এক্সট্রা

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 752 বার দেখা হয়েছে

(১)

“তুই যখন এপিটাফটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসবি , তখন আমি একটা ক্লোস আপ নিবো । আর যখন ফুলটা দিবি তখন আপার লেংথ ঠিক রেখে আমি একটা ফুলস্ক্রীন নিবো । আর এরপরেই কাট । ” – শর্ট নেয়ার আগে সেট-আপটা আবার বুঝিয়ে দিলাম রাহাতকে ।

 

“এটাই তো লাস্ট শর্ট , তাই না ?” কেমন যেন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা করলো রাহাত ; আমার শর্ট ফিল্মের নায়ক; আমার বন্ধু , সবচেয়ে কাছের বন্ধু ।

‘কাট । প্যাক আপ’  । শর্টটা ঠিকভাবে নেয়ার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আমার সর্বশেষ শর্ট ফিল্মের শুটিং শেষ হয়ে গেলো , এরপর বাকি কেবল এডিটিং । কেমন যেন খালি খালি লাগছিলো । ভাবলাম সেলিব্রেট করবো – রাহাত আর আমি । শুধু আমরা দুইজন । কিন্তু সে আর পারা গেলো না । আমাদের দু’জনের বন্ধু আর রাহাতের ‘বিশেষ বন্ধু’ দীপা এসে জুটে গেলো আমাদের সাথে । এই মেয়েটা বড্ড অদ্ভুত । মঞ্চে অসম্ভব ভালো অভিনয় করে , কিন্তু ক্যামেরার সামনে আসতে সদা সঙ্কুচিত । তবে আমার সব শর্ট ফিল্মের শুটিঙে তার উপস্থিতি সদা নিশ্চিত । ভালোলাগাটা ছবিটার জন্য নাকি রাহাতের জন্য ঠিক বুঝে উঠতে পারি না , বলা যায় ও-ই বঝার সুযোগ দেয় না ।

 

সাধারণত আমরা তিনজন একসাথে হলে কথার কোন অভাব হয় না । কিন্তু সেদিন কেন জানি কেউই কথা খুজে পাচ্ছিলাম না । একটা শুন্যতা বোধহয় ছেয়ে ছেয়ে যাচ্ছিলো আমাদের ।

শূন্যতার বিশৃঙ্খল শৃঙ্খলতাটা আমরা কেউই ভাঙতে পারি নি সেদিন ।  

ভাবতেই অবাক লাগছিলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ বাঁকে এসে পৌঁছেছে । জীবনের এতোগুলো রঙ গায়ে মেখে এখন বাইরের সাদামাটা জগতে খাপ খাওয়াতে হবে । ছলে যাওয়ার সময় নাকি পিছু তাকাতে নেই । কিন্তু বোকা মনের খালি মনে হতে থাকে পেছনে কী যেন ফেলে যাচ্ছি । দলা পাকানো দুঃখ বোধহয় এরকমই খানিকটা ।  

 

সেদিন অনেক রাতে নিজেদের রুমে ফিরি আমি আর রাহাত ।

 

 

(২)

রাহাত আর আমার পরিচয় হয় এই রুমেই । আমি গণিত আর সে ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র । প্রথম আমাদের মাঝে প্রায় কোন কথাই হতো না । এর কারণ ছিল বোধহয় আমাদের মেরুমুখী স্বভাব চরিত্র ; আমি উত্তর মেরু হলে সে দক্ষিণ মেরু । আমি রবীন্দ্রনাথ শুনলে সে শুনতো জনি কোল্ড্রিন । হঠাৎ করেই খুজে পেলাম একটা জায়গায় দুজনের প্রচন্ড মিল , আর সেটা হল সিনেমা । আমার আগ্রহ ডিরেকশনে আর রাহাতের সবটুকুই অভিনয়ে । এই রুমে বসেই আমি আমার জীবনের প্রথম স্ক্রিপ্ট লিখি । রাহাত স্ক্রিপ্টটা পড়ে জানায় সে অভিনয় করবে । আমি প্রথমে রাজি হই না , পরে তার একান্ত পীড়াপীড়িতে রাজি হই । তবে প্রথমদিনি আমি বুঝে যাই সে একজন জাত অভিনেতা ; হিচককের ভাষায় যাকে বলে ‘অভিনয় খেয়ে বাঁচে যে ’ ।  এরপর একটানা অনেকগুলো শর্ট ফিল্ম বানিয়েছি । সবগুলোতেই ক্যামেরার সামনে ছিল রাহাত আর পেছনে ছিল দীপা ।

 

ছায়াছবির আলোছায়া নিয়ে আলাপচারিতায় আমরা তিনজন একসাথে কতো হাজার ঘণ্টা যে কাটিয়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই ।

 

আর কিছুদিন পর হয়তো এভাবে রাত জেগে আর ছবি দেখা হবে না , বাঙলা ছবি যে অস্কারের যোগ্য সেটা নিয়ে জুক্তি-তক্কে মেতে উঠবো না ।

 

 

(৩)

‘আমার স্বপ্ন আমি ‘ওথেলো’ বাংলায় বানাবো ।’ সিগারেটের ধোঁয়ার রিং বানাতে বানাতে ঘোষণা দিলাম আমি । ‘এটাই হবে আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ’

‘তা ওথেলো কে হবে ?’ আমার হাত থেকে সিগারেট নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো রাহাত ।

‘কে আবার ? অবশ্যই তুই ।’

আমি জানতাম ওথেলো রাহাতের স্বপ্নের চরিত্র , তাই তার খুশির ঝিলিকটা আমার চোখ মন দুটাতেই গেঁথে গেলো । সেদিন দীর্ঘরাত চললো আমাদের ‘ওথেলো’ নির্মাণের খসড়া । রাত শেষে ভোর হয়ে গেলো , তাও ছবির ছায়া আমাদের মাঝে রয়েই গেলো ।

 

এর কিছুদিন পর আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলো । আমি হল ছেড়ে একটা মেসে উঠলাম এবং আমার সাথে অতি অবশ্যই রাহাত ।

 

(৪)

বিশ্ববিদ্যালয় গেটটার ভিতরে আমরা জীবনটাকে নাচাই , জীবনের সমস্ত রঙ চোখে মেখে ঘুরে বেড়াই । আর গেটের বাইরে জীবন আমাদের নাচায় , শুধু যে নাচায় তা না ; জীবনের ধুসর রঙটার সাথেও ভালোমতোই পরিচিত করে তুলে । আমিও সেই ধুসর রঙটা দেখছিলাম । প্রতিদিন সকালে বের হই ইন্টারভিউ দিতে আর রাতে ফিরি নিরাশ হয়ে । চাকরী পেতে হলে আজকাল মামা-চাচা লাগে , না হলে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট – যার কোনোটাই আমার নাই । তাই টিউশনির ভরসাতেই দিন কাটাই আর ইন্টারভিউর দরখাস্ত লিখি । মাঝে কিছুদিন ওথেলোর স্ক্রিপ্ট নিয়ে বেশ কয়েকজন প্রযোজকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছি । সবাই প্রশংসা করলেন , কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার কথায় পৃষ্ঠটান দিলেন । কাজেই ওথেলোর স্ক্রিপ্টের উপর ধুলোর প্রলেপ ইঞ্ছি ইঞ্ছি করে বাড়তে লাগলো ।

 

আর রাহাত? সে এফডিসির চক্কর কেটেই চলেছে দিনের পর দিন একটা সুযোগের জন্য । একটা সুযোগ পেলেই সে দেখিয়ে দেবে । কিন্তু অই একটা সুযোগও সে পায় না । কিন্তু সে হাল ছাড়ে না । প্রতি রাতের স্বপনগুলোকে বুকে আঁকড়ে ধরে আবার ভোরবেলায় পা বাড়ায় স্টুডিওপাড়ায় ।

 

(৫)

‘দোস্ত , কালকে মনে হয় কাজ হয়ে যাবে ।’  রাহাত উত্তেজনা আর ধরে রাখতে পারছে না ।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম – ‘কী কাজ ?’

‘কালকে মনে হয় একটা সুযোগ পেয়ে যাবো ।’ আমার খুশি আর দেখে কে ! যাক! আমাদের একজনের স্বপ্ন ত অন্তত পুরণ হল ।

 

পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে রাহাত তার সবচেয়ে ভালো শার্টটা পড়ে রওনা দেয় স্টুডিওপাড়ায় । আর আমি বেরিয়ে পরি আরেকটা ব্যর্থ ইন্টারভিউ দিতে। ইন্টারভিউটা সেদিন খুব ভালো হয় । মনে হচ্ছিল চাকরীটা পেয়ে যাবো ।

সেদিন রাতে এসে রুমের লাইট বন্ধ দেখেই বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে । খানিকবাদে জানতে পারলাম রাহাত আজকে একটা রোলে অভিনয় করেছে । এক্সট্রার পার্ট । সাড়ে চারখানা ডায়লগ ছিল বলে ২০০ টাকা পেয়েছে ।।

 

 

(৬)

এরপর থেকে রাহাত ক্রমাগত এক্সট্রার পার্ট করে যেতে থাকে পেট চালানোর জন্য । তার আর ‘ওথেলো’ হয়ে ওঠা হয় না । ‘এক্সট্রা রাহাত ’ পরিচয়টাই তার ক্রমাগত স্থায়িত্ব লাভের দিকে এগুচ্ছিল । আর আমি সেইদিনের চাকরীটা পেয়ে জাই । এরপর টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে যাই । দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা কেবল কাজ আর কাজ । এসব কাজের ভীড়ে হিচকক , বারগম্যান , মেল গিবসন , মৃণাল সেন , জহির রায়হান , সত্যজিৎ রায় – কবে যে হারিয়ে গেলেন টেরি পেলাম না ।

 

আমার চাকরীটা ছিল বদলীর । প্রথমে বদলাতে হল শহর , এরপর জেলা , এরপর বিভাগ আর সবশেষে দেশ । মাঝখানে সংসারীও হলাম । উন্নতির স্বর্ণশিখর বলতে যা বোঝায় সেখানেই উঠলাম । ওখানে উঠে দেখি রাহাত নামের বন্ধুটা আমার জীবনের কোন এক বাঁকে লুকিয়ে গিয়েছে ।

 

 

(৭)

অনেকদিন পর দেশে ফিরে এলাম । এয়ারপোর্টে নেমেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম । চেনা মাটির সোঁদা গন্ধে বুক ভরে যাবে ভেবেছিলাম । কিন্তু কালো ধোঁয়ার ভিড়ে সেগুলোও  আজ যেন গৃহবন্দী । দেশে থিতু হতে কয়েকটা দিন কেটে গেলো । তখন আবার চলছে রমজান মাস । শুরু করলাম রাহাতকে খুঁজে বের করার কাজ । প্রথমে ভেবেছিলাম এতো বছর আগে যার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে তাকে কী আর খুঁজে পাবো ! পরে দেখলাম এটা খুব কঠিন কিছু না । খবর পেলাম রাহাত এখন থাকে দুই কামড়ার একটা টিনের ঘরে । এখনো এক্সট্রার পার্ট করেই চলেছে , ওটা দিয়েই চলে । বিয়ে করেনি এখনো । কোন পুরান বন্ধুর সাথে যোগাযোগও রাখে নি ।

 

পরদিন ইফতারের পর পর গেলাম তার বাসায় । পরদিন ঈদ হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা ।

দরজা নক করলাম । রাহাতই খুললো । আশ্চর্যের ব্যাপার , এতোদিন পরে দেখা । তবুও দুজনেই দুজনকে ঠিক চিনে নিলাম ।

‘কেমন আছিস , ইমন ?’ – প্রশ্ন করল রাহাত ।

‘ভালই । তুই ?’

‘চলে যাচ্ছে । ’

‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি । বিয়ে করিসনি কেন? দীপা ত মেয়ে ভালই ছিল ।’

কিছুক্ষণ চুপ রাহাত , যেন কথা খুঁজছে । ‘একজন ৫০০ টাকার এক্সট্রার সাথে প্রেমটা যদিও হয়তো কোনভাবে করা যায় , ঘর কখনোই বাঁধা যায় না । দীপা একজন এক্সট্রার জন্য কেন নিজের জীবন নস্ট করবে ?’

আবার দুজনেই চুপ । আমি বললাম – ‘আমাদের ড্রিম প্রজেক্টটার কথা মনে আছে তোর ? ওথেলো !’

‘থাকবে না আবার ! কতোরাত ওটাকে বুকের ভিতর জাপটে ধরে পার করেছি ! ’

‘আমার দেশে ফেরার একটা কারণ আমি আমার সিনেমা বানানোর স্বপ্নটা পুরণ করতে চাই । ওটাকে আবার কবর থেকে তুলে আনতে চাই ।  ’

‘তুই ‘ওথেলো’ বানাবি ? ’

‘নাহ । ‘কিং লিয়ার ’ । তোর আর ‘ওথেলো’ হওয়ার বয়স নাই । ’

 

রাহাত কেমন যেন আনন্দিত দিশেহারার মতো মুখে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় বাইরে থেকে একটা শোরগোল শোনা গেলো , ‘চাঁদ দেখা গেসে , কাল ঈদ ।’ আমার কেন জানি মনে হল চাঁদের সবটুকু আলো এসে রাহাতের মুখের উপর পরেছে । মুখটা অন্য পাশে ঘুরিয়ে নিলাম । পুরুষ মানুষের নাকি সবার সামনে কাঁদতে নেই

Share