স্বপ্নপুরুষ

লিখেছেন - রিয়াজুল আলম শাওন | লেখাটি 808 বার দেখা হয়েছে

সকাল থেকেই নাজের মনে হচ্ছে আনন্দে মরে যাওয়া বলে একটা বিষয় রয়েছে। মহান সৃষ্টিকর্তা মাঝে মাঝে মানুষকে এমন আনন্দ দেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়া একটা মেয়ের অনেক কিছু করা মানায় না। তবু নাজ আজ অনেক কিছুই করল। মায়ের সাথে অনেকক্ষণ ন্যাকামি করল, পাশের বাসার পিচ্চিটাকে ইনজেকশান দেওয়ার ভয় দেখাল, একুরিয়ামের গোল্ডফিশগুলোকে ডবল খাবার দিল, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল এলোমেলো করে নিজেকে পেত্নী বানাল।

আর দুপুর থেকেই সাজতে বসল নাজ। আজ নাজ তার স্বপ্নপুরুষের সাথে দেখা করবে। তাই স্বপ্নপুরুষের সাথে দেখা হওয়ার জন্য যত প্রস্তুতি দরকার, কোনটারই কমতি করবে না নাজ। নাজের এই স্বপ্নপুরুষের নাম ধ্রুব। ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওদের পরিচয়। ফেসবুকে ধ্রুব নাজকে ফেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। ধ্রুবের ছবি দেখে নাজের অন্যরকম আনন্দ হতে থাকে। অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক। ধ্রুবের আদ্যপান্ত সব তথ্য পড়তে থাকে নাজ। ধ্রুব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। সবকিছু দেখে ধ্রুবের রিকোয়েষ্ট একসেপ্ট করে নাজ।

ধ্রুবের  সাথে নিয়মিত ফেসবুকে চ্যাট হতে থাকে নাজের। সারাদিন ফেসবুক নিয়ে মেতে থাকত নাজ। মাঝে মাঝে খাওয়া দাওয়া পযন্ত ভুলে যেত। ধ্রুবের  টাইপ করা কথাগুলো নাজকে মন্ত্রমুগ্ধের মত আকর্ষণ করত। ওদের এই ঘনিষ্ঠতা শুধু ফেসবুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। ধ্রুব নাজের নাম্বার নিল। শুরু হল ওদের আরও কাছাকাছি আসা। মনের সব কথাগুলো ধ্রুবকে না বললে ভাল লাগত না নাজের। এক মুহুর্তের জন্য ধ্রুবের ফোন বন্ধ পেলে চিন্তায় অস্থির হয়ে যেত নাজ। নাজের মনে সবসময় শংকা কাজ করত যদি ধ্রুব হারিয়ে যায়। ধ্রুবও তার মনের সব কথা বলত নাজকে। তার স্বপ্নের কথা, ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা। এভাবে কথা বলতে বলতে কখন যে ধ্রুব নাজের অনুভবে, নিঃশ্বাসে মিশে গেছে নাজ নিজেও তা জানে না। ধ্রুবের গম্ভীর কন্ঠস্বর নাজকে প্রেরণা যোগায়, সঙ্গী হয় প্রতিটি কাজের। মাঝে মাঝে ধ্রুব নাজকে বিভিন্ন গিফট পাঠায়।

এক বছরের এই সম্পর্কে আজ ওদের প্রথম দেখা হবে। নাজ ধ্রুবকে অনেকবার দেখা করার কথা বললেও ধ্রুব বরাবরই এড়িয়ে গেছে। এতদিন পর আজ দেখা করতে রাজি হয়েছে ধ্রুব। ঠিক বিকাল পাঁচটায় ।একটা রেস্টুরেন্টে দেখা হবে ওদের। উত্তেজনায় নাজের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। নাজ ধ্রুবকে ফোন করে।

নাজ: কি পাঁচটায় আসছ তো ?

: হ্যাঁ। আসব।

: আমার না কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।

: কেমন লাগছে?

: উত্তেজনায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তোমাকে আজ আমি দেখব।

: আমাকে তো তুমি দেখেছ।

: সে তো ফেসবুকে আজ তোমাকে সামনাসামনি দেখব। ইচ্ছা হলেই তোমার অনেক কাছাকাছি থাকতে পারব।

: আচ্ছা।

: কি ব্যাপার বলো তো, মনে হচ্ছে তোমার কোন আগ্রহ নেই।

: কি যে বলো আগ্রহ থাকবে না কেন!!!! তুমি সময়মত চলে এসো। আমি অপেক্ষা করব।"

সোয়া পাঁচটায় রেস্টুরেন্টে পৌছে যায় নাজ। হাতে কিছু গোলাপ। পুরো রেস্টুরেন্ট খুঁজেও ধ্রুবের চেহারার কাউকে দেখতে পায় না নাজ। হতাশা ভর করে নাজের উপর। নাজ ধ্রুবকে ফোন দেয়। ফোনের রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করছে না। হঠাৎ নাজ দেখল তার দিকে একটা মধ্যবয়স্ক লোক এগিয়ে আসছে। নাজ মুখ ঘুরিয়ে ধ্রুবকে ফোন দিতে থাকে। হঠাৎ নাজ লক্ষ্য করল লোকটি তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটি বলল, 'নাজ, আমি ধ্রুব '।

নাজ চমকে উঠে। বলে, 'কি বলছেন!!!! দেখুন এসব মজা ভাল লাগে না। আপনি নিশ্চয়ই ধ্রুবের কোন আত্নীয়। ধ্রুব নিশ্চয়ই আপনাকে পাঠিয়ে আমার সাথে মজা করছে।      

: নাজ, আমিই ধ্রুব।

: তুমি মানে আপনি ধ্রুব!!!!!!!!!!

: আমি খুবই দুঃখিত নাজ। তুমি ফেসবুকে যে ছবিটা দেখেছ সেটা আমার নয়।

: এসব কি বলছেন?? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

: নাজ আমার বলতে খুব খারাপ লাগছে তবু আমাকে বলতেই হবে। তোমার থেকে আমার বয়স অনেক বেশি। আর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ি না। আমি এক্সপোর্ট ইমপোর্ট এর ব্যবসা করি। আমার নাম ধ্রুব নয়। আমার নাম কমল।’

নাজের দৃষ্টি কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। মনে হতে থাকে জ্বরে যেন ওর গা পুড়ে যাচ্ছে। মৃদুস্বরে নাজ বলে, 'আপনি আমার সাথে এমন করলেন কেন? কেন আমার জীবন নিয়ে খেলা করলেন? '

            : আমি তোমাকে অনেকবার বলতে চেয়েছি, নাজ। কিন্তু বলতে পারি নি। এখন তুমি যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পার।'

দুজনে প্রায় আধাঘন্টা চুপচাপ বসে থাকে। একসময় কমল উঠে যায়। যাওয়ার সময় বলে, "নাজ পারলে আমাকে মাফ করে দিও। "

 

বাসায় ফিরে নাজের চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করতে থাকে পুরো পৃথিবী ধ্বংশ করে দিতে। মায়ের রুমে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে নাজ। মা অবাক হন। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করেন, "কি হয়েছে মা তোর ?" নাজ কিছু বলতে পারে না। আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। মা নাজকে আকড়ে ধরে থাকেন। যত বিপদই আসুক তিনি তার মেয়েকে বুক আগলে রক্ষা করবেন।

 

রাত বারটা বাজে। নাজ মোবাইলটা হাতে নেয়। ধ্রুবকে ফোন দেয়।

নাজ ঃ হ্যালো ধ্রুব ।

     ঃ বলো নাজ।

     ঃ আমরা কি কাল আর একবার দেখা করতে পারি ?"

 

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

Share