প্ল্যানচেট

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 909 বার দেখা হয়েছে

“মামা , কই তুমি ?’’ –সাত সকালে শুভর কণ্ঠ শুনে মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল । সারারাত মুভি দেখে ভোরের দিকে ঘুমাতে গিয়েছি । আর এই ফাজিল কিনা ৭টার সময় কল দেয় । আবার জিজ্ঞাসা করে আমি কোথায় ।

       “আমি দোস্ত রাস্তায় । ঝাড়ু দিতে বের হইসি । নতুন চাকরি , আজকেই জইনিং । ’’ – দাঁত মুখ খিঁচে জবাব দিলাম আমি ।

      “মামা , চ্যাতো ক্যান ? তোমারে একটা জবর খবর দিব বইলাই তো কল দিলাম ।’’ 

          “কি খবর? ’’ – অনেক কষ্টে রাগ চেপে জিজ্ঞাসা করলাম ।

         ‘‘ওইটা তো জানি না । আমারে রাহাত ফোন দিয়া কইলো , জবর একটা খবর আছে । ক্যাম্পাসে যাইতে কইসছে। সারপ্রাইজ দিবে বলে ।  ’’

    ‘‘শালা এইটা বলার জন্য তুই আমার ঘুম ভাঙ্গাইসোস ? ’’ –- ফোনটা সুইচ অফ করে আবার ঘুম দিলাম ।

 

 

         এগারোটায় ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি শুভ , নাহিদ , জয় –সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছে । শুভ , নাহিদ , জয় আর আমি ---এইটা হল আমার গ্রুপ । ক্লাসরুম ছাড়া ক্যাম্পাসের আর সব জায়গায় আমাদের সরব উপস্থিতি । সব সময়ই কোন না কোন কিছু নিয়ে আমরা মেতে থাকি । দূর থেকে দেখলাম নাহিদ কি যেন একটা বোঝাচ্ছে , আর বাকি দুইজন উত্তেজিত ভঙ্গিতে শুনছে । আমি গিয়ে যোগ দিলাম ।

        “দোস্ত সিরাম মজা হবে । তোরা সবাই চল । মাছ ধরব , বন-মুরগি শিকার করব, রাতে বারবিকিউ পার্টি হবে । খেজুরের রস তো আছেই । ” ---একটানা বলে গেল নাহিদ , আমাদের মধ্যে একমাত্র যার মানিব্যাগই সবসময় ভরা থাকে ।

         “আমরা সবাই যামু ।  কি মামা ? তুমি জাইবা তো ? ” –আমাকে জিজ্ঞাসা করলো শুভ ।

         “তোদের সাথে যখন আছি , তখন মরার আগ পর্যন্ত তো মুক্তি নাই । মরলে না হয় আমি বেহেস্তে যামু আর তরা যাবি নরকে । কিন্তু কথা হইতেসে যাওয়াটা হইতেসে কোথায়? ’’

         “ নাহিদদের গ্রামের বাড়ি , শহর থেকে অনেক দূরে । ’’ --- বলল আমাদের মধ্যে সবসময় যে চুপচাপ থাকে সেই জয় ।

         “কখন রওনা দিবি ? ”

         “আজকে রাতে । ” ---বলল নাহিদ ।

         “শালা , আজকে রাতে রওনা দিবি আর তোরা আমারে এখন জানাইতেসস ?”

         “মামা , এইটা কোন প্রবলেমই না । সবকিছুই রেডি । তুই খালি রাইতের ১০ টা নাগাদ নাহিদের বাসায় চইলা আসিস । নাহিদের গাড়িতে যামু আমরা । ভোরের দিকে পৌছামু যদি রাস্তায় জ্যাম না থাকে ।”  --- কাঁধে বিশাল একটা চাপড় মেরে বলল শুভ ।

          “তাইলে আমরা আজকে ১০ টায় মিট করতেছি ।” ---নাহিদ উল্লসিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো ।

          “ইয়াপ” ---সবাই একযোগে উত্তর দিলাম ।

 

           বাসায় গিয়ে দ্রুত ব্যাগ গুছালাম । মাকে অনেক কষ্টে রাজি করালাম । ফিরে এসে নিয়মিত ক্লাস করবো এই প্রতিজ্ঞা করার পরে অনুমতি মিলল ।

 

            ঠিক রাত ৯ টার সময় নাহিদের বাসায় পৌঁছালাম । নাহিদদের বাসাটা বিশাল বড় । আমি অনেকবার এসেছি । ভালই লাগে আমার । সবাইকে যদিও বলা হয়েছিল টাইমলি আসতে কিন্তু সাড়ে দশটার আগে কেউ আসল না ।

 

            সবাই এসে পড়লে আমরা রওনা দিলাম  নাহিদদের ভক্সিতে করে । সাথে ড্রাইভার ছিল , তাই চারজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দিতে কোন বাঁধাই আর রইল না । শহর ছেড়ে বাইরে চলে আসার পর চারপাশের অদ্ভুত এক অপরিচিত নৈশব্দ বিরাজ করতে থাকে । সেই নৈশব্দ কেন জানি আমাদের আড্ডার শব্দ হতেও অনেক বেশি তীব্র হয়ে আমাদের কানে বাজে ।

 

            খুব ভোরে এসে আমরা পৌঁছাই নাহিদদের গ্রামে । নাহিদদের গ্রামের এই বিশাল বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না । নাহিদের দুর-সম্পর্কের এক চাচা , জলিল শেখ বাড়িটার দেখাশোনা করেন । উনি দেখলাম আমরা আসাতে বেশ খুশিই হয়েছেন । সবকিছুর আয়োজনই করে রেখেছেন । সারারাত জার্নি করে আমরা সবাই খুব ক্লান্ত । ঘুমের দেশে হারাতে সময় লাগলো না ।

 

               ঘুম থেকে যখন উঠলাম ,তখন বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গিয়েছে । আজকে যখন আর মাছ ধরা হল না , তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আজকে রাতেই হবে বারবিকিউ পার্টি । বিকাল থেকেই প্রস্তুতি নিলাম । কিন্তু বিধি বাম । সন্ধ্যা থেকেই শীতের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরতে লাগলো । ভেস্তে গেলো বারবিকিউ পার্টি ।

 

               গ্রামের লোকজন খুব সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ে । জলিল চাচাও দেখলাম তার ব্যতিক্রম নয় । ৯ টার মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া শেষ । এরপর সময় যেন আর কাটতেই চায় না । কিছুক্ষণ 29 খেললাম । কিন্তু সে আর নতুন কি?                    

               হঠাৎ শুভ বলে উঠলো –“মামা একটা কাম করলে হয় না ?”

               “কি কাজ ?” – জিজ্ঞাসা করলো নাহিদ ।

               “মামা , আসো প্ল্যানচেট করি । আমাগো জয় তো হেভভি একটা মিডিয়াম ।”

 

               একটা কথা বলা হয়নি । আমাদের মধ্যে শুভ খুব ভাল একজন মিডিয়াম , অন্তত তার মতে । যদিও প্ল্যানচেট ব্যাপারটার উপর আমার তেমন একটা আস্থা নেই , কিন্তু ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে বেশ ইন্টারেস্টিং ।

                যেই বলা সেই কাজ । বিশাল হলঘরের মাঝে একটা গোলটেবিল এনে তার চারপাশে গোল করে বসলাম আমরা চারজন । আমার দুইপাশে জয় , যার মধ্য দিয়ে আত্মা নামবে ; আর অপর পাশে নাহিদ , যে আত্মাকে প্রশ্ন করবে । নাহিদ আর জয়ের মাঝখানে শুভ । ঘরের সব বাতি নিভিয়ে টেবিলের মাঝখানে একটা মোমবাতি রাখা হয়েছে ।

                প্ল্যানচেটের নিয়ম খুব সোজা । সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভুত করে কোন আত্মাকে ডাকা । কিন্তু প্রশ্ন হল আমরা কার আত্মাকে নামাবো । আমরা সবাই একেকজনের নাম বলতে লাগলাম । কিন্তু কোন নামই সবার পছন্দ হল না ।

               “আচ্ছা , আমরা একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মা নামাই না কেন? ” – হঠাৎ করে বলে উঠলো জয় ।

               তার আকস্মিক প্রস্তাব আমাদের কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ করে দিলো । সবসময়কার মতো সেই নীরবতা ভাঙল শুভ । “চল মামা , শুরু করা যাক ।”

               আমরা কাজ শুরু করে দিলাম । প্রায় আধঘণ্টার মতো চুপচাপ একমনে বসে থাকার পর হঠাৎ মনে হল টেবিলটা যেন কেঁপে উঠেছে । আমার ডান হাত দিয়ে জয়ের বাম হাতটা ধরা ছিল । এই শীতের রাতে হঠাৎ করে মনে হল তার শরীর আগুন-গরম হয়ে উঠেছে ।

                 “কেউ কি এসেছেন ?” –প্রশ্ন করলো নাহিদ ।

কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই । তারপর বহুদুর থেকে যেন একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল , যার সাথে জয়ের কণ্ঠস্বরের কোন মিল নেই ।

                 “আমায় কেন ডেকেছো?” – প্রশ্ন করলেন আগন্তুক ।

                 নাহিদঃ আপনি কেমন আছেন ?

                 আগন্তুকঃ ভাল না ।

                 নাহিদঃ কেন?

                 আগন্তুকঃ উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না ।

                 নাহিদঃ আপনার নাম কি?

                 আগন্তুকঃ ফজল হোসেন । যদিও তোমাদের এই অঞ্চলের প্রায় কেউই তা জানতো না , জানেও না ।

                 নাহিদঃ আপনি কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ?

                 আগন্তুকঃ ছিলাম । একাত্তর সালে আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম ।

                 নাহিদঃ কথাটা একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?

                 আগন্তুকঃ যে মানুষটা দিনের পর দিন নিজের চায়ের দোকানে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিল , সে কি যুদ্ধ করে নি ? যে গরিব চাষি আমাদেরকে একরাত আশ্রয় দিয়েছিল , সে কি যুদ্ধ করে নি ? যে বাবা দিন-রাত এক করে নিজের সন্তানকে কাঁধে চাপিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গিয়েছিল , সে কি যুদ্ধ করে নি ? যে গর্ভবতী মা তার সন্তানকে পেটে নিয়ে মাইলের পর মাইল ছুটেছিল একটা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সে কি যুদ্ধ করে নি ? যে মেয়ে তার সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছিল কিন্তু যুদ্ধে যাওয়া ভাইয়ের কথা বলে দেয় নি ঐ জানোয়ারদের সে কি যুদ্ধ করে নি ? যে ছেলেটা বিদেশে বৃত্তি পেয়েও , দেশের এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে যায় নি সে কি যুদ্ধ করে নি ?

                 এই বলে আগন্তুক খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থাকলেন , সেই সাথে আমরাও । এরপর আবার শুরু করলেন ---সেই সময়টা এদেশের প্রতিটা মানুষকেই মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দিয়েছিল ।

                  নাহিদঃ আপনি কি এই অঞ্চলের মানুষ ছিলেন ?

                  আগন্তুকঃ না, যুদ্ধের সময় আমার ডিউটি পড়ে এই জায়গায় । পাকিস্তানিদের বিশাল একটা ক্যাম্প ছিল এই গ্রামে । আমি এবং আমার কয়েকজন সহযোদ্ধা মিলে নানাভাবে , নানাবেশে তাদের উপর নজর রাখতাম ।  তারপর , একদিন রাজাকারদের কম্যান্ডার নজু বিল্লার কাছে ধরা পড়ি । গাঙ্গের পাড়ে দাঁড় করিয়ে ফায়ার করে । শুনেছি নজু বিল্লাহ এখন এই এলাকার এমপি ।

                  নাহিদঃ আপনার কি মনে হয় আপনাদের যুদ্ধটা সফল হয়েছে ?

                  আগন্তুকঃ যুদ্ধ সফল হবে কি করে ? যুদ্ধ তো এখনো চলছে । এই যুদ্ধ সফল করার দায়িত্ব তোমাদের সবার ।

                  নাহিদঃ আপনার কি মনে হয় , আমরা এই যুদ্ধে জিততে পারবো ? আমাদের দেশ কি সফল দেশ হতে পারবে ?

               “  Give me a glass of water “ – এটা তো জয়ের গলা । অর্থাৎ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ফজল হোসেনের আত্মা চলে গিয়েছেন । শেষ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনিও আমাদের মতো দিশেহারা হয়ে গেলেন কিনা তা আর জানা হল  না ।

 

 

                পরদিন সকালে জলিল চাচার সাথে গ্রাম ঘুরে দেখতে বের হলাম আমরা সবাই । গাঙের কাছাকাছি এসে একটা উঁচু ঢিবি দেখতে পেয়ে জয় জানতে চায়লো ওটা কি ।

                 জলিল চাচা বললেন –“একাত্তর সালে যখন যুদ্ধ আরম্ভ তখন এই অঞ্চলে একটা পাগল এসে হাজির হয় । ফইজা পাগল । সারাদিন আর্মি ক্যাম্পের কাছে গিয়ে বসে থাকতো , কখনো সখনো ভিতরেও ঢুকে যেত । পাগল মানুষ তাই কেউ কিছু বলত না । একদিন শালা রাজাকারদের মাথায় কি ভূত চাপলো কে জানে । মিলিটারিদের বলে গাঙের কাছে ব্রাশ ফ্রায়ার করে দিলো । পরে গ্রামের মানুষজন লাশটা এনে এখানে কবর দেয় । আশ্চর্য ব্যাপার এতগুলো বছরেও কবরটার কিছুই হয় নাই ।”

 

                আমরা চারজন একে অপরের দিকে তাকাই ।

 

               এটা বোধহয় শুধুমাত্র এদেশেই সম্ভব । যখন একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ফজল হোসেন হারিয়ে যান ‘ফইজা পাগল’ হয়ে , তখন সংসদে বসে ভাষণ দেয় নজু বিল্লারা ।

 

 

 

Share