অপরিচিতা এবং মায়াবতী

লিখেছেন - আফরিনা হোসেন রিমু | লেখাটি 1080 বার দেখা হয়েছে

পনের বছর আগে তাঁকে প্রথম দেখি।             

 

দশ বছরের এই আমি শৈশবটাকে অগ্রাহ্য করে সারা গ্রাম দৌড়ে বেড়াই তখন। কোনকিছুর পরোয়া নেই তখন। থামতে বললে থামি না, আরও দৌড়ে চলি। দৌড়ে দৌড়ে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি, সূর্য পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঢলে পড়ে,আমার ছোটা থামে না। হাঁটুর ছাল কখনোই আস্ত দেখিনি, গোল একটা লাল জায়গা সবসময়ই রয়ে যায়, শুকোতে না শুকোতেই আবার নতুন করে চামড়া উঠে যায়।   

 

 

গ্রামের বাড়িগুলো যেমন হয়, এই আলো তো এই অন্ধকার। বাড়ির পাশের বিশাল বাঁশঝাড়টাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। দুপুরের প্রখর রৌদ্রেও সেখানে ঘোর অন্ধকার। কেন যেন মনে হয়, কোন অদ্ভুত আর অপার রহস্য লুকিয়ে আছে সেই অন্ধকারের ভিতরে। কেউ সহজে যেতে সাহস করে না ওদিকটায়। নিষিদ্ধ নিঃশব্দ জায়গাটাকে ঘিরে থাকে।

 

কিন্তু পাখিরা, মনের আনন্দে সেখানে সংসার পাতে, টুনটুন করে গান গায়। পাখিদের এই রাজত্বে কারো সাহস নেই উঁকিঝুঁকি মারার। শুধু তিনজন ছাড়া...  আমি, রাহি আর তপু..

 

এমনই চলছিল দিন, স্কুল থেকে এসেই বাঁশবাগানের ভেতরটায় আরামসে ঘুরে বেড়ানো, আর পাখিগুলোকে জ্বালিয়ে মারা, আমাদের নিত্যদিনের কাজ। খাওয়া দাওয়ারও সময় হতো না তখন।  

 

সেইদিনটাও একইরকম। কিছু না ভেবেই সেই নিষিদ্ধ জগতে যেখানে আমাদের অবাধ যাতায়াত। আমাদের আটকায় কার সাধ্য!!

 

রাহি আর তপু একটু পেছনে ছিল সেদিন। দলনেত্রী আমি, তাই আমাকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হয়। কোয়েলের বাসায় ঢুঁ মেরে ডিম চুরি করে আনতে হবে, আজকের মিশন। এগুচ্ছি।   

 

শ্বাস বন্ধ করে পিছন পিছন আসছে ওরা। টুঁ শব্দটা করছে না কেউ। সবাই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে। শব্দ হলেই সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে যাবে যেন।

 

হঠাৎই, সামনে একটা কিছুর অস্তিত্ব টের পেলাম। বুঝতে না বুঝতেই দেখতে পেলাম ওটাকে...

 

সামনে ফণা তুলে হিসহিসিয়ে আমার দিকেই ঠাণ্ডা চোখ মেলে চেয়ে আছে গোখরাটা। শরীর দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। পা জমে গেছে। এগুতে পারছিনা, পিছাতেও না।  

 

ফণাটা এগিয়ে আসতে লাগল। রাহি আর তপু ততক্ষণে পগাঢ় পার হয়ে গেছে। হতচ্ছাড়াগুলো এই ঘোরতর সময়ে আমার কথা একবারও ভাবল না। আমিও কিছু ভাবছি না। সব যেন থেমে গিয়েছে। আমার চিন্তাও বেশি দূর যাচ্ছে না। কিন্তু কোথায় যেন একটা স্বস্তি পাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার কিছুই হবে না। এমনটা কেন মনে হচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না নিজে থেকেই।

 

সব নিস্তব্ধ যেন। পাখিদের কলকাকলি থেমে গেছে। আমি স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি সামনে।   

 

একটা হাসিমাখা মুখ,  খুবই অদ্ভুতভাবে হাসছে আমারই দিকে তাকিয়ে। সেই হাসিতে ভীষণ মায়া। অদ্ভুত সুন্দর চোখগুলো মেলে আমারই দিকে তাকিয়ে আছে সেই মুখ। আজব একটা অনুভূতি হচ্ছে, সেই অনুভুতি প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। আমি সেই মায়াময় চোখের তীব্র দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারছি না।

 

গোখরাটাও যেন বুঝে গেল, কোন অপার্থিব কিছু আছে এখানে। কখনোই যা হয় না, সাপটা তার দিক পরিবর্তন করে, আপনাআপনি।  সামনে তাকালাম। আশ্চর্য, সেই চেহারা, গায়েব।     তাঁকে আরও অনেকবার দেখেছি এরপর। কখনো কখনো নির্ঘুম রাতগুলোতে,দেখতে পেতাম তাঁকে। জানালার পাশে অদ্ভুত মায়াময়  হাসি নিয়ে  দাঁড়িয়ে থাকত সেই নারী। কেন যেন,ভয় পেতাম না। কাউকে বলতামও না। মনে হতো, বললেই হারিয়ে যাবে, কখনো খুঁজে পাব না আর।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর যখন দোতলা বাসটা একদিন পিষে ফেলতে গেল আমাকে, সেই হাসিমাখা মুখখানা দেখেছি। আশ্চর্যজনকভাবে, সেদিনও আমি অক্ষতভাবে বেঁচে ফিরি।

 

একা একাই , অনেকদিন খুঁজে ফিরেছি সেই চেহারাকে। দুঃখজনক হলেও, কখনোই আমার ইচ্ছায় তাঁকে পাইনি। বিপদে কেন যেন সবসময় পেতাম, মাঝে মাঝে রাতের আঁধারে। এছাড়া পুরোটা সময়, কোথাও পেতাম না সেই প্রিয় হাসি।   

 

আমার জীবনটা বদলে যাওয়ার তখনো বাকি ছিল। একদিন বাবার পুরনো দিনের বাক্সপেটরা গুছাতে গিয়ে অনেকগুলো ছবি পাই। কৌতূহল দমাতে পারিনি। উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ আটকে যায়।

 

নিঃশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে আসে আমার। সেই মুখ, তার মুখে লেগে থাকা হাসি।  মাকে দেখিনি। জানানো হয়েছিল, আমায় জন্ম দিতে গিয়ে মা মারা গেছেন। কিন্তু আজ, অনেকদিন পর, এই ছবির সূত্র ধরেই জানতে পারলাম, মারা যান নি মা। মানসিক বিকৃতি দেখা দিয়েছিল তাঁর। আমাকে সহ্য করতে পারতেন না, খুন করে ফেলার একটা প্রবল মানসিকতা চেপেছিল তাঁর মঝে।      চট্টগ্রামের একটা ছোট্ট নার্সিং রুমে একা একা এতোগুলো বছর কাটাচ্ছেন আমার মা। সবার ভীষণ আদরের এই আমাকে বাঁচাতে গিয়ে মাকে ঠেলে দেয়া হয়েছে অন্ধকারের জীবনে।

 

 

সেই হাসিমাখা মুখটি... আমার মায়ের।   

 

 

 

কিছুদিন ব্যাপারটা অনেক ভাবিয়েছে আমাকে। যাঁকে কখনো দেখিইনি, কেমন করে তাঁকে কল্পনা করে নিলাম। কেমন করে সেই চেহারা বারবার আমার সামনে চলে এসেছে, খুঁজেছি উত্তর।  

 

কেউ জবাব দিতে পারেনি। কিছু প্রশ্নের কোন জবাব থাকে না।

 

 

 

####

 

 

 

মাকে এখন প্রায়ই দেখতে যাই। ঢাকা থেকে শতমাইল পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের সেই ছোট্ট নার্সিং হোমটায় যখনই ঢুকি, আমি তাঁর অস্তিত্ব টের পাই।   সাদা রঙের মলিন হয়ে যাওয়া দেওয়ালের গায়ে মা ঠেস দিয়ে বসা থাকে, জটাধারী এলোমেলো চুলের আমার মায়ের চোখে তখন অপার শূন্যতা।   

 

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি মায়ের দিকে। শূন্যু সেই দৃষ্টি আমাকে ভীষণ টানে। কিছুই থাকে না, কিন্তু তবুও, কেন যেন মনে হয় মায়ের চোখে আমি ভালোবাসা দেখতে পাই... শুধুই আমার জন্য সেই ভালোবাসা; অথবা প্রায়শ্চিত্ত।  আর মাঝে মাঝেই তিনি ফিরে আসেন, মুহূর্তখানেকের জন্য। কেউ বিশ্বাস করবে না, কিন্তু আমি জানি, মা আমাকে চিনতে পারেন। মায়ের মুখে লেগে থাকে সেই অদ্ভুত হাসি।

 

ওই চেহারার রহস্য আর খুঁজতে যাই নি কখনো। সেই মায়াময় হাসি অগ্রাহ্য করার ক্ষমতাই যে নেই আমার।

 

 

 

Share