এইসব দিনে সেইসব মানুষেরা

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 580 বার দেখা হয়েছে

সেই কৈশোর থেকেই খুব ভোরে ওঠার অভ্যাস রাকিব সাহেবের । অল্প বয়সেই ঘর ছেড়ে দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছিল ; সেই হোস্টেল জীবনে নিজেকে একা একা খোঁজার জন্য , বোঝার জন্য এই সময়টাকেই বেছে নিয়েছিলেন । এই বাষট্টি বছর বয়সে এসেও অভ্যাসটা রয়ে গিয়েছে । আজো সূর্য ওঠার আগেই বিছানা ছাড়লেন তিনি । শীতের সকাল দেরীতে হয় , আঁধার যেন কাটতেই চায় না । সূর্যেরও তো শখ বলতে একটা ব্যাপার আছে । রোজ রোজ সে কেন ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠবে! পৃথিবীর মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায় কীসের তার ! আজো বারান্দায় দাড়িয়ে রাকিব সাহেব অপেক্ষায় সূর্যটার শয্যাত্যাগের ।   

 

পূর্বদিকে ফিকেভাবে রক্তিম আভা ছড়াতে ছড়াতে যেই সূর্যটা উঁকিঝুঁকি মারা শুরু করলো ঠিক তখনই রাকিব সাহেব বেরিয়ে পড়লেন প্রাতঃভ্রমণের উদ্দেশ্যে । এই প্রাতঃভ্রমণটাও তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস । মেইন গেইট খুলে বের হতেই  পাশের বাড়ির সেলিম সাহেবের সাথে দেখা । দুজনে বহুকালের বন্ধু । সেই ’৭১ থেকে । একই সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন , একই সাথে গাজী হয়ে ফিরেছেন । যুদ্ধ শেষেও দুজনের যোগাযোগটা অক্ষুণ্ণ রয়ে যায় । শেষ বয়সে দুজনের বদলির চাকরী তাদের একই জায়গায় এনে মিলিত করে । চাকরীর ক্ষেত্রে রাকিব সাহেব অবশ্য বন্ধু সেলিম সাহেবের সিনিয়র । রাকিব সাহেবের এল,পি,আর, শেষ হয়েছে মাসখানেক হল আর সেলিম আসছে বছর যাবেন অবসরে । দুই বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা পাশাপাশি হাঁটতে থাকেন । আশপাশের বিল্ডিঙগুলো থেকে আরো অনেক বার্ধক্যের অপেক্ষায়  থাক মধ্যবয়স অতিক্রান্ত মানুষ বের হয়ে আসেন । জীবনের শেষ ভাগটাতে এসে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছে মনে হয় প্রবলভাবে দিগুণ হয়ে যায় ।

 

আধঘন্টা হাঁটার পর রাস্তার ধারের এক চায়ের দোকানে বসেন দুই বন্ধু । এই ডিসেম্বরে বসে তারা স্মৃতিচারণ করেন ’৭১ এর ডিসেম্বরের । যুদ্ধ শেষে বাসায় এসে রাকিব নামের ২২ বছরের যুবকটা জানতে পারে তার বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি মিলিটারিরা ; তাদেরকে পথ দেখিয়ে দিয়েছিল তাদেরই এক আত্মীয় । বাবার লাশটা পর্যন্ত খুঁজে পায় নি রাকিব নামের যুবকটা । ’৭১ তাকে একটা দেশ দিয়েছিল , কিন্তু ছিনিয়ে নিয়েছিল সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে । তবে ভেঙ্গে পড়ে নি সেই যুবকটি । শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারী চাকরী জুটিয়েছে ।

 

ধীরে নগরীতে কর্মব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়ে । দুই বন্ধুও নিজ নিজ ঘরের দিকে পা বাড়ান ।

 

রাকিব সাহেবের এক ছেলে , এক মেয়ে । বড় ছেলে  তৌফিক একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র আর  মেয়েটা এখনো কলেজে পড়ে । রাকিব সাহেবের স্ত্রী একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা । নাস্তার টেবিলে তিনি মনে করিয়ে দিলেন রাকিব সাহেবকে যে আজ তার পেনশন অফিসে যাওয়ার কথা ।

 

গত মাস-দুই ধরেই রাকিব সাহেব চড়কির মতো ঘুরছেন পেনশন অফিসে । এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে , এক রুম থেকে আরেক রুমে , এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের কাছে । কিন্তু কেউই কিছু করছে না । খালি হয়রান করছে । রাকিব সাহেবের মাথায় ঢুকছে না সারাজীবনের চাকুরিক্ষেত্রের নথি এতোটা পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও কেন তার পেনশন পেতে এতোটা কষ্ট হচ্ছে ! আজো সেই গোলকধাঁধায় জেতে হবে ভেবেই তিনি ঘাবড়ে উঠলেন ।

 

১০টার দিকে মেয়েকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে তিনি আবার গেলেন অডিট অফিসে । আজ তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ; বিষয়টার একটা না একটা ফয়সালা তিনি করবেনই । পেনশনের টাকাটা তার মধ্যবিত্ত সংসারে বড্ড প্রয়োজন ।

 

অফিসে ঢুকতেই পিয়ন তাকে একটা সালাম দিল । তিনি এখানে এতো এসেছেন যে পিয়নটার কাছেও তার মুখ চেনা হয়ে গিয়েছে । যাই হোক , রাকিব সাহেব এগিয়ে গেলেন এখন তার ফাইলটা যার টেবিলে সেই জোয়ারদার সাহেবের দিকে । তাকে আসতে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন জোয়ারদার সাহেব ।

 

“আরে রাকিব সাহেব । বসুন , বসুন ।”

 

“আসলে আমি এসেছি আমার পেনশনের টাকাটার ব্যাপারে । অনেকদিনই তো হল । টাকাটা আমার খুব জরুরী দরকার । ”

 

“দেখুন রাকিব সাহেব  , এসব কাজ কী এতো দ্রুত হয় নাকি ! আমাদের সবারই তো এখানে হাজারটা কাজ । সবগুলোই সমান গুরুত্বের । কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখি বলুন তো ? ”

 

“তা হলে আমি কবে নাগাদ আমার ক্লিয়ারেন্সটা পেতে পারি ?”

 

“সময় লাগবে । এখানে সব কাজেরই একটা আলাদা মুল্য আছে । আপনি মুল্য পরিশোধ করলেই আপনার কাজটা হয়ে যাবে । ”

 

“মুল্য ? কীসের মুল্য ? ”

 

“দেখুন আমি আপনার ফাইলটা দেখেছি । আপনি বেশ ভালো রকমের অ্যামাউন্টই  পেতে যাচ্ছেন । এখন সেখান থেকে আপনি যদি পাঁচটা পারসেন্ট আমাদের জন্য খরচ করতেন তাহলেই সব সহজ হয়ে যায় । ”

 

রাকিব সাহেবের মনে হল তার চারপাশের পৃথিবী হঠাৎ করেই ঘুরতে শুরু করেছে আর তিনি ক্রমাগত নীচে পড়ে যাচ্ছেন । তিনি সারাজীবন সরকারী চাকুরী করে এসেছেন । একটা কালির দাগও পড়তে দেন নাই কর্মজীবনে । আর তার কাছেই কিনা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে ! তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন । ভাবতে থাকলেন সেই ’৭১ এর কথা । এরকম দেশের জন্যই কী তারা জীবন বাজি রেখেছিলেন ! তার ভাবনায় ছেদ পড়ল জোয়ারদার সাহেবের কথায় --

 

“দেখুন রাকিব সাহেব আপনি বুদ্ধিমান মানুষ । অনেক দেখেছেন এ জীবনে । তাই আমি ভেবেছিলাম আপনি বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা । তাই এতোদিন কিছুই বলি নাই । কিন্তু আপনি সত্যিই অদ্ভুত লোক । আপনার মতো অভিজ্ঞ মানুষকে সব খুলে বলা লাগলো । এখন আপনি আমাদের মুল্যটা দিলেই আপনার কাজ হয়ে যায় । ”  

 

রাকিব সাহেব ঝিম মেরে বসে রইলেন । তারপর উঠে দাঁড়ালেন --

 

“দেখুন জোয়ারদার সাহেব , যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলাম একদিন । আজকে সেই দেশে আমার পক্ষে অন্তত কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া সম্ভব না । আপনার একবার লজ্জাও করল না এই বিজয়ের মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে ঘুষ চায়তে ! আমি এক টাকাও দিতে পারবো না । আপনি আমার কাজটা করে দিবেন নাহলে আমি হায়ার অথোরিটির কাছে যেতে বাধ্য হবো । ”

 

জোয়ারদার সাহেব মৃদু হাসলেন --- “আপনি হায়ার অথোরিটির কাছে যেতেই পারেন । তাতে খরচটাও হায়ার হবে । আপনার কোন লাভ হবে না ।”

 

রাকিব সাহেব আর সেখানে দাঁড়ালেন না । ধীর পায়ে অডিট অফিস ছেড়ে বাইরে চলে গেলেন । যাওয়ার সময় আবার পিয়নটা সালাম দিল , রাকিব সাহেব খেয়াল করলেন না । তার মনে হল তিনি প্রতারিত হয়েছেন , তিনি হেরে গিয়েছেন ।

 

সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় এসে তৌফিক দেখল তার বাবা ঘরের লাইট বন্ধ করে শুয়ে আছে । ব্যাপারটা দেখেই সে আঁচ করল কিছু একটা হয়েছে । তার বাবা এ সময়ে এভাবে শুয়ে থাকার মানুষ না । সে তার মার কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনল  এবং বুঝতে পারল তার বাবা এই দুনিয়ার সবচেয়ে বোকা মানুষগুলোর একজন । অবশ্য এইরকম ধারণা তার আরো আগেই হয়েছিল , যখন বাবার অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তারা নিজেদের বাড়ি করে ফেলেছেন এই শহরে , তখন তার বাবা এখনো এই তিন কামড়ার ভাড়া বাসায় মধ্যবিত্তের জীবনযাপন করছেন ।

 

তৌফিক তখন মায়ের সাথে পরামর্শে বসল এবং রাতে খাবার টেবিলে বসে বলল সে কাল অডিট অফিসে যাবে । রাকিব সাহেব কিছু বললেন না ।

 

পরদিন তৌফিক একাই গেলো অডিট অফিসে দুপুর নাগাদ ফিরে এলো । তার বাবাকে জানালো সে সব কাজ ঠিকভাবেই সেরে এসেছে । রাকিব সাহেব মুখে কিছু  বললেন না । তবে ছেলের জন্য তার গর্বে বুকটা ভরে উঠলো । যে কাজ তিনি পারেন নাই , সে কাজ তার ছেলে করে ফেলেছে ।

 

১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা নাগাদ রাকিব সাহেবের মোবাইল বেজে উঠলো । জোয়ারদার সাহেবের ফোন । তিনি রাকিব সাহেবকে বিজয়ের শুভেচ্ছা জানালেন আর বললেন পরদিন যাতে তিনি অফিসে চলে আসেন । রাকিব সাহেবর ফাইল ক্লিয়ারেন্স পেয়ে গেছে ।

 

রাকিব সাহেব অত্যন্ত খুশি হলেন । তিনি বাসার সবাইকে ডেকে ব্যাপারটা জানালেন । তিনি বললেন , এদেশে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছে । তারাই এদেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা । রাকিব সাহেব লক্ষ্য করলেন না তার স্ত্রী আর ছেলের মধ্যে একটুখানি দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেলো ।

 

সে রাতে তৌফিক শুনতে পেলো তার বাবার রুম থেকে গান ভেসে আসছে ---

 

"সবকটা জানালা খুলে দাও না..

আমি গাইব গাইব বিজয়ের গান...

ওরা আসবে চুপি চুপি

যারা এই দেশটাক ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ

সবকটা জানালা খুলে দাও না.."

 

 

তৌফিক ভাবতে লাগলো সেই মুক্তিযুদ্ধের কথা ,তাদের গৌরবের কথা , কষ্টের কথা । পৃথিবীর আর কোন দেশ এতো অল্প সময়ে নিজেদের স্বাধীন দেশের কাতারে শামিল করতে পারে নাই । আর কোন দেশে এতো কম সময়ে মালকোঁচা মেরে লুঙ্গি পড়া কৃষকেরা , চশমা পরিহিত সুবোধ যুবকের দল সমরসাজে সজ্জিত মিলিটারির পশ্চাতদেশে লাথি মেরে খেদাই দেয় নাই ।

 

আর কোন দেশের যুদ্ধে এতো অপূরণীয় ক্ষতি হয় নাই । এতো মা-বোন ধর্ষিত হয় নাই , এতো সম্পদ লুন্ঠন হয় নাই , এতো প্রাণ যায় নাই ।

 

আর কোন দেশ এতো বড় ভুল করে নাই --- সেইটা হল "রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমা ।"

 

তৌফিকের মনে হল জানালা খুলে দিয়ে শহীদদের ডেকে  আসলেই আর লাভ নাই ।   তারা বোধকরি আর আসবে না ; তারা খুব সম্ভবত এইরকম একটা দেশের জন্য যুদ্ধ করে নাই ।

 

সে একবার ভাবল তার বাবাকে গিয়ে সব সত্যি কথা জানিয়ে দেয় । সে আর তার মা মিলে কিভাবে টাকা যোগাড় করে জোয়ারদার সাহেবের কাছে দিয়ে আসলো , কিভাবে রাকিব সাহেবের পেনশন চেক ক্লিয়ারেন্স পেয়ে গেলো – সবকিছু  । পরক্ষণেই ভাবল কী দরকার ! থাক না মানুষটা তার বিশ্বাস নিয়ে । কেউ যদি এই দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে তাতে ক্ষতি তো কিছু নাই । তৌফিক আবার গান শোনায় মনোযোগী হল ।

 

“আজ আমি সারানিশি থাকবো জেগে

ঘরের আলো সব আঁধার করে |

তৈরী রাখো আতর গোলাপ

এদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে

ওরা আসবে চুপি চুপি যারা এই দেশটাকে....

কেউ যেন ভুল করে গেওনাকো

মন ভাঙা গান

সবকটা জানালা খুলে দাওনা ||"

 

 

Share