তিন কন্যা -১

লিখেছেন - আফরিনা হোসেন রিমু | লেখাটি 1004 বার দেখা হয়েছে

" আমি একটা প্রেম করতে চাই 'নি'(আমার নাম) ...আমাকে একটা বয়ফ্রেন্ড খুঁজে দিস না তোরা,তোরা ভীষণ বাজে...উহুহুহুহুহু...ভেউভেউভেউভেউ!"রিদ্ধি চিৎকার করে কান্না শুরু করল আর বারবার রুমালে নাক মুছতে লাগল ।

 

 বিরাট এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফেললাম ওর সামনেই ।অবাক হবেন না বেশি আমার নি নাম শুনে । বারবার বলার পরেও কখনই আমার নিজের সুন্দর নামটা ধরে আমাকে ডাকবে না এই মেয়ে ।বাবা মা এত সখ করে নিলাঞ্জনা নামটা রেখেছিলেন। সেটাকে এই মেয়ে ছোট বানাতে বানাতে এখন শেষে শুধু  'নি ' তে এসে ঠেকে গেছে। কিছুদিন পর তো মনে হয় আমার আর কোন নামই থাকবেনা।পুরা ডিপার্টমেন্ট এ এখন আমি শুধু 'নি' নামে পরিচিত।মাঝে মাঝে স্যাররাও শুনে ফেলেন আর তখন আমাকে ব্যাখ্যা করতে হয় এর ইতিকথা।সব এই পুচকা মেয়েটার দোষ।

ভার্সিটি তে পড়া একটা মেয়ে যে কি পরিমান 'পুচকা' হতে পারে তার আদর্শ উদাহরণ অবশ্যই আমাদের রিদ্ধি।নিয়ম করে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কার্টুন দেখবে (তার টাইমিংটাও খুব জোশ,কোন কোন কার্টুন যেন রাতে দেখায় আর তার জন্য রিদ্ধি মনি ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাতে উঠে কার্টুন দেখে ফের ঘুমাতে যায়) আবার চেহারা আর কাজকর্মেও তার কার্টুন ভাব খুবই প্রবল।

ঠিক মত মোবাইলটাও ব্যবহার করতে শিখে নাই যে পুচকু,তার আজ প্রেম করার ইচ্ছা হলে মেজাজটা কতটা খারাপ হয় বলুন!

তবুও কিছু বললাম না।গত সপ্তাহে এই একই বিষয় নিয়ে কথা বলায় বিশাল এক ঝাড়ি দিয়ে দিয়েছিলাম ।তারপর আমার সাথে পুরা দুই দিন কোন কথাই বলেনাই ও। বান্ধবীদের জ্বালাতন করার ব্যাপারে সে পুরোপুরি সিদ্ধহস্ত।এমন রাগ লেগেছিল ভেবেছিলাম আর কথাই বলবনা এই পুচকার সাথে।কিন্তু ওকে এত ভালবাসি যে আমাকেই শেষ পর্যন্ত স্যরি বলতে হয়েছিল ফোন দিয়ে । 

তাই আজকেও যখন একই ব্যাপার নিয়ে আবার ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করল কিসুই বললাম না। শান্তিময় ব্যবস্থা ।ভাবলাম একটু পর যখন রিয়া এসে পরবে(আমি রিয়া আর রিদ্ধি সেই 'আসল' পুচকাকাল থেকেই তিন সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী-তিন কন্যা) তখন সব ঠিক হয়ে যাবে ।আমাকে পুরাপুরি মহা অবুঝ প্রমাণ করে দিয়ে রিয়া আসার পর রিদ্ধি কান্নার জোর আর বাড়িয়ে দিল।

আমি আর রিয়া পড়লাম মহা বিপদে।সামনে সেমিস্টার ফাইনাল।তার জন্যে একসাথে পড়তে আসাটার যে প্ল্যানটা ছিল তা পুরাই মাটি হতে যাচ্ছে ।তার উপর এই প্রেম ভালবাসা নিয়ে আমাদের দুই জনের স্ট্যাটাস আরও খারাপ।রিয়া তো কোনদিন ঐ দিকের কথা মাথায় ও আনেনাই,আর আমি বেচারি একবার এই বিপদজনক ফাঁদে পরে এমন ছেঁকা খেয়েছি যে শপথ করেছি এমনকি বিয়েও করবনা। এই দুই চরম 'আনএক্সপেরিএন্সড' মানুষের কাছে রিদ্ধি পাগলি কান্নার বন্যা বইয়ে দিচ্ছে।  

নানা ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করল রিয়া।কে শোনে কার কথা! রিদ্ধি ননস্টপ কেঁদেই যাচ্ছে। ওর একই কথা......"আগামগাসগা সব মেয়েদের একটা,দুইটা এমনকি তিনটা পর্যন্ত(!) বয়ফ্রেন্ড থাকতে পারলে আমার কেন থাকতে পারবেনা শুনি?সত্যি করে বল,আমি কি দেখতে অনেক বেশি খারাপ?উহুহুহুহুহুহুহুহুহু ............"  

কিভাবে বুঝাব একে! তারপর রিয়ার কাছ থেকে শুনলাম এ FM  এ 'লাভ স্টোরি' শুনতে শুনতে আর FB তে গল্প পড়তে পড়তে এর এমন ই দশা যে এর থেকে বাঁচার একটাই উপায়...যে করেই হোক একটা প্রেম করানোর ব্যবস্থা করে দিতে হবে।নাহলে নিজের লেখাপড়া তো যাবেই, সাথে আমাদের  মার্ক সীট গুলাতেও শুন্য না বসায় ছাড়বে না। 

 

তবে সামনে ফাইনাল হওয়াতে মনে হল এখন এসবে আমাদের জড়ানো উচিত হবেনা। তাই রিদ্ধি কে আমি আর রিয়া মিলে ভাল করে বুঝালাম অনেকক্ষণ যে ফাইনালটা দেয়ার পরপরই রিদ্ধিমনির জন্য একটা রাজপুত্রের মত ছেলে জোগাড় করব।ওকে প্রমিজ করলাম দুই জন।অনেকক্ষণ বুঝানোর  পর শেষ পর্যন্ত মানতে রাজি হল পুচকুটা। 

রিদ্ধিটা আসলে দেখতে ভারি মিষ্টি।এত বাচ্চা বাচ্চা লাগে মনেই হয়না কিছুদিন পরেই পাশটাশ করে বের হয়ে যাবে ।বাবা মার একমাত্র মেয়ে হওয়াতে খালা খালু ওকে একটু বেশিই আদর দিয়েছেন ।এখনও বাবা মায়ের কাছে রিদ্ধি ছোটই রয়ে গেছে(তবে সবাই মনে হয় বাবা মায়ের কাছে ছোটই থাকে)। ওর জন্মদিনে খালু এখনও বিশাল বড় এক পুতুল গিফট করেন। 

আসলে ও ঠিক মত বুঝেওনা ওর কেমন ব্যবহার করা উচিৎ ।খালা খালু এটা জানেন বলেই ছোটবেলা থেকে আমার আর রিয়ার উপর দায়িত্ব হচ্ছে ওকে সব জায়গায় দেখেশুনে রাখা।আমরা দুইজন ওকে অনেকটা ছোটবোনের মত দেখে রেখেছি। ওর সব আবদার পূরণ করার চেষ্টা করি সবসময় ।এই জন্য মাঝে মাঝে যখন রাত ১০ টা বেজে যাওয়ার পরও আমাদের নিয়ে ওর ড্রাইভ এ যেতে ইচ্ছা হয়,মানা করিনা।আমাদের বাবা মায়েরাও জানেন আমাদের কথা ভালমত।আমাদের বন্ধুত্বটা এমনই মজার আর সুন্দর।

 

যথারীতি আমাদের ফাইনাল শেষ হল।আমাদের মধ্যে ঐ পুচকুটাই সবচেয়ে ভাল স্টুডেন্ট,তাইর পরীক্ষাই সবচাইতে ভাল হল।আমাদেরটা হল কোন রকম।আমি আর রিয়া ভেবেছিলাম পরীক্ষার মধ্যে রিদ্ধি সব ভুলেটুলে খেয়ে বসে থাকবে।আবারো ভুল ধারণা করলাম ওর সম্পর্কে।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার তিন দিন এর মাথায় রিদ্ধি হুট করে আমার বাসায় এসে হাজির।

"এখনি রিয়া কে ফোন দে এখানে আসার জন্য।"রুম এ ঢুকতে না ঢুকতেই ধরাম করে ব্যাগটা আছাড় দিয়ে বলল রিদ্ধি।

রিয়া তখন ঢাকায় ছিলনা।আগের দিন রাতেই ছুটি পেয়ে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে চলে গেছে বাবা মা সহ।রিদ্ধি কে বলে যেতে পারেনি তাড়াহুড়ার জন্য।

"রিয়া তো ঢাকায় নাই রিদ্ধি।কাল রাতে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেল।বেশি তাড়াহুড়ায় তোকে ফোন দিতে পারেনি।"

"আচ্ছা ঠিক আছে, সমস্যা নাই।এখন তাহলে তুই একাই করবি।"

আমি জানতাম রিদ্ধি কি বলতে চাচ্ছে।তবুও এমনভাব করলাম যে কিছুই জানিনা।

"কি করব আমি?আজব!"

"তুই আবারো ভুলে গেসিশ না ইচ্ছা করে আমার কাছে লুকাতে চাচ্ছিশ শুনি?"রিদ্ধি রীতিমতো চিৎকার করল।

"আরে রিদ্ধিমনি, ব্যাপারটাতো একবার বল আমাকে।"

"তোরা দুইজন আমাকে প্রমিজ করেছিলি ,এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি?!তোরা খুব খারাপ বন্ধু আমার..."মুখ ভার দেখাল রিদ্ধির।

"ও...... ঐ ব্যাপার। আমি তো ভাবলাম কি না কি।"পাত্তা না দেয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু হল না।

"এখন তোরা তোদের প্রমিজ রাখবিনা তাইনা?" কাঁদো কাঁদো শোনালো রিদ্ধির কথাগুলা।

"রাখবতো।কখন বললাম রাখবনা। আচ্ছা,তুই একবার বল তোর কিরকম দরকার।"এটা বলার পরে নিজের কাছেই মনে হল যেন বাজার সদাই করতে যাচ্ছি কিছু।

তারপর রিদ্ধি শুরু করল।এবং টানা পনের মিনিট বলে গেল কোনরকম থামা ছাড়াই। এক বিরাট সিভি লিখা যাবে ওর ক্রাইটেরিয়া গুলো নিয়ে। বুঝতে পারলাম কপালে দুঃখ আছে।ওর পছন্দ মোতাবেক যদি খুঁজতে হয় তাহলে অন্তত ৬/৭ টা ছেলের দরকার।

এবারো কিছু বললাম না ওকে।বুঝতেও দিলাম না কি তীব্র হতাশ হয়েছি ওর কথা শুনে।কোনোমতে মুখে একটা ছোট হাসি আনলাম আর ওকে অভয় দিলাম সব আমার উপর ছেড়ে দিতে। 

শুরু হল আমার মিশন।একা একাই শুরু করলাম।রিয়া এসে যোগ দিল ২ দিন পর। চিন্তায় পড়ে গেলাম যে দুইদিন পর মানুষ না যেন আমাদের ধরে পাগলা গারদে ভরে দেয়।তবুও কাজ অব্যাহত রাখলাম। খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম কেউ আছে কিনা যে রিদ্ধি কে পছন্দ করে।নানা জায়গায় খোঁজ লাগালাম। প্রথমে তো ভার্সিটি এর বাকি ফ্রেন্ডরা হেসেই খুন।তবুও ওদের বুঝিয়েশুনিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি করালাম আমাদের সাহায্য করার জন্য।

পুরা ভার্সিটি সার্চ দেয়ার পর মাত্র দুইজন পাওয়া গেল যারা রিদ্ধি কে পছন্দ করে। আফসোস। রিদ্ধি যদি জানতে পারে তার শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যা, বাজি ধরে বলতে পারি টানা একদিন অঝোর ধারায় চোখের পানি সব শেষ করে ফেলবে।ওকে কিছুই জানতে দিলাম না।তবে রিদ্ধির খবর নেয়ার গতি কমল না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন এ আমাকে আর রিয়া কে পাগল করে ফেলল একটা হপ্তা।

রিদ্ধি কে যারা পছন্দ করে তাদের একজন রিয়াজ,আরেকজন ফাহিম।প্রথম ইয়ার থেকেই পছন্দ করে আসলেও রিদ্ধির পাগলামির কথা ভেবে কেউ ই আর এগুতে পারেনি।

প্রথমে আমরা ঠিক করলাম রিয়াজ কে বলব ।রিয়াজ ভাল ছেলে।পড়াশুনায় ও ভাল। তবে দেখতে মাঝারি রকম।ওকে প্রথম পছন্দ করার কারন আমি ব্যক্তিগতভাবে ফাহিমকে পছন্দ করিনা।

তবে সবদিক থেকেই  ফাহিম রিয়াজের তুলনায় ভাল।

খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম রিয়াজ আর রিদ্ধি কে নিয়ে পড়ে থাকেনি। কয়েকমাস হল অন্য কারো  হয়ে গেছে রিয়াজ।তাই আর ওকে না ঘাঁটানোর  সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আর রিয়া।

বাকি রইল ফাহিম।আমার খুবই অপছন্দের।বেশি ভাব নিয়ে চলে সবসময়, যেন কাউকে পাত্তা দেয়না।এও পড়াশুনায়  ভাল।ভাবটা আসলে নেয় ওর কবি কবি ভাবের জন্য ।আমি কবিদের আবার দুই চোখে দেখতে পারিনা কিনা তাই ফাহিমকে প্রথমে বলতে যাই নাই ।এমনি এক অতিভাবওয়ালা কবির প্রেমেই পড়েছিলাম একবার।সেখানে কি পরিণতি হয়েছিল আমার  তাতো আপনাদের আগেই বলেছি।

ফাহিম কে ফোন করে তাই রিয়া।

তারপর...........................তারপর আর বেশি কাহিনি নাই।রিয়া ফাহিম কে সব খুলে বলে। ফাহিমও রিয়াকে রিদ্ধির প্রতি ওর ভালবাসার কথা বলে যায়।অবাক হই জেনে যে এতদিন যত কবিতা লিখেছে সব আমার বুদ্ধু বান্ধবী রিদ্ধিকে নিয়ে। রিদ্ধির পাগলামিই নাকি বেশি টানে ফাহিমকে।  

আমিই নাহয় এক কবির কাছ থেকে ধোঁকা খেয়েছি,কিন্তু সব কবিই তো আর এমন হয়না।

..............................................................................................................................................................................................

সাত বছর পরের কথা।আমরা তিন প্রাণের বান্ধবী এখন তিন জায়গায়। প্রেম করার কিছুদিনের মধ্যেই রিদ্ধি ফাহিম বিয়ে করে।অদ্ভুত সুন্দর একটা জুটি ওদের। ভালবাসায় ওদের ঘর ভরে থাকে যেন । একটা মেয়ে হয়েছে রিদ্ধির।আমার আর রিয়ার নামের সাথে মিলিয়ে মেয়ের ডাকনাম রেখেছে রিনি। তবে সেই,আমাকে যেমন ডাকত তেমন মেয়েকেও সর্ট করে ডাকে 'নি'।

রিয়াও বিয়ে করেছে দুই বছর আগে।বরের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় সেট হয়ে গেছে বছরখানেক হল।

 

...........................আর আমার কথা??সে আরেক ইতিহাস।আর জায়গা নাই লেখার।আরেকদিন বলব না হয়.....................  

 

 

Share