দ্য রেড ট্রাভেল ব্যাগ !

লিখেছেন - এজি মাহমুদ | লেখাটি 836 বার দেখা হয়েছে

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্যি একটি ব্যাগ, হ্যাঁ একটি ব্যাগ আমাকে তাড়া করে ফেরে। টকটকে লাল রঙের একটি ট্রাভেল ব্যাগ। সাথে কালো স্ট্রাইপের ফিতা। ব্যাগটার দু’পাশে আবার দুটো সাইড চেইনও রয়েছে। ব্যাগটার নিচে কোনো প্রকার হুইলও নেই। ব্যাগটার তাড়া করার কোনো যোগ্যতা না থাকা স্বত্ত্বেও সেটি আমাকে তাড়া করে।

 

 

ব্যাগটি কি সত্যিই আমাকে তাড়া করে? বিষয়টি বোধহয় খানিকটা ভুল হয়ে যাচ্ছে। আসলে ব্যাগটা আমাকে অনুসরণ করে। আমি ব্যাগটাকে নিয়ে এক অজানা আতঙ্কে ভুগছি বলেই হয়তো মনে হচ্ছে, ব্যাগটা বুঝি আমাকে তাড়া করছে। আমি যখন আজ আফসানার বাসায় যাচ্ছি তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর হিমেল বাতাসের ঝাপটা এসে মুখে লাগছে। আফসানাদের বাসায় ঢোকার মুখে যে লনের বাগানটা পড়ে তার একটা ঝোপের পাশে ব্যাগটাকে আজ আবারও দেখলাম। আমি ব্যাগটার দিকে তাকাতেই মনে হলো, ব্যাগটা বুঝি আমার দিকে খানিকটা এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আমি কেমন একটা শিহরণ নিয়ে বাগান পেরিয়ে আফসানাদের বাসার দরজায় নক করলাম। দরজা খুললেন আফসানার আম্মা। উনি আমাকে দেখেই চমকে উঠে বললেন, কী ব্যপার বাবা? তোমাকে অমন লাগছে কেন? আমি পকেট থেকে আফসানার ডিজাইন করে দেওয়া রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে বললাম, ‘না আম্মা, কিছু না।’

 

 

আফসানা আমার স্ত্রী। ওর সাথে আমার বিয়েটা হয়েছিল ২২শে আষাঢ়। ইংরেজি তারিখটা মনে নেই। আজ থেকে বছর দুয়েক আগের কথা। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। আফসানা আমার হাত চেপে ধরে বললো, ‘চল বিয়ে করে ফেলি।’ আমি সেদিন অবাক হয়ে আফসানার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। যে মেয়ে আমাকে বলেছিল, আমাকে ওর অসহ্য লাগেÑ তারই মুখে এমন কথা শুনে আমি অবাক না হয়ে পারিনি।

 

 

আফসানা মারা যাওয়ার পর আফসানাদের বাসায় খুব একটা আসা হয় না আমার। এ বাসায় আসলে দেখা যায় আফাসানার মা আমাকে ছাড়তে চায় না। ভদ্রমহিলা এখনও আমাকে তার ছেলের মতোই দেখেন। আফসানার ছোটবোন রোখসানা কেন যেন আমাকে পছন্দ করে না। অথচ আফসানা বেঁচে থাকতে রোখসানা অন্যরকম ছিলো। কেমন যেন বদলে গেছে রোখসানা। আজও ড্রইংরুমে ঢুকে দেখি রোখসানা বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছো রোখসানা? রোখসানা জবাব দিল না।

 

 

আমি রিকশার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার মোড়টাতে। এখান থেকে মেইনরোডে হেঁটে যেতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। বেশ রাতও হয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, সাড়ে এগারোটা। আজও আফসানার আম্মা আমাকে ছাড়তে চাননি। থেকে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি জোরাজুরি করাতে রাতের খাবার খাইয়ে তবে ছেড়েছেন। আমি ওদের বাসায় থাকি না মূলত রোখসানার জন্যেই। সে সারাণ ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘৃণার সঙ্গে বসবাস আমার পে সম্ভব না।

 

 

 

রিকশার টুং টাং আওয়াজ শুনে আমি পাশে তাকাতেই দেখি সেই লাল ব্যাগটা। আমার তখন ভয় না পেয়ে বেশ অবাক লাগলো। একটা ব্যাগ রাস্তার ফুটপাতে পড়ে আছেট অথচ কেউ সেটা সরিয়ে নিচ্ছে না। ব্যপারটা কেমন যেন! রিকশাটা খালি ছিলো না। সেটা আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। রিকশাটা চলে গেলে আমি ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, ব্যাগটার মধ্যে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। আমি দ্রুত পায়ে ব্যাগটাকে পেছনে ফেলে হাঁটা দিলাম। খানিক পর মনে হলো, কিছু একটা আমার পেছন পেছন আসছে। কেমন যেন একটা ঘঁষাটে শব্দ। আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে শান্ত হই। নাহ্! পেছনে কেউ নেই। কিচ্ছু নেই। কিন্তু সামনে তাকাতেই থমকে গেলাম। ব্যাগটা কিভাবে যেন আমার সামনে চলে এসেছে। খেয়ালই করতে পারিনি ব্যাগটা কিভাবে আমার হাত পাঁচেকের দূরত্বে চলে এসেছে। আমার মনে হলো, ব্যাগটা আমাকে তার দিকে টেনে নিচ্ছে। আমি দৃঢ় পায়ে পায়ে সামনে গিয়ে দুহাত দিয়ে ব্যাগটাকে চেপে ধরলাম। কেমন যেন একটা উষ্ণতা। আমি জিপারটা মুক্ত হাতে টেনে খুলে ফেললাম। ভেতরে সাইজ করে কেটে সাজানো আফসানার লাশ! সবার ওপরে আফসানার ধড়টা রাখা আছে। তখনই হঠাৎ করে চোখ মেলে তাকালো আফসানা। ঠোঁট জোড়া নেড়ে আফসানা বলল, ‘অ্যাই কেমন আছো তুমি? আমাকে ছাড়া কি খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?’

 

 

আমি লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠলাম। উফ্! কী ভয়াবহ এক দূঃস্বপ্ন!

 

 

আফসানা আমাকে ঠিক কতটা ভালোবাসতো কিংবা পছন্দ করতো জানি না। তবে আফসানার চাইতেও রোখসানা যে আমাকে বেশি পছন্দ করতো ব্যপারটা জানতাম। রোখসানার ব্যাপারটা প্রথমে আমি বা আফসানা কেউ ধরতে না পারিনি। একসময় আমি বিষয়টি বুঝতে পারলেও আফসানা  পারেনি। আফসানার অজান্তে ব্যপারটিকে প্রশয় দিতে গিয়ে একদিন যা ঘটে গেল তার জন্য আমাকে বা রোখসানাকে দায়ী করা চলে না। কিন্তু আফসানা সেদিন আমাদের ব্যাপারটি ধরে ফেলেছিল। বিষয়টি আমি রোখসানাকে বললে সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। এদিকে আফসানার সাধারণ আচরণও আমার কাছে ক্রমশ বিরক্তিকর, অস্বস্তিকর মনে হতে থাকে।

 

 

এমনি এক নিঝুম সন্ধ্যাবেলায় আমি মুখোমুখি হয়েছিলাম আফসানার।

 

 

আমি: কোথায় ছিলে সারাদিন?

 

 

আফসানা: যেখানেই থাকি, তোমাকে বলতে হবে? তুমি সারাদিন কোথায় যাও সেটা কি তুমি আমাকে বলে যাও?

 

 

আমি: তুমি আমার স্ত্রী! সুতরাং তোমার ভালোমন্দ আমাকে বুঝতে হবে...

 

 

আফসানা: আর সেজন্যই বুঝি রোখসানার কাছে ভালোমন্দ বুঝতে যাওয়া হয়..

 

 

আমি নিশ্চুপ!

 

 

আফসানা: আমি আজকে রাহাতের ফ্যাটে গিয়েছিলাম।

 

 

আমি: মানে কী? কী সব বলছো তুমি?

 

 

আফসানা: মানে খুব সহজ। ওর ফ্যাটে সারাদিন ওকে একটু সময় দিলাম।

 

 

আফসানার কথা শুনে আমার মধ্যে কোথায় যেন চিনচিনে ব্যাথা লাফিয়ে ওঠে। আমি শক্ত করে ডাইনিং টেবিলে রাখা চাকুটা চেপে ধরে ওটা ছুঁড়ে মারি আফসানাকে ল্য করে। কিন্তু ওটা ফসকে গিয়ে আফসানার পেছনের দেয়ালে গিয়ে আঘাত করে।

 

 

আফসানা বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন বিশ্বাস করতে পারছে নাÑ আমিই চাকুটা ওর দিকে ছুঁড়ে মেরেছি! তারপর ঝট করে ওটা তুলে আশ্চর্য রকমের শান্ত কন্ঠে আফসানা আমাকে বলল, তুমি চাও না আমি বেঁচে থাকি, সে কথা আগে বলবে তো! আমার মৃত্যুর দায়ও তোমাকে নিতে হবে না।’

 

 

জবাবে আমি কিছু বলার আগেই চাকুটা বুকের বামপাশে সজোরে গেঁথে দিলো ও! আমি চিৎকার করে ওকে জড়িয়ে ধরলে ও বলল, ‘ছোঁবে না! একদম ছোঁবে না তুমি আমাকে!’ আমি আফসানার কথা শুনে চমকে উঠে ওকে ছেঁড়ে দেই। মারা যাওয়ার আগে আফাসানা বলেছিল, আমি তোমাকে রাহাতের কথা মিথ্যে বলেছিলাম। তুমি আমাকে মাফ করে দিও...

 

 

সেদিন রাস্তায় রোখসানার সাথে দেখা হয়েছিল। সে আমাকে দেখার পর দু’বার রাস্তায় থুতু ফেলে চলে গেল। আমার এখন আর কিছু বলার নেই। শুধু একটি কাজই করছি এখন। কাজটি হলো, লাল ব্যাগটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। সেই ব্যাগটি এখন আর কেন যেন আমার পিছু নিচ্ছে না। অথচ ওই ব্যাগটিকে আমার দরকার। খুঁজে বেড়াচ্ছি আলোতে, আঁধারে!

 

Share