বালুচরে হাঁটছি। বাতাসে তোমার চুল উড়ছে। তোমার চুল আমার মুখে এসে লাগছে। আমি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছি তোমার মধ্যে। তুমি আমার বুকের সাথে মিশে আছ। সমুদ্র আছড়ে আমাদের পায়ের কাছে................."

 

এভাবে কতক্ষণ পর হয়েছে জানি না। হঠাৎ বাইরে অনেকগুলো গাড়ী, মোটর সাইকেলের শব্দ শুনতে পেলাম। আমি নিঝুমের কানে ফিশ ফিশ করে বললাম, "ওরা এসে গেছে নিঝুম।" নিঝুম কিছুটা চমকে উঠল। আমি দরজা খুলেই রেখেছি যাতে ওদের বেশি কষ্ট করতে না হয়। নিঝুম চোখ বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আমরা ওদের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। ওরা আসছে। আমি আর নিঝুম ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

 

 

(গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক)

 

Share