ফেরা

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 655 বার দেখা হয়েছে

     ঠিক ভোর ৫-৩০ এর সময় বিতিকিচ্ছিরি শব্দে অ্যালার্ম ঘড়িটা বেজে উঠলো । প্রতিদিনই এই ঘড়ির ডাকেই রিফাতের ঘুম ভাঙ্গে। ক্লাস আর পার্টটাইম চাকরি শেষে রিফাত মরার মতো ঘুমায় । এতো কর্কশ শব্দ ছাড়া ঘুম ভাঙ্গার কোন উপায় নেই । তবে আজকে ঘড়িটার না বাজলেও চলতো । রিফাত কাল সারারাত জেগেই ছিল । শত চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারে নি ।

 

        অ্যালার্ম বন্ধ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো সে । পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মাঝে শীর্ষে থাকা এই দেশে কিছুক্ষণ পরই আরেকটা ব্যস্ত দিন শুরু হয়ে যাবে । রিফাতেরও খুব ইচ্ছে হল ঐ ব্যস্ত মানুষগুলোর ভিড়ে মিশে যেতে । আবার পরক্ষণেই একরাশ নৈরাশ্য তাকে ঘিরে ধরে ।

 

        ল্যাপটপটা ওপেন করে সে । একে একে মেইল , এফবি , চেক করে ।  নাহ , কোথাও কেউ তাকে মনে করে নি । সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করলো ।  কিন্তু লাইটারটা কোথাও খুঁজে পেল না । অন্যদিন হলে খুঁজে দেখত একটু, কিন্তু আজকে আর ইচ্ছে করলো না ।

 

         সিগারেটের প্যাকেটটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে । এই দেশের অন্যান্য শহরগুলোর মতো এই শহরের লোকজনও আরেকটা যান্ত্রিক দিনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে । শুধু রিফাতেরই আজ কেন যেন রক্ত-মাংসের মানুষ হতে ইচ্ছে করছে । সে রাস্তার পাশের একটা বেঞ্চে বসল , দেখতে লাগলো অন্যদের জীবনগুলোকে ।

 

            পকেট থেকে মুঠোফোনটা বের করে অহনাকে ফোন করল ।   একের পর এক রিং বাজল । কিন্তু অহনা ধরল না। অবশ্য রিফাতের এটা জানাই ছিল । আজকে অহনার গায়ে হলুদ । ছেলে এদেশের গ্রিনকার্ডধারি , অনেক টাকা ইনকাম । অহনাকে সুখে রাখবে খুব ।

 

           অহনার সাথে রিফাতের চার বছরের সম্পর্ক । অনেক বাধা-বিপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাদের সম্পর্কটা এতদিন টিকে ছিল । কিন্তু হটাত কী থেকে যে কী হয়ে  গেল..............................

 

 

           গত পরশু রাতে অহনার ফোন আসে।

 

          ‘’কেমন আছো , রিফাত?”

 

          “ভাল। তোমার কি খবর? সারাদিন কই থাক? ফোন ধর না কেন? “

 

          “রিফাত , তোমাকে একটা কথা বলি । মন দিয়ে শোন । আমার মনে হয় আমাদের আর যোগাযোগ রাখা উচিত না । আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে । ছেলের স্ট্যাটাস অনেক হাই । “

 

          ‘’কি বলছ তুমি এইসব? নিশ্চয় ফাজলামি করছো? আমাকে বোকা বানাচ্ছো, না? “

 

          ‘’ আমি মজা করছি না । সত্যি বলছি । তুমি আমাকে ভুলে যাও । এটা তোমার আর আমার –আমাদের দুইজনের জন্যই ভাল । “

 

 

          এদেশে রিফাত যখন প্রথম পড়তে আসে তখনি অহনার সাথে পরিচয় । রিফাত কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি অহনা এরকম কিছু করতে পারে । তার সমস্ত দুনিয়া যেন প্রচণ্ড ঝড়ে ওলটপালট হয়ে গিয়েছে । জীবনের প্রতি সমস্ত আগ্রহই তার চলে গিয়েছে ।

 

          নিজের জীবনের এলোমেলো দিকগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে রিফাত সারাদিন কাতিয়ে দিল । বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পথে , তখন সে হেঁটে হেঁটে শহরের একদম শেষপ্রান্তের রেলস্টেশনে এল ।

 

          প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্ছিতে বসলো রিফাত ।  কাজ শেষ করে মানুষজন ঘরে ফিরে আসছে । চোখে-মুখে পরিত্রিপ্তির পূর্ণ আভাস । স্টেশনটা ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। লোক চলাচল একদম কমে আসে । এমন সময় রিফাতের কাছে এক ভিখিরি এসে হাত পাতে । এদেশের ভিখিরিরাও অবশ্য কোট-প্যান্ট পরে । রিফাত কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে ভিখিরিটার দিকে চেয়ে রইল ।  তারপর পকেট থেকে নিজের মানিব্যাগটা বের করে লোকটার হাতে তুলে দিল । ভিখিরিটার ঘোর কাটার আগেই  রিফাত বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়ল ।

 

           ধীর পায়ে হেঁটে এসে সে রেল লাইনে নামল । তার বেঁচে থাকা ব্যাপারটা কেমন যেন অর্থহীন মনে হতে লাগল । রেল লাইন ধরে সে হাঁটতে শুরু করলো পরের ট্রেনের অপেক্ষায়  । হাঁটতে হাঁটতে সে একটা টানেলের মধ্যে ধুকে গেল ।

 

            ঐ তো ট্রেনের ক্ষীণ হুইসেল শোনা যাচ্ছে । অনেকদুরে আছে এখনো , কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে । এরপরেই তার দীর্ঘ , ভারি জীবনটাকে আর বইতে হবে না । অসহ্য অনুভূতিগুলোকে সইতে হবে না ,না পাওয়ার কষ্টে আর পুড়তে হবে না ।

 

 

           হটাৎ তার মুঠোফোনটা বেজে উঠলো । জীবনের শেষবেলায় এসে আর কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করল না রিফাতের । তারপরও কি ভেবে যেন পকেট থেকে মুঠোফোনটা বের করল সে । স্ক্রিনে ভাসছে---Maa is calling…………….

 

              রিফাতের মা বাংলাদেশের এক গ্রামে থাকেন । প্রতিদিনই ছেলের খোঁজ নিতে এ সময় ফোন করেন। রিফাতের মাথার ভিতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল । বুকের ভিতর কোথা থেকে এসে একটা পাথর আঘাত করল । তার মায়ের গায়ের সেই অতি পরিচিত গন্ধটা যেন তার নাকে ভেসে এল । মায়ের হাতে ভাত খাওয়া , মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমানো ---------সব কিছু তাকে কোথায় যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল । সে বুঝতে পারল তার তো এমন অনেকেই আছে যারা শত বিপদেও তাকে ছেড়ে যাবে না । তারা শুধু দিতেই জানে , কিছু পাওয়ার সামান্য বাসনাও তাদের নেই । তার মৃত্যুতে তাদের কি অবস্থা হবে ভাবতেই তার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এল ।

 

          ততোক্ষণে ট্রেন ব্রিজের উপর চলে এসেছে ।  বাঁচার একটাই উপায় , যেকোনোভাবেই হোক তাকে টানেলের অপর প্রান্তে পৌঁছাতে হবে ।

 

 

          রিফাত ছুটতে শুরু করল । সে দৌড়াতে শুরু করল তার টানেলের খোলা প্রান্তের দিকে । তাকে সেখানে পৌঁছাতেই হবে ।তার জন্য যে অপেক্ষায় আছে ভালবাসার বিশাল এক পৃথিবী ....................................।।

 

 

 

Share