কাসেম একজন পুরুষ মানুষ

লিখেছেন - এজি মাহমুদ | লেখাটি 636 বার দেখা হয়েছে

ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন।

দুপুরবেলা শহরতলির মোড়ের বাসস্ট্যান্ডে এসে থামলো পুরানো লক্কর-ঝক্কর মার্কা একটি বাস। বাসের অবস্থা যা তাতে সেটাকে বাস না বলে মুড়ির টিন বলাই ভালো। জরাজীর্ণ বাসের মরিচা ধরে যাওয়া ফুটোগুলো দিয়ে তাই বৃষ্টির ছোটখাট ফোটাগুলো ভেতরে ঢুকে পরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বাসের ভেতরে এতক্ষণ বৃষ্টির ফোটাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে বেশ চালিয়ে নিয়েছিলো কাসেম। কিন্তু এখন এই শহরতলীর মোড়েই নামতে হবে তাকে। না হলে বৃষ্টির মাঝে এই বাস তাকে কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে!

 

 

 

বাস থামতেই এলাকার ভেতরের গলির দিকে দৌড় দিল কাসেম। যদি কোথাও কোনো একটা আশ্রয় পাওয়া যায়। কিন্তু কোথায় কী! ঝুমবৃষ্টির মাঝে কেউ একটা চায়ের দোকানও খোলা রাখেনি। ছাতি মাথায় যে কেউ একটু বাইরে হাটাহাটি করছে তা-ও নয়।

 

চারপাশ সুনশান। শুধু বৃষ্টির একটানা শব্দ আর মাঝে মাঝে দূরে কোথাও বৃষ্টির আনন্দে ডেকে ওঠা ব্যাঙের ডাক-ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ! ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ!

 

দৌড়ে অনেকটা পথ চলে এসেছে কাসেম। কিন্তু বৃষ্টির সাথে খুব বেশি সুবিধা করা যাচ্ছে না। বাসায় পৌছাবার আগেই বৃষ্টি তাকে পুরোপুরি ভিজিয়ে ফেলবে-বুঝতে পারছিলো কাসেম। তাই আর উপায়ন্তর না পেয়ে শেষপর্যন্ত মর্জিনাদের বাড়ির জানালার কার্নিশের নিচেই দাঁড়িয়ে পড়লো সে। বৃষ্টির ঝাঁঝ একটু কমে এলেই নিজেকে আবার খানিকটা এগিয়ে নেওয়া যাবে, মনে মনে সেটা ভেবে নিলো কাসেম।

 

কার্নিশের নিচেই পর্দাঘেরা বন্ধ কাচের জানালা। কাসেমের জন্য সেটা ভালোই হয়েছে। পর্দা না থাকলে এখানে দাঁড়াতে ভীষণ অস্বস্তি লাগতো তার। এদিকে বৃষ্টিটাও আজ কেন যে কমছে না আর!

 

হঠাৎ পেছনে জানালা খোলার শব্দে চমকে পেছনে ফিরে তাকায় কাসেম। জানালার ওপাশে মর্জিনাকে দেখেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। মর্জিনাকে দেখে এমনটা আগেও হয়েছে তার। ভালোবাসার মানুষ নাকি এমনি করেই হৃদয়ে অনুভূতির জন্ম দিয়ে যায়।

 

মর্জিনা হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করে, ‘আরে কাসেম ভাই আপনি?’

 

এমনিতেই কাসেম মর্জিনার প্রতি খানিকটা দুর্বল । তারপর আবার এই ঝুম বৃষ্টিতে মর্জিনার রহস্যময় মায়া মায়া হাসি যেন খানিকটা এলোমেলো করে দেয় কাসেমকে। কী বলবে চট করে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

 

রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে নিজেকে সামলে নেয় কাসেম। তারপর ইতঃস্তত গলায় বললো, ‘আর বলো না, কি যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে! একদম ভিজে গেছি।’

 

কথাটা বলেই কাসেমের মনে হলো, মর্জিনা এখনই তাকে ভেতরে এসে বসতে বলবে। হাতে ধরিয়ে দেবেÑ একটা পরিস্কার সাদা তোয়ালে আর এক কাপ গরম চা!

 

কল্পনার ঢেউ তাকে আরও অনেকদূর নিয়ে যাচ্ছিল। মর্জিনা এ সময় কাসেমের দিকে এক ভাবনায় তাকিয়ে থেকে বললো, ‘বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছেন বলে আপনি এখানে দাড়িয়ে আছেন! বৃষ্টিকে ভয় পান? আপনি না পুরুষ মানুষ? পুরুষ মানুষ কখনো কী বৃষ্টিকে ভয় পায়?’

 

মর্জিনার কথা শুনে কাসেমের মুখ লাল হয়ে যেতে শুরু করলো। মর্জিনা তার পৌরুষে আঘাত করেছে। ভালোলাগার-ভালোবাসার মেয়েটি তার পৌরুষ নিয়ে প্রশ্ন তুলবেÑ নাহ, এই ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

 

লজ্জায় কাসেম আর কথা বাড়ায় না। আস্তে আস্তে সেই ঘোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ির পথে হাটতে শুরু করলো। কাসেম খানিকদূর সামনে যেতেই পেছন থেকে মর্জিনার হাসির আওয়াজ শুনতে পায়।

 

এই হাসির জন্য মর্জিনা যদি তাকে শিলা বৃষ্টির মাঝেও হেঁটে যেতে বলে তাতেও সে কখনো পিছপা হবে না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কাসেম। কিন্তু সেই শিলাবৃষ্টির দিন কবে আসবে?

 

 

প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কাসেম। বাইরে আজও প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির একটানা রিমঝিম শব্দে কাসেম ক্রমশ যেন কেমন এক ঘোরের মাঝে চলে যাচ্ছিল। জ্বরের দুর্বল শরীর তাকে সেই ঘোরের মাঝে আরও টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

 

কাসেম হঠাৎ সেই ঘোর কাটিয়ে চোখ মেলতেই দেখতে পায় মর্জিনা তার সামনে দাঁড়িয়ে। কাসেম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে ফেলে, ‘মর্জিনা তুমি?’

 

মর্জিনা তাচ্ছিল্যের নিঃশব্দ হাসিতে একাকার হয়ে গিয়ে বলল, ‘কাসেম ভাই, বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে আর আপনি ঘরের ভেতরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন? আপনি না পুরুষ মানুষ?’

 

প্রবল লজ্জায় কাসেম একেবারে গুটিসুটি হয়ে যায়। মর্জিনাকে কী  বলবেÑ সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে তার জ্বর এসে গেছে? কিন্তু এ কথা বললে মর্জিনা যদি তাকে নিয়ে আবার হাসাহাসি করে!

 

 

প্রবল বর্ষণের মাঝে কাসেম এখন কাঁথা মুড়ি দিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির ফোটাগুলো তুমুল বাতাসে ভেসে এলোমেলো ভাবে ভিজিয়ে যাচ্ছে তাকে। কিন্তু মর্জিনার হাসির শব্দ কেন শোনা যাচ্ছে না এখনও? হিমশীতল সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মর্জিনার দিকে ফিরে তাকায় কাসেম। প্রবল বিস্ময়ে মর্জিনার চোখে জল দেখতে পায় সে। তবে কী সত্যিই মর্জিনা তাকে ভালোবাসে? দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে কাসেম। প্রবল বর্ষণের এমনও নিঝুম সন্ধ্যায় অশ্র“ আর বৃষ্টিকে কখনও আলাদা করে চেনা যায় না।

Share