আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

লিখেছেন - দুর্জয় বৈদ্য | লেখাটি 489 বার দেখা হয়েছে

(১)২০ ফেব্রুয়ারি , সকাল ৯ টা । ঠক । ঠক । ঠক । কে যেন খুব বিচ্ছিরিভাবে দরজার কড়া নাড়ছে । ধরমরিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসলো রাফা । সারারাত সে দু’চোখের পাতা একবারের জন্যও এক করতে পারে নি । শেষে যখন ভোরবেলা মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছিল , তখন সে তন্দ্রামগ্ন হয়ে পড়ে । 

 

হঠাৎ ঘুম ভাঙার কারণে রাফা মনে করতে পারলো না সে এইরকম ময়লা , আলো-বাতাসের অপ্রতুলতা যুক্ত , দুর্গন্ধময় পরিবেশের একটা চার দেয়ালের কুঠুরিতে কি করছে । তার মাথার নিচে তেল চিটচিটে বালিশ আর গায়ে চায়ের দাগযুক্ত হলদে সাদা রঙের চাদর থাকার কারণটাও তার মনে এলো না । খানিকবাদে তার মনে পড়ল , সে গত ২ দিন ধরে লুকিয়ে আছে হুসাইন বোর্ডিঙের রুম নাম্বার ২০৭ এ, তার এই অবস্থান সম্পূর্ণ গোপনীয় । আর প্রায় সাথে সাথেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো ফাহিমের রক্তাক্ত নিথর শরীর আর তার হাতে ধরে থাকা কিরিচটা যেখানে লেগে আছে তার বন্ধু ফাহিমের রক্ত ............ অসহ্য একটা যন্ত্রণায় তার নিজেকে কেমন যেন খাঁচার ভিতর আঁটকে পড়া নখ-দন্তহীন সিংহ মনে হল ,যার শুধু ক্ষমতাই কেড়ে নেওয়া হয় নি , বরং একই সাথে কেটে নেওয়া হয়েছে তার গর্বের কেশর ।

 

ওইদিকে তখনো দরজার কড়ানাড়া চলছে । বিছানা থেকে উঠে সন্তর্পণে দরজার কি-হোলে চোখ রাখল রাফা । তারপর জিজ্ঞাসা করলো , “কে? ” ওপাশ থেকে জবাব এলো –“মামা,আমি নাছিম । সকালের নাশতা আনসি ।”রাফা এই বোর্ডিঙে এসে আত্মগোপন করার পর আর একবারও রুম ছেড়ে বের হয় নি । বোর্ডিঙের এক কর্মচারী তার তিনবেলার খাবার আর পত্রিকা এনে দেয় । সে যে খুব নিয়মিত পত্রিকা পড়ে তা নয় , কিন্তু গত ২ দিন ধরে পড়ছে । কোথায় না আবার তার ছবি ছাপা হয়ে যায় । এম্নিতে ফেসবুক তার বারোটা বাজিয়ে চলেছে ।দরজা খুলে নাশতা আর পত্রিকাটা নিল রাফা । পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা দিলো নাছিমকে । যে টাকা নিয়ে পালিয়ে এসেছিলো তা প্রায় শেষের পথে । খুব বেশি হলে আর ২-৩ দিন চলতে পারবে । তারপর যে কি হবে !! কে জানে?? এখন রাফার একমাত্র আশা রফিক ভাই । তার ভরসাতেই রাফা এখানে আত্মগোপন করে আছে । তিনিই সংবাদ মাধ্যমে ব্যপারটা এখনো আসতে দেন নি । 

 

 

(২) আসলে ফাহিমকে খুন করার কোন ইচ্ছাই রাফার ছিল না । ফাহিম ছিল তার স্কুল জীবনের বন্ধু । কলেজে দুজন আলাদা হয়ে গেলেও তাদের মধ্যে সবসময় যোগাযোগ ছিল । বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবার তারা একই প্রতিষ্ঠানের একই বিভাগে ভর্তি হয় । ফাহিমই রাফাকে সর্বপ্রথম মিছিলে নিয়ে গিয়েছিলো , পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো পলিটিকাল বড় ভাইদের সাথে । প্রথমে এসব থেকে দূরে থাকতে চাইলেও রাফা নিজেকে ছাত্ররাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলে । ক্যাম্পাসে যখন-তখন যা ইচ্ছে তাই করার স্বাধীনতাটা রাফাকে খুব বেশি আকৃষ্ট করে । ধীরে ধীরে সে ক্যাম্পাসের মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম হয়ে পড়ে ।এভাবে ১ম বর্ষের মেধাবী ছাত্র রাফা , ৩য় বর্ষে এসে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ক্যাডারে পরিণত হয় । অনেকেই এই পরিবর্তনে অবাক হয় , কিন্তু এই ক্যম্পাসের পথগুলো অবাক হয় না ; তারা যে এই ধরনের পরিবর্তনে অভ্যস্ত ।

 

 

(৩) ফাহিম যদিও রাফাকে রাজনীতির পথঘাটগুলো চিনিয়ে দিয়েছিল , তবুও এই পথের রেসে রাফা ফাহিমকে খুব দ্রুতই পিছনে ফেলে দেয় । ধীরে ধীরে দুইজনের পথ ভিন্ন হয়ে যায়, পৃথক হয়ে যায় লবিং । একসময় তারা একজন আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়ে ।

 

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসে বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় । আনফিসিয়ালি ছাত্রদের কাছ থেকে প্রচুর চাঁদা তোলে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক সংগঠন । এ বছর এই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় রাফার উপর এবং সে খুবই যত্নের সাথে তা পালন করা শুরু করে । কিন্তু গোলযোগ বাধায় ফাহিম এবং তার অনুসারী কয়েকজন । তারা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায় । তাই ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে রাফা তার আরো কয়েকজন অনুসারী নিয়ে যায় ফাহিমের রুমে । 

 

রাফার ফাহিমকে মেরে ফেলার কোন ইচ্ছাই ছিল না । কিন্তু গোঁয়ার ফাহিম তার মেজাজ খারাপ করে দেয় । রাফা পরিবেশ পরিস্থিতি ভুলে গিয়ে কিরিচ দিয়ে কোপ মেরে বসে ফাহিমের মাথায় । ফাহিম মাটিতে পড়ে যায় । কিন্তু রাফা থামে না , একের পর এক কোপ মেরেই যায় । হঠাৎ তার চেতনা ফিরে আসে । সে বুঝতে পারে সে ফাহিমকে খুন করে ফেলেছে । সে তার অনুসারীদের নিয়ে দ্রুতই সেখান থেকে পালিয়ে রফিক ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে । রফিক ভাই রাফা যে রাজনৈতিক সংগঠনের ক্যাডার তার ক্যাম্পাস প্রধান । তিনি রাফাকে হুসাইন বোর্ডিঙের ঠিকানা দিয়ে সেখানে কয়েকদিন আত্মগোপন করতে বলেন । তিনি এই আশ্বাসও দেন যে তিনি সব সামলে নিবেন । 

 

 

সেই ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে আজ ২০ ফেরুয়ারি পর্যন্ত রাফা এই বোর্ডিঙের একটা অন্ধকার রুমে লুকিয়ে আছে ।

 

(৪) ২০ ফেব্রুয়ারি , ঘড়িতে রাত আটটা বাজার ঘণ্টা পড়ল । 

 

রফিক বসে আছে এলাকার গডফাদার কায়েস ভাই এর বাসায় । সে খুবই দুশ্চিন্তিত । ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত । সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে নেমে এসেছে । ক্যাম্পাসে এখন রাজনৈতিক কর্মীরা কোণঠাসা । কিভাবে কারো কোন নেতৃত্ব ছাড়া এইসব ছেলেমেয়েরা এতটা সংঘবদ্ধ হল ব্যাপারটা কোনোভাবেই মাথায় ঢুকছে না রফিকের । তার সুদীর্ঘ ছাত্রজীবনে কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন সে হয় নি । এইসবের কারণে আজ তার তলব পড়েছে কায়েস ভাই এর বাসায় ।

 

কায়েস ভাই ঘরে এসে ঢুকলেন । রফিক উঠে দাঁড়ালো । 

 

“রফিক , সরাসরি কাজের কথায় চলে যাই । তোমার কি মনে হয় না , তুমি রাফাকে একটু বেশিই লাই দিয়ে দিচ্ছো ? ’’ “ভাই আমি তো কিছুই করি নাই । ” “সেটাই তো সমস্যা । তুমি কিছুই কর নাই । যা করসো তাও ভুল করসো । তুমি রাফাকে লুকিয়ে রেখে বড় একটা ভুল করে ফেলসো । ”“ভাই , রাফা আমাদের সংগঠনের জন্য অনেক কিছু করসে । অরে ছাড়া আজকে আমাদের আজকের অবস্থান সম্ভব হইত না । ” “ওর পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল তার সবই সে করে ফেলেছে । এখন অন্যদের করার সুযোগ দাও ।”“ভাই, আপনি এইটা কি বলতেসেন ?”“কি বলতেসি তুমি ভাল করেই বুঝতাসো । আর যদি না বুঝ তাইলে বল তোমার জায়গায় অন্য কাউরে সুযোগ দেই ।”“না ভাই , ঠিকাসে । আমি দেখতেসি , কি করা যায় । ”

 

 

কায়েস ভাইয়ের বাসা থেকে বের হয়ে রফিক আজাদকে ফোন দিলেন । আজাদের অবস্থান সংগঠনে রাফার ঠিক নীচে । সে রাফার বন্ধু এবং তার মতোই ভয়ংকর ও কার্যকর । 

 

 

(৫) ২০ ফেব্রুয়ারি , রাত ১১-৩০ ।কিছুক্ষণ আগে রাতের খাবার শেষ করেছে রাফা । আজকে গভীর রাতে সে এখান থেকে পালাবে । রফিক ভাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন । তিনি নিজে আসবেন অথবা বিশ্বাসভাজন কাউকে পাঠাবেন । দরজায় টানা তিনটা টোকা পড়লেই সে দরজা খুলে দিবে । নক ! নক ! নক !রাফা দরজা খুলে দিলো । আজাদকে দেখে রাফার মন খুশিতে ভোরে উঠলো । সে তাকে জড়িয়ে ধরল । আজাদ রাফাকে বলল , তারা ঠিক ৩ টায় এখান থেকে বের হবে ; রফিক ভাইয়ের নির্দেশ ।

 

 

(৬) 

 

২১ ফেব্রুয়ারি , রাত ৪-২৫ ।

আকাশ সূর্যকে জায়গা করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ।আজাদ আর রাফা হাঁটছে । তারা হাঁটছে রাফার নতুন আত্মগোপনের জায়গার দিকে । বিভিন্ন অলিগলির মাঝ দিয়ে চলছে তারা । হঠাৎ একটা জংলা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালো আজাদ । রাফার দিকে মুখ ঘুরালো সে । “দোস্ত , আমাকে মাফ করে দিস । আমার আর কিছুই করার ছিল না । ” – কুণ্ঠা জড়ানো কণ্ঠে বলল আজাদ ।“মানে ? ”—অবাক হল রাফা ।“রফিক ভাই আমাকে কথা দিয়েছেন আমাকে উনি তোর পোস্টটা দিবেন । ”

 

রাফা বুঝতে পারলো কি হতে চলেছে । সে একবার ভাবলো পালাবে । কিন্তু পালিয়ে সে কোথায় যাবে ? সে দেখতে পেল আজাদের হাতে একটা রিভলবার চলে এসেছে ।পরপর তিনটা গুলি চালালো আজাদ । ২টা রাফার বুকে আর ১টা মাথায় ।রাফা মাটিতে পড়ে গেল। তখনো সূর্যের আলো ভালো করে ফুটে নি । ফুটলে আজাদ দেখতে পেতো রাফার লাল রক্ত আর ঘাসের সবুজ মিলে কুৎসিত একটা রঙ সৃষ্টি করেছে । 

 

 

(৭)২১ ফেব্রুয়ারি , ভোর ৫-১৫ ।

মানুষ খালি পায়ে দলে দলে যোগ দিচ্ছে প্রভাতফেরীতে । সবার মুখে সেই চিরচেনা গান –“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি ,আমি কি ভুলিতে পারি ?”

 

 

Share