দূরত্ব

লিখেছেন - রিয়াজুল আলম শাওন | লেখাটি 974 বার দেখা হয়েছে

রাত দশটায় এসেও মা বাবাকে বাসায় পেল না সোহান। সোহানের বাবা আনিস চৌধুরী দেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। পাশাপাশি তিনি একজন সমাজসেবক। সোহানের মা মনোয়ারা একজন ডাক্তার। রোগীর সেবা করতে করতে তিনি বাসার মানুষের সেবা করার সময় পান না। সোহান ছোটবেলা থেকেই চাওয়া মাত্রই সব পেয়েছে। ছোটবেলায় সোহানের বন্ধুরা যখন একটা খেলনার জন্য দিনের পর দিন মা বাবার কাছে ঘ্যানঘ্যান করত, তখন সোহান প্রতি সপ্তাহে নতুন খেলনা পেত। তবে একটা জিনিস সোহানের বন্ধুরা না চাইতেই পেত; মা বাবার সান্নিধ্য। যেটা সোহান পায় নি। একটু বোঝার পর থেকেই করিম চাচা আর রহিমা বুয়াকে কাছে পেয়েছে সোহান। প্রতিদিন সকালে খাওয়ার টেবিলে মা বাবার সাথে দেখা হয় সোহানের। মা গৎবাধাঁ কিছু উপদেশ শুনিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে যান। বাবা উপদেশ দেওয়ার ও সময় পান না। তিনি উপদেশ দেওয়াকে মনে করেন সময় নষ্ট ।

 

সোহান এবার এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী। সারা বছর কোন পড়াশুনাই করা হয় নি সোহানের। বাসায় অবশ্য গোটা চারেক টিচার আসে। কিন্তু পড়াশুনা এগোয় না। কলেজে গিয়েও ঠিকমত ক্লাস করে না সোহান। মা বাবার অবশ্য ধারনা ওর রেজাল্ট খুব ভালো হবে। কারন স্কুলে সবসময় সোহান ভাল রেজাল্ট করে এসেছে। এস.এস.সি তে ও জিপিএ ৫ পেয়েছে। কিন্তু কলেজে গিয়ে সোহান পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেই বেশি ভাল লাগে ওর। কিংবা বাসায় বসে কম্পিউটারে মুভি দেখে এবং গেমস খেলে সময় কাটে সোহানের। কিছু খারাপ বন্ধুদের সাথেও সখ্যতা হয়েছে ওর। সেই সাথে কিছু খারাপ অভ্যাসও আয়ত্ত করে ফেলেছে সোহান। বন্ধুদের সাথে দাড়িয়ে সিগারেট খাওয়া এখন ওর জন্য নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সমযগুলো এভাবেই কাটছিল ওর। মা বাবাকে কাছে পাওয়ার আকুলতা দিন দিন বাড়তে থাকে ওর। কিন্তু সেই আকুলতা প্রকাশ করতে পারে না সোহান।

সেদিন কলেজের সামনে বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল সোহান। বন্ধুদের মধ্যে একজন হুট করেই সিগারেট ধরায়। দেখে সোহানের ও বড্ড ইচ্ছা করে। বন্ধুর হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নেয় ও।

আনিস চৌধুরী আজ হঠাৎ করেই কিছুটা ফাঁকা সময় পেয়েছেন। তার হঠাৎই ইচ্ছা করল তার ছেলেকে চমকে দিতে। তিনি সোহানের কলেজের কাছাকাছি গিয়ে সোহানকে ফোন করলেন। আজ সারাদিন সোহানকে নিয়ে ঘোরার ইচ্ছা তার। সোহান বাবার ফোন পেয়ে অবাক হয়। বাবা কখনই তাকে ফোন করে না।

: হ্যালো বাবা।

: সোহান, কোথায় তুমি?

: আমি বাসায় স্যারের কাছে পড়ছি।

: ও। ঠিক আছে তুমি পড়।

: বাবা কোন প্রয়োজন?

: না। কোন প্রয়োজন নেই।"

আনিস চৌধুরী সোহানের কলেজের সামনে দিয়ে গাড়ীতে করে গেলেন। তিনি সোহানকে দেখতে পেলেন। সোহান কিছু একটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।

 

 

বাসায় ফিরতে ফিরতে সোহানের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাসায় ফিরে হতবাক হয়ে যায় সোহান। মা বাবা দুজনেই বাসায় চলে এসেছে। এত আগে তো তারা কখনই বাসায় আসে নি। তবে কি কোন সমস্যা হয়েছে ? চিন্তাটা মাথার ভিতর ঘুরতে থাকে সোহানের। করিম চাচা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললেন, ছোট সাহেব কোথায় ছিলেন??? স্যার,ম্যাডাম সেই বিকাল থেকে বাসায় বসে আছেন। ম্যাডামের চোখে দেখলাম পানি।" মায়ের চোখে পানি!!! বিস্মিত হয় সোহান। সোজা মা বাবার রুমের দিকে এগিয়ে যায়।

 : বাবা আসব?

 : এসো সোহান।"

ঘরের ভিতর কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। মা মাথা চেপে বসে আছে। আর বাবা অত্যাধিক গম্ভীর।

বাবা আস্তে আস্তে সোহানকে জিজ্ঞাসা করলেন, "সোহান তোমাকে কিছু কথা সরাসরি বলতে চাই।"

: বলো বাবা।

: তুমি আমাদের এতটা কষ্ট কেন দিলে? কেন বিশ্বাসের অমর্যাদা করলে?

: বাবা কি করেছি আমি?

: আজ আমি তোমাকে সিগারেট খেতে দেখেছি। তুমি কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলে, কিন্তু আমাকে বললে তুমি বাসায় পড়ছ। আজ তোমার প্রতিটা হাউজ টিউটরের সাথে আমি কথা বলেছি। তারা বলেছে তুমি এখন পড়াশুনা থেকে অনেক দূরে।

: বাবা আমি পড়াশুনা থেকে যতটা না দূরে, তোমাদের থেকে তার চেয়ে বেশি দূরে চলে গেছি।

মা হঠাৎ বললেন, "তুমি কি বলতে চাইছ? তোমার জন্য আমরা কিছুই করি নি !!!! তোমার কোন ইচ্ছা কি আমরা অপূর্ণ রেখেছি?

: না, আম্মু। রাখ নি।

: তাহলে কেন এমন কষ্ট দিলে আমাদের?

: আমি কষ্ট দিতে চাই নি আম্মু। আমি শুধু হতাশা থেকে বাঁচার পথ খুঁজেছি।

: হতাশা !!! তোমার আবার কিসের হতাশা??

: ছোটবেলা থেকে দেখছি তোমরা ছুটছ আর ছুটছ। আমার মনের কথা জানার সময় তোমাদের নেই। ছোটবেলায় খুব ইচ্ছা করত তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে; পারি নি। পারি নি অন্য ছেলেদের মতো বাবার হাত ধরে মেলায় ঘুরতে। আদর,ভালবাসা,শাসন কিছুই আমি পাই নি। পেয়েছি একাকীত্বের যন্ত্রণা।"

মা হঠাৎ উঠে সোহানকে জোরে চড় মেরে বসেন। পরক্ষণেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সোহান মায়ের সামনে যেতেই মা শক্ত করে সোহানকে আঁকড়ে ধরেন। সোহান ও ফুপিয়ে কেঁদে উঠে।

 

সেদিন রাতে মা সোহানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমালেন। প্রথমে সোহানের একটু লজ্জ্বা লাগছিল। পরে অবশ্য আনন্দে মনটা ভরে উঠেছিল। সকালে উঠে বাবা হঠাৎ বললেন, তোমার এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর আমরা সবাই মিলে দেশের বাইরে বেড়াতে যাব।" সোহান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

হঠাৎ সোহান বলে উঠে, বাবা আমি আমার সব খারাপ অভ্যাস দূর করব। আর এইচ.এস.সি পরীক্ষার এখনও তিন মাস বাকি। দেখো আমি ঠিকমত পড়াশুনা করে A+ পাবই।"

বাবা মা সেই থেকে সোহানের অনেক কাছে চলে আসেন। সকল দূরত্বেরও হয় অবসান ।

Share