আত্মার কথা শুনুন

লিখেছেন - আফরিনা হোসেন রিমু | লেখাটি 752 বার দেখা হয়েছে

ছিমছাম ছোট্ট সুন্দর সাজানো একটা গ্রাম আমাদের। শহরের বড় বড় গাড়িগুলো যে পিচঢালা চওড়া রাস্তাটা দিয়ে হুস হুস করে বেরিয়ে যায়, তার থেকে মাত্র শ দুয়েক কদম এগুলেই আমার বাড়ি। বড় রাস্তাটা থেকে ছোট একটা পায়ে চলা পথ আমাদের গ্রামটার দিকে এগিয়ে গেছে, ঠিক আমাদের উঠোনটা ঘেঁষেই। ছোট ছোট নুড়ি বিছানো কাঁচা পথটা উঠোনের যে জায়গাটায় মিলেছে, ওখানে গেলে টলটলে পানির মাছ ভরা পুকুরটা সহজেই চোখে পড়ে। কতশত দিন পার করে দিয়েছি ওটাতে ঢিল ছুঁড়ে! বর্ষায় বৃষ্টির  অবিরাম টুপটাপ ঝরে পড়া আর মৎস্যকূলের মনের আনন্দে ঝাঁপাঝাঁপি করা দেখতে যে আমার কি ভাল লাগত!

 

 

এক পা এক পা করে এগুচ্ছি ঐ পথ ধরে, আর মনে পড়ছে মায়ের প্রিয় মুখটা। মাকে মিথ্যা বলেছিলাম কাল। কিন্তু ঐ ছোট্ট মিথ্যাটা না  বললে যে মা আমাকে আজকে আর যেতেই দিতনা। মায়ের আঁচল থেকে বাইরে যাওয়ার সুযোগ তো তেমন হয়না। মা আমার বলে,যা দৌড়োদৌড়ি ঝাঁপাঝাঁপি করার এই গ্রামের সীমানার মধ্যেই করে ফেলবি। খবরদার, তোকে যেন বাইরে যেতে না দেখি।

 

 

মাকে কেমন করে বুঝাই,তা কি হয় নাকি? সবাই ঢ্যাংঢ্যাং করে সেই কোথাকার কোন মাঠে গিয়ে খেলাধুলো করে আসবে,আর আমি কেবল চেয়ে চেয়ে দেখব! মাকে তাই বুঝাতেও যাইনি আজ। কতক্ষণই আর থাকব। এটুকু সময় না থাকলে মা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেনা।

 

 

 

 

পুকুরটা পেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ল বড় বাড়ির লাল রঙের ইয়া শিংওয়ালা গরুটা। আমাদের এরকম তিন চারটে ইয়া মস্ত আকারের গরু আছে।কিন্তু কেন যেন এই বিশাল দর্শন গরুটার সাথেই আমার বেশি সখ্য। আমাকে দেখলেই হল, এদিক ওদিক তুমুল বেগে মাথা নাড়ানো শুরু হয়ে যাবে, আর সেই সাথে গলা ছেড়ে ডাকাডাকি। এমন গুরুগম্ভীর ভয়ঙ্কর 'হাম্বা' ডাক এই গ্রামের আর একটা গোবৎসের সাধ্য নেই ডাকতে পারে। আমি যখনই পারি বাসি ভাতের ফ্যানটুকু, কখনো ঘাস বিচালি দিয়ে পেটপূজো করাই এই বাজখাঁই গলার প্রাণীটাকে।

 

 

 

 

কিন্তু আজ ওটা যেন একদমই সমাদর করলনা আমায়। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলাম অথচ দেখে মনেই হলনা আমাকে দেখতে পেয়েছে। কোন কারণে দুঃখ পেল নাকি আমার কাছ থেকে যে মন ভার করে আছে?

 

 

বেশি ঘাঁটানোর সময় নেই আজকে। যত তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছানো যায় ততই মঙ্গল। মা এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছে। এতক্ষণ মাকে জানান না দিয়ে কখনো বাইরে থাকি নি।

 

 

 

 

আজ সব কিছুই বড় বেশি নিস্তব্ধ। কোথাও কোন শব্দ নেই যেন। নৈশব্দের জাল পড়ে আছে সবাই। শীতকালও তো নয় বাবা,যে কাঁথামুড়ি দিয়ে সবাই জম্পেশ ঘুম দিচ্ছে। সব কেমন অন্যরকম লাগছে। গণ্ডগোলটা ধরতে পারছিনা।

 

 

 

এতকিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে বাড়ির উঠোনে পা দিয়ে ফেলেছি, খেয়ালই করিনি। কাঁচা পায়ে হাঁটা পথটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেটাই আমাদের বাড়ি। মোট তিন খানা ঘর। উঠোনটা পেরুলেই প্রথমে দেখা যায় মায়ের হেঁশেল। আমার স্নেহময়ি মা সারাদিন মাটি ধুলো ধোঁয়া এর সাথে খেলা করে মজার মজার রান্না করে আমাদের জন্য। দুটি মাত্র ভাই বন আমরা। কিন্তু এই দুই বিচ্ছুকেই সামলাতে মায়ের রাত দিন পার হয়ে যায়। কখনো এটা খাবনা,আবার কখনো ওটা খাবনা, এই চলতে থাকে।

 

 

বাঁশের বড় বড় ডাণ্ডার সাথে বেত মেশানো বিরাট সদর দরজাটা থেকে যে বড় কাঁচা পাকা বাড়ীটা চোখে পড়ে,  বাবা মায়ের শোবার ঘর। আমার ছোট বোনটাও থাকে ওখানে। আমার ছোট্ট কিন্তু ভীষণ দুষ্টু বোনটাকে আমি অনেক ভালবাসি। আজ যাওয়ার আগে ওকেও বলে যাইনি।আর এই বাড়িটার পাশে যে ছোট একটা ঘর দেখা জায়,ওটা আমার ঘর। আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

 

 

মনে করতে লাগলাম বাড়ি থেকে পালিয়ে বন্ধুদের সাথে খেলা দেখতে চলে যাওয়া, বাবা মাকে কিছু না বলে, সেই হইহল্লা করে একসাথে একই ট্রাকের পিছনে ছুটে চলা......... এবং ক্রিকেট ম্যাচটায় জিতে আবারো চিৎকার করে দুনিয়া তোলপাড় করতে করতে বাড়িতে ফিরতে থাকা.........সব। বাবা মাকে না বলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি,তাইতো এত কাহিনি হয়ে গেল আজকে। সব কিছু সুন্দর করে এগুচ্ছিল,কিন্তু একসময় সব ওলটপালট হয়ে গেল। কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই হঠাৎ তাই আমাদের নিয়ে বিপুল বিক্রমে ছুটে চলা ট্রাকটা উলটো হয়ে যাওয়া শুরু করল। খুব বেশি হলে সেকেন্ড দুই এর ব্যাপার, সব বন্ধু সহ ট্রাকটা পাশের পানি ভরা খাদের মত মাজা পুকুরটায় পড়ে গেল। অন্ধকার ছেয়ে গেল চারপাশে। প্রাণপণ চেষ্টা করছি কোনোমতে বের হয়ে আসি এই নিকষ কাল অন্ধকার থেকে।কানে ভেসে আসছে অনেক চিৎকার। বাঁচার আকুতি সবার মধ্যে। ট্রাকটা উলটে যাওয়ায় আমরা সবাই আটকা পড়ে গেছি এই ছোট জায়গায়। যে যার মত হাতপা ছুঁড়ছে। ঐ অসম্ভব হতাশার বদ্ধ জায়গাটা থেকে সবাই বেরিয়ে পড়তে চায়।

 

 

 

বাঁচার আকুতি আমার মধ্যেও জেগে উঠেছে। কিন্তু আমাদের এত্তটুকুন শরীরের কি সাধ্য ঐ বিশাল দানব কে সরিয়ে বেরিয়ে আসব। আস্তে আস্তে পানিতে ডুবে যাচ্ছি আমি, আমরা। একেকটা মুহূর্ত কে মনে হচ্ছে একেকটা ঘণ্টা। নিশ্বাস নেয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছে ।

 

 

 

আর বেশিক্ষণ নেই। বাঁচার চেষ্টা করেছিলাম। বুঝতে পারলাম  বিধাতা আমার আয়ুরেখা এতটুকুই লম্বা করেছিলেন। কি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! শ্বাস নেয়া যে এত কষ্টকর কখনো বুঝিনি। মনে পড়ে যাচ্ছে জীবনের সব আনন্দময় ঘটনাগুলো। ছোট বোনটার সাথে খুনসুটি, বন্ধুদের সাথে বাঁধভাঙা হাসিঠাট্টা আর ছুটে বেড়ানো গ্রামের এমাথা থেকে ওমাথা, মাকে জ্বালানো আবার মায়ের হাতে দুধ গুড়ে মাখান দেয়া ভাত খাওয়া, বাবার আদর মাখা টেনিস বল উপহার পাওয়া। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার।

 

 

 

একসময় শেষ হয়ে গেল সব। সব শব্দ চুপ হয়ে গেল হঠাৎ করে। আর কোন আলোড়ন নেই পানিতে। যেন অনেক দিন ঘুমের পর জেগে উঠলাম আজকে এমন মনে হল। আর কি আশ্চর্য, নিজেকে আবিষ্কার করলাম উলটে যাওয়া ট্রাকটার বাইরে। কেমন করে ঐ মৃত্যুফাঁদ থেকে বের হলাম বুঝতে পারলাম না। অনেক মানুষ হুটোপুটি করছে উলটে যাওয়া যানটার আশেপাশে, পাড়েও অনেক মানুষের ভিড়। কি যেন পর পর সাজানো রাখা আছে পাড়ের ওখানে। তার চারপাশেই ইতিপাতি খুঁজে ফিরছে মানুষজন।

 

 

 

 

আমার আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলাম না। এক নিশ্বাসে ঝেড়ে দৌড় লাগালাম বাড়ির পথে। আর কখনো বাবা মা কে না বলে কিছু করতে যাবনা । মা বলে, দুষ্টু ছেলেরা সবসময় বিপদে পরে। কিন্তু মা কখনো এটা তো বলেনি, এত বড় গাড়িটা যে চালাচ্ছিল, সে ও এমন বিপদে ফেলতে পারে আমাদের।  

 

 

 

এতকিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে বাড়ির উঠোনে পা দিয়ে ফেলেছি, খেয়ালই করিনি। কিন্তু আজ উঠোনে  পা দিতে গিয়েই থমকে যেতে হল।অনেক মানুষের জটলা আমাদের বাড়ীটা জুড়ে। যেন খুব বাজে কিছু হয়েছে।বাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে। কোন শব্দ নেই। সবাই যেন কোন কারণে শব্দ করা ভুলে গেছে। গাছের পাতাগুলো নড়ছে না পর্যন্ত। উঠোনের ডান দিকের বটগাছটার মগডালে বসে সারাদিন আপন মনে গাইতে থাকা বউ কথা কউ পাখিটাও কোন শব্দ করছেনা।

 

কিছু ভাল লাগছে না আমার। কোথাও কোন বড় সমস্যা হয়েছে। বুঝতে পারছিনা। উঠোনের যে জায়গাটায় মানুষের সবচেয়ে বেশি ভিড়,সেখানেই আমার মাকে দেখতে পেলাম। অঝোর ধারায় জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে মায়ের গাল জুড়ে। থেকে থেকে বিলাপের মত করে উঠছেন কিন্তু শুধু শব্দটাই শুনতে পাচ্ছিলাম না।

 

মা কিছু একটা হাতড়ে ফিরছেন সমানে। মায়ের সামনে একটা খাটিয়ার মত রাখা। কে আবার মারা গেল! সাদা কাপড়ে জড়ানো একটা দেহ আছে ওটাতে, বুঝা যায়। আমার বুক ঢিপ ঢিপ করা শুরু করল।কাকে না যেন দেখতে হবে।

 

 

 

সামনে দেখতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল,আমার শ্বাস তাতে বন্ধ হয়ে আসল।  তবু আরও সামনে গেলাম ঠিক মত দেখার জন্য। না, ভুল দেখছিনা। খাটিয়ায় শোয়ানো আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে মোড়া দেহটা আর কারো নয়, আমারই! ঐতো দেখা যায়, কি নিশ্চিন্ত প্রশান্তিময় আমি। নিষ্পাপ চেহারাটা নিয়ে চোখদুটো মুদে আছি,যেন এখনি ডাক দিলে জেগে উঠবো। আমার নাকের ফুটোদুটোতে দুটুকরো তুলো  গুঁজে দেয়া। আমার মা আমাকে ক্ষণে ক্ষণে দেখছে, তার চোখে বিস্ময়। বিশ্বাস করছে না মা, তার সোনার টুকরো ছেলেটা এমন নিস্তব্ধ হয়ে আছে, আর কোন দিন ও জেগে না উঠে মা ডেকে উঠার সম্ভাবনা শেষ করে দিয়ে।

 

 

 

তাহলে আমি কে! আমি যেমন কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছিনা,তেমনি আমাকেও কেউ শুনতে পাচ্ছেনা । কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, আমাকে কেউ দেখতেও পাচ্ছেনা। কাছে চলে আসলাম, নিজের মত দেখতে দেহটাকে একটু ছুঁয়ে দিতে।আশ্চর্য, ছুঁতে পারলাম না।

 

 

আমি কি তাহলে..............................মরে গেছি? তাই কি ঐ উলটে পড়া ট্রাকটা থেকে এত সহজেই বের হয়ে আসতে পারলাম? তাইতো, নাহলে আমার প্রিয় মা কার জন্য কেঁদে যাচ্ছেন! উঠোনের আরেক কোনায় আছড়ে পরেছেন আমার বাবা,সে কার জন্য?

 

 

 

ভীষণ অসহায় লাগল নিজেকে। আর কখনো আমার দৌড়ানো হবেনা এই উঠোনটা জুড়ে। আর কখনো বউ কথা কউ এর ডাক শুনে জেগে উঠবো না আমি। আর কখনো শব্দ শুনবনা, কাউকে ছুঁয়ে যাবনা।

 

 

কিন্তু যাদের জন্য এত তাড়াতাড়ি এই মায়ার জগত ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হল,তাদের কি কিছু হবে? না তারা দিব্বি হেঁটে বেড়াবে পৃথিবীর বুকে, আরও অনেক বাবা মায়ের দিনগুলোকে কান্নাময় করতে!

 

 

 

 

###################

 

( অনেক আগের একটা লেখা এটি... তারিখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে।

 

১১ জুলাই,২০১১... প্রতিদিনের মতই খবরের চ্যানেলগুলো উল্টে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই মাথার উপর বজ্রপাতের মত একটা খবর শুনতে পেলাম। খেলা দেখা শেষে বাড়ির পথে চলতে থাকা প্রায় ৪০ টি শিশুকে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে।

 

কয়েকটা দিন খুবই মন খারাপ ছিল। তখন এই লেখাটা লিখি। সেই মর্মান্তিক ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় দেয়া হল গত বৃহস্পতিবার ( ৮ ডিসেম্বর, ২০১১)। সেদিন যমদূতের মত হাজির হয়ে বাসের সহকারী হয়ে গিয়েছিল চালক... নিজে পালিয়ে গেলেও এতগুলো কচি তরতাজা প্রাণকে ঝড়িয়ে দিয়েছে...

 

সুষ্ঠু বিচার হয়েছে কিনা জানিনা। অর্ধশত প্রাণের হন্তারক হয়েও মাত্র ৫ বছর শাস্তি দেয়া হয়েছে মফিজুর রহমানকে। বিচারকের ভাষ্য, " সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছে"। হয়তোবা আইনেই  এর বেশি শাস্তি নেই। যেই দেশে অপরাধ করার পরেও উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার এখতিয়ার থাকে না, সেই দেশকে নিয়ে মাঝে মাঝে অনেক দুঃখ হয়, কষ্ট হয়।

 

তবুও তো, অনেক অনেক মামলার ভিড়ে এই মামলাটার যে দ্রুত নিষ্পত্তি হল, এই ব্যাপারে কিছুটা হলেও একটু শান্তি পাচ্ছি।

 

বাচ্চাগুলোকে আমরা আর ফেরত পাব না। মিরসরাই নামক অদৃষ্টের নিয়তির শিকার জায়গাটির একটা প্রজন্ম "নেই" হয়ে গেল। অপূরণীয় এই ক্ষতি আমরা কখনোই পুষিয়ে দিতে পারব না।

 

শুধু মন থেকে প্রার্থনা,না ফেরার দেশে এইসব শিশু ভাল থাকুক।

 

আর...

 

......... প্রার্থনা, আর কোন কচি প্রাণকেই যেন এমন করে ঝরে যেতে না হয়... আর কোন মায়ের বুক যেন খালি না হয়... আর কোনদিন পৃথিবীকে যেন শুনতে না হয়... তার ভবিষ্যৎ সম্পদগুলোকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি...  )

 

Share