শুধু তোমাকেই

লিখেছেন - আফরিনা হোসেন রিমু | লেখাটি 1540 বার দেখা হয়েছে

 অনেকক্ষণ হল রেস্তোরাঁটাতে বসে আছি ।আমার খুব পছন্দের জায়গা এটা।এমনিতে খুব একটা বেশি মানুষ আসেনা এই রেস্তোরাঁটাতে । দেখা  যায় আমরা কয়েকজনই এখানে প্রায় আসি। এখানকার একেবারে কর্নার এর জানালা লাগোয়া টেবিলটাতে বসি আমি আর অয়ন। খেতে খেতে বাইরের মানুষগুলোর চলাফেরা দেখি,ভাল লাগে অনেক।আসলে অয়ন এর সাথে কাটানো সময়গুলো ভীষণ আনন্দে কাটে আমার ......

 

আজ একঘণ্টা হয়ে গেল এখনো অয়নের আসার নাম নেই।আগে কখনই এতক্ষণ অপেক্ষা করিনি একা একা।সবসময় ওই আগে চলে আসে।আমার জন্য অপেক্ষা করে।একা একা আমাকে অপেক্ষা করাতে ওর নাকি একদমই ভাল লাগেনা।আজকে কি হয়েছে কে জানে!জরুরি তলবে এখানে আসতে বলে দিল...ঠিক মত  শাড়িটাও পরতে পারিনি।তবে ওর গিফট এর কাল পেড়ে লাল শাড়িটা পরে এসেছি।আমাকে নাকি খুব ভাল লাগে এটাতে ...কিন্তু সাহেবেরই তো কোন খবর নেই আজকে।

 

ফোনটাও ধরছেনা... ...ধ্যাত!কি এমন কাজ যে এত তাড়াতাড়ি আসতে বলা আবার নিজেরই লাপাত্তা হয়ে যাওয়া।ভাল লাগছেনা আর অপেক্ষা করতে।আজকে বুঝতে পারলাম একা একা অপেক্ষা করার যন্ত্রণা কি! ভাগ্য ভাল আসলে আমার .......কখনই এই যন্ত্রণা পেতে হয়না। 

 

শেষ পর্যন্ত এলেন তিনি... আমার রাজপুত্র।সাদা সার্ট আর নীল জিন্‌স এ ওকে ভীষণ সুন্দর লাগছে...আমি সবসময় মুগ্ধ হই ওকে দেখে।এখনো অবাক হই মাঝে মাঝে....আমাকে যে কেন পছন্দ করল ছেলেটা!আমি দেখতে যেমন মাঝারি   মানের,রেজাল্ট থেকে শুরু করে সবকিছুই তেমন।তবে আমাকে অয়ন ভীষণ ভালবাসে।কেন যেন প্রকাশ করে কম...এই নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেকবার ছোট বড় ঝগড়া হয়ে গিয়েছে...কতটা ভালবাসে আমাকে কখনই বলতে চায়না। আমাকেই সবসময় আদায় করে নিতে হয়।

অয়ন এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকছে।ওকে অনেক খুশি খুশি লাগছে। পুরো চেহারাটা হাসিতে ভরে আছে,নাচতে নাচতে আমার কাছে আসল যেন .........

 

কাছাকাছি এসেই কোন কথা না বলে আমার দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিল..."এটা দেখ।"

চেহারায় প্রশ্নবোধক চিণ্হ ফুটে উঠল আমার..."কি এটা ?"

"আরে আগে দেখওই না..."

আর কথা না বাড়িয়ে খামটা খুললাম আমি।একটু পড়েই বুঝতে পারলাম অয়ন এতদিন পর্যন্ত যে ব্যাপারটার অপেক্ষায় ছিল  তা পূরণ হতে যাচ্ছে ।পি.এইচ.ডি. করার জন্য অয়নকে বাইরের এক বিখ্যাত ইউনিভারসিটি আমন্ত্রণ জানিয়েছে! একবার পড়ে তো আমি বিশ্বাসই করতে পারলাম না।তাই দ্বিতীয়বার পড়লাম...

"নুপুর, শেষ পর্যন্ত আমার স্বপ্নটা সত্যি হতে যাচ্ছে।উফফ!আমি যে কি ভীষণ খুশি !ইচ্ছে করছে তোমাকে নিয়ে নেচে বেড়াই ..."উচ্ছ্বাস ঝরে পরছে ওর কথায় .........

 

কিন্তু কেন জানিনা একটু পর  মনটা খারাপ লাগা শুরু হল। ওকে ছাড়া আমার অনেক গুলো বছর থাকতে হবে এটা  চিন্তা করেই খারাপ লাগার শুরু।কোথায় আমার ভীষণ খুশি হওয়া উচিত তা না হয়ে বরং মন টা এমন করা শুরু করল!এত ভয়ঙ্কর স্বার্থপর কেন আমি বাবা!অথচ আমার উচিৎ অয়ন কে সাহায্য করা এসব ব্যাপারে । হোকনা তাতে কয়েকটা বছর একা একা থাকতে হলে.........

 

অয়ন কে বুঝতে দিলাম না আমি আমার মন খারাপের ব্যাপারটা ।সেলিব্রেসন এ যোগ দিলাম ওর সাথে।আজকে তো উৎসবের দিন! আমারই প্রিয় রেসিপি গুলো পছন্দ করা হল মেন্যুতে।হাসিখুশি ই থাকলাম পুরোটা সময়। 

দেখতে দেখতে দিনগুলো কোন ফাঁকে চলে গেল টেরও পেলাম না।অয়নের যাওয়ার দিন চলে এসেছে।পরশু ফ্লাইট।এই কয়েকটা মাস অয়ন অনেক ব্যস্ত ছিল সবকিছু নিয়ে ।আমিও ওর সাথে ছিলাম ওর কাজগুলো গুছিয়ে দিতে।অনেক কষ্ট লাগছে ওকে বিদায় জানাতে...

 

আজ অয়নের সাথে শেষবারের মত ঘুরতে গিয়েছিলাম। গত মাসগুলোতে কাগজপত্র গুছাতে গুছাতে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তেমন ।সব গোছগাছ শেষে শেষ পর্যন্ত সময় করতে পারলাম আমরা।

আসার সময় আমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল অয়ন। ওখানেই খুলতে যাচ্ছিলাম,অয়ন দিলনা।বাসায় যাওয়ার আগে খোলা একদম বারণ......

আমার আর তর সইছিল না।বাসায় পৌঁছে একটা মুহূর্ত অপেক্ষা না করে খুলে ফেললাম প্যাকেটটা।একটা শাড়ি আর সাথে একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো...

 

অয়নের লেখা চিঠি ।খুবই অবাক হলাম।অয়ন আমাকে কখনই চিঠি লিখেনি এর আগে।ওর প্রথম চিঠিটা পেলাম আজ।  

 

"নুপুর, 

আমার প্রথম চিঠি তোমার কাছে। কখনই চিঠি লিখিনি কাউকে।তোমাকেই প্রথম লিখছি আজ। আমার প্রথম আর শেষ ভালবাসা তুমি।তুমি জান এটা,তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছি সেদিন থেকেই তোমাকে ভালবাসি। তবে কতটা বেশি তা জানিনা।ভাবতেও পারিনি কখনও কাউকে এতোটা ভালবাসব।কিন্তু বাসি নুপুর, তোমাকে।আমার সমস্তটা জুড়ে কেবল তুমি।তুমিই যে আমার প্রেরণা তা কি তুমি জান?তোমাকে আসলে সেভাবে কখনো বলা হয়নি যে ।এই ব্যাপারটায় কেন যেন তোমার সাথে সহজ হতে পারিনা আমি। যখনই চিন্তা করেছি বলব,মনে হয়েছে তুমি হাসবে।কিন্তু আমি তোমাকেই ভীষণ ভালবাসি নুপুর।তোমাকে ছাড়া একটা মুহূর্তও কল্পনা করতে পারিনা।স্কলারসিপটা পাওয়ার পর খুশি হয়েছিলাম অনেক কিন্তু পরে অনেক মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এতদিন কাজের জন্য বুঝতে পারিনি,কিন্তু আজ বুঝতে পারছি তোমাকে ছেড়ে যাওয়াটা আমাকে কতটা কষ্ট দেবে। ভীষণ মিস করব যে তোমায়ে.....

 

বেশিদিন নয়, সুযোগ হয়ে গেলেই তোমাকে নিয়ে যাব আমার সাথে......অবশ্যই আমার বউ করে।আঙ্কেল আনটি জানেন সব... হ্যাঁও বলে দিয়েছেন।কেবল তোমার পালা বাকি। 

এনগেজমেন্টটা করে তোমাকে আমার বানিয়ে রেখে যেতে চাই যেন পরেরবার এসে তোমাকে আমার করে নিয়ে যেতে পারি।

আমার হতে রাজি আছতো তুমি?

অপেক্ষায় থাকব তোমার হ্যাঁ শোনার।যেমন সবসময় থাকি তোমার জন্য।

 

                                           অয়ন"

 

 

 

অঝরে জল গড়িয়ে পরছে আমার দু'গাল বেয়ে......এত আনন্দের কান্না কখনো কাঁদিনি আমি......! 

 

Share