অহং

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 1098 বার দেখা হয়েছে

মুঠোফোনটার পর্দার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গৌতম । আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে এগারো ডিজিটের একটা মুঠোফোন নাম্বারের দিকে । কিছুক্ষণ আগে এই নাম্বার থেকে এই নাম্বার থেকে একটা ফোন এসেছিল । রিসিভ করতেই সেই বহুচেনা , মনের মাঝে স্থায়ী বসত গড়ে তোলা কণ্ঠস্বর । চার বছর পর ফোন করে রূপু একবারের জন্যও জানতে চায়নি গৌতম কেমন আছে , কী করছে । কোন একটা অদ্ভুত আবেগকে কুয়াশার অবগুন্ঠণে ঢেকে রূপু কেবল জানিয়েছে সে আসছে । সে আসছে গৌতমের শহরে , একঘন্টার একটা যাত্রাবিরতিতে । বিমানবন্দরে যদি গৌতম আসে তাহলে দেখা হবে । দেশটা সম্পূর্ণভাবে ছাড়ার আগে তাকে শেষবারের জন্য দেখার বড্ড ইচ্ছা রূপুর ।

আজকে যে শহরে রূপু ফিরছে সেটাতে একসময় বিকেলগুলোর দখলদারিত্বের খেলায় মেতে ছিল গৌতম আর সে ; একসাথে , এক হয়ে । সমস্ত অবৈধ বৈধতাগুলোকে যখন দুজন একত্রে মুঠোবন্দী করে জমা করছিল ভবিষ্যতের জন্য , তখনই রূপু চলে যায় গৌতমকে একা করে ; ঠিক বারো ভূতের এই শহরের মতো । বলা চলে , গৌতমই তাকে যেতে বাধ্য করেছিল একরকম ।

তাদের ভবিষ্যৎটা হয়তো মধুর হতে পারতো কিন্তু সেটা ছিল চূড়ান্ত অনিশ্চিত । রূপুর ফ্লুরোসেন্টের আলোয় অভ্যস্ত হওয়া চোখ জোনাকির মৃদু আলোয় উচ্ছ্বসিত হতে পারতো হয়তো – কিন্তু সেটা কেবল ক্ষণিকের জন্য । জীবন নামক লম্বা রেসের ট্র্যাকের জন্য শুধু ভালোবাসা নামক জকিটা যথেষ্ট নয় কখনোই । এসব ভেবেই গৌতমই হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে দিয়েছিল রূপুকে , তাদের ভালোবাসাটাকে ; রূপুর শত অনুরোধ সত্ত্বেও ।

রূপুদের মতো মেয়েরা শত চেষ্টা করেও একা থাকতে পারে না । রূপুও পারে নি । বাবা-মা’র পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করেছিল সে । এরপর গত চার বছর তাদের মাঝে কোন যোগাযোগই ছিল না । নীরবতাটা তাদের দুজনের মধ্যে কেউই ভাঙ্গে নি । আজ এতোদিন বাদে সাতান্ন সেকেন্ডের ফোনালাপ অনেকগুলো অতীতকে যেন জাগিয়ে তুললো গৌতমের সামনে , একসাথে । সে ভাবতে লাগলো তাদের রোদ পেরিয়ে যাওয়া বিকল দিনের দীঘল গানগুলোর কথা , শিশিরভেজা রাতগুলোর কথা । নিয়মানুযায়ী বর্তমান স্বামীকে নিয়ে রূপুর সুখেই থাকার কথা । বিত্ত , বৈভব , শ্রী – কোনকিছুতেই গৌতম তার সমকক্ষ নয় , বরং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যোজন যোজন । কিন্তু কেন যেন গৌতমের কেবল মনে হতে লাগলো রূপু আসলে ভাল নেই । কেবল ভাল থাকার অভিনয়ে ভালো করে চলেছে ক্রমাগত একসাথে করা সেইসব থিয়েটারের মতো । গৌতম ভাবতে লাগলো রূপু আসলে এখনো তার ফেলে যাওয়া পথের কথা ভেবে মন্ময় হয় , নাহলে এতগুলো বছর পরে কেন এই যোগাযোগ ! এইসব ভাবনায় বিভোর গৌতমের নিজেকে জীবনের সবচেয়ে সুখী মুহূর্তে আসীন বলে মনে হয় । এতো কিছু থাকা সত্ত্বেও একটা মানুষ রূপুকে সুখী রাখতে পারলো না , হেরে গেল গৌতমের ভালোবাসার কাছে – এই ভাবনা ক্রমাগত গৌতমের মনে অহং-এর সঞ্চারণ ঘটাতে লাগলো ।

সারাটা দিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অহংকারের আলো মেখে নিজেকে গর্বিত ভেবে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয় গৌতম । অনেকদিন পর ক্লিন শেভ করেছে সে । নিজেকে এতো যত্ন নিয়ে তৈরি করে এর আগে এতোবার আয়নার সামনে মহড়া দেয় নি সে । হাতে একটা র‍্যাপিং করা বক্স নিয়ে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকার সময় হুট করে অন্যরকম একটা ভাবনা এসে জুটে গৌতমের মনে । যদি সে দেখে , রূপু আসলেই অনেক সুখে আছে তার স্বামীর সাথে ! এমনকি গৌতমের সাথে থাকার চেয়েও বেশি সুখে ! তাহলে তার কী হবে ! সারাটা দিন যে ভাবনাটা তাকে পৃথিবীর সর্বাধিক সুখী মানুষের একজন করে তুলছিল , সেটা তো তাহলে বালির বাঁধের মতো ভেঙ্গে যাবে । এসব ভাবনা-চিন্তার ডামাডোলে যখন গৌতমের মস্তিষ্কে একটা নিউরাল গ্যাপ সৃষ্টি হচ্ছিল , ঠিক তখনই সরব হয়ে উঠলো তার মুঠোফোনটা । স্ক্রিনে ভেসে উঠলো সকালের সেই নাম্বার । খানিকক্ষণ ভেবে গৌতম মুঠোফোনটা সুইচড অফ করে দিল । পা বাড়ালো নিজের বাসার দিকে ।

রাতের বেলার চাঁদটাকে মাথার ছাতা করে ঘরের পথে ফিরতে থাকা মধ্যবয়স্ক মানুষটা এ জীবনে বহুবার ডুবেছে , গভীর থেকে গভীরে তলিয়েছে বেশ কবার । জীবনের খেলাঘরে খেলতে খেলতে খুইয়েছে প্রায় সব । রূপু তার সাথে থাকলে অধিক সুখে থাকতো – এই শেষ অহংবোধটা আর হারাতে চায় না সে । এটাই তার বাদবাকি নিঃসঙ্গ জীবনপথটার একমাত্র অফুরান রসদ । এটার ভাঁড়ার সে কোনভাবেই শেষ হতে দিবে না ।



Share