ভরসা রেখো, একদিন ঠিক বর্ষা নামবে

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 851 বার দেখা হয়েছে

প্রতিদিনের মতোই ঘুমটা ভাঙলো সকালের রোদ এসে জানালায় আঘাত করার কারণে । ঘুম থেকে উঠেই মুঠোফোন দিয়ে অন্তরজালিকায় প্রবেশ করলাম । ওমা ! এ কী হেরি আমি এই নয়নযুগলে ! বাংলাদেশ নাকি পৃথিবীর নাকি ১১তম সুখী রাষ্ট্র । গর্বে বুকটা ফুলে উঠলো । আমরা আমেরিকার আগে , ইংল্যান্ডের আগে এমনকি ভারতেরও আগে । এর চেয়ে মধুর আর কী হতে পারে !

 

বিছানা থেকে পা ফেললাম সাবধানে । হাজার হোক সুখী দেশের নাগরিক , যেমন তেমন করে চললে তো আর হয় না । বেসিনের সামনে গিয়ে খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বুলালাম । সুখী দেশের নাগরিক হয়ে আমার গালে খোঁচা দাড়ি । নাহ ! এটা তো হতে দেওয়া যায় না । এতো বড় সম্মান মাথায় নিয়ে একগাল ভর্তি শশ্রু --- একদমই মানায় না । শেভ করবো ভেবে শেভিং ফোমের ক্যানটা নিলাম । ধুর ! কিছুই বের হয় না । শেষ হয়ে গিয়েছে । মেজাজটা সাত-সকালেই খিচড়ে যেতে বসেছিল । পরক্ষণেই মনে পড়ল , আরে আমি তো সুখী দেশের নাগরিক । আমার তো এরকম সামান্য ব্যাপার নিয়ে রাগ করা সাজে না ।

 

এরপর বের হলাম । উদ্দেশ্য মজিদের দোকানঃ চা-পান এবং সুখদুঃখের আলাপচারিতা বন্ধুদের সাথে । বের হতেই দেখলাম ফুটপাতের উপর বেশ ভালো একটা জটলা পেকেছে । গেলাম দেখতে । গিয়ে দেখি একটা ভিখারিনী মরে পড়ে আছে আর তার পাশে ছোট একটা বাচ্চা বসে কাঁদছে । তার কান্নার মধ্যে অবশ্য তেমন একটা সুখ দেখলাম না ; অবশ্য সে তো এখনো নাগরিকত্ব পায় নাই । সুখী দেশের নাগরিক হলে মনে হয় তার কান্নার মধ্যেও একটা সুখের ভাব থাকতো । পড়ে থাকা মৃতদেহ উপুড় হয়ে আছে , তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না । দেখা গেলে নিশ্চয় সেখানেও সুখের ছোঁয়া দেখা যেতো । এম্নিতেই সুখের কারণে তার পেট শুকিয়ে পিঠের সাথে মিশেছে প্রায় ।

 

ওখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়ালাম  না , সুখী দেশের মানুষ তো ; তাই বাচ্চাটার অসুখী কান্না বেশিক্ষণ শুনতে ইচ্ছে হল না । কিছুদূর এগুতেই বন্ধু হাসানকে দেখতে পেলাম একটা ট্রাফিক পুলিশের সাথে কথা বলছে । কিছুক্ষণ বাদেই দেখলাম হাসানের হাতে উঠে এসেছে তার মানিব্যাগ আর তার বাদেই দেখলাম পুলিশটি তার পকেটে একটা একশত টাকার নোট ঢুকাচ্ছে । এরপর হাসতে হাসতে দুজন দুদিকে চলে গেলো । বাহ! এদেশে তো দেখি সত্যিই সুখী মানুশের অভাব নেই ।

 

রাস্তার ধারে একটা শুন্য ডাস্টবিন থেকে গন্ধে গা প্রায় গুলিয়ে আস্তে লাগলো । কিন্তু শেষমেশ সামলে নিলাম । সুখী দেশের মানুষদের রাস্তা-ঘাটে গা গুলাতে নেই । সুখী মানুষদের কাজকর্মই অন্যরকম । এই ডাস্টবিনটা সম্পূর্ণ শুন্য,

অথচ তার আশেপাশের ছয় ফুট জায়গা জুড়ে বৃত্তাকার ভাবে ময়লা-আবর্জনা ছড়ানো । আবার সেখানে বসেই ব্রেকফাস্ট সেরে নিচ্ছে টোকাইয়ের দল । বাহ ! কী সুখী মানুষ ! এতো বড় ছড়ানো ব্রেকফাস্ট টেবিল আর কাদের আছে ?

 

ডাস্টবিন ছেড়ে আর একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম ওয়াসার কল । অবিরাম পানি পরেই যাচ্ছে সেখান থেকে । আহ! কি সুখের ব্যাপার ! যার দরকার , যখন দরকার , তখন এসে ব্যবহার করতে পারছে এই কলের পানি । ব্যবহার করেই ভুলে যেতে পারেন , কোন সমস্যা নাই । শহরতলির মাঝখানেই কেমন একটা ঝর্নার ব্যবস্থা !

 

আর কয়েক পা হাঁটতেই চলে এলো মজিদের দোকান । ঢুকেই পরোটা আর ভাজি অর্ডার দিলাম । টেবিল বয় মাসুদ জানালো আজকে থেকে সবকিছুর দাম ২ টাকা করে বাড়তি । মেজাজ আবার খারাপ হতে যাচ্ছিল , সামলে নিলাম । সুখী দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না তো কোথায় বাড়বে ? এসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে রাগ করাটা সুখী দেশের একজন  নাগরিকের মানায় না ।

 

আমার এক পাশের টেবিলে এসে বসলেন একদল মুরুব্বি আরেক পাশে বসলো একদল ইয়ো-ইয়ো তরুণ । আগে এসব তরুণের মুখে সর্বদা “হোয়াই দিস কোলাভেরি ডি ” লেগে থাকতো , কিন্তু জলিল ভাইয়ের কল্যাণে এদের মুখে এখন সবসময় “আর ইউ পম গানা ?” । যাই হোক আমি পরোটা ছিড়তে ছিড়তে দুপাশের কথাবার্তা শুনতে লাগলাম । মুরুব্বির দল  আক্ষেপ করছে তাদের যৌবনের দিনগুলোর ক্তহা স্মরণ করে । তাদের অতীত গৌরবে ভর্তি ছিল । জীবনের অর্থ ছিল তখন একটা । আহা , তাদের সেই সময়ের গান , চলচ্চিত্র , খাবার-দাবার !! শুনে এমন লোভ লাগলো যে ইচ্ছা হল এইচ জি ওয়েলসের সাথে দেখা করার উপায় থাকলে  টাইম মেশিন নিয়ে আসতাম একটা । অপর পাশের তরুণদলও থেমে নেই । তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলচে । এই দেশ একদিন অনেক এগিয়ে যাবে , এদেশের ছবি অস্কার পাবে , আন্তর্জাতিক টপচার্টে থাকবে এই দেশের সঙ্গীত – আরো কতো কী ! শুনে ভাবলাম টাইম মেশিনে চেপে কেবল অতীতে গেলেই হবে না , ভবিষ্যতেও যেতে হবে ; ওটাও দেখা দরকার । নাহলে আক্ষেপ রয়ে যাবে ।

 

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবলাম আমি যেনো আসলে কমোডে বসে আছি । আমার দুপাশে দুইটা পাদানি । একটায় বসে একদল অতীত গৌরব আলোচনায় মেতে উঠেছে আর আরেক দল আরেকটায় বসে ভবিষ্যৎ স্বপ্নে  বিভোর । আর মাঝখানে আমার বোকা বর্তমান কেবল ভিজেই চলেছে(কীসের জলে সেটা না হয় আর না-ই বললাম) ।

 

বিল দিতে গিয়ে আজ সকালে এই প্রথমবার নিজেকে অসুখী মনে হল ; আমার মানিব্যাগ হাওয়া হয়ে গিয়েছে । আর বোধহয় সুখে থাকাটা পোষাল না । বাকির খাতায় নাম লিখিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে । বাইরে এসেই দেখি চৌরাস্তার মোড়ে আবার একটা জটলা পেকেছে । পা চালালাম সেদিক বরাবর  ।

 

গিয়েই দেখলাম নুলা পাগলা আজ আবার খেপে উঠেছে । নুলা পাগলা এলাকার চেনা পাগল । মাসের কয়েকটা দিন খুব বেশি এগ্রেসিভ হয়ে উঠে , এছাড়া বাকি দিনগুলা শান্ত থাকে । সে আবার পাগল হওয়ার আগে নাকি কবি ছিল ।

এখনো সারাক্ষণ বিরবির করে কবিতা বলে । আর খেপে গেলেই কয়েকটা লাইনই বারবার চিৎকার করে বেড়ায় । যেমন আজো ক্রমাগত লাফাতে লাফাতে চিৎকার করে বলচে --

                               “ভরসা রাখ , একদিন ঠিক বর্ষা নামবে ”         

কিছুক্ষণ বাদেই সেখানে ট্রাফিক পুলিশ চলে এলো এবং নুলার কপালে জুটলো বেশ কয়েকটা লাঠির বাড়ি । পাগলটা তাও চিৎকার করে যাচ্ছেই ।

 

হুট করে আমার মনে ঐ লাঠির বাড়িগুলোর ভাগীদার আমরা সবাই । পাগলটা তো ঠিক কথাই বলছে । এতো অনিয়ম , বিশৃঙ্খল , দুর্নীতি , অন্যায় চারপাশে ; তবু আমাদের সবার বুকের মাঝে কেন জানি একটা আশার দামামা ক্রমাগত বেজেই চলে । একদিন এদেশে সত্যিই সুখের বর্ষা নামবে । আমরা সত্যিই নিজেদের সুখী ভাববো , সুখী উপাধিটা আর কোন উন্নত বিশ্বের দেওয়া উপহাসের তকমা মনে হবে না । বিরবির করে   আউরালাম--

                                  “ভরসা রাখি , একদিন ঠিক বর্ষা নামবে ”

কেন জানি আমার মনে হল আশেপাশের আরো অনেকজন আমার সাথে একই কথাই উচ্চারণ করলো।

Share